ম্যাকডোনাল্ডে খাবারের জন্য ঢুকে বুঝতে পারলাম মানুষ দেখার জন্য এই জায়গা অতুলনীয়। প্রচন্ড গিজগিজ করছিলো ম্যাক। হরেক রকমের মানুষ। বেশিরভাগই ইউরোপিয়ান শ্বেতাঙ্গ। হাতে গোনা দুয়েকজন আফ্রিকান। এশিয়ান বলতে কয়েকটা অল্প বয়স্ক চাইনীজ ছেলে মেয়ে লাইনে দাড়িয়ে মাখামাখি করছে। একটু পর পর চাইনীজ মেয়েগুলো কোন এক অজানা কারনে সাথে বয় ফ্রেন্ডের বুকের উপরে ঝাপিয়ে পড়ছে। এরা দ্বিতীয় জেনারেশন চীনা যাদের বাবা মায়েরা ইউরোপে সেটেলড করেছে। চেহারায় চীনা ছাপ থাকলেও আচার আচরনে পশ্চিমা।
খাবার নিয়ে আমি যে টেবিলে দাড়িয়ে খাচ্ছিলাম সেখানে এক মধ্যবয়স্কা মহিলা এসে দাড়ালেন। সৌজন্যমূলক হাসি বিনিময় করলাম আমরা। কিছুক্ষন পরে আলাপের উদ্দেশ্যে জানতে চাইলাম ইংরেজী জানে কি না। মাথা নাড়লেন তিনি বিব্রত হাসি সহকারে। (অস্ট্রিয়া আর ইতালীর মধ্যে এইখানে বিশাল পার্থক্য। সেখানে প্রায় সবাই ইংরেজী জানে ও বলতে পারে। ইতালীতে উল্টো)। আমি হাল না ছেড়ে ইংরেজীতেই (এবং হাতে ইশারায়) জানতে চাইলাম ও মাত্র ফোরেন্সে এসেছে নাকি ফিরে যাচ্ছে। বুঝতে পারে নি। উল্টো ইতালীয় ভাষাতেই সে বোঝালো সে নার্সের কাজ করে। আমার কথা জানতে চাইতে আমি জানালাম, স্টুডেন্ট, সিঙ্গাপুর। ওহ সিঙ্গাপুর ! বিস্ময় প্রকাশ এত দূর থেকে ইতালীতে আসায়।
এর ভিতরে মায়ের সাথে ম্যাকে আসা এক পিচ্চি অনেকন আমার দিকে তাকিয়ে। আমি হাসি দিয়ে হাত নাড়তেই সেও বিপুল আগ্রহে আমার দিকেও হাত নাড়তে শুরু করলো। আমরা একে অন্যের সাথে হাতের ইশারায় কখনো টাটা, কখনো ডাকা ডাকি ইত্যাদি খেলা করছিলাম দূর থেকেই। সে বেজায় খুশি। শিশুদের এই ব্যাপারটা মজার, ভাষার বাঁধনের বাইরে বেড়িয়ে আসার দূর্দান্ত মতা থাকে প্রত্যেক শিশুর।
পেছনের টেবিলে যে ভদ্রলোক একটা আইসক্রিমের কাপ নিয়ে এসে দাড়ালেন, সে আশ্চর্যভাবে নিজের মনেই নিজে হেসে যাচ্ছেন। কখনো মৃদু কখনো একটু বেশি। কে জানে হয়তো একা একা আইসিক্রিম খেতে গিয়ে নিজের সন্তানের কোন কথা মনে পড়ে গেছে।
বিশাল জোব্বা পড়ে দুই আফ্রিকান এক লাইনে দাড়িয়ে। তার মধ্যে একজন জোরে জোরে তার ব্লুটুথ হেড সেটে ফোনালাপে ব্যস্ত। ট্্রাডিশনাল ড্রেসের সাথে স্টেট অফ দি আর্ট কমিউনিকেশন, অনেকের চেহারায় কৌতুক তাদের দেখে।
