somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পেশা ও ব্যবসায় মেডিটেশন-অবিশ্বাস্য সাফল্য-১

২৭ শে অক্টোবর, ২০১১ রাত ১০:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

মেডিটেশন মনের উন্নতি ঘটায়, দেহের উন্নতি ঘটায়। কিন্তু ডেট্রয়েটের একটি কেমিকেল কোম্পানির সিইও আর ডব্লিউ মন্টগোমারি দেখলেন, মেডিটেশন তার কোম্পানির স্বাস্থ্যেরও উন্নতি ঘটিয়েছে অবিশ্বাস্য মাত্রায়। আশির দশকের শুরুতে আমেরিকায় বিরাজমান অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে পড়ে ৪০ বছরের এ প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হলেন মন্টগোমারি ও তার সহকর্মীরা। নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন পরিকল্পনা, নতুন ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির দরকার হয়ে পড়লো। বেশ কয়েকটি উদ্যোগে ব্যর্থতার পর ১৯৮৩ সালে তারা শুরু করলেন কোম্পানিব্যাপী ৬ মাসের এক মেডিটেশন কর্মসূচির। ইতোমধ্যে কোম্পানির প্রতিটি ডিভিশনেই মেডিটেশন চালু হয়ে গেল। কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দুবেলা করে মেডিটেশন করতে লাগলেন। সকালে কাজ শুরু করার আগে এবং বিকেলে কাজের মাঝখানে নির্দিষ্ট বিরতিতে। পরবর্তী তিন বছরের মধ্যেই দেখা গেল অভাবনীয় পরিবর্তন। অনুপস্থিতির হার ৮৫%, অসুস্থতা ৭৬% এবং কাজে দুর্ঘটনার হার ৭০% কমে গেল। অন্যদিকে বিক্রি বেড়ে গেল ১২০% এবং পণ্যের গুণ নিয়ন্ত্রণ মান ২৪০% বেড়ে গেল। আর এর সার্বিক ফলাফল হিসেবে কোম্পানির মুনাফা বেড়ে গেল ৫২০%। এই অভাবনীয় অগ্রগতির পেছনে কাজ করেছে কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মেডিটেশন চর্চা- বলেছেন সিইও মন্টগোমারি। কারণ মেডিটেশনের ফলে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত হয়ে তারা কাজ করতে পেরেছেন আগের চেয়ে বেশি কর্মক্ষমতা, সৃজনশীলতা ও আনন্দ নিয়ে। মন্টগোমারি খুব সুন্দরভাবে বলেছেন, “ব্যবসায়ের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তার মানবসম্পদ। কারণ আপনার প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা যদি ক্লান্ত অবসন্ন থাকে, তারা যদি কাজে উদ্বুদ্ধ হতে না পারে এবং তারা যদি এটা ভাবতে না পারে যে তাদের কোনো সৃজনশীলতা আছে, তাহলে আপনি তাকে যত আধুনিক যন্ত্রপাতিই দিন না কেন, এটা সময়ের অপচয় ছাড়া আর কিছু নয়।

