somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

মুনতাসির রাসেল
শব্দ আমার আশ্রয়, চিন্তা আমার পথ। ইতিহাস, সমাজ আর আত্মপরিচয়ের গভীরে ডুব দিই—সত্যের আলো ছুঁতে। কলমই আমার নিরব প্রতিবাদ, নীরব অভিব্যক্তি।

দাসত্বের মনস্তত্ত্ব

১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


সভ্যতার দীর্ঘ ইতিহাসে মানুষ বহুবার নিজেকে মুক্ত ভেবেছে, অথচ প্রতিবারই নতুন কোনো কাঠামোর ভেতরে আবদ্ধ হয়েছে। একসময় দাসত্ব ছিল প্রকাশ্য; মানুষের গলায় শৃঙ্খল থাকত, দেহের ওপর মালিকানার ছাপ থাকত স্পষ্ট। আজ সেই শৃঙ্খল আর দৃশ্যমান নয়, কিন্তু তার অস্তিত্ব আরও গভীর, আরও সূক্ষ্ম। আধুনিক মানুষ নিজেকে স্বাধীন বলে ঘোষণা করলেও বাস্তবে সে এক জটিল ক্ষমতাবিন্যাসের অন্তর্গত সেবক মাত্র। পার্থক্য শুধু এতটুকু, আজকের দাসত্ব আইন দিয়ে নয়, মানসিকতা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং স্বপ্ন নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত।

ভ্যাটিকান সিটিতে যারা বাস করে, তারা নিজেদের ঈশ্বরের দাস বলে পরিচয় দেয়। সেই দাসত্বের মধ্যে অন্তত এক ধরনের আধ্যাত্মিক আত্মসমর্পণ আছে। কিন্তু আমাদের সমাজে মানুষ একে অপরের দাস হয়ে উঠেছে। এখানে নিম্নবিত্ত উচ্চবিত্তের দাস, মধ্যবিত্ত সামাজিক মর্যাদার দাস, উচ্চবিত্ত বৈশ্বিক পুঁজির দাস। ক্ষমতার প্রতিটি স্তর নিজের নিচের স্তরকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় এবং নিজের ওপরে থাকা শক্তির কাছে নতজানু থাকে। ফলে একটি বিস্তৃত দাসত্বচক্র সমাজকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করে রেখেছে, যেখানে কেউই প্রকৃত স্বাধীন নয়।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এই দাসত্বকে আমরা এখন স্বাভাবিক জীবনব্যবস্থা বলে মেনে নিয়েছি। আমরা এমন এক মানসিক কাঠামোয় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, যেখানে নেতৃত্বের স্বপ্ন দেখাকে দুঃসাহস মনে হয়, অথচ আনুগত্যকে ভদ্রতা ও সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। আমরা নির্মাতা হতে চাই না, পরিচালিত হতে চাই। আমরা মালিকানার দায়িত্ব নিতে চাই না, বরং দক্ষ কর্মচারী হয়ে ওঠাকেই জীবনের চূড়ান্ত সাফল্য ভাবি। ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা, পারিবারিক সংস্কৃতি এবং সামাজিক ধারণাগুলো ধীরে ধীরে এমন এক মানুষ তৈরি করে, যে প্রশ্ন করতে ভয় পায়, ভিন্নভাবে ভাবতে সংকোচ বোধ করে এবং প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার বাইরে নিজেকে কল্পনা করতে পারে না।

এই মানসিক পরাধীনতার সবচেয়ে প্রকট রূপ দেখা যায় অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতায়। আমাদের প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করে বহিরাগত চিন্তা, বিদেশি নীতি, বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্কৃতি। আমরা নিজেদের ভাষা, ঐতিহ্য ও অভিজ্ঞতাকে উন্নয়নের উপযোগী করে গড়ে তোলার পরিবর্তে অন্যের মানদণ্ডে নিজেদের উপস্থাপন করাকে অগ্রগতি বলে মনে করি। বিদেশি উচ্চারণে কথা বলা, বিদেশি সংস্কৃতির অনুকরণ করা কিংবা বহির্বিশ্বের অনুমোদন অর্জন করাকে আমরা সাফল্যের চিহ্ন হিসেবে দেখি। যেন নিজের পরিচয়ে নয়, অন্যের স্বীকৃতিতেই আমাদের অস্তিত্বের মূল্য নির্ধারিত।

