একটা অদ্ভুত! স্বপ্ন দেখে ঘুম ভাঙ্গল আকাশের। দু:স্বপ্ন!, নাকি মধুর তা ঠিক ঠাহর করতে পারছেনা। তন্দ্রাচ্ছন্ন চোখেই অনেকক্ষন চেয়ে রইল আবছা অন্ধকারের দিকে। একসময় উঠে সাইড টেবিলে রাখা রেডিয়াম ঘড়িটা দেখল। তিনটা বাজতে আর সাত মিনিট বাকী। চারিদিকে রাতের নীরবতা, বেশ সুনসান। মাঝে মাঝে সিকিউরিটির বাশীর আওয়াজ আর দুরে ট্রাক চলার শব্দ ছাড়া তেমন কোন শব্দ নেই। হঠাৎ একটা কুকুর ডেকে উঠল কাছাকাছি কোথাও, তারপর আরেকটা। উঠে গিয়ে লাইটটা জ্বেলে ঢেকে রাখা কাচের মগ থেকে পানি খেল খানিকটা। তারপর খালি মগটার দিকে আনমনে চেয়ে রইল কিছুক্ষন। এই মগটাই কিছুদিন আগে কিনে দিয়েছিল 'নীলা', এর পর থেকে সে এই মগটা ছাড়া পানি খায় না।
'নীলা' হচ্ছে আকাশের স্ত্রী। কিছুদিন হল সে মায়ের বাসায় গেছে, কয়েকদিন থাকবে বলে। বর্তমানে বাসায় আকাশ একাই থাকছে। নীলা যখনই দুরে থাকে তখনই আকাশ একটা জিনিস খেয়াল করে যে, নীলার অবর্তমানে সে তাকে খুব মিস করে। তখন নিজেকে বড্ড নিস:ঙ্গ, অসহায় মনে হয়। যেমন এই মুহুর্তে নীলার সুন্দর-নিশ্পাপ মুখটা বার বার চোখের সামনে ভেসে উঠছে, কেমন যেন বুকটা ফাকা ফাকা লাগছে। এরকম কেন হয় জানেনা আকাশ। কেমন জানি অন্যরকম লাগে, ব্যাস এতটুকুই, এর বেশী এসব নিয়ে চিন্তা করতে মন চায় না। খুব ভয় হয় তার, হারানোর ভয়। "ঘর পোড়া গরু সিদুঁরে মেঘ দেখলে নাকি ভয় পায়'। তেমনি হারানোর ভয়ে আকাশের মনটা সব সময় কেমন যেন কুকড়ে থাকে। এখন আকাশ একটা জিনিস খুব ভালভাবেই জানে, 'না পাওয়ার বেদনার চেয়ে পেয়ে হারানোর বেদনা সহস্র গুন বেশী, অনেক কষ্টের'। প্রেম, ভালবাসা, বিরহ, বিচ্ছেদ এগুলোকে সে এখন রীতিমত ভয়ই পায়, চিন্তা করতে বুক কাপেঁ, যদি পাছে অমঙ্গল কিছূ হয়.........। এলোমেলো সব চিন্তা মাথার ভিতর কেমন যেন গিজ গিজ করছে। তারপর হঠাৎ করেই তার মনে হল, আসলে সে কি নীলাকে ভালবাসতে পেরেছে? কি জানি! হতেও পারে!! তবে, নীলাকে সে অবহেলা করেনি কখনও।
প্রথম যেদিন আকাশের বিয়ের কথা উঠে তখন সে বিয়ে করবে না বলে জানিয়ে দেয়। বড্ড একটা অভিমান জন্মেছিল তার সব নারী জাতির উপর। সেই ছোটবেলায় আকাশ জানত ও বিশ্বাস করত যে, ছেলেরাই শুধু মেয়েদেরকে ঠকায়, তাদের সাথে প্রতারনা করে, কষ্ট দেয়, প্রেম প্রেম খেলা করে ইত্যাদি ইত্যাদি....। আর সব গুলোকেই সে মন থেকে ঘৃনা করত। পাছে সেও যদি সবার মত হয়ে যায় তাই কখনও প্রেম করবেনা বা কাউকে ভালবাসবেনা বলেই ঠিক করে রেখেছিল সেই তখন