somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প : কোথাও কেউ নেই

১৫ ই মার্চ, ২০২০ রাত ১০:৩১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(ছবি : গুগল)

শতবর্ষী কৃষ্ণচূড়ার নিচে ফুলগুলো ঝড়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। পদহীন ঝঞ্ঝা খানিকটা জুড়ে। পুরোনো মালবাহি বগি জীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে অনেক দিন ধরে। পুরো স্টেশনে কৃষ্ণচূড়া আর ঘাসের সবুজ রঙ মিলে মৌন একটা সৌন্দর্য।

সন্ধ্যে হয়ে এলো। কৃষ্ণচূড়ার নিচে দাড়িয়ে সজল। ফিটফাট ফরমাল ড্রেসআপে প্লেইন কালো জুতো। মোটা ফ্রেমের চশমা চোখে।
স্টেশনের মূল ফটকে একটি হারিকেন জ্বালছে। ডান পাশের হাতলহীন চেয়ারে বসে ট্রেনের অপেক্ষায় সজল। নাইক্ষণছড়ী এলাকার ফরেস্ট অফিসার সজল। মাস তিন বা চারেক পর পর বাড়ি যেতে হয়। নয়টার ট্রেনে চড়লে ভবানীজীবনপুর পৌঁছতে সকাল হয়।

সজল চুপচাপ স্বভাবের। সে ভাবতে পছন্দ করে। এটা সেটা অনেক কিছু। দূর থেকে সজল যে বেঞ্চিতে বসে আছে ভাবলে দেখা যায়, তিন জনের একটা বেঞ্চি সজল একটা বসে। পেছন থেকে একটু বড় চুলো কেউ বসে আছে। বাম পা একটু পর পর নাড়াচাড়া করছে। অল্প কিছু প্যাসেঞ্জার পুরো স্টেশনে। খুব একটা সাড়া শব্দ নেই। মাঝে মাঝে ঘন্টা বাজিয়ে সময় জানিয়ে যায় স্টেশন পিয়ন। ট্রেনের শব্দ, চলে যাওয়া, ট্রেনের জানালাগুলো সর্বোপরী সামনে দিয়ে ট্রেন চলে যাওয়ার মধ্যে ব্যতিক্রম ধরণের ভালো লাগা আছে।

ট্রেনে ছাড়লো, ঘড়িতে সময় রাত্রি ৯টা বেজে ১৮। ডান পাশের সিট ফাঁকা। সামনে দুজন প্যাসেঞ্জার। সব মিলিয়ে সামান্য একটু হই-চই। বাম পাশের সিটের চারজন রাজনীতির ব্যাপার স্যাপার নিয়ে তুঙ্গে। তখন ৫৮’র ভাষা আন্দোলন নিয়ে দেশ প্রায় রেডিওর মূল উত্তেজনা।
চোখ লেগে এলো সজলের। তখনো আবছা তর্ক-বিতর্ক কানে ভাসছে। তাও অল্প অল্প। ক্ষণিকের মধ্যে সব কিছু কেমন চুপচাপ হয়ে গেল। চোখ খুলতেই সামনে বসা দুজন লোক নেই। বাম পাশের সীটের লোকজনও নেই। ভর দেয়া সীট থেকে সজল দাঁড়িয়ে দেখে পুরো বগিতেই কেউ নেই। বাম পাশে রাখা ব্যাগটা চেপে ধরে সজল চশমাটা পরিষ্কার করে।

ভোর হয়ে এলো। ট্রেনের শব্দের সাথে আবছা আজানের শব্দ আসছে। রাতের তিমির থেকে দিনের আলো স্পষ্ট হয়ে এলো। ট্রেনের জানালার ফাঁকে সুন্দর গ্রাম। সাপের মতো আঁকাবাঁকা খাল হয়ে ছোট ছোট কুড়ে ঘর। কোথাও কোথাও পাশে একটা গোয়ালঘরও। কিন্তু কোথাও কেউ নেই।

