সরকারের বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত ঠিক এ সময়ে নেয়াটা কতটুকু রাজনৈতিক দূরদর্শীতার পরিচয় বহন করে তা নিরপেক্ষ দৃষ্টিসম্পন্ন যে কোন বিবেচক মাত্রই বুঝতে পারেন। শীত মৌসুম গত হয়ে গ্রীষ্মকাল সমাগত। বিদ্যুতের চাহিদা ও ব্যবহার এসময়ে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু ক্রমবর্ধমান চাহিদার তুলনায় উৎপাদন বাড়েনি। অসহনীয় লোডশেডিং শুরু হবে কিছুদিন পরেই। এমনিতেই সাম্প্রতিক আইন শৃংখলা পরিস্হিতি, দ্রব্যমূল্য, শেয়ার বাজার, পৌরসভা ও উপ-নির্বাচনের ফলাফল সরকারের রাজনৈতিক অবস্হান অনেকটা ম্লান করে দিয়েছে। তার উপর ঠিক এ মূহুর্তে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করা হলে তার ফলে পরিবহন ব্যয় ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির যে অতিরিক্ত চাপ জনগণের উপর এসে পরবে তার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সরকারকে ভালভাবে আগাম চিন্তা ভাবনা করতে হবে। জনগণের বাস্তব পরিস্হিতির কথা না ভেবে শুধু তাত্ত্বিক পরামর্শক বা দাতাগোষ্ঠীর কথা বিবেচনা করলেই প্রকৃত সমাধান পাওয়া যাবে না। জনগণের মনে সরকারের গ্রহণযোগ্যতা টিকিয়ে রাখার প্রশ্নটিকে রাজনৈতিক স্বার্থেই প্রাধান্য দিতে হবে।
বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানে দেরীতে হলেও সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো আশাব্যঞ্জক। পিপিপি ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য দেশী বিদেশী বিণিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনতে হবে। দেশের স্হানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান সিটি ও পৌর কর্তৃপক্ষগুলোকেও একাজে সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। বিশেষ করে পৌরসভাগুলোতে ছোট ছোট কনভেনশনাল ও রিনিউয়েবল বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট স্হাপনের উদ্যোগ নিয়ে দেশের বিদ্যুৎ সমস্যা অনেকখানি দূর করা সহজে সম্ভব হতে পারে। এসব প্ল্যান্ট স্হাপনে সরকার, স্হানীয় পৌর কর্তৃপক্ষ ও ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের যৌথ বিণিয়োগে মূলধন পাওয়া সম্ভব। উৎপাদিত বিদ্যুৎ স্হানীয় পরিচালন ব্যবস্হা ও ব্যবস্হাপনার মাধ্যমে নিজস্ব মূল্যে বিতরন সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব। কনভেনশনাল উৎপাদন ব্যবস্হায় ব্যবহৃত জ্বালানী গ্যাস, ফারনেস ওয়েল, ডিজেল, কয়লা- এসবের সংগ্রহ মূল্য বা সহজলভ্যতা বিবেচনায় পাশাপাশি রিনিউয়েবল প্ল্যান্টও স্হাপন করা সম্ভব। সোলার প্ল্যান্ট ও বর্জ্য ব্যবস্হাপনার সাথে যুক্ত করে প্রতিটি পৌরসভা অধিক্ষেত্রেই বিদ্যুৎ উৎপাদন প্ল্যান্ট বসানো যেতে পারে। এরূপ বিকল্প উৎপাদন ব্যবস্হা পাশাপাশি রাখতে পারলে ন্যাশনাল গ্রীডের সাথে যুক্ত না থেকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ সেবা এসব স্হানীয় কর্তৃপক্ষগুলো জনগণকে দিতে পারবে। এ লক্ষ্যে সরকার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নীতিমালাভূক্ত করে পাঁচশালা উন্নয়ণ পরিকল্পনার অন্তর্ভূক্ত করতে পারেন।
বিদ্যুৎ সমস্যা দূর করার ক্ষেত্রে চুরি ও অপচয় রোধ করার বিষয়টি এখন মূল্য বৃদ্ধির চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। পরিচালন ব্যবস্হাপনায় সিস্টেম লসের নামে সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে লুটপাট হয়ে যাচ্ছে তা জনগণ জানে। অপরদিকে বিলাসী ও বৈষম্যমূলক জীবনযাপনে অভ্যস্ত সৌভাগ্যবানরা জনগণের টাকায় কীভাবে বিদ্যুতের অপচয় করছেন তাও জনগণ জানে। গরমে গায়ে কোট টাই এঁটে এসি চালিয়ে বিদ্যুতের বাড়তি অপচয় নেহাত বেমানান ও বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রতি উপহাস বৈকি! সরকারকে এ বিষয়গুলো আগে ভাবতে হবে ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্হা নিতে হবে। তারপর বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়িয়ে একটা পর্যায়ে এসেই কেবল বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করাটা জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