বিশ্বজুড়ে ব্যবসাক্ষেত্রে মেডিটেশনের জয়জয়কার
শুধু এই একটি কোম্পানিই নয়, মেডিটেশনকে কাজে লাগিয়ে অসাধারণ সাফল্য লাভ করছে বিশ্বব্যাপী আরও অসংখ্য কোম্পানি ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান। যাদের মধ্যে রয়েছে তোশিবা, সনি, টয়োটা, সুমিতমো, ভলভো, জেনারেল মটরস বা আইবিএম-এর মতো বিশ্বখ্যাত কোম্পানি। জেনারেল মটরস ঘোষণা করেছে, তাদের যেসব কর্মী মেডিটেশন কোর্সে অংশ নিতে আগ্রহী, তাদের ব্যয়ভার কোম্পানি বহন করবে। কর্মীদের মেডিটেশন শেখানোর জন্যে কোরিয়ার স্যামসাং শিল্পগোষ্ঠী রাজধানী সিউলের দক্ষিণে ১৭ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তুলেছে এক বিশাল প্রশিক্ষণকেন্দ্র। কেন বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ী মহলে মেডিটেশনের এ জয়জয়কার? পেশাগত ক্ষেত্রে মেডিটেশনের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক গবেষণা হয়েছে। পৃথিবী জুড়ে দুই শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত এসব গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে একাডেমি অফ ম্যানেজমেন্ট জার্নাল, সায়েন্স, সাইকোসোম্যাটিক মেডিসিন, হাইপার-টেনশন, আমেরিকান সাইকোলজিস্ট এবং আমেরিকান জার্নাল অফ ম্যানেজ্‌ড কেয়ার প্রভৃতি শীর্ষস্থানীয় জার্নালে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে কোম্পানিতে মেডিটেশন চালু করার ফলে কর্মীদের টেনশন, অস্থিরতা অবসাদ ও নিদ্রাহীনতা কমেছে, ধূমপান ও নেশার আসক্তি কমেছে এবং দক্ষতা, কর্মসন্তুষ্টি ও পারস্পরিক সম্পর্কোন্নয়ন বেড়েছে লক্ষণীয় মাত্রায়। যে কর্মীরা সৃজনশীল, বুদ্ধিমান, সুস্থ এবং প্রাণবন্ত স্বাভাবিকভাবে তারাই বেশি কাজ করতে পারে। তখন উৎপাদনক্ষমতা বাড়ে, অনুপস্থিতির হার কমে এবং দলগতভাবে কাজ করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।

জবস্ট্রেস- আধুনিক ব্যবসা জগতের প্রধান চ্যালেঞ্জ
১৯৯৩ সালে আন্তর্জাতিক শ্রমসংস্থা বা আইএলও-র একটি রিপোর্ট অনুযায়ী জবস্ট্রেসের কারণে আমেরিকায় প্রতিবছর ২০০ বিলিয়ন ইউএস ডলার অপচয় হয়। এ্যালেন প্রাইজ একজন বিজনেস স্ট্রেস কনসালট্যান্ট। মিনেপোলিসে অবস্থিত তার কনসালটিং ফার্মটির ক্লায়েন্টদের তিনি শেখান মেডিটেশনকে কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে ও পেশায় কাজে লাগাতে হয়। তিনি বলেন, “কম্পিউটারের ব্যবহার মানুষের জীবনকে সহজ করার বদলে আরও সমস্যা ভারাক্রান্ত করেছে। কারণ এর ফলে একদিকে কর্মীদের কাছ থেকে প্রতিষ্ঠানের প্রত্যাশা বেড়ে গেছে, অন্যদিকে কাজের ধরন ও যোগ্যতার চাহিদায় ঘটেছে ব্যাপক পরিবর্তন। ফলে কম লোক দিয়ে বেশি কাজ করানোর আর্থিক সুবিধা পেতে উঠে পড়ে লেগেছে বর্তমান দুনিয়ার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো। আর এর শিকার হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের এক্সিকিউটিভ, ম্যানেজার ও শ্রমিকরা পেশাগত মানসিক চাপ ও নানা জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে। ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া লস এঞ্জেলেসের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পেশাগত চাপের মুখে দশ বছর ধরে কাজ করছেন এমনদের কোলন ও রেকটাল ক্যান্সারে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি অন্যদের চেয়ে সাড়ে পাঁচ গুণ বেশি। এ্যালেন প্রাইজ বলেন, জবস্ট্রেস বা পেশাগত মানসিক চাপের ফলে কর্মীদের ওপর যে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে তা হলো, তার মনোবল কমে যায়; বস, সহকর্মী বা অধীনস্থদের সাথে সম্পর্কের সমস্যা হয়; বিষণ্নতা, অস্থিরতা দেখা দেয়। ফলে কমে যায় তাদের উৎপাদন ক্ষমতা এবং বেড়ে যায় স্বাস্থ্যরক্ষা খরচ। একজন অসুখী বা অসুস্থ কর্মী কখনো কাজে তার পুরোশক্তি ব্যবহার করতে পারে না।”

