দুনিয়া রেজিষ্ট্রি কর
তিলেক হিম্মত নাই, আধা ছটাকের নাই তেজ
সাত আসমানে প্রভু খোদাতা'লা হয়ে বসে আছ
মুখে খালি কহ শুনি দুনিয়ার তুমিই মালিক
অথচ মালিক অন্যে, অন্যে কহিতেছে তারা খোদা ।
ধরো আমাদের গ্রামে আলহাজ্ব ছামাদ মৌলবি
তিনি নিজ নামে বাহাত্তর বিঘা হালটের
জমির মালিক, তেতাল্লিশ চেয়ারম্যান, ষাট বিঘা
রশিদ কনট্রাক্টর, ইটের ভাঁটার ছরু মিয়া
চৌদ্দ বিঘা বিশ ডেসিমেল, বাকি থাকে ছমিরুদ্দি
চন্দনের বাপ, হারাধন-প্রত্যেকেই তোমার শরিক
তোমার শরিক নাই এই কথা তবে কি বোগাস ?
এদের দলিল যদি মিথ্যা হয় যাও তবে আদালতে
উকিল ধরিয়া কর রেজিষ্ট্রি নিজ নামে ।
ফরহাদ মজহার
'এবাদতনামা'
৯ ফাল্গুন, সারত
২১ ফেব্রুয়ারি,১৯৯০
প্রতিপক্ষ প্রকাশনী, শ্যামলী, ঢাকা-১২০৭।
আমাদের ই কালের সময়ের কবিতা এটি । এই ভূখণ্ডের, বাংলার সবচেয়ে বড় কথা এই 'বাংলাদেশের' ই কবিতা এটি । খুব বেশি দিনের আগেরও নয় এই কবিতাটি । এই তো সেদিনের । কবিতাটি কার কিংবা কোনোও গুঢ় রহস্য নিয়া কবিতাটি রচিত হয়েছে কিনা সেটা আমার বিবেচ্য নয় । সেটা বিচার বিশ্লেষণ করবেন টুপি পাঞ্জাবি-ধূতিপড়া সাহিত্যের মৌলবি,ব্রাহ্মিরা । আমরা যদি কবিতার প্রতীতি প্রেক্ষাপট নিয়া বলতে চাই, তবে সে আলোচনা চলতে পারে । এখন কথা হইলো কী প্রেক্ষাপটে আল্লা সরাসরি ভুস্বামিতে ভুপাতিত হয়, কলিমুদ্দি, ছলিমুদ্দি, চন্দনের বাপ হারাধন হয়ে ছামাদ মৌলবি কিংবা রশিদ কনট্রাক্টর পর্যন্ত গেলেই খটকা লাগে , দ্বন্দ্ব-অজস্র প্রশ্ন নিয়া মন বিদ্রোহী হইয়া উঠে । ভুস্বামীর চোখে তখন ছামাদ মৌলবি রশিদ কনট্রাক্টর, হারাধনরা খেটে খাওয়া কামলা,মজুর। আল্লা তখন গভীর উদ্দ্যেশ্য প্রণোদিত হাওয়াই আসমানি বাদশার ভুমিকায় থাকে না, চুপসে যাওয়া বেলুন হয়ে যায় । 'বেলুন সিনড্রোম' কী তা ফ্রয়েড জানা পাঠকের অজানা নয় । 'বেলুন সিনড্রোম' দিয়া কলিমুদ্দি, ছলিমুদ্দি কিংবা হারাধনের লাভ নাই, লোকসান ই বেশি । বেলুন ব্যবহারে যা ফল না করলেও একই । বছর না ঘুরতেই প্রতিবছর সন্তান আসাটা হারাধনদের গা সওয়া ব্যাপার । কথা সেইটা না, কথা হইলো এখানে কবিতা প্রেক্ষাপটে আল্লানাম্নী ভুস্বামীর ক্ষমতায়ন কোন শক্তিবলে অস্তিত্ববান । জমিনের মালিক বলেই জমিদার । কিন্তু এখানে যে হারাধন আছে , দুর্যোধন আছে, বিভীষণ আছে চাই রাম-রাবণও আছে বায়া কলিম ছলিম হয়ে ছামাদ মৌলবি রশিদ কনট্রাক্টর । সবাই ই যে সবার অংশী । রহস্য তাইলে কোনটা ! কে কার পরিপুরক ? দাঁড়ান ফাঁক থাইকাই যাচ্ছে ... ফাঁকটা হইলো আল্লাফাঁক । সবাই সবার পরিপূরক হইলে ভুস্বামী ভৌতিক আল্লার পরিপূরক কেউই নাই । সে স্বয়ংভু । ফাঁকিটা ওই জায়গায়ই । ফাঁকির রহস্যে ঝাঁকি খেয়ে আঁখি খুলে হারাধন-কলিমরা জেনেছে ...সব ই মিছা, একমাত্র আমি ই সত্য । অবশেষে হারাধন-কলিমরা জেনেছে ছামাদ মৌলবি আর রশিদ কনট্রাক্টরের রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার পেছনে ভুস্বামী ভৌতিক আল্লার কারসাজির আছে । এও জেনেছে ... হাওয়াই আসমানি জমিদারির ভৌতিক জমিদার আল্লা ''বেলুন সিন্ড্রোম' মাত্র । ক্ষুধার্ত উত্তেজিত কলিমুদ্দি হারাধনকে 'বেলুন সিন্ড্রোমে'র ফতোয়া দিয়া ক'দিন রোখা যায় বটে, চিরকাল নয় । মৌলবি, পাণ্ডা-পুরুত,যাজকদের সৃষ্ট 'বেলুন সিন্ড্রোম' আজ ভূপাতিত । কবিতা যদি দর্শন হয়ে দলিলপত্রে রূপ নেয় তবে এটা হবে আগামি দিনের আগাম চিন্তার খোরাক । ও হ্যা, কলিম ছলিম কিংবা হারাধনরা আজও ছামাদ মৌলবিদের কবজায় । আদি পাপের খেসারত দিচ্ছি আমরা । '৪৭ এ দ্বিজাতি তত্ত্বের ভূত ২০১১ এসেও চেপে বসে আছে । গোলাম আজম দেলুয়ার মোল্লা আমিনি মোল্লা এরা '৪৭ এর দ্বিজাতি তত্ত্বের সাম্প্রদায়িক ভূত হয়ে আমাদের প্রভু হতে চায় । শুধু তাই ই নয়, এই সাম্প্রদায়িক ভূতেরা এখন সব্বাইকে খতম করে আল্লাফাঁক হতে চায় । এই অবস্থায় এমনি পরিবেশ পরিস্থিতে এই কবিতার গুরুত্ব খুব । তাই এই আলোচনা।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


