somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মুক্তির দেবদূত ও একটি অবিনাশী কণ্ঠস্বর

০৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



শোষণ আর বৈষম্যের অন্ধকারে নিমজ্জিত পরাধীন পূর্ব পাকিস্তানকে আলোর দিশা দেখাতে যুগে যুগে লড়াই করেছেন শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মাওলানা ভাসানীর মতো মহান নেতারা। কিন্তু ষাটের দশকে এসে সেই লড়াইয়ে বজ্রকণ্ঠ হয়ে আবির্ভূত হন একজন মানুষ—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
​১৯৬৬ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি, পাকিস্তানের লাহোরে শোষকদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তিনি পেশ করেন বাঙালির বাঁচার দাবি, ঐতিহাসিক 'ছয় দফা'। এটি কেবল কোনো রাজনৈতিক দাবি ছিল না, এটি ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার এক জাদুকরী ইশতেহার।
​"ছয় দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ, যা পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ভিত নাড়িয়ে দিয়েছিল।"

​কী ছিল সেই ঐতিহাসিক ছয় দফায়?

​বঙ্গবন্ধুর দূরদর্শী রাজনৈতিক চিন্তার ফসল এই ছয় দফার মূল সুর ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন। তথ্য উপাত্তের আলোতে দেখে নেওয়া যাক সেই দাবিগুলো:

​১. ফেডারেল রাষ্ট্র গঠন: ঐতিহাসিক লাহোর প্রস্তাবের ভিত্তিতে পাকিস্তানকে একটি সত্যিকারের ফেডারেল রাষ্ট্র হতে হবে, যেখানে থাকবে সংসদীয় পদ্ধতির সরকার এবং সার্বজনীন ভোটাধিকার।

​২. কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা সীমিতকরণ: প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র—কেবল এই দুটি বিষয় থাকবে কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে। বাকি সব ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে।

​৩. পৃথক মুদ্রা ব্যবস্থা: দুই অঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক অথচ সহজ বিনিময়যোগ্য মুদ্রা থাকবে, অথবা একই মুদ্রা থাকলে পূর্ব পাকিস্তানের টাকা যাতে পশ্চিম পাকিস্তানে পাচার হতে না পারে, তার সুনির্দিষ্ট সাংবিধানিক গ্যারান্টি থাকতে হবে।

​৪. কর আদায়ের ক্ষমতা: কর, রাজস্ব ও শুল্ক ধার্য এবং আদায়ের সম্পূর্ণ ক্ষমতা থাকবে প্রাদেশিক সরকারের হাতে। কেন্দ্রীয় সরকার তার ব্যয়ের জন্য নির্দিষ্ট অংশ পাবে।

​৫. বৈদেশিক মুদ্রার পৃথক হিসাব: দুই অঞ্চলের অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা হিসাব থাকবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের অর্জিত মুদ্রা পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়ন ও সুরক্ষায় ব্যবহৃত হবে।

​৬. আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন: পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিরক্ষার ঝুঁকি কমানোর জন্য এখানে নিজস্ব আধা-সামরিক (প্যারা-মিলিশিয়া) বাহিনী গঠন এবং নৌবাহিনীর সদর দপ্তর স্থাপন করতে হবে।

শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র ও বজ্রের হুংকার:

​এই ছয় দফা ঘোষণার পর পাকিস্তানি স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রমাদ গুনলেন। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, শেখ মুজিবকে থামাতে না পারলে বাঙালির স্বাধীনতা ঠেকানো যাবে না। শুরু হলো নির্মম নির্যাতন। বঙ্গবন্ধুকে বারবার কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো, একের পর এক মিথ্যা মামলা দেওয়া হলো। ​কিন্তু শেখ মুজিব তো দমে যাওয়ার মানুষ নন! তিনি আপসহীন। যখন ছয় দফা আন্দোলনকে কোনোভাবেই স্তব্ধ করা যাচ্ছিল না, তখন তাঁকে চিরতরে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে দেওয়ার জন্য কুখ্যাত 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা' (রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য) দেওয়া হলো।
​কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, বাঙালির আবেগের নাম যখন শেখ মুজিব, তখন তাকে খাঁচায় বন্দি রাখা অসম্ভব। বঙ্গবন্ধুর এই অদম্য চেতনাকে বুকে ধারণ করে ১৯৬৯ সালের ৪ জানুয়ারি ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে গঠিত হয় 'সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ'। বঙ্গবন্ধুর ৬ দফাকে ধারণ করে ছাত্রনেতারা গড়ে তোলেন ১১ দফা আন্দোলন। গ্রাম-গঞ্জ, শহর-বন্দর, কলে-কারখানায় ছড়িয়ে পড়ে বিদ্রোহের দাবানল। আইয়ুব খানের কারাগারের প্রাচীর ভেঙে মুক্ত হয়ে আসেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা।

