
বেশ কয়েক মাস হলো সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে আমি একটি ব্লগে রেজিস্ট্রেশন করেছি। উদ্দেশ্য তেমন কিছুই নয়, সামাজিক যোগাযোগের সকল মাধ্যমে নিজের বিচরনের প্রমান রাখা। ব্লগ মানুষের সৃজনশীল ও মুক্তমত প্রকাশের জায়গা। যদিও এই সব মুক্তমত আর বাকস্বাধীনতা নিয়ে আমার খুব একটা মাথা ব্যাথা নেই তথাপি একজন একজন আদর্শ ফেসবুকার হিসেবে এই ইস্যুতে নিজের অবস্থান শক্ত করার জন্য আমাকেও এই পরিচয় নিতে হয়েছে। সম্প্রতি ফেসবুকে আমার নাম পরিবর্তন করে রেখেছি ব্লগার আহমেদ রবিন। এটা আমার ছদ্মনাম। ফেসবুক এবং ব্লগে কেউ কখনও আমাকে বাস্তবে দেখি নি। ছদ্মনাম থাকায় সুবিধা হয়েছে কেউ আমার বাস্তব জীবন নিয়ে আলোচনার সুযোগ পাচ্ছে না অন্য দিকে আমি পরিচিত দু'চারজনকে কিছু অপ্রিয় সত্য কথা মিষ্টি করে বলে আসতে পারছি। বেশি ঝামেলা হলে এক নাম থেকে বিদায় নিয়ে আবার অন্য নামে প্রত্যাবর্তন করছি। এটা এক অফুরন্ত লুপ যা অনন্তকাল ধরেই চলবে। তাই আমাকে ধরার সুযোগ কোথায়?
নিজের সৃজনশীল লেখালেখি নিয়ে খুব একটা আস্থা কখনও ছিল না। অধিকাংশ সময়ই চলমান ইস্যুতে গা ভাসিয়ে অন্যদের লেখার সাথে নিজের দু চার লাইন যোগ করে বেশ কিছু লাইক নিশ্চিত করেছি। তাই ব্লগে রেজিস্ট্রেশন করার পর বেশ সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। গল্প, কবিতা এই সব আমাকে দিয়ে লেখা হবে না, রাজনীতি নিয়ে নিয়ে লেখার রুচি নেই, তাহলে কি নিয়ে লিখব আমি? প্রথম কয়েকদিন নতুন পোস্ট লিখুন অংশটি ক্লিক করে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে ছিলাম। আমার ভেতরের সকল শব্দ, সকল ভাষা যেন নির্বাসনে চলে গিয়েছে। একটার পর একটা সিগারেট পুড়িয়েছিলাম শুধু ছোট্ট একটা লাইন লেখার আশায়, কিন্তু একটা শব্দও লিখতে পারি নি। প্রচন্ড রাগে ক্ষোভে হতাশায় নিজের উপর ঘৃনা জন্মে গিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত আমাকে আশ্রয় দিয়েছিল ফেসবুকের এক কিশোরী। আমার সম্পর্কে তার তার প্রচন্ড জানার ইচ্ছে। তার অনুপ্রেরণায় সিদ্ধান্ত নিলাম নিজের সম্পর্কেই লিখব। কিন্তু আমি তো একজন ভার্চুয়াল ক্যারেক্টার, পৃথিবীর মায়া কাটানো একজন মানুষ। আমার সম্পর্কে মানুষের কি জানার থাকতে পারে?
আমার প্রথম পোস্টে আমি লিখলাম,
অনেকেই বলে থাকেন ভার্চুয়াল জগতেই নাকি আসল মানুষকে চেনা যায়। আমাকে কেউ কখনও জানতে চেয়েছে বলে মনে পড়ে না, তাই অন্যদের চোখে নিজেকে চিনব বলে এই ভার্চুয়াল জগতে আমার আগমন। নিজের সম্পর্কে কিছু বলতে চাইছি, কিন্তু সমস্যা হচ্ছে আমার নিজের সম্পর্কে তেমন কিছু বলার খুঁজে পাচ্ছি না। হতে পারে আমি আপনার পাশের বাসার অবসরপ্রাপ্ত বৃদ্ধ মানুষটি, যার কাজ সারাদিন বারান্দায় বসে মানুষ দেখা কিংবা পাড়ার ফোন ফ্যাক্সের দোকানের এক কর্মচারী যে কিনা কাজের ফাঁকে এই ভার্চুয়াল জগতে ঢুঁ মারছে। কিংবা আজকে অফিসে আসার সময় বাসে আপনি হয়ত আমার পাশেই বসেছিলেন। আমার সাথে আপনার প্রায় প্রতিদিনই দেখা হচ্ছে, বাস্তব জগতে দেখা হলে আপনি হয়ত হেসে জিজ্ঞেস করেন কেমন আছেন?
