কৃষ্ণকান্তের উইল যারা পড়েছেন তারা ভাল বুঝতে পারবেন আমি কোথা থেকে বা কী লিখেছি। বঙ্কিম চন্দ্রের উপন্যস পড়ার আগে আমাকে একজন বলেছিলেন উনার রচনা খুব কঠিন, পড়তে পারবোনা আমি। যে বলেছিলেন সে খুব পড়ুয়া কিন্তু কথাটায় তেমন ভয় পাইনি। ভেবেছিলাম একজনের কাছে যা কঠিন-নিরস আরেক জনের কাছে তা সজহ-সরসও হতে পারে, অসম্ভ কিছু না। কিন্তু পড়া শুরু করে বুঝতে পারলাম কথাটা আসলে বারো আনাই সত্যি ছিল। সাধু ভাষায় লেখা বলে খুব কষ্ট হচ্ছিল। কিন্তু তাও হাল ছাড়িনি। হয়ত কোথাও একেবারেই বুঝিনি তাও পড়েছি, কোন কোন জায়গায় স্কিপ করে গেছি। সংকল্প ছিল পড়ব-ই। যাই হোক, যেটুকু নিয়ে এখানে বলবো সেটুকু হলো চতুর্দশ পরিচ্ছেদ।
উপন্যাসের একটি চরিত্র ছিল রোহিণী। বাল্য বিধবা, যাকে এক সময় লোভে ফেলে কৃষ্ণকান্তে'র জেষ্ঠ্য ছেলে হরলাল তার-ই বাবার করা উইল চুরি করে আসল উইলের জায়গায় জাল উইল রাখতে রাজী করায়। রোহিণী উইল চুরি করলেও হরলালের হাতে দেয়নি। এক সময় বিবেকের কাছে পরাজিত হয়ে ঠিক করে যেমনি করে জাল উইল রেখে আসল উইল চুরি করেছিল তেমনি করেই আবার আসল উইল ফেরত দেবে। কিন্তু ফেরত দিতে যাওয়ার সময় ধরা পড়ে যায়। এক পর্যায়ে ঠিক হয় রোহিণীকে শাস্তি দিয়ে দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়া হবে। কিন্তু কৃষ্ণকান্তের ভাতিজা গোবিন্দলাল চাচার অনুমতিক্রমে রোহিণীর সঙ্গে কথা বলে তাকে কলকাতা যাওয়ার জন্যে রাজী করায়।
হতভাগিনী রোহিণী কলকাতা চলে গেলেতো কাহিনী-ই শেষ হয়ে যেতো। যাক সে আর হয়নি, কেননা রোহিণী গোবিন্দলালের প্রেমে পরে যায়। তাই কলকাতা যাওয়ার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলে। গোবিন্দলাল বুঝেছিল রোহিণীর ভালবাসা তাই চেয়েছিল তাকে কলকাতা পাঠানোর, কিন্তু যাবেনা শুনে সে একটু দুঃখ-ই পায়। এই মুহুর্তে তার কিশোরী স্ত্রী ভোমরা উপস্থিত হয়ে (আমি এই কথোপকথোন টুকু দারুন উপভোগ করি। কী সহজ-সরল!) বলে,
"ভাবছ কি?"
গোবিন্দ: বল দেখি?
ভোমরা : আমার কালো রূপ।
গোবিন্দ: ইঃ-
ভোমরা ঘোরতর কোপাবিষ্ট হইয়া বলিল, "সে কি? আমায় ভাবছ না? আমি ছাড়া পৃথিবীতে তোমার অন্য চিন্তা আছে?"
গোবিন্দ: আছে না ত কি? সর্ব্বে সর্ব্বময়ী আর কি! আমি অন্য মানুষ ভাবতেছি।
কী সহজ সরল মেয়ে! কী দৃঢ় বিশ্বাস! ভোমরার জায়গায় নিজেকে দাড় করিয়ে ভেবে দেখলাম ঐ মুহুর্তে রাইগ্যা-টাইগ্যা ফায়ার হইয়া না গেলেও বিশ্বাসের ভিত একটু হলেও নড়ে যেতো! কিন্তু কম বয়সী মেয়েটার মনে ঘুনাক্ষরেও তা না এসে আরো বেশী আহ্লাদ করে স্বামীর গলা জড়িয়ে ধরে জানতে চায় অন্য কাকে ভাবছে। গোবিন্দলালের উত্তর ছিল
গোবিন্দ: কি হবে তোমায় বলিয়া?
ভ্রমর: বল না !
গোবিন্দ: তুমি রাগ করিবে।
করি করবো- বল না।
গোবিন্দ: যাও দেখগিয়া সকলের খাওয়া হল কি না।
ভ্রমর: দেখবো, এখন বল-না কে মানুষ?
