somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্যাচেলর'স ডায়েরী - ১

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

খাবার মুখে তুলতইে এক অদ্ভুত অনুভূতি হল। এমন মুখরোচক খাদ্য বহুদিন খাইনি। মুখরোচকই বটে। ডাল নিয়ে মনে হল সমুদ্রের জলে হাবুডুবু খাচ্ছি। লবনে লবনে টইটুম্বুর। কোনটা ঝালের জন্য মুখে তোলা যায়না, কোনটায় লবন বেশি, আর তেল তো মনে হয় আজকাল পানির দরে বিকছে।

ঝা ঝা করে মাথায় রাগ চেপে গেল। সারাদিন অফিস সেরে ক্লান্ত- শ্রান্ত মন আর বুভুক্ষের মত ক্ষিধা নিয়ে খেতে বসে যদি এই গোখাদ্য গলধঃকরন করতে হয় তবে কার না রাগ চাপে। যে ভয়ে সংসার করতে চাইনা সেই দাম্পত্য কলহের উপাদান যদি এই ভাবে প্রতিনিয়ত আমার চারপাশে ছড়িয়ে থাকে তখন জীবনটাকে আরো দূর্বিষহ মনে হয়।

ক্ষিধাও লেগেছিল খুব। সুতরাং গোখাদ্যই হোউক আর কুখাদ্যই হোউক আপাততঃ এই খেতে হবে। কি আর করা। একেকবার খাওয়া মুখে তুলি আর মনে মনে বলি ভাগ্যিস এসময় কেউই সামনে ছিলনা। থাকলে আমার মুখোঃছবি মোটেই কোন অবস্থাতেই মনোরম হতো না। এত খিদা নিয়েও যে খাদ্য মুখে সইছে না তা ভরা পেটে কতখানি বিস্বাদ লাগত তা ভাবতেই মুখ আরো তেতো হয়ে যাচ্ছিল।

কোন মতে খাওয়া শেষ করলাম।

তবে যতই গালমন্দ করিনা কেন খাওয়ার পর শরীরে কিছুমাত্রায় হলেও যে বল ফিরে পেয়েছি তা বেশ বুঝতে পারলাম নিজের গলার স্বর আর রাগের পরিমানটা বুঝে। খাবার আগেও রাগটা ছিল অসহায়ত্বের মত। চার্লি চ্যাপলিন এর সমস্ত কিছু হারিয়ে গেলে যেমন নিজের উপর রাগ হত আমার রাগটাও ছিল তেমন। আর এখন রাগটা হচ্ছে বুশের মত। নিজের দোষ দেখার সময় নাই। আগে অন্যের উপর এক হাত নেব তারপর বাদবাকি যা হবার হবে।

যেমন ভাবনা তেমন কাজ। ঘর থেকে বেরুলেই মমিনের দোকান। এই পাচকীর সন্ধানদাতা সেইই। সুতরাং প্রথম কোপটা তার ধ্বরেই পড়া উচিত।

বেশ আয়েশি ভঙ্গিতে সিগারেট ধরিয়ে হাঁক দিলাম তার নাম ধরে। সে আসল বিনম্র ভাবে এক বোতল ঠান্ডা পানি নিয়ে (প্রতিবার রাতে খাবার পর মমিন ফ্রিজ থেকে এক বোতল ঠান্ডা পানি এনে দেয় আমাকে নিয়মিত ভাবেই)।

গলায় গাম্ভির্জ এনে বললাম, ‘বস, তোমার সাথে কিছু কথা আছে’। মমিন গলার স্বরেই বুঝল কোথাও একটা সমস্যা হয়েছে, সে ইতস্তত করে বসল।

বললাম, তুমি যে নতুন বুয়াকে এনে দিলে আমাকে সে কি তোমার পরিচিত...? হঠাৎই গলাটা চড়ে গেল আমার।

কেন ভাই..? কোন সমস্যা হয়েছে? মমিন একটু ভয় পেয়ে গেল যেন।

সমস্যা মানে! সে তো কোন কাজই ঠিকমত করতে পারেনা। ঘরের অন্যান্ন কাজ তো দূরের কথা রান্নাটাও তার ধাতে সয়না। আগের বুয়াতো কিছু বুঝে ওঠার আগেই ঝটপট সব শেষ করে ফেলত আর এর তো দেখাই পাইনা কখনো। আসে সূর্য ওঠার আগে, ঘুম ভাঙ্গার আগেই হাওয়া। তারপর যে পদার্থ খেতে দেয় সেটা আর কি বলব তোমাকে। তুমি কি বুঝে আমার জন্য এমন জঘন্য একটা বুয়া দিলে। এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বললাম।

