somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এমন মানব জীবন আর কী হবে?

১১ ই জুন, ২০০৬ সকাল ১১:০২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কয়েক সপ্তাহ আগের কথা। ফ্লোরেন্স থেকে আবার ভিয়েনায় ফিরে যাচ্ছি। হাতে ঘন্টা তিনেক সময়। ট্রেন স্টেশনেই আছি। করার কিছু নেই, তাই ভাবলাম মানুষ দেখে সময় কাঁটাই। পৃথিবীর দুটি চমৎকার জিনিস যা সম্পূর্ণ বিনা খরচায় দেখা যায় অথচ কখনোই রিপিটেশন নেই। এর ভিতরে একটা হলো আকাশ আর আরেকটা হলো মানুষ।

ম্যাকডোনাল্ডে খাবারের জন্য ঢুকে বুঝতে পারলাম মানুষ দেখার জন্য এই জায়গা অতুলনীয়। প্রচন্ড গিজগিজ করছিলো ম্যাক। হরেক রকমের মানুষ। বেশিরভাগই ইউরোপিয়ান শ্বেতাঙ্গ। হাতে গোনা দুয়েকজন আফ্রিকান। এশিয়ান বলতে কয়েকটা অল্প বয়স্ক চাইনীজ ছেলে মেয়ে লাইনে দাড়িয়ে মাখামাখি করছে। একটু পর পর চাইনীজ মেয়েগুলো কোন এক অজানা কারনে সাথে বয় ফ্রেন্ডের বুকের উপরে ঝাপিয়ে পড়ছে। এরা দ্বিতীয় জেনারেশন চীনা যাদের বাবা মায়েরা ইউরোপে সেটেলড করেছে। চেহারায় চীনা ছাপ থাকলেও আচার আচরনে পশ্চিমা।

খাবার নিয়ে আমি যে টেবিলে দাড়িয়ে খাচ্ছিলাম সেখানে এক মধ্যবয়স্কা মহিলা এসে দাড়ালেন। সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময় করলাম আমরা। কিছুক্ষন পরে আলাপের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলাম ইংরেজী জানে কি না। মাথা নাড়লেন তিনি বিব্রত হাসি সহকারে। (অস্ট্রিয়া আর ইতালীর মধ্যে এইখানে বিশাল পার্থক্য। সেখানে প্রায় সবাই ইংরেজী জানে ও বলতে পারে। ইতালীতে উল্টো)। আমি হাল না ছেড়ে ইংরেজীতেই (এবং হাতে ইশারায়) জানতে চাইলাম ও মাত্র ফোরেন্সে এসেছে নাকি ফিরে যাচ্ছে। বুঝতে পারে নি। উল্টো ইতালীয় ভাষাতেই সে বোঝালো সে নার্সের কাজ করে। আমার কথা জানতে চাইতে আমি জানালাম, স্টুডেন্ট, সিঙ্গাপুর। ওহ সিঙ্গাপুর ! বিস্ময় প্রকাশ এত দূর থেকে ইতালীতে আসায়।

এর ভিতরে মায়ের সাথে ম্যাকে আসা এক পিচ্চি অনেকন আমার দিকে তাকিয়ে। আমি হাসি দিয়ে হাত নাড়তেই সেও বিপুল আগ্রহে আমার দিকেও হাত নাড়তে শুরু করলো। আমরা একে অন্যের সাথে হাতের ইশারায় কখনো টাটা, কখনো ডাকা ডাকি ইত্যাদি খেলা করছিলাম দূর থেকেই। সে বেজায় খুশি। শিশুদের এই ব্যাপারটা মজার, ভাষার বাঁধনের বাইরে বেড়িয়ে আসার দূর্দান্ত মতা থাকে প্রত্যেক শিশুর।

পেছনের টেবিলে যে ভদ্রলোক একটা আইসক্রিমের কাপ নিয়ে এসে দাড়ালেন, সে আশ্চর্যভাবে নিজের মনেই নিজে হেসে যাচ্ছেন। কখনো মৃদু কখনো একটু বেশি। কে জানে হয়তো একা একা আইসিক্রিম খেতে গিয়ে নিজের সন্তানের কোন কথা মনে পড়ে গেছে।

বিশাল জোব্বা পড়ে দুই আফ্রিকান এক লাইনে দাড়িয়ে। তার মধ্যে একজন জোরে জোরে তার ব্লুটুথ হেড সেটে ফোনালাপে ব্যস্ত। ট্্রাডিশনাল ড্রেসের সাথে স্টেট অফ দি আর্ট কমিউনিকেশন, অনেকের চেহারায় কৌতুক তাদের দেখে।

ম্যাকের বাইরে বিশাল ক্যাচাল। সবাই বিভ্রান্তিকর ভাবে ছোটাছুটি করছে। এখানে মানুষ দেখে আনন্দ নেই। কেউ স্থির নেই যে দেখবো। পাশের ওয়েটিংরুমে বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষজন ঝিমুচ্ছেন ট্রেনের অপোয়। যুবক যুবতীরা কেবল নয়, দুই প্রেমময় বয়স্ক বয়স্কা জড়াজড়ি করে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভালোবাসা জানাচ্ছেন এখানেও।

যারা একা তাদের চেহারায় এক অপার্থিব বিষন্নতা। এই ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছি ইউরোপের প্রায় সর্বত্র। অনেক বয়স্ক মানুষগুলো এক সময়ে এসে সব কিছুর খেই হারিয়ে ফেলে। ম্যাটেরিয়ালিস্টিক সমাজের পরাবাস্তবতা।

