

জুনের ২১ তারিখটি ছিল একটি বিশেষ দিন । বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে সিরিজ জিতেছে । আর এদিনটি ছিল বাবা দিবস । বলা যেতে পারে একসঙ্গে দুই দুইটা উৎসব । ফেসবুকের দেয়ালগুলো এই উৎসবের পোস্টে সয়লাব ছিল । ক্রিকেটে ভারতকে হারানো তো বহু কাঙ্ক্ষিত । সে আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ হয়েছে । ফলে একটু বাড়াবাড়ি থাকতেই পারে । দেশ জিতেছে । অনেক বড় ব্যাপার তো বটেই । আমাদের বুদ্ধিদীপ্ত ছেলেমেয়েরা ভারতীয় ক্রিকেটারদের ছবি সম্পাদনা করে যার যার দেয়ালে তুলে দিয়েছে । পুরো পৃথিবীর মানুষ দেখেছে । আমোদ পেয়ে হেসেছে । আমি নিজেও হেসেছি ।
বাবা দিবস উপলক্ষে নিজ নিজ বাবার কথা বলেছে । বাবার সঙ্গে ছবি তুলে ফেসবুক দেয়ালে টানিয়েছে । বাবাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে । কারও ছেলের জন্মদিন ছিল । আবার কেউ বাবা হয়েছেন, আবেগে আপ্লুত হয়েছেন । সে সব লেখা দেখে পড়ে আমাকেও সে আবেগ স্পর্শ করেছে । সত্যি বড় ভাল লেগেছে । মনটা ভরে গেছে ।
একুশ জুন রবিবার আরও একজন মানুষ বাবা হয়েছেন । তার নাম আবদুর রাজ্জাক । তিনি বাংলাদেশের একজন সীমান্ত রক্ষী । সীমান্ত পাহাড়া দেন । বাংলাদেশের মানুষ যেন তাদের প্রিয় বাবা ছায়ায় থাকতে পারে বা নিরাপদে ভারত বাংলাদেশ ম্যাচ দেখতে পারে, সেটা নিশ্চিত করেছেন । দীর্ঘ একুশ বছর ধরে আবদুর রাজ্জাক এই মহান কাজটি করে আসছিলেন ।
ছয় দিন হল নায়েক আবদুর রাজ্জাক তার দায়িত্ব পালন করছেন না । করতে পারছেন না । ছয় দিন আগে মিয়ানমারের সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) তুলে নিয়ে গেছে । ১৭ জুন বুধবার ভোরে বিজিবির ছয় সদস্যের একটি দল নায়েক আবদুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে নাফ নদীতে টহল দিচ্ছিল । তারা বাংলাদেশের জলসীমায় মাদক চোরাচালান সন্দেহে দুটি নৌকায় তল্লাশি করছিল । এ সময় মিয়ানমারের রইগ্যাদং ক্যাম্পের বিজিপির সদস্যরা একটি ট্রলারে করে বাংলাদেশের জলসীমায় প্রবেশ করেন । একপর্যায়ে বিজিপির সদস্যদের বহনকারী ট্রলারটি বিজিবির টহল নৌযানের কাছে এসে থামে । বিজিপির ট্রলারটিকে বাংলাদেশের জলসীমা ছেড়ে যেতে বলা হলে তারা নায়েক রাজ্জাককে জোর করে ট্রলারে তুলে নেয় । বিজিবির অন্য সদস্যরা এতে বাধা দিলে দুই পক্ষের মধ্যে গুলিবিনিময় হয় । সিপাহি বিপ্লব কুমার গুলিবিদ্ধ হন । পরে বিজিপির ট্রলারটি আবদুর রাজ্জাককে নিয়ে মিয়ানমারের দিকে চলে যায় । শুধু যে তুলে নিয়ে গেছে তা নয়, এরপর বিজিপির ফেসবুকে রাজ্জাকের তিনটি ছবি তুলে দেয়া হয়েছে । তার একটিতে দেখা গেছে, রাজ্জাকের নাক দিয়ে রক্ত ঝরছে । আরেকটিতে হাতকড়া পরিয়ে তাকে আসামির মতো দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে । আবদুর রাজ্জাককে নির্যাতন করেছে । তার প্যান্ট খুলে লুঙ্গি পড়িয়েছে । কি স্পর্ধা !
কাল পত্রিকায় দেখলাম মায়ানমার বলছে শর্ত সাপেক্ষে ফিরিয়ে দেওয়া হবে রাজ্জাককে। আর শর্ত হলো সমুদ্রপথে মালয়েশিয়াগামী উদ্ধার হওয়া ৫৫৫ জনকে বাংলাদেশে ফেরত আনলে তবেই রাজ্জাককে ফেরত দেওয়া হবে । দুঃসাহসিকতা বলব নাকি স্পর্ধাই বলব ? মায়ানমার এই সীমাহীন সাহস পেল কোত্থেকে ?
কিছুদিন আগে এই মায়ানমারে মুসলমানদের হত্যা করা হচ্ছে বলে ফেসবুকের দেয়ালগুলোয় সত্য মিথ্যা খবর আর ছবি দিয়ে কদিন কি বিপুল প্রতিবাদের তাণ্ডব চলেছে । আবদুর রাজ্জাকও মুসলমান । তিনি মায়ানমারের নন, আমার বাংলাদেশের মানুষ । তাকে মায়ানমারে ধরে নিয়ে গিয়ে নির্যাতন করা হচ্ছে । অথচ এখন বাংলাদেশের ওই মুসলমানপ্রেমীরা টু শব্দটি করছে না । কেন ? নাকি তারা আবদুর রাজ্জাকের মৃত্যুর প্রতীক্ষায় রয়েছে ? আমাদের চিন্তা কি এতই দৈন্য ? অসুস্থ রাজনীতি কি আমাদের মানসিকতাকে কি এতই পঙ্গু করে দিয়েছে ? যে ছয়টি দিন বাংলাদেশের সীমান্তে পাহারারত অবস্থায় একজন সীমান্ত রক্ষীকে অপহরণ করে নিয়ে যায় আর আমরা কিছুই বলি না ! নুন্যতম প্রতিবাদও করি না ! আমাদের কি লজ্জাবোধ হবে না কখনও ?
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা জুলাই, ২০১৫ বিকাল ৪:৩৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