ম্যাকের বাইরে বিশাল ক্যাচাল। সবাই বিভ্রান্তিকর ভাবে ছোটাছুটি করছে। এখানে মানুষ দেখে আনন্দ নেই। কেউ স্থির নেই যে দেখবো। পাশের ওয়েটিংরুমে বেশিরভাগই বয়স্ক মানুষজন ঝিমুচ্ছেন ট্রেনের অপোয়। যুবক যুবতীরা কেবল নয়, দুই প্রেমময় বয়স্ক বয়স্কা জড়াজড়ি করে পরস্পরের প্রতি পরস্পরের ভালোবাসা জানাচ্ছেন এখানেও।
যারা একা তাদের চেহারায় এক অপার্থিব বিষন্নতা। এই ব্যাপারটা আমি খেয়াল করেছি ইউরোপের প্রায় সর্বত্র। অনেক বয়স্ক মানুষগুলো এক সময়ে এসে সব কিছুর খেই হারিয়ে ফেলে। ম্যাটেরিয়ালিস্টিক সমাজের পরাবাস্তবতা।
ওয়াশরুম বা টয়লেট ব্যবহার করে ফিরে আসছি। এক মোটা ভদ্রলোক আর তার স্ত্রী ওয়াশরুম খুঁজে পাচ্ছেন না। আমাকে জানতে চাইলো এটাই ওয়াশরুম কি না। 70 সেন্ট ইউরো দিয়ে ঢুকতে হয় বলে বাইরে থেকে বোঝা মুশকিলই। কয়েন ফেলানোর জায়গায় লেখা ভাঙ্গতি ফেরত দেওয়া হয় না। এটা দেখে ভদ্রলোকটি হঠাৎই যারপর নাই বিরক্ত। আমায় জিজ্ঞেস করলো আর কোন ওয়াশরুম নাই আশে পাশে। আমি জানতাম নাই। সেটা জানাতে ভদ্রলোকের উষ্মা প্রকাশ। আমি বললাম তোমার ভাঙ্গতি লাগলে আমি দিতে পারি। বেজায় খিপ্ত মানুষটা গোঁ ধরেছেন টয়লেটে যাবেন না। তার পেছনে তার বিব্রত স্ত্রী। মানুষজন কত সামান্য বিষয় নিয়েই না বিরক্ত ডেকে নিয়ে আসে মনের ভিতরে !!
প্রথমে সিঙ্গাপুর, তারপরে ভিয়েনার মতো অসম্ভব গুছানো শহর থেকে ইতালীতে এসে সবকিছু কেমন যেন অগোছালো লাগছিলো। আমি আমার কমফোর্ট জোন থেকে দূরে আছি বুঝতে পারছিলাম। ভিয়েনা বা সিঙ্গাপুরে কিছু চুরি হতে পারে এরকম ভাবনার প্রয়োজন নেই। হোস্টেলে দিব্যি ল্যাপটপ পাবলিক স্পেশে চার্জে রেখে বাইরে গেছে। পকেট পিসি টেবিলে রেখে নিশ্চিন্তে থেকেছি। ইতালী আসার পরেই টের পেলাম এখানে সব কিছিমের পাবলিক আছে। প্রচুর ভবঘুরে টাইপ মানুষ। ভিখারীর সংখ্যাও অনেক। বাস স্টপে পকেটমার হইতে সাবধান জাতীয় অফিসিয়াল সতর্কতা।
ইতালীয়রা অনেকটা ঢাকাইয়াদের মতো। আমোদপ্রিয়, আড্ডাবাজ, জোরে কথা বলে, হইচই করতে পছন্দ। মহিলারা তাদের ইতালীয় উচ্চারনে যখন জোরে কথা বলে, মনে হয় ভিন গ্রহে চলে এসেছি। জামর্ান এর চেয়ে ঢের ভালো। ইতালীয় উচ্চারন যদিও আমাদের বাংলা ভাষার মতো কোমল উচ্চারনের ভাষা তারপরেও কেন যেন আমার খুব ভালো লাগেনি। অস্ট্রিয়ায় গিয়ে জামার্ন ভাষার প্রেমে পড়েছি বরং।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

