আমরা জেনেছি বার্ড ফ্লূ একটি মারাত্মক, মৃত্যু বহনকারী ভাইরাস। বিগত বেশ কয়েক বছর ধরে আমরা বার্ডস ফ্লু আতংকে বার বার হাস মুরগী ও পোল্ট্রি পুড়িয়ে মেরে আমাদের সম্ভাবনাময় পোল্ট্রি শিল্পের বারোটা বাজিয়ে দিয়েছি।
আসলেই বার্ড ফ্লু কি ততটাই মারাত্নক যতটা আমাদের কাছে প্রচার করা হয়েছিল? আমাদের বিজ্ঞানীদের চেয়ে ভারতের বিজ্ঞানীদের এ বিষয়ে কেন বেশি প্রচারণা ছিল? আমাদের পোল্ট্রির বারোটা বাজলে কাদের লাভ? আরো অনেক অনেক বিষয় খোলামেলা করতেই আমার এই লেখা।
২০০৭ সাল থেকে বাংলাদেশের প্রায় ১,৫০,০০০ পোল্ট্রি ফার্মের প্রায় অর্ধেকের বেশীই লোকসান গুনছে, প্রায় লক্ষাধিক পোল্ট্রি চাষী যাদের অধিকাংশই যুবক, এই সম্ভাবনাময় ব্যাবসা হারিয়ে পথে বসে গেছে! বাংলাদেশের, বিশেষ করে গাজীপুর আর জয়পুরহাটের মতো এলাকা গুলিতে লক্ষাধিক বাড়ীর প্রতিটিতেই কম-বেশি ৫০০ করে পোল্ট্রি মুরগী ছিল, যার কোন অস্তিত্ব আজ আর নেই। এই উপার্জন মুখী মানুষগুলো আজ উপার্জনের পথটি হারিয়ে নিঃস্ব জীবন কাটাচ্ছে। দেশের সবচাইতে স্বাস্থ্যকর প্রানীজ আমিষ উৎপাদনের বিপ্লব মাঝপথে থমকে গেছে। ফলস্রুতিকে কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে ইন্ডিয়া থেকে আনা হয়েছে (বর্তমানেও হচ্ছে) ডিম ও মুরগী। এসব ডিম ও মুরগীতে এভিয়ন ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রাদুর্ভাব ছিল লক্ষ্য করার মত, যদিও অজানা কোন এক কারেণে এভিয়ন ইনফ্লুয়েঞ্জার বিষয়টি চেপে যাওয়া হয়েছে। বর্তমানে ২০১২ সালে প্রতিদিনের ৩ কোটি ডিমের উৎপাদন ১.৫ কোটিতে বা তারও নীচে নেমে এসেছে। একটি ডিম কিনতে গেলে খরচ হচ্ছে ৯-১০ টাকা। যারা এই সম্ভাবনাময় শিল্পে বিনিয়োগ করেছিলেন, তারা হয়ে পড়েছেন দিশেহারা, নিঃস্ব।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেব অনুযায়ী সারা পৃথিবীতে এ বছর যে জনা পঁচিশেক মানুষ বার্ড ফ্লু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে, তার মধ্যে বাংলাদেশের রয়েছে মাত্র ৩ জন।
কিন্তু পোল্ট্রি ফার্ম আর মুরগী ও ডিম পোড়ানোর মহোৎসব এমনভাবেই চলেছিল যে এখন স্বার্থান্বেষী মহল ঢালাও ভারতীয় ও থাইল্যান্ডের ডিম ও মুরগী আমদানী করার সরকারী সিদ্ধান্ত আদায় করে নিতে সক্ষম হয়েছিল।
পাশাপাশি ঘন ঘন এন্টিজেনিক কোর পাল্টানোর ফলে H5N1 ভাইরাস টিকা প্রদান মিশর, দক্ষিন আমেরিকা ও অন্যান্য দেশে কোন ভাল ফল তো আনতে পারেই নি, বরং “কাউন্টার প্রোডাক্টিভ” হিসেবে প্রমানিত হলেও আমাদের সরকার যে কি কারনে সেই টিকা দানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে তা অনেকের কাছে বোধগম্য নয়, এমনকি আমাদের দেশের এই বিষয়ে নিয়োজিত বিজ্ঞানীরাও এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে আগে তেমন কিছু জানতেন না বলে জানিয়েছিলেন।
H5N1 ভাইরাস ঘটিত বার্ড ফ্লু নিয়ে আগের মতবাদকে ঘিরে সারা বিশ্বে এখন এতটাই অবিশ্বাস যে বহু বিখ্যাত সংস্থা তা নিয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতবাদ কে মানতে চাইছে না। তার সাথে যোগ হয়েছে সাবেক আমেরিকান সেক্রেটারী অব স্টেট ডিক চেনির সংস্থা কর্তৃক বিগত বছর সমুহে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের টিকা বিক্রয়ের কানকথা।
এ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবেই H5N1 ভাইরাস ঘটিত বার্ড ফ্লুর মানব সংক্রমনের সংখ্যা মোট ৫৮৭ জন মাত্র, যার ভেতর মারা গিয়েছে ৩৪৬ জন। অথচ প্রতিবছর শুধু ডায়রিয়াতেই সারা বিশ্বে্র পোল্ট্রি ফার্মে ণ্যুনতম ১৬০০০ মানুষ মারা যায়! ২০০৭ সালে এক আফ্রিকাতেই প্রায় ১২ লক্ষ শিশু মারা গেছে ম্যালেরিয়াতে, এখনও প্রায় একই সংখ্যায় মারা যাচ্ছে, তা নিয়ে তো এত হইচই হয়নি কিংবা এখনো হচ্ছে না। H5N1 কি আসলেই “অতি ভয়ংকর” নাকি “বায়ো টেরোরিজমের” একটি মারাত্মক প্রোপাগান্ডা? যার উৎপত্তির মূলে ছিল আমাদের পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের গোয়েন্দা সংস্থার ইন্ধন !!!
