somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) যন্তর মন্তর অভিযান পণ্ড করতে নরেন্দ্র মোদির সরকার যে তাণ্ডব চালাল, তা পুরো দেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আন্দোলন ঠেকানোর জন্য দিল্লিকে পুরোপুরি অচল করে দেওয়া হয়েছিল। ৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ৩৫ হাজার পুলিশ, র‍্যাফ ও আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন, সাতস্তরীয় ব্যারিকেড, ৩ হাজার সিসি ক্যামেরা, দিল্লির ৪৫টি স্টেশন বন্ধ রাখা এবং দিল্লিগামী ২৫০টি দূরপাল্লার ট্রেন বাতিল করার মতো এমন নজিরবিহীন ঘটনা সুদূর অতীতেও কেউ দেখেনি।

জার্মানি থেকে উড়ে আসা জনপ্রিয় ইউটিউবার ধ্রুব রাঠি, চার রাজ্যের সাবেক চার মুখ্যমন্ত্রী—মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, পিনারাই বিজয়ন, মানিক সরকার ও অরবিন্দ কেজরিওয়াল থেকে শুরু করে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে যেভাবে আটক করা হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে এই তরুণ প্রজন্মকে ভয় পাচ্ছে মোদি সরকার। শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপাল হয়ে এবার দিল্লির রাজপথে তরুণদের এই স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকে বলা হচ্ছে ‘জেনজি ২.০’ আন্দোলন।

তরুণদের এই জাগরণ আজ শুধু দক্ষিণ এশিয়ার এক প্রান্তে সীমাবদ্ধ নেই। শ্রীলঙ্কার সরকার পরিবর্তনে তরুণরাই মূল ভূমিকা রেখেছিল। ঠিক একইভাবে, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে বাংলাদেশে সংঘটিত গণঅভুত্থানে ছাত্র ও তরুণ সমাজের ব্যাপক ও রক্তক্ষয়ী অংশগ্রহণ ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। নেপালের তরুণেরাও তাদের দেশে আন্দোলনের মাধ্যমে স্বৈরাচারী সরকার পরিবর্তন করেছে এবং বর্তমানে তাদের দেশ পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণ প্রজন্মই। রাষ্ট্রযন্ত্রের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে এই জেনজি প্রজন্ম যে কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে যেভাবে বুক চিতিয়ে লড়তে জানে, দিল্লির যন্তর মন্তরের ঘটনা তারই সর্বশেষ প্রমাণ।

কিন্তু এই সাফল্যের গল্পের ঠিক উল্টো পিঠে বাংলাদেশের দিকে তাকালে এক গভীর হতাশা আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছুই মেলে না। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর আজ দেড়-দুই বছর পার হতে না হতেই সেই সম্মুখ সারির ছাত্র ও তরুণ নেতারা আজ চরমভাবে ইমেজ সংকটে নিমজ্জিত!

আজ সাধারণ মানুষের মুখে মুখে একটাই অভিযোগ—মব কালচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ, নারী কেলেঙ্কারী আর ক্ষমতার অপব্যবহার—এমন কোনো অপরাধ নেই যার সাথে এদের নাম জড়িয়ে যায়নি। আজ দেশের সাধারণ মানুষ জুলাই যোদ্ধা বা এই তরুণ নেতাদের কথা শুনলে বিরক্তিতে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনটা কেন হলো? কারণটা জলের মতো পরিষ্কার। আন্দোলনের সুফল ভোগ করতে গিয়ে এই তরুণেরা মদমত্ত হয়ে পড়েছিল ক্ষমতার স্বাদে। তাদের মূল প্ল্যান বা টার্গেট হয়ে দাঁড়িয়েছিল—অনির্বাচিতভাবে এই ক্ষমতাকে অনির্দিষ্টকাল ধরে নিজেদের কুক্ষিগত করে রাখা এবং অবাধে ক্ষমতার অপব্যবহার করা।

আজ আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, মাহদী, আয়াশ, তানভীর, নাসির উদ্দীন পাটোয়ারী, হান্নান মাসউদ কিংবা সারজিস আলমের মতো নামগুলো শুনলেই সাধারণ মানুষের মনে এক ধরনের বিতৃষ্ণা তৈরি হয়। অথচ এই তরুণেরাই একদিন দেশবাসীকে স্বপ্ন দেখিয়েছিল এক নতুন ধারার রাজনীতি ও সংস্কারের। তারা বলেছিল টোকাইতন্ত্র বা পুরনো রাজনৈতিক দলের দুর্নীতি তারা ভেঙে চুরমার করে দেবে। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সেই সমস্ত সোনালী স্বপ্ন আজ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে তারা নিজেদের সেই আদর্শকেই জবাই করেছে, যার জন্য রাজপথে রক্ত দিয়েছিল হাজারো সাধারণ ছাত্র-জনতা।

দিল্লিতে যখন অভিজিৎ দিপক, অজিঙ্ক শিন্ডে বা ধ্রুব রাঠিদের হাত ধরে তরুণরা নতুন এক প্রতিরোধের ইতিহাস লিখছে, রাহুল গান্ধী যখন তাদের পিঠ চাপড়ে বলছেন—‘আমি তোমাদের নিয়ে গর্বিত’, ঠিক তখনই আমাদের দেশের তরুণ নেতৃত্বের এই পতন আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—আন্দোলন সফল করা এক জিনিস, আর ক্ষমতা টিকিয়ে রেখে সততা বজায় রাখা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস।

ক্ষমতা যখন মানুষের নীতি এবং আদর্শকে গিলে খায়, তখন তা শুধু ব্যক্তির পতন ঘটায় না, বরং গোটা একটা জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের অর্জনকে ছারখার করে দেয়। দিল্লির রাজপথের এই ‘জেনজি ২.০’ আন্দোলন হয়তো মোদির মসনদ কাঁপিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু বাংলাদেশের তরুণেরা ক্ষমতাকে যেভাবে কলুষিত করেছে, তা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক ট্র্যাজিক শিক্ষা হয়ে থাকবে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮
৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তার পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দিল্লির রাজপথে তরুণদের ‘জেনজি ২.০’ অভ্যুত্থান এবং বাংলাদেশের জুলাই-পরবর্তী রূপান্তরের নির্মম বাস্তবতা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:৩৮

ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে যা ঘটে গেল, তা সাম্প্রতিক ইতিহাসে সত্যিই অভূতপূর্ব। ভারতের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফা ও এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ‘তেলাপোকা’ বা ককরোচ জনতা পার্টির... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিমানবন্দরে নির্ঘুম রাত (সাময়িক পোষ্ট)

লিখেছেন কাছের-মানুষ, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:১৭

আমার এখানে বাজছে রাত প্রায় দুটা! এখনো জেগে আছি। জেগে থাকার শানে নুযুল হলো, আমি অনেকটা ফাইসা গেছি! হায়দার সাহেবের গানের মতো, "আমি ফাইসা গেছি, আমি ফাইসা গেছি মাইনকা চিপায়!"... ...বাকিটুকু পড়ুন

×