সোবহানবাগ মসজিদের পাশে মিরপুর রোডের ধারের সেই সাধারণ সাইনবোর্ডটি যখন প্রথম আমার চোখে পড়ে, তখন আমি নেহাতই বালক। ব্র্যান্ডিং, জেন্ডার-ইকোনমি বা বাজার ব্যবস্থার জটিল সমীকরণ বোঝার বয়স তখনো হয়নি। শুধু এটুকুই জানতাম, ‘সুমি’ আমার বড় বোনের এক বন্ধুর নাম। সম্ভবত সে কারণেই নামটা আমার মনে গেঁথে গিয়েছিল।
মাঝে মাঝে আম্মা আমার হাতে একটা খালি হরলিক্সের কাঁচের বয়াম ধরিয়ে দিয়ে মসজিদের পেছনের এক গরুর খামার থেকে খাঁটি দুধ আনতে পাঠাতেন। ফেরার পথে প্রায় প্রতিদিনই আমার বাম পাশে পড়ত সেই সাইনবোর্ড - ‘সুমি’স হট কেক’। এর অন্তর্নিহিত গুরুত্ব বোঝার অনেক আগেই নামটা আমার কাছে পরিচিত হয়ে গিয়েছিল।
তখনকার দিনে, কিংবা এখনও, বাজারের অধিকাংশ দোকানের নাম হয় কোনো পুরুষের পারিবারিক পদবি দিয়ে, নয়তো কোনো গাম্ভীর্যপূর্ণ ইংরেজি নামে - যেমন “প্যাটিসারী”। কিন্তু এই দোকানটি ছিল ব্যতিক্রম। এর নাম একজন মহিলার নামে খুব স্পষ্টভাবে, কোনো সংকোচ ছাড়াই। বহু বছর পরে, যখন ব্যবসা, ইকোসিস্টেম এবং স্থায়িত্ব নিয়ে ভাবতে শুরু করি, তখন বুঝতে পারি সেই সাইনবোর্ডটি কেবল একটি দোকান বা বেকারির নাম ছিল না। পুরুষশাসিত এই বাজারে সেটি ছিল এক নীরব কিন্তু শক্তিশালী ব্যতিক্রম।
বাজারের পুরুষতাত্ত্বিক কাঠামো
বাংলাদেশের যেকোনো প্রথাগত বাজারে পা রাখলেই তার অভ্যন্তরীণ বিন্যাসটা সহজেই বোঝা যায়। পাইকারি বিক্রেতা থেকে শুরু করে পরিবহনকারী অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষ। ঋণের আদান প্রদানও চলে পুরুষতান্ত্রিক নেটওয়ার্কের ভেতর দিয়ে। বাজারের ভাষা উচ্চকিত, দরদাম-নির্ভর এবং ক্ষমতার টানাপোড়েনে ভরা। এমন এক বাস্তবতায় কোনো দোকানের নাম যদি একজন নারীর নামে হয়, তা কেবল ব্র্যান্ডিং নয়; সেটি এক ধরনের ঘোষণা।
নব্বইয়ের দশকের শুরুতে এই দোকানটি আমাদের প্রচলিত ধারণার ভেতরে এক নীরব অস্বস্তি তৈরি করেছিল। এটি কোনো বড় করপোরেটের আড়াল থেকে আসেনি, কিংবা নিজেদের পরিচয়ের জন্য কোনো বিমূর্ত ইংরেজি নামও গ্রহণ করেনি। ব্যবসা সহজ করার জন্য কোনো পুরুষতান্ত্রিক পদবির আশ্রয়ও নেয়নি। বরং একটি নারীর নামকেই প্রতিষ্ঠানের কেন্দ্রে রেখেছে। দশকের পর দশক ধরে সেই পরিচয় অটুট রাখা মোটেও সহজ কাজ নয়। অথচ তারা সেটিই করে এসেছে।
নামের ভার ও লিঙ্গভেদ
দক্ষিণ এশিয়ায় নাম মানেই কর্তৃত্ব। যখন কোনো ব্র্যান্ড কোনো ব্যক্তির নামে গড়ে ওঠে, তখন সেটি এক ধরনের গন দায়বদ্ধতা তৈরি করে। কিন্তু এই কর্তৃত্বের ধারণাটিও লৈঙ্গিক বৈষম্যে দুষ্ট। ব্যবসায় পুরুষের নাম মানেই ধরে নেওয়া হয় সেখানে মালিকানা, ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দৃঢ়তা আছে। অন্যদিকে, নারীর নাম ঐতিহাসিকভাবেই ঘরোয়া কাজ বা শখের সাথে মিলিয়ে দেখা হয়।
যখন কোনো ব্র্যান্ডের নাম হয় একজন নারীর নামে, তখন বাজার শুরুতেই তাকে এক সূক্ষ্ম সন্দেহের চোখে দেখে। এটি কি ‘হোম বিজনেস’? এটি কি বড় পরিসরে টিকে থাকতে পারবে? বড় সাপ্লাই কন্ট্রাক্ট বা প্রতিযোগিতামূলক বাজার সামলাতে পারবে? অনেক সময় ধরে নেওয়া হয়, নারীর নামে ব্যবসা মানেই হয়তো বুটিক, প্রসাধনী, অলঙ্কার বা বিউটি পার্লারের মতো ঘরানার উদ্যোগ।
কিন্তু “সুমি’স হট কেক” সেই ধারণাকে অস্বস্তিকরভাবে চ্যালেঞ্জ করেছিল। পুরুষতান্ত্রিক বাজারে প্রচলিত খাদ্যপণ্যের দোকান শুরু করে তারা শুধু টিকে থাকেনি, বরং কয়েক প্রজন্মের কাছে এক সাংস্কৃতিক স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। তাদের ‘ব্ল্যাক ফরেস্ট’ কেক এক সময় ঢাকার ভোক্তাদের আস্থার প্রতীকে পরিণত হয়েছিল। ‘হোম বেকার’ থেকে ‘ইন্ডাস্ট্রি রেফারেন্স পয়েন্ট’ হয়ে ওঠার এই যাত্রা দেখায়, বাজারে বৈধতা এবং গ্রহণযোগ্যতা কীভাবে সময়ের সঙ্গে নির্মিত হয়।
