
আরজ আলী মাতুববর সম্বন্ধে লিখতে বসলে এসে যায় আরেক মহান দার্শনিক সক্রেটিসের কথা।সত্যানুসন্ধানে যারা প্রথাগত শিক্ষাকে কোন প্রয়োজন মনে করেনি। সত্যনুসন্ধানে প্রচন্ড তাগিদ জীবনকে তুচ্ছ করে তারা এগিয়ে গেছেন মানবকল্যাণের মাধ্যমে। সত্যানুসন্ধানে তাদের ভিতরের যে তাগিদ তা আমরা দেখেছি নবী রাসূলদের মধ্যে যারা মানব কল্যাণ সাধনে সত্যানুসন্ধানে ব্যাপক ত্যাগ তিতিক্ষা করেছেন।আর এর জন্য অনেককে প্রাণ দিতে হয়েছে।
অশিক্ষিত আরজ আলী মায়ের মৃত্যুতে ব্যপক শোকাবিভূত হয়ে পড়েন।আবেগ তাড়িত মাতববর মৃত মায়ের কিছু ছবি তুলেন।এতে ক্ষুব্দ হয়ে আগত মুন্সী মুসুল্লীরা লাশ দাফন না করে চলে যান।তাতে ব্যথিত ও বিক্ষুব্দ বোধ করেন মাতুববর।তার প্রশ্ন: ছবি তোলা যদি ধর্মীয় দৃষ্টিকোন থেকে গর্হিত কাজ হয়,তা হলে তার জন্য দায়ী তো তিনি,তার মা নন।কিন্তু তবু তাঁর মায়ের এই অবমাননা কেন? মায়ের প্রতি এই অবমাননা তাকে প্রথাগত ধর্মের বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষুব্দ করে তোলেন।গোঁড়ামি ও অন্ধবিশ্বাসের বিরুদ্ধে এবং বৈজ্ঞানিক প্রয়োগপদ্ধতির সমর্থনে মাতুববরের সব বক্তব্যের মূলে রয়েছে জ্ঞানানুশীলন ও সত্য আবিস্কারের দুর্বার প্রেরণা।প্রগতিশীল মতের জন্য তাকে ভুল বুঝেছেন অনেকেই।আখ্যায়িতও করেছেন নাস্তিক বলে।কিন্তু ধর্মের সমালোচক হলেও তিনি যথার্থ ধর্মের বিরোধী ছিলেন না।তাঁর লড়াই ধর্মের বিরুদ্ধে নয়,ধর্মের নামে প্রচলিত ধর্মান্ধতা ও ধর্মতন্ত্রের বিরুদ্ধে,এ কথা সুস্পষ্ট মাতুববরের নিজের উক্তি থেকে: ”এ প্রসঙ্গে কেউ যেন মনে না করেন যে,আমরা ধর্মের বিরুদ্ধাচারণ করিতেছি।আমাদের অভিযান শুধু অসত্য বা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে,কোন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়।ধর্ম থাকিবে মিথ্যার আবর্জনাবর্জিত ও সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত।”কুসংস্কার ত্যাগ করার অর্থ ধর্ম ত্যাগ করা নয়।তিনি বলেন,ধর্ম যদি দর্শনের সমালোচনায় সম্মুখীন হতে না চায়,তাহলে অনিবার্যভাবে নিপতিত হয় নির্বিচার বিশ্বাস ও রহস্যভেদে।অন্যদিকে দর্শন যদি ধর্ম প্রবর্তিত ভাগ্য ও জীবনের মূল সমস্যাবলি সম্বন্ধে উদাসীন হয়ে কিছু পার্থিব সমস্যা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে,তা হলে তা বহুদূরে সরে যায় মানবজীবনে বৃহত্তর পরিমন্ডল থেকে।দর্শন যখনই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ধর্ম থেকে,তখনই তার অভ্যন্তরে আবির্ভাব ঘটে এক ধরনের অন্তঃসারশূন্য ও জীবনবিবর্জিত কূটতর্কের।ধর্মীয় শৃঃখলে আবদ্ধ করে মানুষকে অন্ধ অনুসরনের অনুসারী করার ধারনা তাকে ব্যথিত করত।তিনি ব্যথিত বোধ করতেন”সম্প্রদায় বিশেষ ভুক্ত থাকিয়া মানুষ মানুষকে এত অধিক ঘৃণা করে যে,তদ্রুপ কোন ইতর প্রাণীকেও করে না।হিন্দুদের নিকট গোময়(গোবর)পবিত্র অথচ অহিন্দু মানুষ মাত্র অপবিত্র।পক্ষান্তরে মুসলমানের নিকট কবুতরের বিষ্টাও পাক অথচ অমুসলমান মাত্রই নাপাক।”লোকদার্শনিক আরজ আলীর প্রশ্নঃ এই কি মানুষের ধর্ম? মাতুববরের এ প্রশ্ন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বটে।প্রশ্ন ওটেঃ ধর্মের নামে আজ দিকে দিকে যে সংঘাত শোষণ তার জন্য কি প্রকৃত ধর্ম দায়ী? উত্তরটা নিশ্চয়ই ”না”।এর জন্য দায়ী যারা ধর্মকে প্রয়োগ করতে চায় নিজেদের অসাধু উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার কাজে।একথা কারো অবিদিত নয় যে,যথার্থ ধর্ম অবশ্যই মানব ধর্ম।আরজ আলী মাতুববর কত বড় দার্শনিক ছিলেন জানিনা,কেবল এটুকু বলতে পারি যে তাঁর ধ্যান-ধারণার মূল লক্ষ্যটাই ছিল মানুষ ও মানবকল্যাণ ও মানব প্রেমের বিকাশ।
ছবিসূত্রঃ-নেট
সর্বশেষ এডিট : ২৫ শে মার্চ, ২০১৬ দুপুর ২:৪১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



