আমি বর্তমান বাংদেশের মেডিকেল শিক্ষা ব্যবস্থার ভর্তি পরীক্ষা বিষয়ক কিছু কথা আজ এখানে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাচ্ছি। কয়েকদিন আগে আমি দেশের কোচিং সেন্টার বিষয়ক একটি লেখা এখানে পোষ্ট করি এবং তার পর বিভিন্ন জনের কাছ থেকে
ই-মেইলের মাধ্যমে শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে আরও কয়েকটি লেখার অনুরোধ পাই, তাই আজকে আমার এই ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। দেশের সরকারী মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার যে অবস্থা, তা আমি আমার আগের লেখায় কিছুটা তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি, কিন্তুু আজকে আমি দেশের বেসরকারী মেডিকেল কলেজ সমুহের ভর্তি পদ্ধতি এবং এর মানসম্পর্কে কিছু কথা লিখছি।
বাংলাদেশে প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের গোড়াপত্তন এবং ধারাবাহিকতা বেশ অনেক দিনের হল। যে বিষয়ে আজকে আমি প্রধানত ফোকাস করছি তা হল, দেশের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের মাধ্যমে পাস করে আসা ভবিষ্যত প্রজন্মের ডাক্তারদের বর্তমান ব্যাকগ্রাউন্ড। আমি কোন বিশেষ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজকে আক্রমণ করে লিখছি না বরং লেখার কনটেন্টস হিসেবে যা ডেটা পেয়েছি তা ব্যবহার করছি।
বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ, দেশের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের মধ্যে অন্যতম সেরা হিসেবে বিবেচিত। এ বছর এখানে সরকারের সবাস্থ্য অধিদপ্তরের আদেশ অমান্য করে ভর্তি পরীক্ষা ছাড়াই শুধুমাত্র জি.পি.এ.-এর ভিত্তিতে ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তির নোটিশ দেওয়া হয় যা পরবর্তীতে সরকারী একটি মনিটরিং টিমের দ্বারা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। ফলে আগামী 3রা ফেব্রুয়ারী শুক্রবার, বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে যা, আসলে একটি প্রোপাগান্ডা মাত্র! কারণ, বহু নির্ভরযোগ্য সূত্র হতে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী জানা যায় যে, এখানে অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীই নাকি আগে থেকে ভর্তি করে নেওয়া হয়েছে। তথাকথিত ফরেন কোটার নাম করে মোটা অংকের টাকা নিয়ে যে কোন স্টুডেন্ট-কে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ, তাদের এম. বি. বি. এস. কোর্সে ভর্তি করে নিচ্ছে/নিয়েছে। বহু উচ্চ পদস্থ মন্ত্রী, সচিব ইত্যাদি জনের তদবীর-এর মাধ্যমেও এখানে বেশীর ভাগ ছাত্র-ছাত্রীর ভর্তি চলে। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে শুধু দেখানো হয়, একটি ফরমালিটি; যদিও কিছু সংখ্যক জেনুইন ছাত্র-ছাত্রীকেও ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে নেওয়া হয়ে থাকে যাদের সংখ্যা অতি নগন্য। অতীতে এমন ঘটনার প্রমানও পাওয়া যায় যে, জেনুইন এলাও হওয়া ছাত্র বা ছাত্রীকেও ভর্তি করা থেকে বাদ দিয়ে তদবীর, ঘুষ এবং ফরেন কোটা অথবা টিচার কোটার কথা বলে স্টুডেন্ট ভর্তি করা হয়েছে। কথা হলো, এই মেডিকেল কলেজে যারা এই সকল উপায়ে ভর্তি হয়েছে বা হচ্ছে তারা ডাক্তার হবার কতটুকু যোগ্যতা রাখে? ভবিষ্যতে এরা যখন ডাক্তার হয়ে বের হবে, দেশ কি তখন তাদের কৃতি সন্তান হিসেবে গ্রহণ করবে, নাকি পাবে তাদের কাছ থেকে সত্যিকারের ভাল এবং কাংখিত নির্ভুল চিকিৎসার সেবা?