ভবানীজীবনপুর এসে ট্রেন থামলো। মানব শূন্য পুরো এলাকা। অবাক চোখে এগিয়ে যায় সজল। যে স্টেশন থেকে বের হলে রিক্সা চালকদের ডাকাডাকিতে বিরক্ত হতেন, সেখানে রিক্সাগুলো লাইন ধরে পড়ে আছে। কোথাও কেউ নেই। উপান্তর না দেখে হেঁটে চলা। এগিয়ে গিয়ে সামনে মোহন চাচার চায়ের দোকান। শেখ মুজিব, পূর্ব পাকিস্তান, পশ্চিম পাকিস্তান নিয়ে কতো কথা। শুকনো বনরুটি ঝুলছে, চায়ের পানি তাপ দিচ্ছে, আগুনও জ্বলছে, কিন্তু কোথাও কেউ নেই।

ঠুকঠুক জুতোর শব্দ। হেঁটে যাচ্ছে সজল। বাম কাঁধে ব্যাগ। দূর থেকে দূরে চলে যায় সজল। সাঁকু পার হলে হাদারি বাজার। বাম পাশে বারেকালা প্রাথমিক বিদ্যালয়, একটু সামনে সবজির দোকান, মসজিদ, কৃষ্ণধন কাকার নাপিত ঘর, রাস্তার পাশে বসে থাকা দোকানগুলো, চায়ের কাপের শব্দ, রাশু পাগলার খিলখিলিয়ে হাসা, মাছ বাজারের হই-চই, কিছুই নেই। কোথাও কেউ নেই। পরিস্কার আকাশ।

স্কুলের সামনের রাস্তার খাল পার হয়ে সজলের বাড়ি। সাঁকু পার হতে হয়। সাঁকুর মাঝে দাঁড়িয়ে সজল।
কানে কি যেন ভাসছে, কেউ কিছু চাইছে মৃদু স্বরে। টিকিট প্লিজ! টিকিট দেখিয়ে সজল ডান-বাম তাকিয়ে চশমার ফ্রেম মুছে। ট্রেন ভবানীজীবনপুর আসতে তখনো কিছু সময় বাকি।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই মার্চ, ২০২০ বিকাল ৩:২১
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বালুর নিচে সাম্রাজ্য

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫১


(ডার্ক থ্রিলার | কারুনের আধুনিক রূপক)

ঢাকার রাত কখনো পুরোপুরি ঘুমায় না।
কাঁচের অট্টালিকাগুলো আলো জ্বেলে রাখে—যেন শহর নিজেই নিজের পাপ লুকাতে চায়।

এই আলোর কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে ছিল করিম গ্লোবাল টাওয়ার
আর... ...বাকিটুকু পড়ুন

জ্ঞানহীন পাণ্ডিত্য

লিখেছেন রূপক বিধৌত সাধু, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:২০


এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে স্বদেশ,
যে কিছু জানে না; সে-ই দেয় উপদেশ।
“এই করো, সেই করো;” দেখায় সে দিক-
অন্যের জানায় ভ্রান্তি, তারটাই ঠিক।
কণ্ঠে এমনই জোর, যে কিছুটা জানে-
সব ভুলে সে-ও তার কাছে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণতন্ত্র হলো সংখ্যাগরিষ্ঠের মত এবং শরিয়া আইন হলো সকল পক্ষের সম্মতি বিশিষ্ট ইসলামী হুকুমতের আইন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ০৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:১৯



সূরাঃ ৬ আনআম, ১১৬ নং আয়াতের অনুবাদ-
১১৬। যদি তুমি দুনিয়ার অধিকাংশ লোকের কথামত চল তবে তারা তোমাকে আল্লাহর পথ হতে বিচ্যুত করবে। তারা তো শুধু অনুমানের অনুসরন করে:... ...বাকিটুকু পড়ুন

গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কেমন হবে?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:৫৭



সামনের গণভোট ঘিরে অনেক অপপ্রচার চলছে বলে শোনা যাচ্ছে। অনেকেই জানতে চাঁচ্ছেন, গণভোটের ব্যালটটি দেখতে কি রকম হবে? নির্বাচন কমিশনের ওয়েসবাইট থেকে জানতে পারা গিয়েছে যে, গণভোটের ব্যালটটি উপরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুহতারাম গোলাম আযমই প্রথম We Revolt বলেছিলেন !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:৫৮


আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘জনতার ইশতেহার’। দলটির দাবি, অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার মাধ্যমে সংগৃহীত ৩৭ লাখের বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×