আমাদের প্রয়োজন সরকারী পর্যায়ে দ্রুত এই রোগের কর্মক্ষম মনিটরিং ও সার্ভাইলেন্স চালু করা, যাতে করে প্রকৃত অবস্থা না বুঝে নিজ হাতে আমাদের কোটি কোটি টাকার শিল্পকে ধংস না করতে হয়। এবং সেটি জরুরী ভিত্তিতে, এখনই।
পাখী থেকে ২০০৩ সালে সর্বপ্রথম উল্লেখযোগ্যভাবে মানব দেহে সংক্রমন শুরু হবার পর এ পর্যন্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসেবে সনাক্তকৃত সর্বমোট ৫৮৭ টি রোগীর সন্ধান পাওয়া গেছে! এর মধ্যে ৩৪৬ জনের মৃত্যু ঘটেছে, আর সেই ভাবেই নিরুপিত হয়েছে এই ফ্লুতে মৃত্যুর হার ৫৯%, যেটি সাধারন মওসুমী ফ্লুতে মৃত্যুর হার ০.১% চেয়ে বহুগুন বেশী। যদি সত্যিই H5N1 আক্রান্ত বার্ডস ফ্লুতে আক্রান্ত রোগীদের অর্ধেকেরও বেশীর মৃত্যু ঝুঁকি থাকে, তা হলে এই ফ্লুটিকেই এই পৃথিবী নামক গ্রহের সবচাইতে বড় স্বাস্থ্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করতে হত।
H5N1 ভাইরাস সম্পর্কে আরেকটি ভুল ধারনা অনেক বিশেষজ্ঞ সহ সাধারন মানুষের ভেতরও বিরাজমান, আর তা হল এই ভাইরাসটি অত্যন্ত কম ক্ষেত্রেই মানষের দেহে সংক্রামিত হয়। অথচ ভাইরাসটি বন্য দাবানলের মতো হাঁস-মুরগী আর পাখীদের ভেতর ছড়িয়ে যায়, কিন্তু কদাচিত এটি মানুষের দেহে সংক্রামিত হয়। আমরা আরও শুনেছি যে এটি সে সব মানুষের দেহেই সংক্রামিত হতে পারে যারা আক্রান্ত হাঁস-মুর্গীর সংস্পর্শে থাকে বা আক্রান্ত পোল্ট্রি ফার্মের কর্মীরা, যারা সরাসরি শারীরিক ভাবে উপস্থিত থেকে আক্রান্ত বিভিন্ন হাঁস-মুর্গী নিয়ে কাজ করে। একজন আক্রান্ত মানুষ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে এই ভাইরাস সংক্রামিত হয়েছে বলে কোন প্রমান পাওয়া যায়নি।
বার্ড ফ্লুতে মুরগীর নিধনের মহোৎসবের সময় উল্লিখিত তথ্যগুলো জনসাধারনকে ধারনা দিয়েছিল যে H5N1 একটি ভয়ংকর ভাইরাস, বিশেষ করে যদি কেউ দুর্ভাগ্যক্রমে তাতে আক্রান্ত হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক কালের গবেষনায় প্রমাণিত হয়েছে যে, সামগ্রিক বিচারে এই ভাইরাসের দ্বারা সংঘটিত ফ্লু রোগটি একটি সীমিত স্বাস্থ্য হুমকির (Limited Health Threat), বেশী কিছু নয়।
২০১২ সালের ফেব্রুয়ারী মাসের শেষ সপ্তাহের খ্যাতনামা সাময়িকি “সাইন্স” প্রকাশিত গবেষনা নিবন্ধে জানা যায় যে মার্কিন যুক্তরাস্ট্রের নিউইয়র্কে অবস্থিত মাউন্ট সিনাই স্কুল অফ মেডিসিনে এক ধারাবাহিক সাম্প্রতিক গবেষনায় বিশ্বখ্যাত ফ্লু বিশেষজ্ঞ পিটার পালেস ও তার সহকর্মীরা ২০ টি H5N1 ভাইরাস সংক্রমন গবেষনার একটি সামগ্রিক বিশ্লেষনের পর কিছু সিদ্ধন্তে উপনীত হন! তার ভেতর উল্লেখযোগ্য হচ্ছে -
১. H5N1 ভাইরাস দ্বারা সংক্রামিত রোগীর আসল সংখ্যা বর্তমানে ল্যাবরেটেরি টেস্ট দ্বারা নিরুপিত সংখ্যার চাইতে অনেক বেশী আর এটি সহজেই সংক্রামিত হতে পারে, সংক্রামিত হলেই কিন্তু মারাত্মক রোগ হয় না, খুব বেশীর ভাগই সামান্য উপস্বর্গের পরে আপনাতেই সেরে যায়।
