ঈদের চাদ ক্রিসমাস ট্রি ও অপরাধী ঘুঘু পাখি
এ বছর মাত্র চার দিনের ব্যবধানে দুটি বড় ধর্মীয় উৎসব হতে চলেছে। একটি মুসলমানদের ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ, অন্যটি ক্রিশ্চিয়ানদের ক্রিসমাস ডে বা বড়দিন। দুটি উৎসব কাছাকাছি সময় হওয়াতে যে ধরনের বড় মাপের আয়োজন চোখে পড়ার কথা ছিল এবার সেটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ দেশ জুড়ে অর্থনৈতিক মন্দা ও সাম্প্রতিক সময়ে ঘূর্ণিঝড় সিডরের হামলা আনন্দের মধ্যে বিষাদ ছড়িয়ে দিয়েছে। তারপরও দুই সম্প্রদায়ের মানুষই সাধ্যমতো উৎসব দুটি পালন করার চেষ্টা করছেন।
এতো বাধা বা ঝড়-ঝঞ্ঝা পেরিয়েও এ উপমহাদেশে বাংলাদেশ হলো প্রধান অসাম্প্রদায়িক দেশ। ইনডিয়াতে মুসলমানদের বঞ্চিত হওয়ার কাহিনী নতুন কোনো ঘটনা নয়। সেখানকার জাতপ্রথার কারণে এখনো অসংখ্য মানুষ সামাজিকভাবে নির্যাতিত হচ্ছেন। পাকিস্তানে গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব দেশটিকে কখনোই মানসিকভাবে এক হতে দেয়নি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশের যে অসাম্প্রদায়িক চরিত্র তৈরি হয়েছে, তা পুরো অঞ্চলের জন্যই ব্যতিক্রমী ঘটনা।
সম্প্রতি বাংলাদেশে ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় ব্যক্তি আর্চ বিশপ পৌলিনুস কস্তা বলেছেন, বাংলাদেশে সৌভ্রাতৃত্বের সেতুবন্ধনই হলো আমাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো। এসব অনুষ্ঠান একে অন্যকে আরো বেশি আপন করে নেয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে দেয়।
এর প্রমাণ কিন্তু সব সময়ই দেখা যাচ্ছে। মুসলমানদের উৎসবে যেমন অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন, তেমনি হিন্দু বা ক্রিশ্চিয়ান কিংবা বৌদ্ধদের উৎসবেও একই ঘটনা ঘটছে। মুসলমানদের ঈদে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষ পায়েস বা শবে বরাতের হালুয়া খেতে যান, তেমনি দুর্গা পূজায় যে ভিড় হয় তার একটি বড় অংশই থাকে মুসলমানসহ অন্য সম্প্রদায়ের। ক্রিশ্চিয়ানদের উৎসবে গিয়ে কিভাবে ক্রিসমাস ট্রি সাজানো হলো তা যেমন অনেকে দেখতে যান, তেমনি বৌদ্ধদের বুদ্ধপূর্ণিমা বা কঠিন চীবর দান উৎসবে ভিন্ন সম্প্রদায়ের উপস্থিতি সহজ এবং সাধারণ ঘটনা, যা আশপাশের দেশগুলোতে অসম্ভব ও অবাস্তব।
বাংলাদেশকে একটি সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত করে তুলতে যারা বিভিন্ন প্রচারণা চালিয়েছেন বা এখনো কৌশলে চালাচ্ছেনÑ এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, তারা সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়েই ঘটনাগুলো ঘটিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ এখনো ধর্মীয় পরিচয়কে মুখ্য হিসেবে বিবেচনা করে না। এর বড় প্রমাণ ঘূর্ণিঝড় সিডরের হামলার পর আবারো পাওয়া গেল।
বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঘটে যাওয়া সিডরে কোন সম্প্রদায়ের মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সেটা কিন্তু কেউ দেখেননি। যারা যেভাবে পেরেছেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ক্রিশ্চিয়ান সম্প্রদায় সিডর-পরবর্তী সময়ে ৩০ হাজার ডলার সাহায্য করেছেন। মুসলমানদের অনেকেই এবার কোরবানির অর্থ দিয়ে দিচ্ছেন উপদ্রুত এলাকায়। হিন্দু ও বৌদ্ধ সম্প্রদায় এগিয়ে এসেছে যার যার সাধ্য অনুসারে। কারণ এ দেশের মানুষের ভেতর অসাম্প্রদায়িক চেতনা কোনো দেখানো বিষয় নয়, তা সবাই হৃদয়ে লালন করেন। সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বৌদ্ধ মহাবিহারের অধ্যক্ষ শুদ্ধানন্দ মহাথেরো বলেছেন, জাতপাতের বিচার করা উচিত নয়। আমার প্রথম পরিচয় আমি মানুষ। মুসলিম, হিন্দু, ক্রিশ্চিয়ান, বৌদ্ধÑ এ মনোভাব নিয়ে আমরা যেন গড়ে না উঠি।
বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে বিভিন্ন ধর্মীয় পরিচয় থাকলেও প্রায় একই এথনিক গোষ্ঠী হওয়ার কারণে এখানকার মানুষের আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না সব একই ধরনের। এখানে কখনো ধর্ম এসে দেয়াল তুলতে পারে না; বরং ধর্মীয় উৎসবগুলোর পরিধি এবং দৃষ্টিভঙ্গিতে আসছে ব্যতিক্রমী চিন্তার ছাপ।
গত ছয় বছর ধরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের অনেক সদস্যই বান্দরবানে লামার পার্বত্য এলাকার মানুষের সঙ্গে কোরবানির ঈদ পালন করছেন। এতে করে সেসব এলাকার মানুষ মাংস খাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অনেক পাহাড়ি বা স্থানীয় বাঙালি পরিবার বছরে এই একটি দিনই মাংস খাওয়ার সুযোগ পেয়ে থাকেন। গত বছর কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সে এলাকায় ৪৮টি গরু, চারটি ভেড়া ও একটি গয়াল কোরবানি দিয়ে ঈদের দিন ৩ হাজার ১৬৫টি পাহাড়ি ও বাঙালি পরিবারের ভেতর ৫ হাজার ৬৭৮ কেজি মাংস বিতরণ করেছেন।
সামনের কোরবানির ঈদ ও ক্রিশ্চিয়ানদের বড়দিন ধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনকে আরো বেশি দৃঢ় করবে। ঈদের চাদ দেখার আনন্দের পাশাপাশি ক্রিসমাস ট্রি সাজানোর ভালো লাগা আমাদের সবার মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু গোষ্ঠীগত বা সাংগঠনিক পর্যায়ে আমরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে যা করতে পারছি, রাষ্ট্রীয়ভাবে সে আয়োজনে ব্যর্থ হচ্ছি। সেভাবে সুযোগ তৈরি করে দিতেও ব্যর্থতা দেখা দিচ্ছে।
এ উৎসবের দিনগুলোতে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের অতিরিক্ত দাম, প্রয়োজনীয় নাগরিক সুবিধায় বিরতিহীন বাধা, অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা উৎসব পালনে মানুষের আনন্দকে শুকিয়ে ফেলছে। এ দেশের মানুষের প্রধান খাবার ভাত। সেই ভাত অর্থাৎ চালের ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে। চালের দাম এ যাবৎকালের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। সাধারণ মানুষ যেসব জিনিস নিয়মিত কেনেন তার মধ্যে চালকে সবচেয়ে