অদৃশ্য বাধার দেয়াল
দক্ষিণ এশিয়ায় দীর্ঘস্থায়ী ব্র্যান্ডের ক্ষেত্রে নারীর নাম খুব একটা দেখা না যাওয়ার কারণ হয়তো দক্ষতার অভাব নয় বরং কাঠামোগত বাধা। মূলধন প্রাপ্তির জন্য যে স্থাবর সম্পত্তির প্রয়োজন হয়, সেখানে নারীরা ঐতিহাসিকভাবেই পিছিয়ে। ডিস্ট্রিবিউশন চ্যানেলগুলো গড়ে ওঠে পুরুষ-প্রধান অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে। বাজারের গতিশীলতা, গভীর রাত পর্যন্ত কার্যক্রম কিংবা সরবরাহকারীদের সাথে দর কষাকষি—সামাজিক প্রথার কারণে এই পথগুলো পুরুষদের জন্য সবসময়ই মসৃণ ছিল।
এই প্রতিকূলতার মধ্যেই এই ব্রান্ড এর টিকে থাকা প্রমাণ করে যে তারা সিস্টেমের সাথে নিরন্তর লড়াই করেছেন। অনেক নারী উদ্যোক্তা হারিয়ে যান, অনেকে করপোরেট কাঠামোর আড়ালে নিজের পরিচয় বিসর্জন দেন। কিন্তু তিন দশকের এই ধারাবাহিকতা কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়।
আস্থা বনাম কর্তৃত্বের দ্বন্দ্ব
ভোগ্যপণ্য ব্যবসায় নারী প্রতিনিধিত্বের সাথে বিশ্বাস, শুদ্ধতা এবং মমতার একটা সংযোগ আছে। বাজারের ভাষায় একে ‘ইমোশনাল ইকোনমি’ বলা যেতে পারে। কিন্তু এই একই পরিচয় অনেক সময় প্রতিষ্ঠানের ‘অথরিটি’ বা কর্তৃত্বকে খাটো করে দেখায়। সুমি’স-এর সাফল্য হলো তারা এই আবেগীয় আস্থার দেয়াল টপকে এক প্রাতিষ্ঠানিক পেশাদারিত্ব অর্জন করতে পেরেছেন।
বাংলাদেশে কোনো ব্যবসার প্রবৃদ্ধি মাপার চেয়ে তার ‘টিকে থাকা’ বা সারভাইভাল রেট মাপা বেশি কঠিন। রুচি বদলায়, নকল ব্র্যান্ড আসে, বড় চেইন শপ প্রতিযোগিতায় নামে। দুই দশক পার করতে না করতেই অনেক ব্যবসা বন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু এই ব্রান্ড আজ চতুর্থ দশকে। এর অর্থ হলো তারা কেবল একটি ‘ট্রেন্ড’ ছিল না, তারা নিজেদের একটি প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে পেরেছে।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ইতিহাস খুব কমই জেন্ডার লেন্সে পড়া হয়েছে। আমরা শিল্পগোষ্ঠীর উত্থান, করপোরেট সাফল্য এবং বড় উদ্যোক্তাদের গল্প শুনি। কিন্তু জেন্ডার কীভাবে একটি ব্র্যান্ডের গ্রহণযোগ্যতা, নেটওয়ার্কে প্রবেশাধিকার বা বাজারে বৈধতা অর্জনকে প্রভাবিত করে সেই আলোচনা প্রায় অনুপস্থিত। বড় ব্যবসা বা কনগ্লোমারেটের শীর্ষপদে অবশ্যই উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় নারী নেতৃত্ব আছে। কিন্তু এমন কতটি প্রতিষ্ঠান আমরা দেখাতে পারি যার জন্ম, পরিচিতি এবং উত্তরাধিকার - সবই একটি নারীর নামে নির্মিত? উদাহরণ খুঁজতে গেলে তালিকাটায় কয়টি নাম আসবে সেটাই প্রশ্ন।
‘সুমি’স হট কেক’ কেবল বেকারি পণ্যেন স্বাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, বরং এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি টিকে আছে। যে বাজারে কর্তৃত্ব মানেই ছিল পুরুষতান্ত্রিক পরিচয়, সেখানে একটি নারীর নাম বহনকারী ব্র্যান্ড প্রজন্মের পর প্রজন্ম প্রাসঙ্গিক থেকে এক নীরব বার্তা দিচ্ছে। এটি প্রমাণ করে, একবার যোগ্যতা আর আস্থা অর্জন করতে পারলে তা তথাকথিত ‘বয়েজ ক্লাব’ বা পুরুষতান্ত্রিক বলয়কেও ছাপিয়ে যেতে পারে। টিকে থাকা মানে কেবল মুনাফা নয়, টিকে থাকা মানে এমন এক সিস্টেমে নিজের নামকে সগৌরবে ধরে রাখা, যা মূলত আপনার জন্য তৈরি করা হয়নি।
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে “সুমি’স হট কেক” এর এই দীর্ঘ পথচলা আমাদের সেই সাহসের গল্পই মনে করিয়ে দেয়
প্রকাশিত : বিডিনিউজ২৪.কম view this link
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৩:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