গোবিন্দ: সিয়াকুল কাঁটা! রোহিণীকে ভাব্ছিলাম।
ভ্রমর: কেন রোহিণীকে ভাবছিলে?
গোবিন্দ: তা কি জানি?
ভ্রমর: জান-বল না।
গোবিন্দ: মানুষ কি মানুষকে ভাবে না?
ভ্রমর: না। যে যাকে ভালবাসে, সে তাকেই ভাবে, আমি তোমাকে ভাবি- তুমি আমাকে ভাব।
গোবিন্দ: তবে আমি রোহিণীকে ভালবাসি।
ভ্রমর: মিছে কথা-তুমি আমাকে ভালবাস-আর কাকেও তোমার ভালবাস্তে নাই- কেন রোহিণীকে ভাব্ছিলে বল না?
(পড়ছিলাম আর মনে হচ্ছিলো আমি যেনো ঠিক চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি শ্যাম বর্ণের সরলা-চপলা একটি কিশোরীকে যার কিনা সিঁথিতে মোটা সিঁদুর, হাতে সাদা-লাল মোটা শাঁখা-পলা, মাথার ঘোমটা অর্ধেক পর্যন্ত টানা, স্বামীর কাঁধের উপর নিজের দু'হাত তুলে দিয়ে মুখোমুখি হয়ে ভালবাসার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে জেরা করছে স্বামীকে) ।
গোবিন্দলাল কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে,
গোঃ বিধবাকে মাছ খাইতে নাই, তবু তারিণীর মা মাছ খায় কেন?
ভ্রঃ তার পোড়ার মুখ, যা করতে নাই তাই করে।
গোঃ আমারও পোড়ার মুখ, যা কর্তে নাই তাই করি। রোহিণীকে ভালবাসি।
ধা করিয়া গোবিন্দ লালের গাল ভোমরা এক ঠোনা মারিল। বড় রাগ করিয়া বলিল, "আমি শ্রীমতী ভোমরা দাসী-আমার সাক্ষাতে মিছে কথা?"
হাসতে হাসতে শেষ মেয়েটির রাগ দেখে ।
গোবিন্দলাল হার মানিল। ভ্রমরের স্কন্ধে হস্ত আরোপিত করিয়া, প্রফুল্লনীলোৎপলদলতুল্য মধুরিমাময় তাহার মুখমন্ডল স্বকরপল্লবে গ্রহন করিয়া মৃদু অথচ গভীর, কাতর কন্ঠে গোবিন্দলাল বলিল, "মিছে কথাই ভোমরা। আমি রোহিণীকে ভালবাসিনা। রোহিণী আমায় ভালবাসে।"
এবার ভোমরার মাঝে নারী জাতির স্বভাব সুলভ অধিকার বোধটি চলে আসে। যাগগে সে আলোচনায় না যাই।
প্রফুল্লনীলোৎপলদলতুল্য শব্দটি আমি কয়েকবার পড়েও ঠিক ঠাক উচ্চারন করতে পারিনি অর্থ বোঝাতো দূরের কথা। পরে কয়েকবার আওড়ে শেষে উচ্চারন করতে পেরেছি। এটা পড়েছি গতকাল আর পুরো শব্দটির অর্থ বের করতে পেরেছি আজ!! আল্লাহ মাফ কর এরকম ঊপন্যাস পড়তে গিয়ে আমার দাঁত সব ঝরঝর করে পরে যাবে, চুল ফুরফুর করে উড়ে যাবে ! যায় যাক কৃষ্ণকান্তের উইল আমি পড়ে শেষ করবই ইনশাআল্লাহ।
***************************************
মিছে কথাই ভোমরা। কথাটা বলতে কত্তগুলো উপমা বঙ্কিম বাবু এনেছেন। আমার মতন পাঠকের কথা উনার মাথায় ছিলনা। থাকলে নিশ্চই এরকম শব্দ ব্যবহার করতেন না।
** কোপাবিষ্ট
** সিয়াকুল কাঁটা
** স্বকরপল্লব
সিয়া= কালো,কৃষ্ণবর্ণ, লেখার কালি। কুল মানে বরই। মানে কি দাড়ায় বরই এর কালো কাঁটা?
**************************************
নোটিশ বোর্ডটি মন দিয়ে দেখুন: বরাবরের মতই বলছি, আমি ভাল পাঠক নই। হঠাৎ হঠাৎ কোন বই বা বইয়ের অংশ খুব ভাল লাগলে/খারাপ লাগলে একটু নিজের মতন বিশ্লেষণ (ঠিক বিশ্লেষণ ও বলা যায়না একে) করি। এতে আমার ভুল-ত্রুটি বিজ্ঞ জনেরা নিজ নিজ গুণে ক্ষমা করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ২০ শে এপ্রিল, ২০১৮ সকাল ৮:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




