এ ওহাব খান। এমডি (মেডিসিন), ডিআইএম (নিউরো-মেড), স্পেশালিস্ট ইন নিউরো মেডিসিন (অস্ট্রেলিয়া)। সহযোগী অধ্যাপক নিউরো মেডিসিন বিভাগ। জয়নুল হক সিকদার কার্ডিয়াক কেয়ার অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার।
এ ওহাব খানের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার একটি অভিযোগ উঠেছে। তাঁর সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা গেল, এই স্নায়ু (নিউরো) রোগ বিশেষজ্ঞ কোনো মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস-ই পাস করেননি। এমবিবিএস পাসের যে সনদ ব্যবহার করে এ ওহাব খান চিকিৎসক বনেছেন তার মালিক মো. আবদুল ওয়াহাব। তিনি চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ। ওহাব খান তাঁর নামের সঙ্গে যেসব উচ্চতর ডিগ্রি ব্যবহার করেন তাও ভুয়া।
ওহাব খান ৩ মে এই প্রতিবেদকের কাছে দাবি করেন, ১৯৮২ সালে তিনি রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। এরপর তিনি একাধিক বিদেশি ডিগ্রি নিয়েছেন। এমডি (মেডিসিন) ডিগ্রি তিনি রাশিয়া থেকে পান। তিনি জানান, বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) তাঁর নিবন্ধন নম্বর ১১৭৮৪।
এমবিবিএস পাস করা চিকিৎসকদের পেশা চর্চার অনুমতি দেয় বিএমডিসি। ওহাব খানের দেওয়া নিবন্ধন সংখ্যা নিয়ে ৫ মে বিএমডিসি কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নিবন্ধন সংখ্যাটি মো. আবদুল ওয়াহাবের নামে। তিনি ১৯৮৩ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন। জন্ম মেহেরপুরে। ওই চিকিৎসক চর্ম ও যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ। সংশ্লিষ্ট বিষয়ে একাধিক উচ্চতর ডিগ্রি আছে। তিনি বাংলাদেশ সেনা বাহিনীতে ছিলেন। অবসর নেওয়ার পর এখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি করছেন।
যেভাবে ধরা পড়লেন: মো. রফিক নামের এক ব্যক্তি ১৯ মার্চ জয়নুল হক সিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটাল (প্রা.) লিমিটেডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত অভিযোগ করেন, ওহাব খান ও তাঁর সহকর্মী ডা. হারুন রফিকের বাবা মো. নুরুল ইসলামকে ভুল চিকিৎসা দিয়েছেন। তিনি দুই চিকিৎসকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
কিন্তু কোনো প্রতিকার না পেয়ে রোগীর স্বজনেরা সব কাগজপত্র প্রথম আলো কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। আবেদনকারী ও হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তাৎক্ষণিকভাবে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষকে বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে বলেছিলেন।
অভিযোগে বলা হয়, মো. নুরুল ইসলাম ২৬ জানুয়ারি হূদেরাগে আক্রান্ত হয়ে জাতীয় হূদেরাগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি হন। এরপর তাঁরা গুলশানের সিকদার হাসপাতালে আসেন ২৯ জানুয়ারি। তাঁকে হূদেরাগের কোনো চিকিৎসা না দিয়ে এ ওহাব খান মাথা ও স্নায়ু বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন এবং রোগীকে বাড়ি পাঠিয়ে দেন। রোগী এরপর ৫ ফেব্রুয়ারি আবার ওহাব খানের কাছে যান। এবার ওহাব ও চিকিৎসক হারুন-উর রশিদ ভূইয়া তাঁকে দেখেন। সেখানে তাঁর এনজিওগ্রাম করা হয় এবং বলা হয় দুটি রিং পরানো দরকার। তবে রিং লাগানো হয়নি। রোগীকে বোটোক্স ইনজেকশন দেওয়ার লিখিত পরামর্শ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। রিং লাগানোর পরামর্শ এবং বোটোক্স ইনজেকশন একসঙ্গে দেওয়ার কারণে রোগীর স্বজনেরা অন্য একজন চিকিৎসকের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করেন। এতে সন্দেহের সৃষ্টি হয়।
এই প্রতিবেদক গত মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু শামীমের সঙ্গে তাঁর কার্যালয়ে গিয়ে দেখা করেন। অধ্যক্ষ জানান, বিষয়টি তদন্ত করে দেখেছেন। রোগীপক্ষের অভিযোগ সঠিক নয়। চিকিৎসা রীতিনীতি মেনেই সেবা দেওয়া হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, তদন্তের লিখিত কোনো প্রতিবেদন তৈরি করেননি, জমাও দেননি। হূদেরাগ নিয়ে আসা রোগীকে কেন হূদেরাগ বিশেষজ্ঞ দেখলেন না এবং স্নায়ুসংশ্লিষ্ট পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যৌক্তিক ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাব না দিয়ে অধ্যক্ষ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। তবে এ ওহাব খানের মুঠোফোনের নম্বর দেওয়ার কথা বলে অধ্যক্ষ কালক্ষেপণ করেন এবং এক সপ্তাহ পরে জানান ওহাব খানের মুঠোফোন নম্বর তাঁর কাছে নেই।
এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে গুলশান কার্যালয়ে ওহাব খানের সঙ্গে এই প্রতিবেদক দেখা করেন। অভিযোগের জবাবে তিনি বলেন, কোনো ভুল চিকিৎসা হয়নি। রোগী মাথাব্যথা নিয়ে এসেছিল এবং সেই অনুযায়ী তার পরীক্ষা করা হয়। বোটোক্স ইনজেকশন কেন দেওয়া হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, অন্য একজন রোগীকে ওষুধটি দেওয়ার সময় এই রোগীর লোকজন ওষুধটি সম্পর্কে জানতে চান। তাই তাঁদের ওষুধটির নাম লিখে দেওয়া হয়েছে। ব্যবহার করতে বলেননি।
রোগীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এই প্রতিবেদক ৩ মে আবার গুলশান কার্যালয়ে যান। তখন তাঁর চিকিৎসাসংক্রান্ত বিশেষজ্ঞ শিক্ষার বিষয়ে জানতে চাইলে ওহাব খান বলেন, তাঁর বাড়ি পাবনা জেলায়, তবে বড় হয়েছেন কুষ্টিয়ায় মামার বাড়িতে। এমবিবিএস পাস করেছেন রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে ১৯৮২ সালে। বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি) তাঁর নিবন্ধন সংখ্যা ১১৭৮৪। এমডি (মেডিসিন) ডিগ্রি নিয়েছেন রাশিয়া থেকে। তিনি অন্যান্য উচ্চতর ডিগ্রি এবং প্রশিক্ষণেরও বর্ণনা দেন। একপর্যায়ে দাবি করেন, একাধিক বড় বড় সংবাদপত্রের সম্পাদকের সঙ্গে তাঁর জানাশোনা গভীর।
পরে তাঁর নিবন্ধন নম্বরটি যাচাই করতে গেলে দেখা যায়, ওই নিবন্ধনধারী মো. আবদুল ওয়াহাব, এ ওহাব খান নন। আর আবদুল ওয়াহাব ১৯৮৩ সালে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেছেন।
এরপর চিকিৎসা ডিগ্রি ও নিবন্ধনের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন করলে ওহাব খান মুঠোফোনে বলেন, তিনি আগে যা বলেছেন তার বাইরে কিছু বলার নেই। তবে একাধিক অপরিচিত ব্যক্তি মুঠোফোনে এই প্রতিবেদকের কাছে জানতে চেয়েছেন, ওহাব খানের তথ্য কেন প্রথম আলোর প্রয়োজন হচ্ছে।
যোগাযোগ করলে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান জয়নুল হক সিকদার ৬ মে প্রথম আলোকে বলেন, মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ এ ব্যাপারে তথ্য দিয়ে সহায়তা করবেন। ৭ মে অধ্যাপক মো. আবু শামীম এই প্রতিবেদককে নিয়োগের সময় ওহাব খানের জমা দেওয়া কাগজপত্র (ফাইল) দেখান। তাতেই দেখা যায়, মো. আবদুল ওয়াহাবের এমবিবিএস পাসের সনদপত্রের ফটোকপি ওহাব খানের জীবনবৃত্তান্তের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া। বিএমডিসির নিবন্ধন নেওয়ার কোনো সনদ তাঁর ফাইলে নেই। ডিআইএম, এমডি, এফআরসিপি- এসব ডিগ্রির কোনো কাগজও নেই। তাঁর নিয়োগপত্রেরও অনুলিপি নেই। একটি বড় খাতায় অন্য চিকিৎসকদের যোগদানের তারিখ উল্লেখ আছে। ওহাব খান কোন তারিখে কাজে যোগ দেন তার কোনো উল্লেখ নেই। সহযোগী অধ্যাপক হওয়ার আগে প্রভাষক বা সহকারী অধ্যাপক হিসেবে তিনি কোথায় কাজ করেছেন তারও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
মো. আবু শামীম বলেন, তিনি অধ্যক্ষের দায়িত্ব নেওয়ার আগে ওহাব খান হাসপাতালে যোগ দেন। ওই সময় যাঁরা দায়িত্বে ছিলেন তাঁদের দায়িত্ব ছিল তাঁর কাগজপত্র পরীক্ষা করার। তাঁরা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করেননি। এরপর অধ্যক্ষ ওহাব খানকে এক দিনের মধ্যে মূল কাগজপত্র জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন।
সিকদার মেডিকেল কলেজ থেকে পাওয়া এমবিবিএস পাসের সদনপত্রের ফটোকাপি নিয়ে গতকাল রোববার এই প্রতিবেদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ডা. আবদুল ওয়াহাবের সঙ্গে দেখা করেন। কাগজটি দেখেই তিনি বলেন, কাগজটি তাঁর সনদপত্রের ফটোকপি। তিনি মূল সনদপত্রটিও দেখান।
আর ওহাব খানের জীবনবৃত্তান্তে দেখা যায়, তিনি ২০০১ সালে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি ডিগ্রি লাভ করেছেন। এ বিষয়ে খোঁজ নিতে গেলে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ প্রথম আলোকে জানান, ২০০১ সালে এ ওহাব খান নামে কেউ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমডি (মেডিসিন) ডিগ্রি লাভ করেননি।
গতকাল সন্ধ্যায় জয়নুল হক সিকদার ওমেন্স মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ মো. আবু শামীম প্রথম আলোকে জানান, বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে মূল কাগজপত্র দেখাতে পারেননি ওহাব খান। তাঁর বিষয়ে আজ সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। ভুল চিকিৎসার অভিযোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি বোর্ড করে তা নতুন করে তদন্ত করা হবে।
সূত্র : প্রথম আলো

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