​ ছয় দশক পেরিয়ে: ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম মাইলফলক
​আজ ছয় দশক পরেও ছয় দফা আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে উজ্জ্বল বাতিঘর। এটি কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, এটি ছিল বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রথম নিখুঁত ব্লু-প্রিন্ট। বঙ্গবন্ধু জানতেন কীভাবে ধাপে ধাপে একটি জাতিকে স্বাধীনতার মন্ত্রে দীক্ষিত করতে হয়। ছয় দফাই বাঙালিকে শিখিয়েছিল নিজেদের অধিকার আদায় করে নেওয়ার অদম্য সাহস।

​আজকের এই দিনে পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে, যাঁর তর্জনীর ইশারায় একটি জাতি তার ভাগ্য পরিবর্তন করেছিল। গভীর শ্রদ্ধা জানাই ৭ই জুনের সেইসব বীর শহীদদের, যাঁদের রক্তে রোপিত হয়েছিল স্বাধীনতার বীজ।

​আসুন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে আমরা এই গৌরবময় ইতিহাসকে ছড়িয়ে দিই প্রজন্মের পর প্রজন্মে। আমাদের চেতনা জুড়ে থাকুক সেই বজ্রকণ্ঠ, আমাদের হৃদয়ে থাকুক লাল-সবুজ।
​জয় বাংলা! জয় বঙ্গবন্ধু!
ঐতিহাসিক ৭ই জুন অমর হোক!
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫২
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অদৃশ্য তরঙ্গের জাল

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৬ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৩১


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারতকে যা দিয়েছি, তা সারাজীবন মনে রাখবে

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:০৯


১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব ছিল অনস্বীকার্য। এটা এমন এক ঐতিহাসিক সত্য যাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ আওয়ামী লীগকে বিপুল... ...বাকিটুকু পড়ুন

কল্পগল্প – সেল ট্যুর

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ০৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৩২

(অন্য গালাক্সি থেকে)


শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে, সিনিয়র গবেষক হিসেবে কাজ করছেন প্রফেসর রবার্ট প্রায় ২৪ বছর ধরে। প্রতি বছরই নতুন নতুন ছাত্র আসে তার অধীনে গবেষণা করতে। এবার... ...বাকিটুকু পড়ুন

সীমান্ত নিরাপত্তায় জনসম্পৃক্ততাঃ একটি প্রশিক্ষিত সীমান্ত রিজার্ভ বাহিনী....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ৯:৫৮

সীমান্ত নিরাপত্তায় জনসম্পৃক্ততাঃ সময়ের দাবি- একটি প্রশিক্ষিত সীমান্ত রিজার্ভ বাহিনী....

বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষ অতীতেও এবং বর্তমানেও দেশের সীমান্তরক্ষীদের নীরব সহযোগী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছেন। চোরাচালান প্রতিরোধ, অনুপ্রবেশ শনাক্তকরণ,... ...বাকিটুকু পড়ুন

আঁকড়ে

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ০৬ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৪৩

আঁকড়ে
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

দূর দেশের কন্যার প্রতি আকর্ষণ
আগ্রহ, জানতে, দেখতে, করতে বরণ।
ইচ্ছে তীব্র তাকে আঁকড়ে ধরতে
হাতে হাত রেখে আজীবন চলতে।

কী যে আকাঙ্ক্ষা, রেখেছি লুকিয়ে
অব্যক্ত কথা সব জমা হৃদয়ে।
কিন্তু সে চুপ হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×