মেডিটেশন বুদ্ধিমত্তা, সৃজনশীলতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা বাড়ায় যা ব্যবসার জন্যে খুবই প্রয়োজনীয় কয়েকটি গুণ। পিউরিটান বেনেটের চেয়ারম্যান বার্টন এ-ডোল বলেন, “প্রতিযোগীর চেয়ে ভালো মানের পণ্য ও সেবা দিতে পারাটাই বর্তমান দুনিয়ার ব্যবসাক্ষেত্রে সাফল্যের চাবিকাঠি। আর এর জন্যে প্রয়োজন নতুন কিছু, ব্যতিক্রমী কিছু ভাবতে পারার সামর্থ্য ও সৃজনশীলতা। আর মেডিটেশন কর্মীদের এই সৃজনশীল উদ্ভাবনী ক্ষমতাকেই বাড়ায়।” সুইডেনের এরিকসন কোম্পানির ডিরেক্টর ইভা সলোমনসন। তিনি বলেন, “১৯৭৪ সাল থেকে আমি মেডিটেশন করি। আর এখন আমার শতাধিক সহকর্মী মেডিটেশন করছেন। আমার কোম্পানির পণ্য সংক্রান্ত নতুন আইডিয়া লাভ ও তা বাস্তবায়নে আমি মেডিটেশনের সাহায্য নিই।” জাপানের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইনডাস্ট্রিয়াল হেলথ এবং সেন্ট মারিয়ানা মেডিকেল ইনস্টিটিউট একযোগে একটি গবেষণা চালায়। এতে সুমিতমো হেভি ইনডাস্ট্রির ৪৪৭ জন শ্রমিককে মেডিটেশনের প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। পাঁচ মাস পর তাদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হলো। দেখা গেল আগের চেয়ে তাদের শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক অস্থিরতা, খিটখিটে মেজাজ এবং রাতে ঘুমের সমস্যা অনেক কম। সুমিতমোর হেলথ ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান টি ওয়াতানাবে বলেন, আমরা কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে এই মেডিটেশন প্রোগ্রামের ব্যবস্থা করেছি। কারণ আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বের সাথে তাল মেলাতে মেডিটেশন একটি অপরিহার্য উপাদান। বেথেসডার একটি রিয়েল এস্টেট ফার্ম ‘টাওয়ার কোম্পানি’র কর্মীরা মেডিটেশন করার পর তাদের অসুস্থতার প্রকোপ এত কমে গেল যে, ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি তাদের প্রিমিয়ামের ৫% ছাড়ই দিলো তা নয়, মেডিটেশন কোর্স করার খরচেরও ৮০% দিতে রাজি হলো। প্রক্টর এন্ড গ্যাম্বল প্রাক্তন এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট স্যার জন হার্ভে জোনস। বিশ্বখ্যাত এ কোম্পানিতে ক্যারিয়ারের ৩৬ বছরের মাথায় একদিন তার হার্ট অ্যাটাক হলো। ওপেন হার্ট সার্জারি করা হলো। অপারেশনের পর তার কার্ডিওলজিস্টের পরামর্শে তিনি শুরু করলেন মেডিটেশন। জোন্স বলেন, “আমি আমার প্রতিটি দিন শুরু করি এবং শেষ করি একান্তই নিজের জন্যে কিছু সময় দিয়ে। আর এর ফলে শারীরিক ও মানসিকভাবে আমি এখন আগের চেয়ে অনেক প্রশান্ত। টেনশন, উদ্বেগ প্রায় নেই বললেই চলে। সৃজনশীলতা ও স্মৃতিশক্তিও বেড়েছে আগের চেয়ে বেশি। আগে যদি মেডিটেশন শিখতে পারতাম তাহলে জীবনটা হতো আরো উপভোগ্য।”
উন্নয়নশীল দেশের অবস্থান
শুধু পাশ্চাত্য বা উন্নত দেশগুলোই নয় করপোরেট জীবনের এই ঝুঁকির মুখে এখন পড়েছেন ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশের বিজনেস এক্সিকিউটিভরাও। ইন্ডিয়া টুডে’র এক রিপোর্ট অনুযায়ী- ভারতে প্রতি পাঁচজন এক্সিকিউটিভের একজন বিষণ্নতায় ভুগছেন। করোনারি হৃদরোগে আক্রান্তদের অর্ধেকেরও বেশি হলেন পেশায় যারা মিড লেভেল এক্সিকিউটিভ। ফলে দেখা যাচ্ছে এক্সিকিউটিভ হিসেবে ১০/১৫ বছরের ক্যারিয়ার জীবন এখন নেমে এসেছে মাত্র ৫/৭ বছরে। এসব কারণে টনক নড়েছে ভারতের করপোরেট মহলে। স্ট্রেস মোকাবিলায় তারা নিচ্ছেন বিভিন্ন পদক্ষেপ। কাজের পরিবেশ উন্নত