মোমিন একটু অসহায় হয়ে পড়ল আমার কথায়। বলল, ভাই, আমি আসলে এতসব বুঝতে পারিনি। এই মহিলা আমার মায়ের কেমন যেন পরিচিত। আপনার বুয়ার কথা বলাতেই, মা এই বুয়া দিল। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি দেখি কি করা যায়। অপরাধীর ভঙ্গিতে মমিন উত্তর দিল।

দেখা দেরি আবার কি...! কালই তুমি এইটার সুরাহা করবে। রাগতঃ স্বরে বলে গট গট করে বাসায় ফিরে আসলাম। যাক! মন একটু হলেও শান্তি পেয়েছে মমিন কে বকে। কাল বুয়াকে কি বলব সেটা নিয়ে ভাবতে ভাবতে বেশ পুলক জাগছিল মনে।

সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলাম রাস্তায় হাটু অব্দি পানি জমে আছে। বুঝলাম অনেকক্ষন থেকেই বৃষ্টি হচ্ছে। গতকদিন ধরে খুব অনিদ্রা হয়েছিল গরমের জন্য। বৃষ্টি হওয়াতে ঠান্ডা ঠান্ডা লাগছিল বোধকরি তাইই হয়ত আর ঘুম ভাঙ্গেনি সময়মত। একটু বিরক্তি লাগল নিজের ওপর। বৃষ্টির জন্য বুয়ার দেখাও পেলাম না আজ।

হাত মুখ ধুয়ে অভ্যাসবসতঃ টেবিলের কাছে গিয়ে দেখি রান্না করা আছে। খুব অবাক হলাম। এই মুশুলধারের বৃষ্টির মাঝেও বুয়া এলো কি করে! মনটা একটু নরমও হয়ে গেল। অবশ্য খুব একটা পাত্তা দিলাম না নরম মনকে, কারন সকাল বেলা সকলের মনই কম বেশি দ্রবীভূত অবস্থায় থাকে।

আবারো সেই কুৎসিৎ খাওয়া। রুটি ডিম সবই কাঁচা কাঁচা। যথারীতি রাগটা চড়ে যাওয়ার জন্য যথেষ্ট বাতাস পেল। তক্কে তক্কে থাকলাম সারাদিন।

অন্যদিন এর চেয়ে দ্রুতই অফিস থেকে বাসায় ফিরে এলাম কেবল মাত্র বুয়া বিহিত করবো বলে। সন্ধ্যায় আসল সেই মহেন্দ্রক্ষন।

তখন শুয়ে শুয়ে বনফুল এর একটি বই পড়ছিলাম। হঠাৎ দরজা খোলার শব্দ শুনে তড়াক করে উঠে বসলাম। বুয়াই নিশ্চয়ই। তাকিয়ে দেখি কালো বোরখা পড়া একজন মহিলা আসলেন। নেকাব ওঠানোর পর যাকে দেখলাম তিনি আর যাই হন না কেন, প্রথম দর্শনে বুয়া হিসেবে মেনে নিতে বেশ সংকোচই হল। ধপধপে ফরসা একজন পঞ্চাশোর্ধ মহিলা।

ভুরু কুচকে বোঝার চেষ্টা করলাম উনি কে? দেখলাম একটু সংকোচে রান্না ঘরে ঢুকলো। মুহুর্তেই ক্ষীনকালের সুখোনুভুতি হারিয়ে গেল। চুপ করে বসে রইলাম।

উনি রান্না করলেন, এটো বাসন পত্র পরিস্কার করলেন। দেখতে দেখতে রাত হয়ে গেল। এবার তার যাবার পালা।

বের হতে যাবেন এমন সময় বললাম, ‘বসুন, আপনার সাথে কথা আসে। গলার স্বর খুব স্বাভাবিক ভাবেই উঁচু হয়ে গেল। বৃদ্ধা যেন একটু কুচকে গেল।