একটা মজার ব্যাপার হচ্ছে, বাস্তবে আমরা সবাইকে সবাই চিনি, কিন্তু এই ভার্চুয়ালে কেউ কাউকে চিনি না। ভার্চুয়াল জগতকে মাঝে মাঝে আমার একটা অন্ধকার রুমের মত লাগে। যেখানে আমরা কেউই কাউকে দেখতে পাচ্ছি না, শুধু কন্ঠ দিয়ে চিনছি, অস্তিত্ব অনুভব করছি। কোন এক বৃষ্টিস্নাত বাদল দিনে আপনার সাথে হয়ত আমার দেখা হয়ে যাবে। আমি তখন হয়ত পথচলতি মানুষের ছাতার গুঁতো খেয়ে মৃদ্যু ঝগড়া করছি। আমার কন্ঠস্বর শুনে আপনি থমকে দাঁড়ালেন। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন, একজন একটি অপরিচিত চেহারা থেকে আপনার খুব পরিচিত একটা কন্ঠস্বর ভেসে আসছে।
আপনার অবাক দৃষ্টি দেখে আমি হয়ত জিজ্ঞেস করব, এক্সকিউস মি! আমি কি আপনাকে চিনি?
আপনি বিব্রত হয়ে দ্রুত মাথা ঝাকিয়ে বলবেন, নাহ! মাফ করবেন, ঠিক চিনতে পারছি না।
আমি তখন হয়ত মুচকি হেসে বলব, ঠিকই বলেছেন ভাই সাহেব, এই জগতে আমরা কেউই কাউকে চিনি না। শুধু চেনার ভান করি।
একটুকু লিখে আমি হাপিয়ে উঠলাম। ভীষন দমবন্ধ লাগছে। একটু মুক্তির আশায় জানালার পাশে এসে দাঁড়ালাম। আকাশে ঘন কালো মেঘ, ঝির ঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। দমকা হাওয়ার সাথে মাঝে মাঝে বৃষ্টির ছাঁটও ভেতরে প্রবেশ করছে। বাইরে তাকিয়ে দেখি অবারিত সবুজ বনভূমি আর জলাশয় যেন বৃষ্টিস্নাত হয়ে পূর্নতা পেয়েছে। অবাক হয়ে দেখলাম বৃষ্টির মাঝে এক কিশোরী ছাতা মাথায় লাল রঙের শাড়ি পড়ে, চুলে ফুল গুঁজে জলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে। জলের উপর লাল শাড়ি পড়া মেয়েটির লালচে প্রতিবিম্ব আর বৃষ্টির ফোঁটার যুথবদ্ধতা এক অদ্ভুত সম্মোহনী পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। অনেকদিন পূর্বে হুমায়ূন আহমেদের একটি বই পড়েছিলাম, দীঘির জলে কার ছায়া গো? আমারও এই খুব জানতে ইচ্ছে করছে, দীঘির জলে কার ছায়া গো?
অনেকক্ষন থেকে ভীষন সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু চোখ খুলে সিগারেট ধরাতে ইচ্ছে করছে না। ইচ্ছে করছে না ঐ মোহনীয় দৃশ্যে পরিবর্তে অন্য কোন নেশার মধ্যে প্রবেশ করি। দমকার হাওয়ার সাথে পাল্লা দিয়ে বৃষ্টি বাড়ছে। আমার রুমের মেঝে ভেসে যাচ্ছে বৃষ্টির পানিতে, আমি ভিজে যাচ্ছি। জানালাটা এবার বন্ধ করতেই হবে।
চোখ খুলতেই কংক্রীটের তীব্র জংঞ্জাল আমার চোখে বাড়ি খেলো। গলির রাস্তা ভেসে যাচ্ছে ড্রেনের উপচে পড়া পানিতে। নিচে তাকিয়ে দেখি একটি কিশোরী মেয়ে রিক্সার সন্ধানে ছাতা মাথায় অসহায়ভাবে ঢিবির মত উঁচু একটা স্থানে দাঁড়িয়ে আছে। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটা উপচে পড়া পানির উপর মেয়েটির প্রতিবিম্বকে ঝাপসা করে দিচ্ছে। আমি ধীরে ধীরে আমার রুমের জানালা বন্ধ করে দিলাম।
রুমে এখন বেশ অন্ধকার। আমি খোলা চোখে আবারও ফিরে যাচ্ছি সেই অবারিত সবুজ ঘেরা জলাশয়ের পাড়ে। মেয়েটি এখনও সেখানে দাঁড়িয়ে আছে, কি যেন খুঁজছে জলের বুক চিরে। দূরে হঠাৎ ঘন বৃষ্টির আড়াল থেকে একটি নৌকার কাঠামো স্পষ্ট হতে শুরু করল। কাছে আসতে দেখা গেল নৌকা ভর্তি অমরাবতী পদ্ম নিয়ে হাসি মুখে বসে আছে এক যুবক।
হঠাৎ মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। আবারো আমার কল্পিত সেই দৃশ্যপট বাঁধাগ্রস্থ। বিরক্তস্বরে বললাম, হ্যালো!!
