আমি তখন হলিক্রস কলেজে পড়িতাম। আমাকে হোস্টেলে গৃহশিক্ষা দান করিতে আসিতেন জনৈক নটরডেমিয়ান এন্ড বুয়েটিয়ান এক যুবক। যুবক মাথায় অতিশয় তৈল প্রয়োগ করিতেন এবং উহা প্রয়োগ করিবার পরপরই যেন আমাকে ও আমার দুই সখীকে পড়াইতে আসিতেন। আমরাও পড়িতাম তবে পড়িবার চেয়ে তাহাকে নিইয়া আড়ালে হাসাহাসিই বেশি করিতাম।
একদিন এক সখী তাহাকে খুব বড় মুখ করিয়া আমার কবিতা লেখার কথা বলিল। সেও যেন আমাদের হাসাহাসির কিছু আগেই আচ করিয়াছিল। সেদিন প্রতিশোধ নিবার সুযোগ পাইয়া সে বলিয়া উঠিল, “ ইহা এমন কিছু নয়। কবিতা সকলেই লিখিতে পারে। গুনিয়া দেখিলে বঙ্গদেশে কাকের চেয়ে কবিদের সংখ্যাই বেশী হইবে”।
লজ্জায় অপমানে আমার ও সখীর বড় মুখ সেদিন একেবারে ছোট হইয়া গিইয়াছিল।
অবশেষে আমাদিগর পড়া শেষ হইল, বেতনও পরিশোধ হইল। তবু কি এক অজানা কারনে যুবক হোস্টেলে আসিয়া বসিয়া থাকিত। তাকে শুধাইতে সে বলিল, ভ্রাতা হিসেবে সে আমাদের খোঁজ খবর লইতে আসে।
কিন্তু হোস্টেল মালিক রক্তের সম্পর্কহীন এইরূপ ভ্রাতাকে ভাল চোখে দেখিতেছিলেন না। তাই না পারিয়া একদিন সে গোমর ফাঁক করিল।
আমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিইয়া বসিল। আমিও সেইদিনের সেই অপমানের শোধ লইয়া তাহাকে প্রত্যাখ্যান করিলাম।
তবে আজ বুঝিয়াছি সেইদিন সেই যুবক ভুল কিছু কহেন নাই।
জগত সংসারে কবিতা আসলেই সবাই লিখিতে পারে।
আপনার বাটীতে যেই ঝগড়ুটে মহিলাটি রোজ বাসন মাজে তাহাকে শুধাইয়া দেখুন দু এক ছত্র বাল্যকালে সেও লিখিয়াছে। যাহার অক্ষর জ্ঞান নাই সেও অন্তত ভাবিয়াছে।
তাই আজকাল আমাকে কেউ কবি বলিয়া ডাকিলে খুশী হইবার চেয়ে বেশী রাগ হইয়া যায়। সে কি সত্যিই কবি মনে করিয়া কবি বলিল নাকি উপহাস করিয়া বলিল। আমি জানি স্কুলের পরীক্ষায় ৯০ অনেকেই পাইয়াছে। কিন্তু ডাক্তার-মোক্তার ২/১ জনই হইয়াছে। দু এক খানা লাইন লেখার অপরাধে আমাকে কবি বলিলে নির্মলেন্দু মহাদেব সাহার হয়ত অপমানই হইবে।
কবিতা লেখা এমন কিছু নহে। কবিতা লিখিতে সকলেই পারে। পড়িতে পারে না। জগত সংসারে পড়িবার লোকের বড়ই অভাব। আপনি কাউকে গল্প পড়িতে বলিবেন সময় থাকিলে, ইচ্ছা থাকিলে পড়িবে কিন্তু কবিতা পড়িবার কথা বলিলেই ছুটে পালাইবে।
উহার পেছনের কারণটা কি, তাহা আমি ভাবিয়া বাহির করিয়াছি। কবিতা অনেকটা ‘খালি কলসি বাজে বেশী’র মতন। আড়ম্বরে ভরা যেন উহা এক অসমাপ্ত গল্প। সেই অসমাপ্ত গল্প সকলেই সমাপ্ত করিতে পারেন না। যাহারা পারেন তাহাদেরকেই আমরা সফল কবি বলিয়া থাকি।
আরেক ভাবে ভাবিলে কবিতা হইল আবেগের ছটফটানি। আবেগের ছটফটানি বেশি হইয়া গেলে কবি তাহা আর তখন ধরিয়া রাখিতে পারেন না। যেন এক ভয়ংকর প্রসব বেদনায় কাতরাইতে থাকেন। সেই বেদনা থেকে মুক্তি পাইতে তাড়াতাড়ি তাহা ভূমিষ্ঠ করিতে ব্যস্ত হইয়া পড়েন। আর ঠিক তখনই একটি কবিতার জন্ম হয়। প্রসব বেদনা থেকে মুক্তি পাইয়া ও নবজাতক কবিতার মুখ দেখিয়া কবির এক অনাবিল স্বর্গীয় শান্তি হয়। সফল কবিতার ক্ষেত্রে কবি ও পাঠক উভয়কেই এই শান্তি লাভ করিতে দেখা যায়।
এইরকম ছটফটানি আবেগ আমার ক্ষেত্রেও প্রায়ই আসে।
বেশি ভোজন করিলে আসে, বাড়িতে কেউ বকিলে আসে, পরীক্ষায় খারাপ ফল করিলে আসে, কোন সুদর্শন যুবক দেখিলেও আসে।
কিন্তু তাহা প্রসব করিতে গেলেই বন্ধুরা বলিয়া বসে, থাক বাপু, কবিতা লিখিয়া আর জ্বালাতন করিস নে ।
*** কবিতা লিখি বলিয়া অনেকসময় অনেকেই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করিয়া থাকে। জগত সংসারে আর কেহ কিছু না পারিলেও কবিতাখানা নাকি সবাই ই লিখিতে পারে। এরকম শুনিলে অবশ্য একটু রাগই হয়। সেরকম অনুভুতি থেকেই লেখাটি লেখা।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ফেব্রুয়ারি, ২০১৫ ভোর ৬:১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