২. এই ভাইরাসের “ভয়ংকরত্ব” আগে যা ধারনা করা হয়েছিল তার চাইতে বহু বহু গুনে কম এবং এর দ্বারা সংঘটিত ফ্লুতে মৃত্যুর হার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিরুপিত হারের চাইতে লক্ষ্যনীয়ভাবে কম, যা কিনা প্রায় সাধারন মৌসুমী ফ্লু-র কাছাকাছি।
ড. পালেস ও তার সহযোগীরা প্রায় ১২,৫০০ মানুষের শরীর থেকে রক্তের উপাত্ত নিয়ে পরীক্ষা করেন, তার ভেতর প্রায় ১%-২% মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে তাদের রক্তে H5N1 ভাইরাসের সেরোএভিডেন্স রয়েছে।
অন্যান্য গণমাধ্যমের ভেতর এ ধরনের আরো বেশ কিছু গবেষনাপত্র প্রকাশিত হয়েছে “ন্যাচার” সাময়িকীতেও আর এই সাময়িকীগুলোকেই বর্তমানে অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান সাময়িকী হিসেবে ধরা হয়।
যদিও সাংবাদিকদের কাছে ড. পালেস বিস্তারিত বলেন নি, কিন্তু “সাইন্স” সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষনাপত্রটিতে দেখা যায় যে এই এককালীন “অতি ভয়ংকর” হিসেবে বহুল পরিচিত ভাইরাসের ফ্লুতে মৃত্যুর হার ১% থেকেও কম!!!
H5N1 ভাইরাস ও সংশ্লিস্ট ফ্লু নিয়ে এই গবেষনা ও অন্যান্য গবেষনার মাধ্যমে কিন্তু আরো কিছু উল্লেখযোগ্য তথ্য বেরিয়ে এসেছে, তা হল এই অসুখে আক্রান্ত মুরগী বা পাখীর গোশত পরিপুর্ণ উত্তাপে (৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১৫৫ ডিগ্রী ফারেনহাইট) রাঁধলেই শতভাগ ভাইরাস মারা যায় ও সেই গোশত খাবার জন্যে নিরাপদ থাকে।
সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন এসে যায় আমাদের পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংসে কাদের লাভ? তারাই কি বার্ড ফ্লু ইস্যূতে আমাদের পোল্ট্রি শিল্প ধ্বংসের পরিকল্পনা করেছিল? হয়তোবা এখনো করছে !!!
সংগত কারণেই আরো একটি প্রশ্ন নতুনভাবে তৈরী হয়, আমাদের দেশের পোল্ট্রি শিল্পের মত গুরুত্বপূর্ণ পোশাক রপ্তানী শিল্প ধ্বংসে যেহেতু তাদেরই লাভ, তারাই কি কিছুদিন আগে আমাদের অর্থনীতি পঙ্গু করতে পোশাক রপ্তানী শিল্পকেও ধ্বংস করার চেষ্টা করেছিল???
ভয় নয়, সচেতনতাই আমাদের এগিয়ে নিতে পারে।
রেফারেন্সঃ
1.Time-Health Land
Bird Flu: More Common, Less Deadly than We Thought?
A new study suggests H5N1 is more easily spread and far less deadly than scientists believed. What does that mean for work on potentially lethal man-made versions of the virus?
By Bryan Walsh | @bryanrwalsh | February 24, 2012
2. Bangladesh – Bird flu hits poultry industry(Bangladesh___bird_flu_hits_poultry_industry_.aspx.htm)
3. WHO websites
Read more: Bird Flu: More Common, Less Deadly than We Thought
Read more: bird flu more common less deadly than we thought
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে আগস্ট, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:১৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


