নিরার প্রতি রাগ হওয়াটা মোটেও উচিত হয়নি।হঠাৎ করেই যেন সব কিছু হয়ে গেল।নিজের প্রতি খুব খারাপ লাগতেছে।
রাগ হওয়ার ও কারণ আছে । রাগ হব না কেন??
এত বড় একটা মেয়ে কিনা আলু ভর্তা করতে পারেনা।এটাতো বাচ্চারাও পারে। অবশ্য এতে ওর কোন দোষ নাই। ও আগেই বলছে ও এসব পারেনা।কিন্তু তবুও আলুভর্তা না পারার কি আছে।
আমি এখনো খাবার টেবিলেই বসে আছি।নিরা বাথরুমে , মনে হয় কাদতেছে।কান্নার কোন শব্দ নাই কারণ ট্যাপ ছাড়া। ট্যাপের শব্দে নিরার কান্নার শব্দ ঢাকা পড়তেছে।
আমার আর নিরার বিয়ে হইছে প্রায় চার মাস।কিছুটা লাভ ম্যারেজ আর কিছুটা এরেঞ্জ ম্যারেজ।বড়লোকের মেয়ে তাই রান্না বান্না পারেনা সাভাবীক ব্যাপার।একদিন আমি নিরাকে জিজ্ঞেস করলাম,
-রান্না বান্না কিছু পারো।
ও প্রশ্ন টা শুনে কিছুটা লজ্জা পেল আর লজ্জিত মুখেই বলল,
-না আসলে আমি কখনই রান্না ঘরে যাইনি।সরি।
-পারোনা ঠিক আছে। তোমাকে তো আর রান্না বান্না করার জন্য বিয়ে করতেছিনা,কাজের মেয়ে রাখব সেই এসব করবে।
কিন্তু বিয়ের পর এসে নিরা কাজের মেয়ে ছাড়াই দিল , সংসারে কাজের মেয়ে থাকুক এটা তার ভাল লাগেনা।নিজের সংসারের কাজ সে নিজ হাতেই করবে। আমি বললাম
-তাহলে খাব কি?রানা করবে কে?
নিরা বলল,
-কয়েক দিন একটু কষ্ট কর, হোটেল থেকে এনে খাব।তারপর ব্যাবস্থা হবে।
-কয়েক দিন মানে তারপর কি ব্যাবস্থা হবে ?
নিরা হাসতে হাসতে বলল,
-আমি রান্নার স্কুলে ভর্তি হইছি এক মাসে সব রান্না শেখায় দিবে।ভাল না।
-হুম ভাল।
যেখানে এক মাসে সব রান্না শেখানোর কথা ছিল , সেখানে আজ তিন মাস চলতেছে তবুও নিরা রান্না করতে পারল না। সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফিরতেছি তখন নিরার ফোন।আমি ফোন ধরে বললাম,
-হ্যালো।
-আসতেছ বাবু?
-হুম,,আজ কি খাবা?
-আজ কিছু আনিও না।
-কেন?
-আমি রান্না করতেছি।
আমি নিরার কথা শুনে আকাশ থেকে পরলাম।আমি বললাম,
-সত্যি রান্না করতেছ?
ফোনের ওপাশ থেকে নিরার হাসির শব্দ শুনলাম।হাসি থামিয়ে ও বলল,
-আরে বাবা সত্যি।আমি কি তোমাকে মিথ্যা বলব।
-আচ্ছা।রান্না কি শেষ?
-না হচ্ছে, তুমি আসতে আসতে হয় যাবে।
-ও আচ্ছা,,পারলে ভাতে আলু দিও।আলু ভরতা করিও।
-আচ্ছা,বাবু।আসো তাড়াতাড়ি।
আমি তো খুব খুশি নিরা রান্না করতেছে।অনেক দিন পর ভাল কিছু হয়ত খাওয়া হবে।হোটেলের খাবার আর ভাল লাগেনা।তবে ছুটির দিনে আমি কিছু রান্না করেছিলাম।মেসে থাকতে কিছু রান্না শিখেছিলাম যা বিবাহিত জীবনে অনেক কাজে লাগছে।এসবের জন্য নিরা আমার প্রতি অনেক খুশি।
বাসায় এসে ফ্রেশ হয়ে,, খাবার টেবিলে বসতেই মাথাটা চক্কর দিল,টেবিল পুরাই ফাকা। এক গামলা ভাত এক সাইডে আর অন্য পাশে একটা ছোট বাটি ঢাকনা দেওয়া।
আমি নিরার দিকে তাকিয়ে বললাম,
-যাও খাবার নিয়া আসো।খুব ক্ষুদা লাগছে।
নিরার মুখ এতক্ষন ফ্যাকাশে ছিল, কথাটা শুনে আরো ফ্যাকাশে হয়ে গেল।ও নিচের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগল,
-আসলে বাবু সব কিছু নষ্ট হয়ে গেছে।
আমার নিরার কথাটা শুনে কেন জানি হাসি পেল।আমি হাসতে হাসতেই বললাম,
-কিভাবে।
-মানে সব উল্টাপাল্টা হয়ে গেছে।
-বাদ দাও।ওই বাটিতে কি?
