somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাসস্ট্যান্ড অথবা একজন ছায়ামানবীর গল্প

২০ শে জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

এই মুহুর্তে আমার যেটা খুব প্রয়োজন তা হচ্ছে গায়ের জ্যাকেটটা খুলে ফেলা। শীতকাল বলে অভ্যেস মতই এই জিনিস গায়ে চড়িয়ে বের হয়েছিলাম। কিন্তু বাসের জন্য লাইনে দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই যেভাবে রোদ উঠল অসহ্য লাগছে এখন। এর উপর বাসের কোন খোঁজ নেই। আজ আবার অফিসে একটু তাড়াতাড়ি যেতে হবে। নতুন চাকরি, এখনই বসের গরম চোখ দেখার কোন মানে নেই! সাত -পাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন জ্যাকেটটা খোলার জন্য একটু ঘুরে দাঁড়ালাম, তখনই শুনলাম , "এক্সকিউজ মি, একটু যেতে দেন "। কথাটা কানে আসার সাথে সাথেই আমার ইচ্ছে হল "ওরে বাবারে , গেছিরে ", বলে বিকট এক চিৎকার দিতে! কেননা কেউ একজন তার হিল জুতা দিয়ে আমার পায়ের উপর কঠিন এক পাড়া দিয়েছে! কিন্তু অতি ভদ্রতার খাতিরে এই চিৎকার চেপে রেখে যখন মুখ তুলে তাকালাম, তখন দেখলাম এক জোড়া দুঃখিত চোখ! "আমি খুব স্যরি, আসলে লাইনের মাঝ দিয়ে যাওয়া আমার উচিত হয় নি "। "না, না ঠিক আছে। তবে হিল জুতার উচ্চতা আরেকটু কম হলে ভালো হয়!"। কথাটা বলে নিজেই হতবাক হয়ে গেলাম! মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে! নিশ্চই এখন কঠিন কিছু শুনতে হবে আমাকে। কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে হেসে উঠল মেয়েটা। "আপনি মজা করে কথা বলেন! " এর মধ্যে বাস চলে এসেছে। কোনমতে একটা হাসি দিয়ে লাইনের পিছু হাঁটা শুরু করলাম।


সপ্তাহে ছয়দিন এই লাইনে দাঁড়ানো আমার জন্য অপরিহার্য। সদ্য পাশ করে বেরিয়েছি । বাসার সামনের রাস্তা থেকে অফিসে যাওয়ার সবচেয়ে সহজ উপায় হচ্ছে এই বাস। কাজেই এ ছাড়া উপায় নেই। সি এন জির কথা ভাবতেও ভয় লাগে! পরদিন সকালে একটু দেরিই হয়ে গেল আমার বাস কাউন্টারে পৌঁছাতে। ভাগ্য ভালো, বাসটা এই মাত্র এলো। তাড়াহুড়ো করে টিকেট নিয়ে লাইনে দাঁড়াতেই চোখে পড়ল সামনের একরাশ কালো চুল! মনে মনে বললাম , " কে তুমি কেশবতী! " হায়, কিন্তু সেই কেশবতী বাসের পা দানিতে পা রাখতেই হেল্পার বলল, সিট শেষ! পরেরটায় আসেন! রাগে আমার তখন চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। "আরে মিয়া আমার দেরী হয়ে গেছে, একজন দাঁড়ায় গেলে মহাভারত অশুদ্ধ হবে না", এই কথা শেষ করার আগেই হেল্পার মিয়া মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে! ঠিক তখনই সামনে দেখলাম গতকালের চোখ দুটো! আচ্ছা, ইনিই সেই কেশবতী! "আপনার বোধ হয় খুব তাড়া, আপনি যান" । "আরে না, অসুবিধা নাই!আপনি আবার লাইনে দাঁড়াবেন নাকি। যান আপনি"। "আপনি তো অদ্ভুত লোক। যান । আমার সমস্যা নেই। " ড্রাইভার ততক্ষনে অস্থির! সুতরাং উঠে গেলাম আমি বাসে। বাসে উঠে মনে মনে হাসলাম, বেচারী আমার পায়ে পাড়া দেয়ার কথা মনে রেখেছে!

