সন্ধাবেলা। যথারীতি অফিস থেকে ফিরছি। রিক্সায় বসে সারাদিনের ক্লান্তিতে ঝিমুচ্ছি। এমন সময় পাশ থেকে শুনলাম "কুমির তোর জলে নেমেছি"। চকিতে ক্লান্তি কেটে গেল। ঘুরে দেখলাম কয়েকজন দেবশিশু ফুটপাথে খেলা করছে।
হঠাৎ অনেকগুলো পুরোনো স্মৃতি এসে ভর করল।
যখন খুব ছোট ছিলাম তখন এ খেলাটি খেলেছিলাম। যে সময়ের কথা বলছি তা আশির গোড়ার দিকের। খেলার নিয়মনীতি কিছুই মনে নেই। শুধু মনে আছে আমরা ভাইবোনেরা একটা খাটের উপর থাকতাম আর ফ্লোরে একজন থাকত। আমরা একজন একজন করে খাট থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামতাম আর বলতাম "কুমির তোর জলে নেমেছি"।
সে সময় আরেকটা খেলা খেলতাম... "ফুল টোক্কা"। যারা জানেন তারা হয়ত অনেকেই মিটিমিটি করে হাসছেন... আরে এটা তো মেয়েদের খেলা !! তখন আমার বয়স এতই কম ছিল যে খেলা গুলোকে মেয়ে - ছেলে বলে আলাদা করার বোধও ছিল না। তাই সেসময় কুতকুত খেলেছি, পুতুল ও খেলেছি। পুতুলের বিয়ে নিয়ে কাজিনের সাথে মারামারিও করেছি। তবে সবচেয়ে বেশি ঝগড়া হত লুডু খেলা নিয়ে। আমি আবার চুরি বিদ্যায় বিশেষ এক্সপার্ট ছিলাম।
আরেকটু বড় হওয়ার পর ছোয়ছুয়ি, বরফ-পানি, টিলো-এক্সপ্রেস খেলতাম খুব। এর মাঝে টিলো-এক্সপ্রেস খুব পছন্দের ছিল। ঘরের নানা জায়গায় লুকিয়ে থাকতাম। এমনকি চাল রাখার ড্রামেও
এসময় কাগজ দিয়ে খেলতাম "চোর-ডাকাত-পুলিশ-বাবু" আর "রাম-সাম-যদু-মধু"
একটু বয়স বাড়ার পর কিছুদিন মার্বেল খেলেছিলাম। মা তখন খুব বকা দিয়েছিল। এগুলো বস্তির খেলা আরো কতকি...
খুব ক্ষোভ জন্মেছিল তখন। খেলার মাঝে বস্তি এলো কিভাবে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। তবে এটা সত্যি যে খেলা গুলো আমি বস্তির কিছু ছেলেদের কাছ থেকেই শিখেছিলাম আর খেলতাম ও তাদেরই সাথে
এরপর লাঠিম খেলা শুরু করলাম। নানা ধরনের লাঠিম ছিল। সেগুলোর নানা রকম নামও ছিল যার কিছুই মনে নেই। কেবল মনে আছে তিনটা লাঠিম আমার খুব প্রিয় ছিল। একটা ছিল খুব ছোট। আরেকটা ছিল একটু বড় কিন্তু লম্বা আল ছিল। আরেকটা হচ্ছে পেট মোটা একটা লাঠিম। এবার লাঠিম নিয়েও মা ইচ্ছেমত বকলেন অনেক বস্তিদের খেলা বলে। সেবার আমিও রাগ করলাম। বল্লাম খেলা তো খেলাই... তার আবার বস্তি কি? কারো তো ক্ষতি করছিনা। মা কি বুঝলনে জানিনা... কিন্তু খেলা নিয়ে অন্তত আর কখনো বকেননি।
সেসময় একদিন ছাদে বসে ঘুড়ি ওড়ানো দেখছিলাম। খুব মন খারাপ হচ্ছিল আমার ঘুড়ি নেই বলে। সন্ধায় মাকে বললাম সুতো দিতে। কাল বিকেলে ঘুড়ি ওড়াবো।
পরদিন বাবা দেখি একটা ছোট সাইজের নাটাই নিয়ে এসেছেন আর দুইটা ঘুড়ি। আমি খুশিতে লাফ দিয়েছিলাম সেদিন। আমি আর বাবা সেই ঘুড়ির ইয়া বড় লেজ লাগালাম। তারপর দুজন মিলে ওড়ালাম জীবনের প্রথম ঘুড়ি। যখন ওড়ানোয় একটু পক্ক হয়ে গেলাম তখন মাঞ্জা দেওয়ার পালা শুরু হল। কি একটা যেনো কনডেন্সমিল্ক এর কৌটায় গরম করে আঠা বানিয়ে তাতে নষ্ট হয়ে যাওয়া বাল্বকে গুড়ো করে মিশিয়ে দিতাম। তারপর সুতোয় সেই আঠা লাগিয়ে শুকিয়ে মাঞ্জা কর্ম শেষ হত। আহ! কি দিন ছিল সে সময়....
