somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গণহত্যা দিবস

২১ শে মার্চ, ২০১৭ সকাল ১০:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গত ১১ মার্চ (২০১৭) জাতীয় সংসদে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালোরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বর্বরোচিত ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণের প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে। এর আগে ২৫ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের দাবি ওঠে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছ থেকে।
এ কথা সকলের কাছে পরিষ্কার যে, নয় মাসে ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হওয়া নিয়ে কোনো বিতর্ক চলতে পারে না। কারণ রবার্ট পেইন তার ‘Massacre, The Tragedy of Bangladesh’ গ্রন্থে ইয়াহিয়া খানের উদ্ধৃতি দিয়েছেন এভাবে : ‘Kill three million of them and the rest will eat out of our hands.’ পাকিস্তানি শাসকদের এই সিদ্ধান্তের কারণে দৈনিক গড়ে ছয় হাজারের বেশি মানুষ খুন হয় সারা বাংলাদেশে। এজন্য ১৯৭১ সালে মার্কিন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করে পাকিস্তানি সেনাদের বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যা চালানোর অভিযোগ আনেন। ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞকে বিশ শতকের ৫টি ভয়ঙ্কর গণহত্যার অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আর্কাইভ’ তাদের অবমুক্তকৃত দলিল প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশের নারকীয় হত্যালীলাকে ‘জেনোসাইড’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ঢাকায় অবস্থিত মার্কিন কূটনীতিকরা সেসময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্যাপক গণহত্যার বর্ণনা দিয়ে ওয়াশিংটনে বার্তা প্রেরণ করেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিকরা একাধিক লেখায় এবং বিশ্বখ্যাত পত্রিকা টাইম, নিউইয়র্ক টাইমস প্রভৃতি পত্রিকার সম্পাদকীয়তে পাকিস্তানিদের গণহত্যা নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করা হয়। উপরন্তু ১৯৭২ সালে পাকিস্তানে গঠিত ‘হামিদুর রহমান কমিশন’ তাদের পরাজয় অনুসন্ধান করতে গিয়ে বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ ও নারী নির্যাতনের ঘটনার প্রমাণ পায়। আর এই ভয়ঙ্কর গণহত্যায় কেঁপে উঠেছিল বিশ্ববিবেক। জর্জ হ্যারিসন ও পণ্ডিত রবিশংকর ‘কনসার্ট ফর বাংলাদেশ’ আয়োজন করেন। দার্শনিক আঁদ্রে মালরোর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘আন্তর্জাতিক ব্রিগেড’। প্যারিস ও লন্ডনে সরব হয়ে ওঠেন মানবতাবাদী নেতৃবৃন্দ। বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের দ্বারা সংঘটিত গণহত্যা ব্যাপক এবং নিষ্ঠুরতার দলিল হিসেবে আজও বিশ্বকে নাড়া দেয়।
আসলে বিংশ শতাব্দীতেই ঘটেছে কোটি মানুষের প্রাণসংহার। বিশ্বযুদ্ধ ও জাতি নিধনের সেই পরিকল্পিত ও ভয়াবহ হত্যাযজ্ঞ ‘জেনোসাইড’ অভিধা পেয়েছে। হিটলারের কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের বন্দি শিবির সেই জেনোসাইডের নির্মম ইতিহাসের কথা বলে। অ্যান্থনি মাসকারেনহাস তার ‘দ্যা রেপ অব বাংলাদেশ’ গ্রন্থের ‘গণহত্যা’ অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘সারা প্রদেশ জুড়ে হত্যাকাণ্ডের সুব্যবস্থার নমুনার সঙ্গে জেনোসাইড বা গণহত্যা শব্দটির আভিধানিক সংজ্ঞার হুবহু মিল রয়েছে।’ তিনি প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা এবং পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার মুখ থেকে জেনেছিলেন গণহত্যার লক্ষ্যবস্তু ছিল—ক) বাঙালি সৈনিক, পুলিশ, আনসার প্রভৃতি খ) হিন্দু সম্প্রদায় গ) আওয়ামী লীগের লোক ঘ) কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঙ) অধ্যাপক ও শিক্ষক যারা বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। তবে তিনি এটাও লক্ষ্য করেছিলেন যে সেনাবাহিনীর নৃশংসতা ছিল নির্বিচার। নিরপরাধ, সাধারণ মানুষকেও শত্রু হিসেবে গণ্য করেছিল তারা। তাছাড়া তাদের গণহত্যা ছিল ‘শোধন প্রক্রিয়া’ যাকে শাসকগোষ্ঠী রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান বলে মনে করত। সেই সঙ্গে এই বর্বরোচিত উপায়ে প্রদেশটিকে উপনিবেশে পরিণত করাও ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য।
বাংলাদেশে ১৯৭১-এ পাকিস্তানি শাসক ও তাদের দোসর আলবদর, আলশামস ও রাজাকার বাহিনী পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক ধ্বংসলীলা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, হিন্দু জনগোষ্ঠী নিধন ও বিতাড়ন, রাজনৈতিক ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতন, মুক্তিযোদ্ধাদের নির্বিচারে হত্যা করেছিল। বাঙালি জাতির প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণা থেকে তাদের ২৫ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু হয়েছিল। সেই পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ২৫ মার্চকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের দাবিকে আরো বেশি তাত্পর্যবহ করে তুলেছে। এই দিবস হবে পৃথিবীর মানব জনগোষ্ঠীকে নির্মম নিধনের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য উচ্চকণ্ঠ এবং হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সোচ্চার ভবিষ্যত্ প্রজন্মের একমাত্র ভরসার দিন। আশা করা যায় এই দিবসের চেতনা গণহত্যার বিরুদ্ধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ করবে।
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মার্চ, ২০১৭ সকাল ১১:০০
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিমানবন্দরে নির্ঘুম রাত (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৭

আমার এখানে বাজছে রাত প্রায় দুটা! এখনো জেগে আছি। জেগে থাকার শানে নুযুল হলো, আমি অনেকটা ফাইসা গেছি! হায়দার সাহেবের গানের মতো, "আমি ফাইসা গেছি, আমি ফাইসা গেছি মাইনকা চিপায়!"... ...বাকিটুকু পড়ুন

মতামত পোস্ট: ১ আগস্ট ২৪ এ লেখা: আমার কথা ৯৫ ভাগ মিলে গেছে

লিখেছেন অর্ক, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১:৫৭



এবারের ছাত্র আন্দোলনের মূল যে দাবি বা উদ্দেশ্য, তা আসলে অত্যন্ত সাধারণ। সে সব সকল মাধ্যমে বহু চর্চিত, প্রচারিত ও আলোচিত। তাই পুনরাবৃত্তি থেকে বিরত থাকছি। আন্দোলনের নেতৃত্ব যারা দিচ্ছে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৯



ম্যান মেড প্রাণীজ দুগ্ধ......

বির উনি একজন গোয়ালা (গোয়ালিনী)। তাহার নিজের কোনো গরু(গাভী) নাই। তারপরও তিনি দৈনিক প্রায় একশত লিটার দুধ বিক্রি করেন। নিজের 'কয়েকজন বান্দা কাস্টমার আছে'।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিএনপি একটি বেঈমান আর গাদ্দারদের দল।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:৫০

‘বিএনপি ৭৫এর যোদ্ধাদের রক্ষা করেনি, ২৪ এর যোদ্ধাদেরও রক্ষা করবে না।’ ...বাকিটুকু পড়ুন

×