গুরুত্ব দেয়া হয়। কারণ চালের দাম বেড়ে যাওয়া মানেই সার্বিকভাবে মানুষকে সঙ্কটে ফেলে দেয়া। রাজনৈতিক সরকারগুলো তাদের পাচ বছরের শাসনে যেখানে চালের দাম পঞ্চাশ পয়সা থেকে দুই-তিন টাকা বাড়তে দিয়েছে, সেখানে গত এক সপ্তাহেই চালের দাম বেড়েছে কেজিপ্রতি দুই থেকে তিন টাকা। চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে উৎসবের আনন্দ কমে যেতে থাকে। প্রতিটি পণ্যের দাম বাড়ায় এবার অতিথি আপ্যায়ন করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
দেশে যে অর্থনৈতিক মন্দা চলছে তাতে করে অনেকের পক্ষে এবার ঈদ করা বা কোরবানি দেয়া কিংবা যথাযথভাবে বড়দিন পালন করা সম্ভব হচ্ছে না। গরুর হাটে অনেক কালো মুখ সে বিষয়টিই বুঝিয়ে দিচ্ছে। উৎসবের চেয়ে ভবিষ্যৎ চিন্তায় মানুষের মুখ বেশি শুকিয়ে যাচ্ছে।
নাগরিক সুযোগ-সুবিধা বাড়ার বদলে গেছে কমে। তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে বেড়ে গেছে ট্রান্সপোর্ট খরচ। যারা উৎসবে গ্রামের বাড়ি যান তাদের বিড়ম্বনার কোনো শেষ নেই। বাসে বা ট্রেনে জায়গা নেই, তার ওপর আছে অস্বাভাবিক ভাড়া।
উৎসবে প্রিয়জনকে উপহার দেয়ার চিন্তাও বাদ দিয়েছেন অনেকে। শপিং মলগুলোতে মানুষের উপস্থিতি তুলনামূলক অনেক কম। যারা ব্যবসা করছেন তারা বলছেন, বিক্রি হচ্ছে না। যারা কিনতে যাচ্ছেন তারা বলছেন, দামে মিলছে না।
বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পর রাজনৈতিক সন্ত্রাস কমে গেলেও দ্রুতমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে সামাজিক সন্ত্রাস। অলি-গলিতে হাইজ্যাকের ঘটনা ঘটছে। যাত্রীরা একা সিএনজি কিংবা ট্যাক্সি ক্যাবে উঠতে ভয় পান। মলম পার্টির পাল্লায় পড়ে সর্বস্ব খোয়ানোর পাশাপাশি চোখ নষ্ট হওয়া বা কখনো প্রাণ হারানোর ঘটনাও ঘটছে। এ সমস্যা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ জুড়ে। চট্টগ্রামে ছিনতাই ঠেকাতে গঠিত হয়েছে টাইগার ফোর্স। তবে বাঘের গর্জন কতোটা শোনা যাবে তা নিয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। টাইগার ফোর্স সন্ত্রাসীদের দাপটে ক্যাট ফোর্স-এ পরিণত হয় কি না সে ভয় পাচ্ছেন কেউ কেউ।
শুধু উৎসবে নয়, জীবনযাপনে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো অব্যাহত বিদ্যুৎ সরবরাহ। কিন্তু বারবার আমরা ব্যর্থ হচ্ছি ইলেকট্রিসিটির সুযোগ পেতে। দিন-রাতের যে কোনো সময় লোডশেডিংয়ের পাশাপাশি যোগ হয়েছে ন্যাশনাল গ্রিড ফেল করার মতো ভয়াবহ পরিস্থিতির। মাত্র এক মাসের ব্যবধানে ন্যাশনাল গ্রিডের অচলাবস্থার জন্য দুবার সারাদেশ অন্ধকার হয়ে পড়ে। আশঙ্কা হচ্ছে, লোডশেডিংয়ের মতো ন্যাশনাল গ্রিড ফেল করাটাও নিয়মিত ঘটনা হয়ে যায় কি না।
বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে দেশের অর্থনীতি গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সিলেটের চা শিল্প অনেকটা বড় হুমকির মুখে পড়েছে বিদ্যুৎ অব্যবস্থাপনার কারণে। দেশ জুড়ে আমনের ফলন ৪০ ভাগ কমে যাওয়ার আশঙ্কা করা হয় বিদ্যুৎ সঙ্কটের ফলে। একই কারণে সার কারখানার কয়েকশ শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েন।