সে সময় সাতচারা, বোম বাষ্টিং খেলাটাও খুব পছন্দের ছিল। আর বাসায় বাবার সাথে কেরাম বোর্ড আর বাগাডুলি খেলতাম।
যখন ৬ষ্ট কিংবা ৭ম শ্রেনীতে পড়ি তখন মনে হয় ফুটবল আর ক্রিকেট খেলা শুরু করলাম। কারন আমি খুবই শুকনা পটকা ছিলাম। সে সময় অন্তত ধাক্কা ধাক্কিতে পড়ে যাওয়ার ভয় টা কমে গিয়েছিল।
তাশ আর দাবা খেলার হাতে খড়ি করিয়েছিলেন বাবা। বাবা খুবই তাশ খেলতে পছন্দ করতেন। শুক্রবার এলেই বাবা আর কাজিনরা মিলে ২৯ খেলত। আমি পাশে বসে বসে দেখতাম। এভাবেই একসময় আমিও ২৯ এর পার্টনার হয়ে যাই। বাবা খুবই ভাল খেলতেন আর খুবই ভাল বকতেন যদি ভুল হয়ে যেতো। ইউনিভার্সিটির পুরো সময় আইবিএ কেন্টিনে তাশ খেলেই কাটিয়েছিলাম। এমনকি বাসায় বন্ধরা এলে বাবাও বসে যেতো আমাদের সাথে।
কাবাডি আর হাডুডু খেলেছি গ্রামে গিয়ে। ঢাকায় এ খেলাটা খুব একটা খেলা হত না। পরীক্ষা শেষ হলে ডিসেম্বরে যখন গ্রামে যেতাম সে সময়টা খুব মজা হত। তখন ধান কাটা শেষ হয়ে যেত। মাঠের মাঝে খড়ের বিশাল একটা স্তুপ করা হত। তার মাঝে মিষ্টি আলু দিয়ে পুরো খড়টা জ্বালিয়ে দিত। এটা একটা উৎসবের মত ছিল। আমরা অনেক রাত পর্যন্ত জেগে মিষ্টি আলু খেতাম আর সেই আগুনের তাপ নিতাম।
আমি জানি এ লেখা পড়ে অনেকেই প্রথম দিকে বলা খেলাগুলোর নামই শুনেননি। খুব দুঃখও হয় এখনকার প্রজন্মের জন্য। খেলার জন্য না আছে জায়গা না আছে মানুষিকতা। খেলাগুলো অত্যাধুনিক হয়ে চলে এসেছে কম্পিউটারের স্ক্রীনে।
কিন্তু আজো এই স্মৃতিগুলো খুব নষ্টালজিক করে দেয়। জানি কখনো ফিরে পাবোনা, কখনো ফিরে যাওয়াও যাবে না। ছেলে বেলার ছেলে খেলা গুলো কেবল স্মৃতিই হয়ে থাকবে। আর এই স্মৃতিগুলো রোমন্থন করে এখনো মনে মনে হাসি, এক ধরনের ভাল লাগা ছেয়ে যায় সাথে কিছুটা বিষাদও।
ছেলেবেলাটা কেন এত বর্নিল হয়? জীবনের এতটা পথ পাড়ি দিয়েও সেই সময়ের সাথে তুলনীয় কিছুই পাইনা।
হয়ত একদিন পুটুশ করে মরে যাব কিন্তু আমার এই অমূল্য স্মৃতিগুলো যেনো আমৃত্যু আমার স্মৃতিতে সজীব থাকে।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা ফেব্রুয়ারি, ২০১১ সন্ধ্যা ৬:০৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