করা, কর্মীদের আরো বেশি ক্ষমতা দেয়া ইত্যাদি ছাড়াও তারা আয়োজন করছেন বিভিন্ন স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপের, আশ্রয় নিচ্ছেন ভারতীয় যোগ বা বেদান্ত মেডিটেশনের। যেমনটি করেছেন ভারতের ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের বিশাল প্রতিষ্ঠান ভিডিওকনের সিইও বেনুগোপাল দূত তার ৬ শতাধিক কর্মীকে যোগ প্রশিক্ষণ দেয়ার মাধ্যমে। বিড়লা গ্রুপ অফ কোম্পানিজ, টিসকো, টেলকো, গোদরেজ, রিজার্ভ ব্যাংক বা স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে এখন নিয়মিত আয়োজিত হচ্ছে স্ট্রেস ম্যানেজমেন্ট ওয়ার্কশপ।
বাংলাদেশের শিল্প-বাণিজ্যে মেডিটেশন
বাংলাদেশও পিছিয়ে নেই। গত ১২ বছর ধরে কোয়ান্টাম মেথড কোর্সের দুই শতাধিক ব্যাচে অংশ নিয়েছেন শত শত পেশাজীবী ও শিল্প-বাণিজ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। এদের মধ্যে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ল’ইয়ার ও ব্যাংকারসহ রয়েছেন বড় শিল্পগোষ্ঠীর চেয়ারম্যান, বহুজাতিক কোম্পানির সিইও থেকে শুরু করে অসংখ্য পাবলিক ও প্রাইভেট কোম্পানির এক্সিকিউটিভ এবং ব্যবসায়ী। মেডিটেশন চর্চা করে ব্যক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি তারা পেয়েছেন পেশাগত উপকারও। এ নিয়ে এক গবেষণাধর্মী প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে ‘ইনস্টিটিউট অফ কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট একাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ’-এর জার্নাল ‘দি কস্ট এন্ড ম্যানেজমেন্ট’-এর নভেম্বর-ডিসেম্বর সংখ্যায়। ‘দি ইনফ্লুয়েন্স অফ এ মেডিটেশন- রিলাক্সেশন টেকনিক অন এক্সিকিউটিভ পারফরম্যান্স’ শিরোনামের এ প্রবন্ধে কোয়ান্টাম মেথড কোর্সে অংশগ্রহণকারী ২০ জন শিল্পমালিক ও ব্যবস্থাপকের মেডিটেশন পরবর্তী অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. ফারুক আহমেদ ও ড. আব্দুল হান্নান মিঞার সাথে এ গবেষণায় সহযোগিতা করেন গবেষক রাবিয়া নাজরীন। এতে দেখা যায়, মেডিটেশনের ফলে মালিক ব্যবস্থাপকদের কাজে উৎসাহ এবং তৎপরতা বেড়ে গেছে। বস, সহকর্মী ও অধীনস্থদের সাথে সম্পর্কেও ঘটেছে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি। নেতিবাচক আবেগ অর্থাৎ রাগ-ক্ষোভ-ঈর্ষাকে নিয়ন্ত্রণ করে তারা এখন আগের চেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। শারীরিক-মানসিকভাবেও তারা আগের চেয়ে সুস্থ ও প্রশান্ত। মুনি-ঋষি-দরবেশদের চৌহদ্দি থেকে ধ্যান বা মেডিটেশন বেরিয়ে এসেছে অনেক আগেই। আত্মউন্নয়ন বা নিরাময়ে মেডিটেশনের কার্যকারিতা এখন এক পুরনো সত্য। কিন্তু শিল্প- বাণিজ্য-ব্যবসায়ের মতো টাকা-কড়ির ক্ষেত্রে মেডিটেশন যেভাবে কার্যকরী প্রমাণিত হচ্ছে তা বিস্ময়কর হলেও সত্য। এ কারণেই হয়তো হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের মাইন্ড বডি মেডিকেল ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট ডা. হার্বার্ট বেনসন মন্তব্য করেছেন, “ব্যবসা কর্তৃপক্ষ যদি বুদ্ধিমান হতো তাহলে প্রত্যেকেই তাদের প্রতিষ্ঠানে একটি আলাদা কক্ষ রাখতো এবং কর্মীদের আলাদাভাবে প্রতিদিন কিছুটা সময় দিতো যাতে তারা নিজেদের পছন্দমতো কোনো মেডিটেশন করে নিতে পারে।” শেষ
সূত্র: কোয়ান্টাম মেথড
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে অক্টোবর, ২০১১ সন্ধ্যা ৭:২৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





