অফিসের পথে কয়েকটা বাচ্চাকে গাছ থেকে আম চুরি করতে দেখে কেন জানি মনটা উদাস হয়ে গেল। মনে পড়ে গেল ছেলেবেলার কথা। চেয়ারে হেলান দিয়ে চোখ বুজে পৌছে গেলাম সেই বেলায়।
আমাদের পাড়ার ঢোকার রাস্তায় দুপাশে পাঁচিল। বাঁ পাশে সরকারী মাঠ আর ডান পাশে ক্রিশ্চান মেয়েদের স্কুল এবং হস্টেল। রাস্তার দু'পাশ দিয়ে প্রায় ২০০ মিটার পাঁচিল। সন্ধ্যার পর ঘুটঘুটে অন্ধকার। বাইরের কেউ ঢোকেনা। পাঁচিলের গায়ে একটা বড় নাড়কেল গাছ। আমাদের এবং পাশের পাড়ার ছেলেদের স্বরস্বতী পুজোর লক্ষ্য। মিলিত অভিযান চলত। ভাগে পড়ত কম। এটা ক্লাস এইটের ঘটনা, এর আগে ঐ গাছের নাড়কেলের জন্য দাদাদের দয়ার ওপর নির্ভরশীল ছিলাম। যখন দায়ীত্ব হ্যান্ড ওভার হল তখন আমি ও আমার বন্ধু অজিত ঠিক করলাম পুরোটাই আমাদের চাই।
স্বরস্বতী পুজো এলো, তৈরী হল প্ল্যান। রাত ১২.৩০ শে অভিযান চলবে মিলিতভাবে। সবাই রাজী, আমি বললাম আমরা কিন্ত গাছে উঠতে পারব না। ঠিক আছে, তাই হবে কিন্তু তাহলে ভাগ হবে ৭:৩ এর। সন্ধ্যা ৮.৩০ শে আমি আর অজিত গাছে উঠে সব নাড়কেল পেরে নিয়ে এলাম। ৬৪ টা। গাছে পোস্টার দিয়ে এলাম "কাঁচা কলা খা" । অজিতদের বাড়ির ছাদে লুকিয়ে রাখা হল। কিছু বিক্রী করা হল পুজোর টাকা যোগারের জন্য। পর পর ২ বছর এভাবেই চলল। পাশের পাড়ার ছেলেরা হাল ছেড়ে দিল।
এরপর যখন বি. এ সেকেন্ড ইয়ার। একটু সিনিয়ার হয়ে গেছি। আমাদের ছোটরা বলল, দাদা আগেরবার ভাগে কম পেয়েছি। এবার একটা ব্যাবস্থা করতে হবে। অজিত আর আমি বললাম, তোদের যেতে হবেনা আমরা দেখছি। রাত ১১টা নাগাদ আমি, অজিত, আরেক বন্ধু বিদ্যুৎ হাঁটতে হাঁটতে গাছের দিকে এগোচ্ছি দেখি গাছতলায় দু'জন কেউ বিড়ি টানছে। একটু এগোতেই বুঝতে পারলাম পাশের পাড়ার বাচ্চা দুটো ছেলে। আমাদের দেখেই বিড়ি লুকিয়ে আমাদের দিকেই হাঁটা দিল। কাছে যেতেই একজন বলল, কে দাদা নাকি? আমি বললাম, কোথায় যাচ্ছিসরে? তোমাদের ওখানেই যাচ্ছি দেখি কেমন মন্ডপ হল। ওরা চলে গেল, আমরা ভাবলাম বিড়ি খেতে এসেছিল।
গাছতলায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরালাম আর ভাবলাম খেয়েই উঠি। হঠাৎ ওপর থেকে আওয়াজ, কিরে ফেলবো, ফেলবো? মূহুর্তে ব্যপার বুঝে নিয়ে বললাম, আরে ফেল তাড়াতাড়ি। সঙ্গে সঙ্গে ধুপধাপ। তিন কাঁদি। তিনজনে তিন কাঁদি নিয়ে পাড়ার দিকে হাঁটা। রাস্তায় ঐ দু'জনের সাথে দেখা। করুণ চোখে বলল, দাদা কোথায় পেলে? -আরে গাছতলায় পড়েছিল, নিয়ে এলাম। ওরা চলে গেল। ঘন্টা খানেক পড়ে চারজন এল দুজন নিচের, দুই মুর্তিমান ওপরের। দাদা আমাদের কিছু দাও। ৬ টা দিয়েছিল ভাইরা।
আজও যেদিন বাড়ি ফিরি, রাস্তায় নাড়কেল গাছটা দেখে মনে পড়ে যায়। এখন আর কেউ পাড়েনা। এখনকার ছোটরা ক্রিকেট, ভিডিও গেম, টিভি নিয়ে ব্যস্ত। আমার কেন জানি ভাবলে কান্না পায় এভাবে আমাদের দিন গুলো একেবারে হারিয়ে গেল?
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই জুলাই, ২০০৭ বিকাল ৫:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




