somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ইতিহাস দখলের হীনচেষ্টা

১৩ ই এপ্রিল, ২০১৪ সকাল ৯:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি ছিলেন বলে দাবি করেছেন তার ছেলে বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান। অর্থাৎ স্বয়ং জিয়াউর রহমান কোথাও দাবি করেননি যে তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি। এখন তারেক রহমানের এ অদ্ভুত দাবির পেছনে নিশ্চয়ই রাজনৈতিক মরতবা লুকিয়ে আছে। বর্তমান সরকারের পতন ঘটানোর জন্য তারা দেশবাসীকে অনেক আহ্বান জানিয়েছিলেন, দেশবাসী কর্ণপাত করেনি। দেশের মানুষকে ডাক দিয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, ডাক দিয়েছিলেন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়া বন্ধ করার জন্য, সর্বশেষ ডাক দিলেন ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বন্ধ করার জন্য। ২৯ ডিসেম্বর দলের কার্যালয়ের সামনে মহাসমাবেশ ডেকেছিলেন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া। তাতেও কর্ণপাত করেনি জনগণ। তত্ত্বাবধায়ক হলো না কিন্তু কাদের মোল্লার ফাঁসি হলো, মহাসমাবেশ হলো না কিন্তু নির্বাচন হয়ে গেল, আমাদের আব্বা হুজুরও (মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) প্রসন্ন কণ্ঠে স্বীকৃতি দিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ১৫৭টি আসন পাওয়া সরকারকে। এতে বিপন্ন হওয়ারই কথা তারেক রহমানদের। তারা বেশ বেকায়দায়ই পড়েছেন। আমি এ কথা বলব না যে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ যতটা বিপদে পড়েছিল, জেলখানায় চার জাতীয় নেতাকে হত্যার পর যতটা বিপদে পড়েছিল, বিএনপি ততটা বিপদে পড়েছে। তবে বিপদে পড়েছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এ চলমান সঙ্কট থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তারেক রহমান ইতিহাসকে হাতিয়ার করেছেন তার বিকৃতি ঘটিয়ে কোনোরকম তীরে উঠতে। তা কি সম্ভব হবে? আন্দোলনও যুক্তি ও সততার ওপর মেরুদ- সোজা করে দাঁড়িয়ে সামনে অগ্রসর হয়। এর ব্যতিক্রম হলে আন্দোলন জমে না। আমাদের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস তো সে কথাই বলে। ওইসব আন্দোলন তো সিভিল সমাজের নেতাদের ত্যাগের বিনিময়ে গড়ে উঠেছিল। তারা এত ছোট সাইজের নেতা ছিলেন না যে তাদের ইতিহাস দখলের প্রয়োজন হয়েছিল। শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানী, কমরেড মণি সিংহ, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ কেউ কারো ইতিহাস দখলের চেষ্টা করেননি। কেউ কাউকে ছোট করেননি। কেউ কাউকে ল্যাং মারেননি। স্বাধীনতা আন্দোলনের ধারাবাহিকতার ধাপে এদের প্রত্যেকের অবদান আছে। এদেরই ত্যাগী অবদান কাজে লাগিয়ে, এদেরই পদক্ষেপ অনুকরণ করে এক পর্যায়ে নিজেই সঠিক-সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়ে, জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন করে ফেলেছেন বঙ্গবন্ধু। রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা ভাষার কবি-সাহিত্যিকরা কোনো না কোনোভাবে রবীন্দ্রনাথের দ্বারা প্রভাবিত। তাই যখন পাকিরা রবীন্দ্রনাথকে অপমান করত, তখন তাবৎ রবীন্দ্রউত্তর কবি-সাহিত্যিকদের অপমান করা হতো। সুতরাং যখন বঙ্গবন্ধুকে তারেক রহমানরা অপমান করেন, খাটো করেন তখন প্রত্যেক জাতীয় নেতাকে অপমান করেন বলেই ধরে নিতে হবে। জাতীয় নেতাদের ত্যাগ ও স্বপ্ন বঙ্গবন্ধুর মাধ্যমে সফল হয়েছে_ স্বাধীনতার ১৪ খ- দলিল এ কথারই সাক্ষ্য দেয়, যা জিয়ার আমলে সংগ্রহ ও সম্পাদনা করেছিলেন কবি হাসান হাফিজুর রহমান। ২০০১ সালের ১ অক্টোবরের পর খালেদা জিয়ার তাঁবেদাররা এ দলিল বিকৃত ও সংশোধন করেছিলেন। ইতিহাস