-আলুভরতা ।
-আচ্ছা,তাই দাও।তাই দিয়ে খাই।
নিরা আমাকে বাটিটা এগিয়ে দিতে কেমন জানি সংকোচ করতেছে।তাই আমি নিজেই বাটিটা আমার দিকে টানলাম। ঢাকনা টা সরায়া দেখি, শুধু আলু মেখে রাখছে।পিয়াজ, তেল মরিচ, কিছুই নাই।
আমি নিরার দিকে তাকিয়ে দেখলাম,ওর অবস্থা খুব খারাপ।
আমি বললাম,
-এটা কি?
-আলুভর্তা
-এটা আলুভর্তা,, কই শিখছ?
-জানিনা।
-এত বড় হইছ এখনো আলু ভর্তা করতে পারোনা। সারাজীবন শুধু শপিং করে বেড়াইছ।
নিরা কোন জবাব দিল না,আমি ওর দিকে তাকায়া দেখি ওর চোখে পানি। আমার কেমন জানি অসহ্য লাগতেছিল,,তাই আমি বললাম,
-কাদিও না তো।কোন কিছু তো পারোনা শুধু কান্না করাই শিখছ মনে হয়।
নিরা আমার সামন থেকে চলে গেল,গিয়ে বাথরুমে ঢুকল।ঘটনা ঘটার পাচ মিনিট অতিবাহিত হয়েছে,,এখনো ও দরজা খুলে নাই।আমার কিছু করা দরকার।
আমি টেবিল থেকে উঠে বাথরুমের দরজার সামনে গিয়ে দাড়ালাম আর বললাম,
-বের হও।চলো বাইরের কোন রেস্টুরেন্ট এ গিয়ে খেয়ে আসি।
কোন জবাব নাই।আমি আবার বললাম,
-কথা বলনা,,আর রাগ করে থাকিও না।বের হও তাড়াতাড়ি।খুব ক্ষুধা লাগছে।
এবার নিরা মুখ খুলল আর বলল,
-যাও এখান থেকে।তোমার সাথে কথা বলতে ভাল লাগতেছেনা।আমি কালকেই বাবার বাড়ি চলে যাব।আর আসবোনা কোন দিন।
খুব মুশকিল হল তো,কিভাবে বের করি ওকে।একটা উপায় আছে।বাড়ির মেইন সুইচ অফ করে দেখি যদি ও বের হয়।কারণ নিরা অন্ধকার ভয় পায়। তার আগে আমাকে দুটা ডিম ভেজে নিতে হবে।
ডিম ভাজা শেষ,আমি বাড়ির মেইন সুইচ অফ করে দিলাম। প্রায় পাচ মিনিট হয়ে গেল মেইন সুইচ পফ করার।তবুও নিরা বের হল না।কি যে করি কিছুই মাথায় আসতেছেনা।
আমি বাথরুমের সামনে গিয়ে বললাম,
-নিরা মরিচ কাটতে গিয়ে হাত কেটে গেছে।ডিসেপ্টিং বক্স টা কই রাখছ?
সাথে সাথেই বাথরুমের গেট টা খুলে গেল।যা চাচ্ছিলাম তাই হল।নিরা বের হয়ে এসে বলল,
-কই দেখি।কতদূর কাটছ?
-এই অন্ধকারে কিভাবে দেখবা কতদূর কাটছে। চল ডাইনিং রুমে চল।
নিরা ডাইনিং রুমে ঢুকে অবাক হল,কঠিন রকম অবাক।যা বিয়ের পর ও কোন দিন হয়নি।আমি প্রায় ১৫ টা মোমবাতি সারা ঘরে জালিয়ে রাখছি আর খাবার টেবিলে ৫ টা। নিরা আমার দিকে রাগ হয়েই বলল,
-তাহলে ঢং করলা এতক্ষন।
-হুম,চল ক্যান্ডেল লাইট ডিনার করি।
নিরা আমার কথা শুনে হাসল।আমি ওর হাত ধরে এনে খাবার টেবিলের চেয়ারে বসালাম।আমি ওর মুখোমুখি চেয়ারে বসালাম।
আমি বললাম,
-সময় কম তাই খাবারের আইটেম দুইটা।
ডিম ভাজি সামনে থাকার কারণে নিরা শুধু ডিম ভাজি দেখেছিল।ও জিজ্ঞেস করল,
-আর কি আইটেম ? এখানে তো একটাই !
আমি ওই ভরতার বাটিটা বের করে টেবিলে রেখে বললাম,
-এই যে আরেকটা আইটেম।
আমার স্ত্রী আমার জন্য এই প্রথম রান্না করছে সেটা যেমনই হোক আমার জন্য অবশ্যই ভাল।
নিরা আমার কথা শুনে হাসল,শুধু হাসলই বললনা কিছুই।
-নাহিদ পারভেজ নয়ন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





