somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আমার খালাম্মার সুন্দর মৃত্যু

২৪ শে এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১১:২০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মৃত্যুর নির্ধারিত সময়ে প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ আস্বাদন করতে হবে। তবে আল্লাহর প্রিয় বান্দা ও বান্দী যারা, আল্লাহর পক্ষ হতে তারা লাভ করেন সুন্দর ও ‘সুস্বাদু’ মৃত্যু। আমার খালাম্মার মৃত্যু ছিলো তেমনি একটি মৃত্যু, যা হতে পারে প্রতিটি মুমিনের আকাঙ্খা! বেশ কিছু দিন তিনি অসুস্থ। আমি মাদরাসায় ছিলাম। দুপুরে জরুরি তলব এল। ছুটে গেলাম। তখন তার শ্বাসকষ্টটা মারাত্মক। শ্বাসকষ্ট কী জিনিস তা জানে শুধু ওই কষ্টের রোগী। আল্লাহ যেন তা কাউকে না দেন।
তিনি হাঁটতে পারছিলেন না, আমার কাঁধে ভর দিয়ে পাঁচতলার সিঁড়ি বেয়ে নামলেন অনেক কষ্টে। খিদমাহ হাসপাতালে নেয়ার পর উদ্বিগ্ন ডাক্তার বললেন, অনেক বিলম্ব হয়ে গেছে। জরুরি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বললেন, এখনই তাকে অপারেশন করতে হবে।
খালাম্মা শুনলেন, কিন্তু কোনো অস্থিরতা প্রকাশ করলেন না। এটা তার স্বভাবে ছিল না। যে কোনো কষ্ট তিনি বরণ করে নিতেন প্রশান্ত চিত্তে, পূর্ণ আত্মনিবেদনের সঙ্গে। তিনি শুধু বললেন, তোমরা চিন্তা করো না। আল্লাহর যা ইচ্ছা তাই তো হবে! তারপর অজু করে দু’রাকাত নামাজ পড়লেন। বিপদে ও প্রয়োজনে সারা জীবন নামাজই ছিল তার আশ্রয়। আমার কেন জানি মনে হলো, হয়ত এটাই তার শেষ নামাজ! আল্লাহর প্রিয় যারা, মৃত্যুর পূর্বে তাদেরকে আল্লাহ প্রস্তুতি গ্রহণের সুযোগ দেন। তার এত কষ্টের নামাজটি যেন ছিল সেই প্রস্তুতি!
নামাজ শেষ করে তিনি আমাকে অসিয়ত করলেন। এটাই ছিল তার জীবনের শেষ অসিয়ত। আমি মুখের কাছে কান নিলাম, কমযোর আওয়াজে তিনি বললেন, আমার নামাজ ও রোজার কাফফারা দিয়ে দিও। আমার ছেলে-মেয়েদের দ্বীনের বুঝ দিও; তুমিও দ্বীনের ওপর চলার চেষ্টা করো। আমার ভীষণ কান্না পেল। ভিতর থেকে কান্নার ঢেউগুলো চোখের তীরে এসে আছড়ে পড়ল। আগে বুঝিনি আমার শক্ত মনেও এত কান্না আছে! আমার শুকনো চোখেও এত অশ্রু আছে! তিন বছরের ছোট্ট ভাগিনীটি আমার খুব প্রিয়। একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে, কাঁদছে। তার চোখেও পানি! জানি না মাসুম চোখের পানিতে ভিজিয়ে আল্লাহর কাছে কী মিনতি নিবেদন করছে!
রাত নয়টায় খালাম্মাকে অপারেশন থিয়েটারে নেয়া হলো; আমাদের যেতে দেয়া হলো না। কবরে এভাবেই একা যেতে হয় আমাদের! কেউ সঙ্গে যায় না, যায় শুধু আমল। উৎকন্ঠা ও অস্থিরতার মাঝে ওটির বাইরে আমরা অপেক্ষা করছি, আর সাধ্যমতো আল্লাহকে ডাকছি। প্রতিটি মুহূর্ত যেন ছিল একটি যুগ। অপারেশন শেষ হল। খালাম্মাকে কেবিনে আনা হলো। তার হুঁশ ফিরে এল; কিন্তু অবস্থার উন্নতি হলো না। তিনি এখন কথাও বলতে পারেন না। ডাক্তার বললেন, দ্রুত ঢাকা মেডিকেলে নেয়া দরকার। কিন্তু খালাম্মা বিছানার চাদরে লিখে বললেন, ‘সময় হয়ে গেছে, আর কোথাও নেয়ার প্রয়োজন নেই।’
শেষরাতে খালাম্মা গোসল করতে চাইলেন। আমরা বুঝতে পারিনি, এটা ছিল তার জীবনের শেষ ইচ্ছা। ডাক্তারের নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমরা শুধু কাপড় বদলে দিলাম।
খালাম্মা আমার কাঁধে মাথা রেখে বসা ছিলেন। তখন তার ভীষণ কষ্ট। হঠাৎ লক্ষ্য করলাম, তার সব কষ্ট যেন দূর হয়ে গেল। তিনি সোজা হয়ে বসলেন, দেয়ালের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসলেন। তারপর ডান হাত গালের নিচে দিয়ে সুন্নত তরীকায় শুয়ে পড়লেন এবং একটু পরে খুব শান্তভাবে চিরাবদায় গ্রহণ করলেন, আমরা কেউ কিছু বুঝতে পারিনি। (ইন্না লিল্লাহ ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন) জীবিত অবস্থায় তার মুখমন্ডল যেমন আলোকশুভ্র ও নুরানিয়াতপূর্ণ ছিল, মৃত্যুর পর তা যেন আরো বৃদ্ধি পেল। যে দেখল সেই আনন্দিত হলো এবং ‘নেকফাল’ গ্রহণ করল। এমনকি হাসপাতালের ‘সিস্টার’রাও শোক প্রকাশ করে বলেছেন, এমন সবর ও ধৈর্য আমরা খুব কমই দেখেছি।
কে তখন কাকে সান্ত¦না দেবে? আমারও তো প্রয়োজন ছিল একটু ¯িœগ্ধ কোমল সান্ত¦নার! যে কোনো শোকার্ত হৃদয় সান্ত¦না ও সহানুভূতির জন্য কাতর হয়, আর আমার জন্য তো তিনি ছিলেন মায়েরই মতো! ওই কঠিন মুহূর্তে আমি অবশ্য সান্ত¦না পেয়েছি, তবে কোনো মানুষের কাছ থেকে নয়, আল্লাহর কাছ থেকে, কুরআনের আয়াতের মাধ্যমে, ‘আর খোশখবর দাও সবরকারীদের যারা মুসিবতগ্রস্ত অবস্থায় বলে, ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন।’
হে আল্লাহ! তুমি আমার খালাম্মাকে বেলা হিসাব জান্নাত নছীব করো এবং যারা তার মাগফিরাতের জন্য দোয়া করবে তাদের উত্তম বিনিময় দান করো। আমীন।

সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১১:২০
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মক্কাহ চুক্তি কি ?

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:৪৯



মক্কাহ চুক্তি লেখা হয়েছে আরবি ভাষায়। বাংলাদেশের পত্র পত্রিকা - পূর্ণাঙ্গ “মক্কাহ চুক্তি” বাংলা অনুবাদ করে প্রকাশ করছে না কেনো ? দেশের মানুষ কিভাবে জানবে এই চুক্তিতে কি লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ ঢাকার হারানো গন্ধ

লিখেছেন রাজসোহান, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:৫৯



নাজিরাবাজারের মোড় থেকে যে গলিটা ভেতরের দিকে সেঁধিয়ে গেছে, ঠিক তার মুখে শামসুর দোকান। দোকান বলতে সাড়ে চার হাত বাই সাত হাত কুঠুরি, সামনে কাচের শোকেস, শোকেসের ভেতরে সাজানো শিশি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

Out of the frying pan into the fire- কড়াই থেকে অগ্নিকুণ্ডে!

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫২



Out of the frying pan into the fire- কড়াই থেকে অগ্নিকুণ্ডে!

ইংরেজি প্রবাদ “Out of the frying pan into the fire”- অর্থাৎ এক বিপদ থেকে বাঁচতে গিয়ে আরও বড় বিপদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৭:৫৩



চিঠির সঙ্গে আমার এক অন্যরকম সম্পর্ক

উনি আমাদের ভবেরচর পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার। অত্যন্ত ভালো মনের একজন মানুষ। তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয়টা শুধু পোস্ট অফিসের প্রয়োজনের কারণে নয়; বরং দীর্ঘদিনের এক আন্তরিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

নীরব আত্মপক্ষ।

লিখেছেন রাজা সরকার, ২৮ শে আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০

নীরব আত্মপক্ষ।

স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র আন্দোলনের মাসুল বাঙালি হিন্দুকে গুণে গুণে দিতে হয়েছিল ব্রিটিশকে । বাকিটা মুসলিম লীগ ও নেহেরুইয়ান কংগ্রেস মিলে যা করার করে গেছে। এবং পরবর্তীকাল থেকে মুসলিম... ...বাকিটুকু পড়ুন

×