মেডিটেশন- জবস্ট্রেস মোকাবিলায়
অল্টারনেটিভ থেরাপি জার্নালের ১৯৯৬ এর একটি সংখ্যায় বলা হয় শতকরা ৫৪ ভাগ ক্ষেত্রে কাজে অনুপস্থিতির কারণ হলো ক্রনিকব্যথা, হাইপারটেনশন এবং মাথাব্যথা। আর এ সবকটি সমস্যাই তৈরি হয় মানসিক চাপ ও উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা থেকে। আর এখানেই মেডিটেশনের ভূমিকা। বিজনেস উইকের ‘কোম্পানিজ আর ব্যাটলিং এমপ্লয়ি স্ট্রেস উইথ মেডিটেশন’ শীর্ষক এক রিপোর্টে বলা হয়, আমেরিকার ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ হেলথ, ম্যাসাচুসেটস্‌ ইউনিভার্সিটি এবং হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির একাধিক গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, মেডিটেশন মানুষের ব্রেনের তৎপরতা বাড়ায়, তার বুদ্ধিমত্তা, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মনোযোগের ক্ষমতাকে বাড়ায়। অন্যদিকে কর্মীরা প্রায়ই আক্রান্ত হয়- এরকম নানা ধরনের ব্যথা-বেদনা দূর করতে সাহায্য করে মেডিটেশন। এসব কারণে পৃথিবীর বড় বড় করপোরেশনগুলো এখন তাদের কর্মীদের উদ্বুদ্ধ করছে মেডিটেশনে। ব্যবস্থা করছে ফ্রি মেডিটেশন ক্লাসের। কারণ এতে যে খরচ হচ্ছে সে তুলনায় উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে অনেক বেশি। বলা যেতে পারে পেশাগত উদ্বেগ নিরসনের সবচেয়ে কার্যকরী ও সাশ্রয়ী একটি উপায় হচ্ছে মেডিটেশন। পিউরিটান বেনেট করপোরেশন পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় চিকিৎসা সামগ্রী প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান। কর্মীদের ওপর মানসিক চাপের ক্ষতিকর প্রভাব দূর করতে ১৯৯৩ সালের আগস্টে কোম্পানিটি কানসাসে অবস্থিত এর করপোরেট হেড কোয়ার্টারে শুরু করে একটি পাইলট প্রোগ্রাম। ৩৮ জন করে কর্মী নিয়ে দুটো গ্রুপ করা হলো। শুধু একটি গ্রুপকে মেডিটেশন শেখানো হলো। ৩ মাস পর দেখা গেল যে গ্রুপটি মেডিটেশন করছে অন্য গ্রুপের তুলনায় তারা বেশি প্রাণবন্ত, বেশি প্রশান্ত। তাদের শারীরিক অসুস্থতা কম এবং তাদের রক্তে কোলেস্টেরল মাত্রাও হ্রাস পেয়েছে অন্যদের চেয়ে বেশি। এমনকি প্রতিষ্ঠানে সবার সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রেও তাদেরই সুনাম হয়েছে। সেখানে যারা মেডিটেশন করে নি তাদের কোনো পরিবর্তন হয় নি। চলবে...
সূত্র: কোয়ান্টাম মেথড
সর্বশেষ এডিট : ২৭ শে অক্টোবর, ২০১১ রাত ১০:৩৯
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলা সাহিত্যে জায়গা পাচ্ছেন ওসমান হাদী

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১২ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:১৭


সংবাদপত্র যা বলছে
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১০ জুন ২০২৬ শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যবই পরিমার্জন-সংক্রান্ত কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেকসহ... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুকুলে নয় শেখ হাসিনা (আপা) প্রতিকুল পরিস্থিতিতেই বেশি অকুতোভয়।

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৪




একদিকে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন তিনি দেশে ফিরছেন, আরেকদিকে তিনি প্রায় নিশ্চিন্ন করে দেয়া আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠন করে ফেলেছেন! এবং সেই সঙ্গে তিনি আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও বাংলাদেশের অগণতান্ত্রিক, ভয়ঙ্কর এবং অবৈধ রাজনৈতিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপির আবালীপনা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮

বিএনপি ৫০ হাজার নাচের শিক্ষক নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। যার পেছনে ১০ বছরে ব্যায় হবে ১৫ হাজার কোটি টাকা। যা দিয়ে ফুল প্যাকেজ ৩০ টি জেএফ-১৭ থান্ডার যুদ্ধবিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

লিখেছেন নতুন নকিব, ১২ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:২৪

আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা জরুরি

অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় সারা দেশ শোকাহত। এতগুলো নিষ্পাপ প্রাণের মৃত্যু নিঃসন্দেহে অত্যন্ত বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×