থেকে। তাছাড়া সেই যখন ফোর ফাইভের ছাত্র তখন এক বৈষ্টবনী তাকে দেখে মাকে বলেছিল, 'তোমার এই ছেলে ভালবাসা করে বিয়ে করবে গো দিদি, খুব ভাল ছেলে, তবে বড্ড জেদী স্বভাবের মনে হচ্ছে! ওকে একটু সামলে রেখো গো দিদি'। বৈষ্টবনীর ঐদিনের ঐ কথার পর সে মনে মনে চির প্রতিজ্ঞ হয়েছিল, সে কোনদিন কাউকে ভালবাসবে না, প্রেম করবে না। জীবনটা এগিয়ে চলছিলও সেমতেই, দু-একটা প্রেমের অফার দুরে সরিয়ে রেখেছে অনেকটা জোড় করেই কিন্তু হায় ইশ্বর! তোমার লীলা বোঝা বড় দায়! নিয়তি যার পিছু নেয়, সাধ্বি কি তার, তার থেকে রেহাই পাওয়ার................'।
হাত থেকে মগটা রেখে উঠে দাড়াল আকাশ। উঠে আড়মোড়া ভাঙ্গার খানিকটা চেষ্টা করল। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে বারন্দায় পেতে রাখা চেয়ারটায় গিয়ে বসল। এই জায়গাটা তার খুবই প্রিয়। বাসার সামনের অনেকটা জায়গা ফাকা। ঘরবাড়ি এখনও তেমন একটা হয়নি, তাছাড়া যে গুলো আছে তার সবই দুই তলা, এর উপরে কাছাকাছি তেমন একটাও নেই। ওখানে বসেই আকাশটা দেখা যায় বেশ ভালভাবেই। বাসার ডান দিকে খানিকটা দুরে মাঝারি আকারের একটা ঝিল আছে। সেটাও দেখা যায় মোটামুটি এখানে বসেই। ঝিলের পানির রংটা কুচকুচে কাল। ময়লা আবর্জনা আর নর্দমার পানি মিশেই এরকম রং ধারন করেছে। আমাদের দেশে দিন দিন জলাশয় গুলো যে হারে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, তা দেখার মত কেউ নেই। এই অসম্ভবের দেশে সবই সম্ভব!!। খুব আফসুস হয় সেজন্য। অন্ধকারের মাত্রাটা হঠাৎ একটু স্পষ্ট হওয়ায় ঘাড়টা কাৎ করে উপড়ে এক নজর দেখল। আহ! কি সুন্দর চাদঁ, কি অপুর্ব! । সাদা মেঘগুলো কেমন করে সরে সরে যাচ্ছে উত্তর থেকে দক্ষিনে। মাঝে মাঝে চাদঁটা মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ছে। দেখতে লাগল আনমনে, চাদঁ আর মেঘের লুকোচুরী। সিগারেটে একটা টান দিয়ে ফেলে দিল। উঠে গিয়ে গ্রীলটায় বাম হাত টেস দিয়ে দাড়াল। দেখতে লাগল সেই অপুর্ব দৃশ্য!! মাঝে মাঝে মনে হচ্ছে কোন সদ্য শৈশব পেরুনো কিশোরী কন্যা অভিমান করে সাদা কাশবনে মুখ লুকোচ্ছো, আবার খানিক বাদেই খলখলিয়ে নাচতে নাচতে বের হয়ে এসে নিজেকে জানান দিচ্ছে। দেখতে দেখতে একসময় তার আবার মনে পড়ল স্বপ্নের কথা, স্বপ্নে দেখা 'বৃষ্টির' কথা।
(চলবে........)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে মে, ২০১৭ দুপুর ২:১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