পর পর কয়েকদিন দেখলাম , মেয়েটা আর আমি প্রায় একই সময়ে লাইনে এসে দাঁড়াই। নিশ্চই আশেপাশে কোথাও থাকে। দিন তিনেক পর সাহস করে যখন পাশের সিটে বসলাম, তখন আমাকে অবাক করে দিয়ে বলে উঠল মেয়েটা, "কেমন আছেন?"। "ভালো, সেদিনের জন্য আপনাকে ধন্যবাদ, আমার অবাক লেগেছে যখন দেখলাম আপনি আমাকে মনে রেখেছেন! ", হাসতে হাসতেই জবাব এলো, "মনে রাখব না? আপনি তো আমাকে হিলের উচ্চতা কমানোর পরামর্শ দিলেন! ফ্রীতে অনেক উপদেশই পাওয়া যায়! কিন্তু অচেনা মানুষের কাছে এমন উপদেশ! " লজ্জায় রীতিমত নিজের উপর রাগ এসে গেল আমার! কি দরকার ছিল এভাবে পাশে সিটে বসার? "রেগে গেলেন নাকি? আমি কিন্তু মজা করছি! "। কিছুক্ষনের মধ্যেই জানা হয়ে গেল নাম, কে কোথায় থাকি, কি করি! জানলাম ও একটা প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়ছে। থাকে আমাদের কছেই,নতুন এসেছে । এই কারনেই এই প্রত্যহ দেখা!

এর পরের কিছুদিন কিভাবে গেল , কি হল আমি কিছু জানি না! যেই আমি ভার্সিটি লাইফে নিজের ব্যাচের মেয়েদের সাথেও লজ্জায় কখনো ঠিকভাবে কথা বলতে পারি নি , সেই আমি কিভাবে প্রিয়ন্তীর ফোন নম্বর চাইলাম্‌ , কথা বললাম! এখন আবার বসে আছি একটা রেস্টুরেন্ট এ! "কি ব্যাপার চুপ করে আছো কেন?" স্বভাবসুলভ মিটিমিটি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল ও। "দেখো একটা কথা বলা দরকার"। "বলে ফেলো"। "রাগ করো না যেন"। "তুমি দেখি বাচ্চাদের মত কথা বলছ ! " । "তোমাকে আমার ভালো লাগে, খুব! ", প্রায় মরিয়া হয়ে কথাগুলো বলে ফেললাম আমি! "কথাটা আরো আগে বললে কি খুব অসুবিধে হত?" , এই প্রথম প্রিয়ন্তীকে লজ্জা পেতে দেখলাম আমি!

ইশ, আজ তো প্রিয়ন্তীর পরীক্ষা, এখনো আসছে না কেন? লাইনে দাঁড়িয়ে অস্থির হয়ে ভাবছি আমি। কিছুক্ষন পরেই ওকে দেখলাম প্রায় দৌঁড়ে আসতে। দেরি হয়ে গেল না তোমার ? আমি জিজ্ঞাসা করলাম। "খুব বেশি না, এখন বাসে উঠলেই হবে"। "চলো তোমাকে সি এন জিতে দিয়ে আসি"। "কথা কম বলো তো। এখন তোমার কাছে এমনিতেই টাকা নেই। মাসের শেষ", ধমক খেলাম একটা! হায় , কি ভাগ্য! আজ আমি এসে দাঁড়াতেই সিট শেষ! ইচ্ছে ছিল ওর সাথে যাব, ওকে ভার্সিটি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে অফিসে যাব। হলো না! "তুমি আজ যাও! আমকে যেমন একদিন তুমি যেতে দিয়েছিলে!" "না, তোমার সাথে যাবো", বলল ও। "পাগল নাকি! তোমার দেরি হয়ে যাবে। যাও তো" , রীতিমত বকা দিয়েই বাসে উঠালাম ওকে। হেসে উঠ গেল ও।

পনের মিনিট পর যখন কাউণ্টারে দাঁড়িয়ে শুনলাম আগের বাসটা এক্সিডেন্ট করেছে , আমি জানি না কিভাবে ছুটে গিয়েছিলাম। মাথায় আঘাত পেয়েছিল ও । চব্বিশ ঘন্টা পর ডাক্তার যখন জানালো , ওর জ্ঞান আর কখনো ফিরবে না, আমি কথাটার মানে বুঝতে পারিনি। অনেকক্ষন শূন্য চোখে তাকিয়েছিলাম ডাক্তারের দিকে।