থেকে বঙ্গবন্ধুকে বিদায় দিয়ে জিয়াকে ঘোষক বানাতে চেয়েছিলেন। ২৭ মার্চের পরিবর্তে ২৬ মার্চ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন জিয়াকে ঘোষক বানানোর স্বার্থে। এটাকে ইতিহাস দখলের হীনচেষ্টা ছাড়া আর কী বলা যেতে পারে? জিয়াউর রহমানেরই লেখা প্রবন্ধ 'একটি জাতির জন্ম', সেখানে তিনি দাবি করেননি তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি, দাবি করেননি যে তিনি ২৬ মার্চ বেতারে কোনো কিছু ঘোষণা দিয়েছেন, দাবি করেননি স্বাধীনতা আন্দোলনে বা মুক্তিযুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কোনো অবদান নেই। তিনি তো বললেন, 'বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ছিল আমাদের জন্য গ্রিন সিগন্যাল'। তিনি যখন ক্ষমতায় তখনো তো বলেছিলেন এক সাংবাদিকের কাছে, 'তিনি আমাদের মহান নেতা'। ২৭ মার্চ বেতারে ঘোষণা পাঠ করার সময়ও তো বললেন, 'বঙ্গবন্ধু আমাদের মহান নেতা, তিনি সরকার গঠন করেছেন, তার সরকারই বৈধ সরকার'। তার প্রবন্ধে আরো বলেছেন, 'তারপর এলো ১ মার্চ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের উদাত্ত আহ্বানে সারাদেশে শুরু হলো ব্যাপক অসহযোগ আন্দোলন'। (কামরুজ্জামান লিটন সম্পাদিত বঙ্গবন্ধু স্মারকগ্রন্থ, পৃ. ১৭৩)। জিয়াউর রহমান তার প্রবন্ধেও কিন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের একটি ধারাবাহিকতার রূপরেখা দিয়েছেন। তিনি ইতিহাস টানার সময় '৭১ সালের ২৭ মার্চ থেকে শুরু করেননি। তিনিও বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক অসহযোগ আন্দোলনের গুরুত্ব স্বীকার করেছেন। 'জাতির পিতা' কাকে বলা হয়? যার নেতৃত্বে দেশ স্বাধীনতা লাভ করে তাকেই বলা হয়। এ কথা জেনেই জিয়া বঙ্গবন্ধুকে 'জাতির পিতা' বলেছিলেন। থুক ফেলে সেই থুক মুখে ফিরিয়ে নেয়া যায় না। এটা ইতিহাস বিকৃতকারীদের বেশি করে মনে রাখা দরকার। তারেক রহমান এবং তার মা, সাদেক হোসেন খোকা নতুন করে 'ঘোষক' বিতর্কের সঙ্গে 'প্রথম রাষ্ট্রপতি' বিতর্ক জুড়ে দিয়ে রাজনীতির বাজারে কুতর্কের জন্ম দিলেন। এতে তাঁবেদারদের, টকশোওয়ালাদের লাভ হতে পারে, সুস্থধারার রাজনীতির কোনো উপকার হবে না। খোদ জিয়া ও তার বিএনপির কোনো উপকার হবে না। জিয়া প্রথম ঘোষণায় নিজেকে সুপ্রিম কমান্ডার ঘোষণা দিয়েছিলেন। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের নেতারা তার ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করলে তিনি বলেছিলেন, 'দেশ-বিদেশের কাছে গুরুত্ব পেতে হলে এই দাবি প্রয়োজন'। এর উত্তরে প্রবীণ রাজনীতিক এ কে খান বলেছিলেন, 'বিনা পটভূমিতে অনুরূপ প্রাধান্য দাবি করা বিপজ্জনক। আর স্বাধীনতা ঘোষণার দায়ভাগ বহনের ক্ষমতা সে মুহূর্তে শেখ মুজিব ছাড়া আর কারো ছিল না।' (ড. মজহারুল ইসলাম- বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব - আগামী সংস্করণ, পৃ. ৬৫৬)। এ কে খানের কথার পরিপ্রেক্ষিতে জিয়া উক্ত কথাটি প্রত্যাহার করে তৃতীয় ঘোষণায় কয়েকবার বঙ্গবন্ধুর নাম ঘোষণা করেন। কবে হলেন তিনি রাষ্ট্রপতি? তখন কে বা কারা, কোথায় কোন পরিবেশে জিয়াকে রাষ্ট্রপতি হিসেবে নাম প্রস্তাব করেছেন এবং সমর্থন করেছেন? তা বেতারে প্রচারিত হলো না কেন? রাষ্ট্রপতি হলে তিনি মুজিবনগর সরকারের অধীনে কাজ করলেন কীভাবে? তিনি জেড ফোর্সের অধিনায়ক হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছিলেন মুজিবনগর সরকারেরই অধীনে। স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি ইতিহাসে পাত্তা পাবেন না। '৭১-এর ১৭ এপ্রিলের প্রণালিবদ্ধ, সুষ্ঠু, গণতান্ত্রিক বিধিসম্মত ইতিহাস পালটাতে পারবেন না তারেক রহমানরা। অতএব সাধু সাবধান!
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×