বিএনপি ও চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান অক্টোবর ২০০৬-এ দাবি করেছিলেন, পরবর্তী ১৮ মাসে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে।
১৮ মাসের ১৪ মাস পার হয়ে গেছে। আগামী চার মাসে বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান সম্ভব কি না সে বিষয়ে বর্তমান বিএনপির স্থায়ী কমিটি মনোনীত অস্থায়ী চেয়ারম্যান সাইফুর রহমান কোনো মতামত দেননি। ১৮ মাস শব্দ দুটি নির্বাচন কমিশনেরও পছন্দের। এ বিষয়টি এর মধ্যে জানা গেছে। ১৮ মাস আরো কারো কারো কাছে প্রিয়। তাদের বলা হয় কুড়ে বা অলস ব্যক্তি। ১৮ মাসে এদের বছর হয়।
এবার ন্যাশনাল গ্রিড ফেল করায় হসপিটাল, সিএনজি স্টেশন, ট্রাফিক সিস্টেম, শপিং মল থেকে শুরু করে সবখানেই ভয়াবহ সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। বঙ্গভবন আলোকিত হতেই কয়েক ঘণ্টা পার হয়ে যায়। আর পুরো বঙ্গদেশে আলো পৌছায় অনেক দেরিতে।
ন্যাশনাল গ্রিড ফেল করার পেছনে কর্মরত কম্পানিগুলোর দ্বন্দ্ব, পুরনো টেকনলজি কাজ করলেও কখনো বিষয়গুলো সামনে আসে না। এক মাস আগের ন্যাশনাল গ্রিডের ব্যর্থতার কারণ ছিল সিডর। আর এবারেরটা হলো টেকনিকাল।
এই টেকনিকাল কারণের ব্যাখ্যা প্রথমে দিতে ব্যর্থ হলেও পরে আসামি চিহ্নিত করা হয়।
সারা দেশের ন্যাশনাল গ্রিড ফেল করার পেছনে নাশকতা সৃষ্টিকারীকে ধরার পর তাকে আটকে রাখা হয়। ঢাকা থেকে বিদ্যুৎ কর্মকর্তারা আশুগঞ্জ গিয়ে তাকে দেখতে যান এবং ছবি তুলে নিয়ে আসেন। সব দায়ভার একজনের ওপর চাপিয়ে দেয়া বক্তব্য আসে বারবার। এ নিয়ে উত্তেজনার কোনো শেষ ছিল না। এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয় আসামিকে।
আসামি হলো ন্যাশনাল গ্রিডের বিদ্যুতের আঘাতে আহত একটি ঘুঘু পাখি! যার শরীর ঝলসে গিয়ে উড়ার ক্ষমতাও লোপ পেয়েছে।
এ ধরনের বিচিত্র ঘটনা কেবল বাংলাদেশেই সম্ভব। যদিও এক পর্যায়ে সরকারিভাবে বাধ্য হয়ে বলা হয়, দোষটি ঘুঘুর নয়।
আসলে শুধু ন্যাশনাল গ্রিডের ক্ষেত্রেই নয়, আমরা সব জায়গাতে শুধু ঘুঘুই দেখি। কিন্তু ঘুঘুর ফাদ আর দেখা হয় না। কখনো কখনো আমরা নিজেরাই ঘুঘু পাখিতে পরিণত হই।
এতো কিছুর পরও আমাদের জীবনে ঈদ আসে, পূজা আসে, বুদ্ধ পূর্ণিমা আসে, ক্রিসমাস আসে। আমরা স্বপ্ন দেখি, চার্লস ডিকেন্সের এ ক্রিসমাস ক্যারল উপন্যাসের মূল চরিত্রের মতো আমাদের দেশের প্রধান চরিত্রগুলোর জীবন দর্শন বদলে যাবে।
এ স্বপ্নগুলো আছে বলেই আমরা এখনো একজন আরেকজনকে বলতে পারি
ঈদ মোবারক।
মেরি ক্রিসমাস।
নিয়মিত সাপ্তাহিক কলাম খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার -এ প্রকাশিত।
২০ ডিসেম্বর ২০০৭ , যায়যায়দিন
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০০৭ বিকাল ৩:১৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