- আপনি এইভাবে হ্যালো বললেন কেন? আপনাকে ফোন দেয়ার জন্য আমাকে কত কষ্ট করতে হয়েছে আপনি জানেন? ফোনের ওপাশ থেকে একটি কিশোরী কন্ঠের অভিমানী সুর।
পরিস্থিতি সামাল দিলে পাল্টা অভিমানের কন্ঠে আমি বললাম, সকাল থেকে এই বুঝি আমাকে মনে পড়ল? আজ বৃষ্টি দেখে তোমার কথা খুব মনে হচ্ছিল।
একটা দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসল ফোনের ওপাশ থেকে। বলল, থাক! আর বানিয়ে কথা বলতে হবে না। আমি সব বুঝি! এখনও যে মানুষ সামনে আসার সাহস করতে পারে না, তার সব কিছু বিশ্বাস করে কষ্ট পেতে চাই না।
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, আহা! এত ব্যস্ত হবার কি আছে? ফোনে তো আমাদের কথা হচ্ছেই। দেখা হবে আমাদের! খুব দ্রুত দেখা হবে। এমনও তো হতে আমাদের অনেক বার দেখা হয়েছে, কিন্তু কেউ কাউকে চিনতে পারি নি?
-উফ! অসহ্য! আবার সেই হেয়ালী! ভাল্লাগে না! ধ্যাত! আচ্ছা আমি রাখি। আম্মু ডাকছে।
আরে শোন শোন! পাগলী!! আরো একটু কথা বলি!
-না। এখন রাখতে হবে। পাশের বাসায় তরকারী দিয়ে এসে পড়তে বসব।
আচ্ছা ভালো থেকো!
-বাই!
ফোনটা রাখার পর বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটা শূন্য অনুভুতি তৈরী হলো। মনে হচ্ছে হৃদয়ের সবচেয়ে দূর্গম অঞ্চলে আমি তীব্র বেগে ছুটে বেড়াচ্ছি আর খুঁজে ফিরছি লুকিয়ে রাখা কিছু স্মৃতি। দীর্ঘদিন পর যেন নূপুরকে দেখতে পেলাম। ছুটির দিন, রাস্তাও বেশ ফাঁকা। আমরা তখন বৃষ্টিতে ভিজছিলাম আর আমাদেরকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে একটি রিকশা। আমাদের ছেলেমানুষী, খুনসুটি, খিলখিল হাসি আর দূরে কোথাও বাজতে থাকা চাইমের টুংটাং শব্দের মাঝে শুনতে পেলাম কে যেন ফিসফিস করে বলছে, রবিন! বাবাকে রাজি করাতে পারি নি। একজন ক্যামেরাম্যানের হাতে তিনি তার মেয়েকে তুলে দিবেন না। আগামীকালই আমার বিয়ে।
হঠাৎ সব কিছু কেমন যেন ভীষন অন্ধকার হয়ে এলো, শেষ বিকেলের সোনালী আলো হেরে যাচ্ছে সাঁঝের অন্ধকারের কাছে। আলো আসছে, আমরা দ্রুত পেছনে পালাচ্ছি। ঝরে পড়া ফুলগুলো গাছে লেগে যাচ্ছে, উড়তে থাকা পাখির দল কি এক অদৃশ্য টানে যেন পেছনে উড়ছে। ফুটপাতে দাঁড়ানো এক তরুনীর চোখের কাজল ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছে। আমাদের রিকশা, রাস্তার অভিজাত গাড়ি, মানুষ, কোলাহল সবাই মিলে আমরা দ্রুত পিছিয়ে যাচ্ছি। একসময় নিজেকে আবিষ্কার করলাম জনাকীর্ণ এক ফুটপাতে। আমাকে নামিয়ে অদ্ভুত গতিতে পিছিয়ে যাচ্ছে প্রিয় রিকশাটিও। চোখ ভরা অভিমান নিয়ে দ্রুত আমার হাত থেকে গোলাপটাও কেড়ে নিল এক বাচ্চা ফুলওয়ালি। আমি অসহায় হয়ে ঘড়িতে চোখ রাখলাম। অবাক হয়ে দেখলাম, দুটো কাঁটা প্রচন্ড কষ্ট নিয়ে টিক টিক চিৎকার করে শুধু সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। আমি দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরলাম। প্রচন্ড যন্ত্রনায় আমার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে।
হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে আমি সংবিত ফিরে পেলাম। এক নিমিষে আমি ফিরে এলাম আমার এই অন্ধকার রুমে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি এখনও বৃষ্টি পড়ছে। আবারও কলিংবেলের শব্দ শুনে জলদি দরজা খুললাম। পাশের বাসার মেয়েটা এসেছে, হাতে পিরিচে ঢাকা একটি তরকারীর বাটি।
সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০১৫ সন্ধ্যা ৬:৫০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




