প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার পিতার কাছ থেকে যে শিক্ষা ও ঘরানার উত্তরাধিকার লাভ করেছেন তাতে তিনি ডাউন টু আর্থ হবেন, এটাই স্বাভাবিক। তার একটি মাটিতে উপবিষ্ট ছবি সামাজিক মাধ্যমে ও মিডিয়ায় ব্যাপক প্রিয়তা লাভ করেছে। পিঠা উৎসবে গণভবনের অঙ্গনে মাটিতে বসা শেখ হাসিনাকে দেখে আমাদের মন জুড়িয়ে গেছে। এটাই তো হওয়া উচিত। ক্ষমতার কাছাকাছি বা ক্ষমতায় গেলে জনগণের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া নেতারা ইতিহাসে টিকে থাকতে পারেননি। একদা তুমুল ও প্রবল জনপ্রিয় নেতাদের অনেকেই সে প্রক্রিয়ার শিকার হয়েছেন। সুহার্তো থেকে জুলফিকার আলী ভুট্টো বা সাদ্দাম হোসেন, সবারই পপুলারিটি ছিল।
কিন্তু তারা তা খুইয়ে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছিলেন যা অনভিপ্রেত বলেও সত্যি ছিল। এদের কথা বললাম এই কারণে, আমাদের দেশের সঙ্গে হুবহু না মিললেও এরাই কাছাকছি। দেশে যে দুজন নেতা বা নেত্রী যে কোনো কারণে সব সময় আলোচনায় থাকেন, শীর্ষে থাকেন, তাদের আচরণগত তফাৎ ধরতে পারলে নীতি বা আদর্শ বোঝাও সহজ। এরপরও আমরা তা করিনি বা করতে চাই না।
শেখ হাসিনার বড় দোষ প্রগলভতা। মাঝে মাঝে তিনি এমন সব সত্যি কথা বলে ফেলেন যা হজম করা কঠিন। মাঝেমধ্যে জনগণের চোখে তা ভালো ঠেকে না। কিন্তু এটা মানতে হবে, তিনি মিথ্যে বলেন না। যখন যেটা অনুভব করেন বা তার কাছে প্রয়োজনীয় ও সত্য বলে মনে হয় অকপটে বলে ফেলেন। এ ধরনের মানুষ বা নেতারা স্বচ্ছ। এদের বুঝতে অসুবিধে হয় না। এদের জীবনে দুধরনের মানুষের প্রভাব থাকে। একদল সমর্থক, অন্যদল বিরোধী, মাঝামাঝি বা দোদল্যমান বলে কিছু নেই। এর সুযোগে হুজুগে বাঙালির এক বিশাল অংশ তাকে নিয়ে যেসব গল্প বানায় তার বেশিরভাগই কাল্পনিক। একটা কথা মাথায় ঢোকে না, যারা সেদিনও তার সঙ্গে ছবি তুলে সেলফি বানিয়ে পোস্ট দিয়ে বিখ্যাত সাজলেন, তারা শেখ হাসিনার বিরোধিতা করেন কিভাবে?
মিডিয়া সংশ্লিষ্ট মানুষদের প্রতি আগে যেমন শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা ছিল, সেটা এখন বিলুপ্তির পথে। এর কারণও কিন্তু ওই স্ববিরোধিতা, বাংলাদেশে একটা ব্যাপার কিছুতেই মানা হয় না, মানার রেওয়াজ নেই। যে মিডিয়া হবে বস্তু ও দলনিরপেক্ষ কিন্তু আদর্শ নিরপেক্ষ নয়। অথচ এরাই গোলাম আযমের মৃত্যু পরবর্তী দিনগুলোকে শোকাবহ করেছিল। এদের কারণে সাকা চৌধুরীর ছেলে হুম্মামের নাম জেনেছে গ্রাম-গ্রামান্তরের বাঙালি। আজ যখন প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে তারা আর কভারেজ দিচ্ছে না, মানুষও ভুলে গেছে। একদিকে একাত্তর মুক্তিযুদ্ধ শহীদ ও ঐতিহ্যের প্রতি আনুগত্য বোধের প্রচারণা। পাশাপাশি ব্যালেন্সের নামে রাজাকারদের হাইলাইট করা মিডিয়ার মানুষগুলো জানে না, দুনিয়ার কোনো দেশে খোদ জার্মানিতেও হিটলার বিষয়ক শোকাবহ কোনো প্রচারণা নেই। ন্যায্যতার দিকটা উপেক্ষিত হলে আদর্শ থাকে না। বলছিলাম গণভবনে পিঠা উৎসবের কথা। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে খালেদা জিয়ার এটাই পার্থক্য। খালেদা জিয়াও উৎসব করতেন, অতিথি অভ্যাগতদের ডাকতেন, চেয়ারে বসে দোয়া নিতেন বা দোয়া দিতেন। তাকে ঘিরে যারা মাতম করত বা নিয়ন্ত্রণে থাকত তারা পিঠা উৎসব বুঝত না। সব কিছুতে বিজাতীয় বিশেষত পাকিগন্ধ আর পাকি ভাব বজায় রেখে পালিত সে আয়োজনেও এরা যেতেন। ফেসবুকে টুইটারে ফটো আপলোড করে নিজের উচ্চতা বোঝাতে দেরি করতেন না। এটাই ভয়ের। নিউজ কভারেজ দিতে বা কভার করতে যাওয়া এক বিষয় আর নিজে জড়িত হয়ে পড়া ভিন্ন।
মিডিয়া সংশ্লিষ্টরা কেন এটা মানবেন না? তারা হয়তো বলবেন ঘনিষ্ঠতা বা ব্যক্তি সম্পর্ক থাকতেই পারে। তা অবশ্যই পারে। আমাদের জীবনে এর প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু আমি দেখছি ঝুঁকে পড়া। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর বদান্যতা ও সৌজন্যের প্রকাশ তার সরলতায়। মিডিয়ার দায় তার মহত্ব প্রচার। আচরণের উদারতা বা নতুন কিছু থাকলে তাকে জাগিয়ে রাখা। সেটা না করলে যে মানুষটি আমাদের হয়ে এতকিছু করছেন যার অজান্তে শত্রু বাড়ছে, রাজাকাররা সংগঠিত হচ্ছে তাকে মর্যাদা বা ভালো থাকতে দেয়া যাবে না। তাকে ভালো রাখা যদি কর্তব্য হয়, নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরা জরুরি। আমরা ঘরপোড়া মানুষ, বঙ্গবন্ধু আমল দেখেছি। তার মতো মহান হৃদয়বান সার্থক বাঙালি আজ আর একটিও নেই। গায়ের চাদর খুলে দিয়ে দিতেন, জড়িয়ে ধরতেন, বাড়িতে এলে না খেয়ে যেতে দিতেন না। সে তাকে নিয়ে কত ছলচাতুরী, কত কৌশলে তাকে ছোট করার অপচেষ্টা। এটা মানি সে রাতের পিঠা উৎসবে সমাগতদের বেশিরভাগই প্রধানমন্ত্রীকে ভালোবাসেন। তার চেতনাকে ধারণও করেন। কিন্তু সেটাই যথেষ্ট নয়। দেশ ও জাতির ক্রান্তিকালে বিশেষত একপক্ষ যখন ষড়যন্ত্রে লিপ্ত, তখন ব্যক্তিগত ভালোবাসার পাশাপাশি আদর্শের দিকটা তুলে ধরাও জরুরি। এমন এক সমাজে আমরা থাকি, এমন এক অতীত আমাদের ঘিরে আছে যেখানে পিঠা খেয়ে পিঠা প্রদর্শনে সময় লাগে না। তাই এত কথা বলা।
প্রধানমন্ত্রীর মাটিতে উপবিষ্ট ছবিটির প্রচার গ্রামগঞ্জে হওয়া জরুরি। তিনি যে মাটির কাছাকাছি ও মানুষের পাশাপাশি সেটা তাদের মতো ভালো কেউ বোঝে না। তারা ভালোবাসে ও চায় বলেই আওয়ামী লীগ টিকে আছে। বারবার শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে দল জেগে ওঠার প্রেরণা পায় এদের কাছে। এরা দল বেঁধে ঝুঁকি নিয়ে ভয়ভীতি এড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের দেশকে সামনে নিয়ে যাচ্ছে একদিন তাদের ডেকেও নিশ্চয়ই আপনি পিঠা খাওয়াবেন। জনতার নেত্রী বলেই আপনাকে আমরা জননেত্রী বলি। জননেত্রী হওয়ার জন্য যে মাটির মানুষের স্পর্শ প্রয়োজন, সেটা আপনার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।
সিডনি থেকে
অজয় দাশগুপ্ত : কলাম লেখক।
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে জানুয়ারি, ২০১৬ সকাল ১০:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



