somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, উগ্রবাদী অবিচার ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তাদের পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো উদারপন্থী দেশেও তা বেড়ে চলেছে। ভারত ও মিয়ানমারে এই ঘৃণা আগুনের শিখার মতো ছড়িয়ে পড়েছে। জাপান, থাইল্যান্ড, চীন ও অস্ট্রেলিয়াসহ পৃথিবীর বহু দেশে এই ঘৃণা প্রবল হচ্ছে।

ক্রমশ অন্য ধর্মের মানুষের মধ্যে এই ধারণা জোরালো হচ্ছে যে, মুসলমানদের ধর্মের মধ্যেই উগ্রবাদের উপাদান রয়েছে, যা সভ্যতার জন্য হুমকিস্বরূপ। তাঁদের জীবনাচার আধুনিক বিশ্বের মূল্যবোধ ও বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ তো নয়ই, বরং তা বহু ক্ষেত্রে সাংঘর্ষিক।

যখন এই ঘৃণা বাড়ে, তখন উগ্র ডানপন্থীরা সেই আগুনে ঘি ঢালে এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক ফায়দা তোলে। ট্রাম্প যে ধরনের রাজনীতি করেন তার কৌশল হিসেবে এই ঘৃণাকে কাজে লাগানোর বিষয়টি প্রতিদিন দেখা যায়। উদাহরণ হিসেবে, কয়েক দিন আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিশিগানের সিনেটর পদপ্রার্থী আব্দুল এল-সায়েদকে "জিহাদি" বলে অভিহিত করার পাশাপাশি তাঁর নাম উল্লেখ করেন মোহাম্মদ এল-সায়েদ। এল-সায়েদের পুরো নাম আব্দুর রহমান মোহাম্মদ এল-সায়েদ; তাঁর প্রথম নাম মোহাম্মদ নয়। মুসলিম সিনেটর পদপ্রার্থীর নামকে ইচ্ছাকৃতভাবে লক্ষনীয় করে ট্রাম্প এল-সায়েদের মুসলিম পরিচয়ের সাথে ইসলামপন্থি সন্ত্রাসবাদকে যুক্ত করেন এবং তাঁকে ঘিরে অপপ্রচারকে শক্তিশালী করেন।

কিন্তু তবুও মুসলিম সমাজের প্রতি এই ঘৃণাকে শুধু উগ্র ডানপন্থী রাজনীতির অসাধু কৌশল বা পশ্চিমা বর্ণবাদী রাজনীতি ও ঔপনিবেশিকতার ফল হিসেবে ব্যাখ্যা করলে বিষয়টি শেষ হয় না।

মুসলমানদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে বারবার যেসব বিষয়কে উল্লেখ করা হয়, তার মধ্যে আছে শরিয়া আইন, জিহাদ ও সন্ত্রাসবাদ। পাশাপাশি, স্বাধীন মতপ্রকাশ ও নারীস্বাধীনতার মতো মৌলিক অধিকারের প্রশ্নে মুসলিম সমাজের একটি অংশের বিরোধিতা এবং অগণতান্ত্রিক অবস্থান ইসলাম সম্পর্কে ভয় ও বিদ্বেষকে উসকে দেওয়ার যৌক্তিকতা তৈরি করে। ধর্মীয় অনুভূতির দোহাই দিয়ে মুসলমানেরা যখন মানুষের মৌলিক অধিকার অস্বীকার করে তখন ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা যৌক্তিকভাবেই আরও গভীর হয়।

এই বিষয়গুলো নিয়ে মুসলিম সমাজের ভেতরে আত্মসমালোচনা না থাকলে, উগ্র ডানপন্থীরা অনবরত সেগুলোকে নিজেদের প্রচারণার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে। এর পরিণতি একদিকে মুসলিম সমাজের জন্য অসহনীয় হয়ে উঠবে, অন্যদিকে ইসলামবিদ্বেষ শুধু পশ্চিমা সমাজে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং বিশ্বের যেখানেই মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করবে, সেখানেই ভিন্নধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের মধ্যে তাদের প্রতি ঘৃণা, ভয় ও অবিশ্বাস বাড়তে থাকবে।

এই আলোচনায় শরিয়াহ আইন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ। এ নিয়ে মুসলিম সমাজের আত্মসমালোচনার যে প্রয়োজনীয়তা সেটা বোঝার জন্য সৌদি আরবের এই সাম্প্রতিক ঘটনাটি বিবেচনা করা যাক।

সৌদি আরবের একটি শরিয়াহ আদালত ২৪ বছর বয়সী এক শ্রীলঙ্কান শ্রমিককে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। তাঁর অপরাধ, তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করে ফেসবুকে মন্তব্য করেছিলেন।

ঘটনাটি শুরু হয় গত বছরের জুন মাসে। শ্রীলঙ্কায় হিন্দুদের একটি তীর্থযাত্রার সময় এক মুসলিম ব্যক্তির কুকুরকে লাথি মারার ভিডিও ভাইরাল হয়। এটা নিয়ে অনলাইনে বিতর্ক ও কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়। সে সময় শ্রীলঙ্কান তামিল এই অভিবাসী শ্রমিক, যিনি নয় মাস আগে কাজের জন্য সৌদি আরবে গিয়েছিলেন, তামিল ভাষায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলাম ধর্মের নবীর প্রতি অবমাননাকর একটি মন্তব্য করেন।

তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মন্তব্যটি মুছে ফেলেন এবং প্রকাশ্যে ক্ষমা চেয়ে একটি ভিডিও প্রকাশ করেন। কিন্তু ততক্ষণে কেউ মন্তব্যটির স্ক্রিনশট নিয়ে তাঁর নিয়োগকর্তার কাছে পাঠিয়ে দেয়। বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষের নজরে আনা হলে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে একটি ফৌজদারি আদালত তাঁকে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও আট লাখ ডলার জরিমানা করে। কিন্তু সৌদি সরকার আপিল করে সাইবার অপরাধ আইনের পরিবর্তে শরিয়া আইনের অধীনে সেই শ্রমিকের আরও কঠোর শাস্তির দাবি জানায়। আপিল আদালত সেই দাবি মেনে নিয়ে ধর্ম অবমাননা বা ব্লাসফেমির অভিযোগে তরুণটির মৃত্যুদণ্ড দেয়।

সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে তাঁর পরিবারের সাথে আর কোনো যোগাযোগ নেই। তাঁর মা ছেলের প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। শ্রীলঙ্কা সরকার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে ক্ষমার আবেদন জানিয়েছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সৌদি আরবে পরিবার কিংবা সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে আগাম নোটিশ না দিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘটনাও অতীতে বহুবার ঘটেছে বলে মানবাধিকার সংস্থাগুলো জানিয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মের প্রতি অবমাননাকর মন্তব্যের শাস্তি কি কোনো সুস্থ বিবেকসম্পন্ন সমাজে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে? এই সেই শরিয়াতন্ত্রের দেশ, যেখান থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধর্মের নামে ওয়াহাবি মতাদর্শ রপ্তানি করা হয়। যার শাসকেরা অন্য দেশের কনস্যুলেটের ভেতরে পেশাদার খুনিদের দিয়ে সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে হত্যা করেছিল। যেখানে বাংলাদেশের মতো দেশ থেকে যাওয়া নারী গৃহকর্মীরা দিনের পর দিন ধর্ষণ ও নির্যাতনের শিকার হন। পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে, নেপালের মতো দেশও এই দেশগুলোতে নারী গৃহকর্মী পাঠানোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।

সেই দেশের মানবাধিকার লঙ্ঘন, নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রীয় আইন ও সন্ত্রাসবাদে পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ নিয়ে প্রশ্ন না তুলে, মুসলিম পরিচয়ের দোহাই দিয়ে মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে বাংলাদেশের যোগদানকে উৎসাহিত করে যেভাবে প্রপাগান্ডা চালানো হয়েছিল, তা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। কোনো দেশের সাথে সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিবর্তে যদি ধর্মীয় পরিচয় মুখ্য হয়ে ওঠে, তবে সেটা শুধু রাজনৈতিক অপরিণামদর্শিতাই নয়, সেটা নৈতিক দেউলিয়াপনাকেও স্পষ্ট করে তোলে।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:২০
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার : বিচারপতি নাভি পিল্লাইকে নির্বাচন করা হয়েছে

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৬

গাজা গণহত্যা’ প্রতিবেদনের তত্ত্বাবধানকারী জাতিসংঘের সাবেক মানবাধিকার প্রধান নাভি পিল্লাই নোবেল শান্তি পুরস্কার জিতেছেন।
জাতিসংঘ মানবাধিকার পরিষদের প্রধান হিসেবে তার দায়িত্বকালে, পরিষদটি ইসরায়েলের নিন্দা জানিয়ে
বিশ্বের বাকি অংশের সম্মিলিত প্রস্তাবের চেয়েও বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৪৮

চট্টগ্রাম বন্দরঃ জাতীয় স্বার্থ, দক্ষতা ও ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি....

বন্দর শুধু রাজস্ব আয়ের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি একটি দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি।
বাংলাদেশের আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্যের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামহোয়্যারইন ব্লগের সেরা ব্লগার

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:০৮



আমাদের দেশে যে কোনো ক্রিটিক্যাল সময়ে লক্ষ্য করা যায় কোনো না কোনো পণ্যের অভাব লেগে গিয়েছে। কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, ভোজ্য তৈল এমনকি রিলিফ গায়েব হয়ে যায়। বন্যায় আক্রান্ত বন্যায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তৌহিদি জনতা কবে দেশ রক্ষায় আন্দোলনে নামবে ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০১


আলহামদুলিল্লাহ। তৌহিদি জনতার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুনামগঞ্জে মেয়েদের একটি প্রীতি ফুটবল ম্যাচ বন্ধ করা গেছে। ইসলামের দৃষ্টিতে মেয়েদের খেলাধুলা নিষিদ্ধ এবং অশ্লীল কাজ হিসেবে গণ্য করা হয়। সুনামগঞ্জের মাটিতে এমন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×