অথচ ইতিহাস বলে, কোনো জাতি কেবল অনুকরণ করে মহৎ হয়ে ওঠেনি। যে জাতি নিজের জ্ঞান, সংস্কৃতি ও সক্ষমতার ওপর আস্থা রাখতে শিখেছে, সেই জাতিই বিশ্বকে নেতৃত্ব দিয়েছে। পৃথিবীর প্রতিটি প্রভাবশালী সভ্যতা একসময় নিজেদের উপযোগিতা এমনভাবে নির্মাণ করেছে, যাতে অন্যরা তাদের ভাষা, জ্ঞান ও প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আমরা উল্টো পথে হাঁটছি। আমরা নিজেদের এমনভাবে গড়ে তুলছি, যেন অন্যের ব্যবস্থার জন্য উপযুক্ত শ্রমশক্তি হতে পারি; নিজেদের জন্য নতুন ব্যবস্থা নির্মাণের সাহস অর্জন করছি না।

এই দাসত্ব কেবল অর্থনৈতিক নয়, এটি অস্তিত্বগত। কারণ মানুষ যখন নিজের সম্ভাবনার সীমা অন্যের হাতে সমর্পণ করে, তখন তার স্বাধীনতা কেবল রাজনৈতিকভাবে নয়, আত্মিকভাবেও বিনষ্ট হয়। সে তখন আর নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করে না; বরং অন্যের নির্মিত ভবিষ্যতের মধ্যে জায়গা পাওয়ার জন্য সংগ্রাম করে। সবচেয়ে করুণ বিষয় হলো, এই মানসিকতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সঞ্চারিত হয়। ফলে যে শিশু জন্ম নেয় স্বাধীন মানুষ হিসেবে, তাকেও ধীরে ধীরে শেখানো হয় নিরাপদ দাসত্বের কৌশল।

তবু আশার জায়গা এখানেই যে, দাসত্ব মানুষের চূড়ান্ত নিয়তি নয়। মানুষের ইতিহাস মূলত মুক্তির ইতিহাস। প্রতিটি পরিবর্তনের শুরু হয়েছে চাওয়ার মধ্য দিয়ে। যে মানুষ স্বাধীনতার কল্পনা করতে পারে না, সে কখনো স্বাধীন হতে পারে না। তাই মুক্তির প্রথম শর্ত অর্থনৈতিক শক্তি নয়, মানসিক সাহস। নিজেদের সম্ভাবনাকে নতুনভাবে কল্পনা করার ক্ষমতা। “আমি” থেকে “আমরা”-তে উত্তরণের ক্ষমতা।

কারণ ব্যক্তি একা টিকে থাকতে পারে, কিন্তু জাতি কেবল সম্মিলিত চেতনায় বাঁচে। আমাদের বেঁচে থাকা যদি শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, চাকরি কিংবা সামাজিক মর্যাদার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে আমরা হয়তো টিকে থাকব, কিন্তু মুক্ত হব না। প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব, যখন আমরা এমন একটি সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন দেখব, যেখানে মানুষ কেবল কারও অধীনস্থ শ্রমশক্তি নয়, বরং সৃষ্টিশীল, আত্মমর্যাদাসম্পন্ন এবং স্বাধীন সত্তা হিসেবে বিকশিত হতে পারে।

মুক্তির শৃঙ্খল ভাঙা শুরু হয় বাইরে নয়, মানুষের ভেতর থেকে। যে দিন আমরা দাসত্বকে নিয়তি নয়, পরিবর্তনযোগ্য বাস্তবতা হিসেবে দেখতে শিখব, সেদিনই মুক্তির প্রথম দরজা উন্মুক্ত হবে।


সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০২৬ বিকাল ৩:০৯
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪



কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজ্ঞানীরাও একেশ্বরবাদী হতে পারেন - আইজ্যাক নিউটন তা প্রমাণ করে গিয়েছেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৪০



প্রত্যেক মহান বিজ্ঞানীই নিজের জীবনে ধর্ম নিয়ে গবেষনা করে গিয়েছেন। এমনটাই আমার বিশ্বাস ছিলো। সামুতে আমি এই নিয়ে আগেও লিখেছি। তারপরও, কয়েক দিন স্টাডি করার পরে বুঝতে পারলাম-... ...বাকিটুকু পড়ুন

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮



আমাদের দেশের সাধারণ ও অসাধারণ জনগণ সহ সকল প্রকার সংবাদ মাধ্যম “মত প্রকাশের স্বাধীনতা”র জন্য প্রায় যুদ্ধ করছেন। মত প্রকাশের সামান্য নমুনাচিত্র হিসেবে একটি সংবাদের ভিডিও চিত্র তুলে ধরছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের "ইসলামী" বই - নমুনা ! আলেমদের দায়িত্ব

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১০ ই মে, ২০২৬ সকাল ৮:৪৭

আমাদের দেশের বিখ্যাত চরমোনাইয়ের প্রাক্তন পীর সাহেব, মাওলানা ইসহাক, যিনি বর্তমান পীর রেজাউল করিম সাহেবের দাদা, এর লেখা একটা বই , "ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা"। এ বইটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×