"ভাই এবার আমি যাই। আপনি তো লেখালেখি করেন, তাই আপনাকে বললাম কথাগুলো। একটা গল্প লিখবেন প্লিজ এটা নিয়ে? আটটা বেজে গেছে। আমাকে আবার বাসের লাইনে দাঁড়াতে হবে"। তাড়াহুড়ো করেই উঠে গেল ছেলেটা। নিস্তব্ধ হয়ে বসেছিলাম আমি। সকাল সাতটায় যখন আমাকে ঘুম থেকে তুলে ময়লা গেঞ্জি পরা উদভ্রান্ত চেহারার এই ছেলেটা কিছু কথা বলতে চাইলো, তখন ইচ্ছে হচ্ছিল ওর গালে একটা থাপ্পড় মারি। কিন্তু তার প্রবল আগ্রহের কারনেই বিরক্তি চেপে কথা শুনতে রাজি হয়েছিলাম। ছেলেটা চলে যেতেই আমার রুমে যে ছেলেটা কাজ করে ও এলো। " ভাইজান, ওই পাগলটা আপনার এখানে আইছিলো ক্যান"? বলল ও। "পাগল?", কিছুটা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করি আমি। "হ , হারাদিন ওই রাস্তার মোড়ের বাস কাউন্টারে দাঁড়ায় থাহে । হে কোথাও যায় না। খালি লাইনে দাঁড়ায় থাহে আর নিজের লগে কথা কয়। পুরাই পাগলা"।

মাস তিনেক পরে বাস কাউন্টার টার সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ঝুম বৃষ্টির মাঝে দেখলাম একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে। সবাই কাউন্টারের মাঝে দাঁড়ালেও ছেলেটা বাইরে দাঁড়িয়ে ভিজছে। হয়ত অপেক্ষা করছে ও, কোন ছায়ামানবীর জন্য।


সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই মে, ২০১২ ভোর ৬:৫৬
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

নূর হোসেন বা ডা. মিলনের যে দেশপ্রেম ও কৃতিত্ব, তার শতভাগের এক ভাগও কি হাদীর আছে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ভোর ৬:৩৭

নূর হোসেন বা ডা. মিলনের যে দেশপ্রেম ও কৃতিত্ব, তার শতভাগের এক ভাগও কি হাদীর আছে?
নূর হোসেন ও ডা. মিলনের দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং গণতন্ত্রের জন্য তাঁদের অবদান ইতিহাসে অমলিন হয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

পুলিশ বনাম জনগণ

লিখেছেন জীয়ন আমাঞ্জা, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৫৪

১.
বাংলা সিনেমা দিয়েই শুরু করি, নিরপরাধ ধরা প্রসঙ্গে সিনেমাতেই প্রথম অজুহাত হিসেবে বলা হয়, আগাছা নিরানোর সময় দুয়েকটা ভালো চারা তো কাটা পড়বেই! এই যে তার নমুনা! দশজন পতিতার সঙ্গে... ...বাকিটুকু পড়ুন

কমলাপুর টু নারায়ণগঞ্জ - ৩ : (ছবি ব্লগ)

লিখেছেন মরুভূমির জলদস্যু, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১:০৭




সময়টা ২০১৫ সালের ডিসেম্বর মাসের ৬ তারিখ।
উত্তর বাড্ডা থেকে রওনা হয়ে সকাল ১১টার দিকে পৌছাই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। উদ্দেশ্য রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে নারায়ণগঞ্জ পর্যন্ত যাবো

হাঁটা শুরু হবে কমলাপুর... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্যক্তিগত স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং মোরাল পুলিশিং বন্ধ করতে হবে

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



১.
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক ছেলে পুলিশের সাথে তর্কের জেরে পুলিশ তাকে পিটাইছে দেখলাম।

ছেলেটা যে আর্গুমেন্ট পুলিশের সাথে করছিলো তা খুবই ভ্যালিড। পুলিশই অন্যায়ভাবে তাকে নৈতিকতা শেখাইতে চাচ্ছিলো। অথচ পুলিশের কাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

এমপি সাহেবের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম!

লিখেছেন অপু তানভীর, ২৪ শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ রাত ১১:৩১


অনেক দিন আগে হুমায়ূন আহমেদের একটা নাটক দেখেছিলাম। সেখানে কোন এক গ্রামে একজন এমপি সাহেব যাবেন। এই জন্য সেখানে হুলস্থুল কান্ডকারখানা শুরু হয়ে যায়। নাটকে কতকিছুই না ঘটে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

×