এবার আসা যাক সিকদার মেডিকের কলেজের কথায়, যা শুধু মাত্র একটি মহিলাদের মেডিকেল কলেজ। আমরা জানি, বাংলাদেশে, মহিলা ডাক্তারের প্রয়োজনীয়তা কতবেশী জরুরী ও গুরুত্বপূর্ণ এবং দেশের রুরাল অঞ্চলে রয়েছে লেডী ডাক্তারদের বিশাল ঘাটতি। বেশী কথা বলব না, শুধু ছোট্ট একটি উদাহরণ টানছি। এবছর সিকদার মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার হলে গিয়ে প্রশ্ন পত্র পেয়ে, ইংরেজী মিডিয়ামের ছাত্রীরা দেখতে পায় যে, প্রশ্নটি মুলত আগের বছরের; যেখানে টিক চিহ্ন দেওয়া উত্তরগুলো ইরেজর দিয়ে মুছে ফটোকপি করে দেওয়া হয়েছে-এ বছরের জন্য এবং একটু ভালমতো দেখলেই প্রশ্নের উত্তরগুলো ঐ প্রশ্ন থেকেই দেখা যাচ্ছিল! তা ছাড়া 11টি প্রশ্ন বাংলায় করা হয় এবং ইংরেজী মিডিয়ামের ছাত্রীরা এ ব্যাপারে সমাধান চাইলে পরীক্ষক অপারগতা প্রকাশ করেন এবং তাদেরকে "হেলথ ফর অল" নামে একটি প্যারাগ্রাফ লিখতে আদেশ দেন যেখানে ঐ 11 নাম্বারের মার্কিং হবে বলে তিনি বলেন। বস্তুুত এটি ছিল একটি নৈর্বক্তিক পরীক্ষা, রচনা মূলক নয়।
মাওলানা ভাসানী, শাহাবুদ্দিন ইত্যাদি সহ আরও অনেক
প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের মধ্যে চলছে এই খেলা! ভর্তি পরীক্ষার দিন বিকেলে বাসায় ফোন করে রেজাল্ট জানিয়ে দিয়ে, দ্রুত ভর্তি হওয়ার জন্য ইনসিস্ট করার মত অভিযোগও পাওয়া গেছে।
সরকারী মেডিকেল কলেজ সমূহের ভর্তিতে উচ্চ জি.পি.এ. পাওয়া ছাত্র-ছাত্রীরা প্রাধান্য পাওয়ায় দেশে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে বেসরকারী মেডিকেল কলেজ, যে গুলোর ভেতরের শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে বলতে গেলে আমাকে এ রকম আর একটি আর্টিকেল লিখতে হবে। কিন্ত ভর্তি পরীক্ষা বা ছাত্র- ছাত্রী নির্বাচনে ক্ষেত্রে, প্রায় এই সকল মেডিকেল কলেজগুলোই দুনর্ীতিগ্রস্ত- এ বিষয়ে নেই বিন্দুমাত্র সন্দেহ!
একটি কথা অস্বীকার করা যাবে না যে, একজন ছাত্র বা ছাত্রী যে ভাবেই হোক না কেন, যখন কোন একটি মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয় তখন তাকে দীর্ঘ ছয়টি বছর কঠোর পরিশ্রম ও পড়া লেখা করে তবেই ডাক্তার হতে হয়। কিনু্ত কথা হলো, এ সকল প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ সমূহের দূর্নীতি দ্বারা, ভর্তি পরীক্ষার সময়েই বঞ্চিত হয়ে পড়ছে অধিকাংশ সত্যিকারের মেধাবী ডাক্তার হতে চাওয়া দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যাদের কাছ থেকে দেশ হয়তো অন্যরকম কিছু একটা পেতে পারত।
দেশে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা অনেক, কিন্তুু প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় গ্র্যাজুয়েট এবং প্রাইভেট মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তারদের মধ্যে রয়েছে ছোট্ট একটি পার্থক্য। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করা একজন প্রকৌশলী, স্থপতি, বি. বি. এ. গ্র্যাজুয়েট, ইকোনোমিঙ্ গ্র্যাজুয়েট ইত্যাদিরা সমাজের উপর সরাসরি একটি প্রভাব তৎখনাৎ ফেলতে পারেন না যেমনটি ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে একজন ডাক্তারের-সরকারী বা বেসরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা।
আমি কখনই সরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তারদেরকে সুপিরিয়র ভাবছিনা অথবা বেসরকারী মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করা ডাক্তারদেরকে হেয় প্রতিপন্ন বা আন্ডারএস্টিমেট করছি না; কারন, আমি আগেই বলেছি, যে কোন ডাক্তারী শিক্ষা অধ্যয়ন করা একটি অত্যন্ত কষ্টসাধ্য ব্যাপার। যে বিষয়টিতে আমি বার বার সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চেয়েছি তা হল বেসরকারী মেডিকেল কলেজ সমূহের ছাত্র ছাত্রী ভর্তির দূর্নীতিমালা, সেইসকল ছাত্র ছাত্রীদের যোগ্যতা এবং প্রকৃত মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের ভর্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঘটনা।
শেষ একটি কথা না বললেই নয়। আমি একজন প্রকৌশলী, তবে কেন আমি দেশের প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের ভর্তি পরীক্ষার পেছনে লাগলাম? একজন সচেতন বাংলাদেশী নাগরিক হিসেবে আমি দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসকদের দশা কি হতে যাচ্ছে তা আপনাদেরকে জানানো প্রয়োজন বলে মনে করেই এই লেখাটি লিখলাম। বাকিটা আপনারা যে যা বুঝতে চান বেঝেন, আমার আপত্তি নেই কোন!
সুপ্রিয় পাঠক, এবার আপনারাই বলুন দেশের মানুষ যখন চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড সহ আরো অন্যান্য দেশে যেতে চায় বা যায় তখন কোন যুক্তিতে আমরা বলি" টিকিট লাগবে না, আমার দেশের সোনার ছেলেরা আছে না!!"(??)
কোন সাংবাদিক যদি এই লেখাটি পড়ে দৈনিক পত্রিকায় আপনার নিজের মতো করে ছাপানোর ব্যবস্থা করেন তাহলে দেশের জনগন এ সম্পর্কে সত্যিকারের ধারনা পেতে পারবে।
ভবিষ্যতে আরও কিছু লেখার ও আপনাদের সুচিন্তিত মতামতের প্রত্যাশায় আজ এখানেই শেষ করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