ওয়াশরুম বা টয়লেট ব্যবহার করে ফিরে আসছি। এক মোটা ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী ওয়াশরুম খুঁজে পাচ্ছেন না। আমাকে জানতে চাইলো এটাই ওয়াশরুম কি না। 70 সেন্ট ইউরো দিয়ে ঢুকতে হয় বলে বাইরে থেকে বোঝা মুশকিলই। কয়েন ফেলানোর জায়গায় লেখা ভাঙ্গতি ফেরত দেওয়া হয় না। এটা দেখে ভদ্রলোকটি হঠাৎই যারপর নাই বিরক্ত। আমায় জিজ্ঞেস করলো আর কোন ওয়াশরুম নাই আশে পাশে। আমি জানতাম নাই। সেটা জানাতে ভদ্রলোকের উষ্মা প্রকাশ। আমি বললাম তোমার ভাঙ্গতি লাগলে আমি দিতে পারি। বেজায় খিপ্ত মানুষটা গোঁ ধরেছেন টয়লেটে যাবেন না। তার পেছনে তার বিব্রত স্ত্রী। মানুষজন কত সামান্য বিষয় নিয়েই না বিরক্ত ডেকে নিয়ে আসে মনের ভিতরে !!

প্রথমে সিঙ্গাপুর, তারপরে ভিয়েনার মতো অসম্ভব গুছানো শহর থেকে ইতালীতে এসে সবকিছু কেমন যেন অগোছালো লাগছিলো। আমি আমার কমফোর্ট জোন থেকে দূরে আছি বুঝতে পারছিলাম। ভিয়েনা বা সিঙ্গাপুরে কিছু চুরি হতে পারে এরকম ভাবনার প্রয়োজন নেই। হোস্টেলে দিব্যি ল্যাপটপ পাবলিক স্পেশে চার্জে রেখে বাইরে গেছে। পকেট পিসি টেবিলে রেখে নিশ্চিন্তে থেকেছি। ইতালী আসার পরেই টের পেলাম এখানে সব কিছিমের পাবলিক আছে। প্রচুর ভবঘুরে টাইপ মানুষ। ভিখারীর সংখ্যাও অনেক। বাস স্টপে পকেটমার হইতে সাবধান জাতীয় অফিসিয়াল সতর্কতা।

ইতালীয়রা অনেকটা ঢাকাইয়াদের মতো। আমোদপ্রিয়, আড্ডাবাজ, জোরে কথা বলে, হইচই করতে পছন্দ। মহিলারা তাদের ইতালীয় উচ্চারনে যখন জোরে কথা বলে, মনে হয় ভিন গ্রহে চলে এসেছি। জামর্ান এর চেয়ে ঢের ভালো। ইতালীয় উচ্চারন যদিও আমাদের বাংলা ভাষার মতো কোমল উচ্চারনের ভাষা তারপরেও কেন যেন আমার খুব ভালো লাগেনি। অস্ট্রিয়ায় গিয়ে জামার্ন ভাষার প্রেমে পড়েছি বরং।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রথমেই বিএনপির যে কাজগুলো করা জরুরি

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৪:৪৬


বিএনপির প্রথম কাজ হলো তারা যে “অত্যাচারী” নয়, তা মানুষের কাছে প্রমাণ করা। "ক্ষমতাশালী" মানে যে ডাকাতি, লুটপাট এবং মাস্তানির লাইসেন্স পাওয়া নয়, এটা নিশ্চিত করা। এর জন্য তাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদেশর স্বপ্নের বাংলা।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:০৬

আমাদেশর স্বপ্নের বাংলা।
--------------------------
আমার স্বপ্নের বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যেখানে মানুষ আগে ধর্ম, বর্ণ, পরিচয় পরে। এই দেশে মোল্লা, পুরোহিত, সাধু, বাউল, ব্রাহ্মণ, চণ্ডাল, চামার, মুচি সকলেই সমান মর্যাদা নিয়ে বাঁচবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

নির্বাচন ২০২৬

লিখেছেন ঢাবিয়ান, ১৪ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৪:০৪

জুলাই বিপ্লবে হাজারো তরুন রাস্তায় নেমেছিল একটা বৈষম্যহীন রাস্ট্র গড়ার স্বপ্ন নিয়ে। নির্বাচনের দাবীতে কোন মানুষই জুলাইতে রাস্তায় নামেনি। একঝাক তারুন্যের রক্তের বিনিময়ে সবার প্রত্যাশা ছিল... ...বাকিটুকু পড়ুন

হাতিয়ায় শাপলা কলিতে ভোট দেওয়ায় তিন সন্তানের জননীকে ধর্ষণ করে বিএনপির কুলাঙ্গাররা।

লিখেছেন তানভির জুমার, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১০

এক আওয়ামী ব্লগার আমাকে প্রশ্ন করছে আপনি তো বিএনপি করেন তাহলে জামাতের পক্ষে পোস্ট দেন কেন। উত্তরা এই পোস্টের শিরোনামে আছে। আমার উত্তর হচ্ছে আমি জামাতও করি না।

আমার পরিবার,আমার... ...বাকিটুকু পড়ুন

দুইশো নয় আসন নিয়েও কেন অন্যদের বাসায় যেতে হচ্ছে?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১:০৯


নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর প্রথম কয়েক ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়ায় একধরনের উৎসবের আমেজ ছিল। স্ট্যাটাস, পোস্ট, কমেন্ট—সবখানে একই সুর। বিএনপি দুইশো নয়টা আসন পেয়েছে, জামায়াত মাত্র সাতাত্তর, দেশ এবার ঠিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×