“আপনি প্রতিদিন কি সব ছাইপাস রান্না করেন একদিন ও মুখে দিতে পারিনা। আপনার চেয়ে আমি ঢের ভালো রাঁধতে পারি। আর বাসার অন্যান্য কোন কাজও তো আপনি করতে পারেন না। না কাপড় ধুতে পারেন, না ঘর মুছেন, আপনিই বলেন আপনাকে আমি মাসে মাসে কোন মনোঃচিত্তে মাইনে দিয়ে যাব? এক নাগাড়ে কথা গুলো শেষ করলাম।

উনি যেন কিছুটা আহত, অনেক খানি অপমানিত বোধ করলেন। মুখে কিছুই বললেন না। চুপাচাপ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। আনমনে এক হাত দিয়ে আরেকহাত মুঠোর মধ্যে নিয়ে খুটতে লাগলেন। আমি উত্তরের অপেক্ষায় আছি আর উনি যেন এক ভয়ঙকর দুঃস্বপ্নের মাঝ দিয়ে যাচ্ছেন এমন একটি ভাব নিয়ে দাড়িয়ে আছেন। মনে মনে রাগ আরো চেপে গেল। নাটক হচ্ছে আমার সামনে, এত দুঃখি দুঃখি ভাব নিচ্ছে যেন আমার মন গলে। উহু, তা হবেনা।

আমার সংযমে বাধ ভাংলো। কি ব্যাপার উত্তর দিচ্ছেন না কেন?

তাহলে মামা, আমি কাল থেকে আর আসব না। খুব অস্ফুট কন্ঠে বলল বৃদ্ধা।

আমার কথাটায় একটু ধাক্কা খেলাম। এটা আমার কাঙক্ষিত উত্তর ছিলনা। আমার ধারনা ছিল উনি বলবেন মামা, কাল থেকে ঠিক মত রান্না করব, কিংবা এরকম আর হবেনা, কিংবা কোন তুচ্ছ যুক্তি দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের চেষ্টা করবেন। তা না করে এভাবে কাজ ছেড়ে দেবার কথা বলবেন তা কল্পনাতেও আসেনি। এটা ঢাকা নয়, এখানে কাজের বড় অভাব এখানে।

মনের মধ্যে খটকা লাগলো। কোথায় যেনো একটা সমস্যা আছে।

খানিক একদৃষ্টিতে চেয়ে থাকলাম। মুখের ভাব আগের মতই কঠোর। বসতে বললাম। কিন্তু' উনি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলেন। আমি কেন যেন একটু অসহিসনু হয়ে গেলাম। অপরাধীকে মানুষ ম্রিয়মান দেখতে ভালবাসে। একসাথে ভালবাসে তার আত্মপীড়িন দেখতে, অপরাধবোধে জর্জরিত এ মুখোচ্ছবি কাম্য আমাদের কাছে। এ সবই তার মাঝে দেখছি কিন্তু কেমন যেন অন্যভাবে। আমার সাধারন দর্শনের সাথে মিলছিল না।

রাগটা একটু পড়ে এলো। একটু নিঃস্বাস ফেলে জিজ্ঞাস করলাম, ‘আপনি কত বছর ধরে রান্না করেন’। কথাটা যেনো একটা অবান্তর প্রশ্ন ঠিক এমন ভাবেই উনি এড়িয়ে গেল উত্তর না দিয়ে। আমার যেন অহমে গিয়ে ঠেকল এই অবাধ্যতা।

কিছু না বলে একটা ক্রুর দৃষ্টি দিয়ে তাকে বধ করতে চাইলাম। কিন্তু উনি এমনভাবে উপেক্ষা করলেন তা যেনো আমি একটা ছোট বাচ্চা।

আমি একটু যেনো অস্থির হয়ে গেলাম। বেশ গম্ভির স্বরে টেনে টেনে বললাম, ‘আপনার কে আছে এখানে?’। এই প্রথম বারের মত তার চোখে যেনো একটা দিশেহারা ভাব দেখলাম। সেই আনতঃ নয়নেই বললেন, ‘কেউ নেই, আমিই আছি’।

এবার আমার রাগটা কেন জানি এবার ঝট করে পড়ে গেল। আমার ক্ষেত্রে এটা অবশ্য বরাবরই তাই হয়।

বললাম, ‘আপনার ছেলে মেয়ে?’

বললেন,‘কেউ নেই। বছর দেড়েক আগে সন্ত্রসীরা কুপিয়ে মেরে ফেলেছে শিহাব এর বাবা কে। আর শিহাব কোথায় আছে এখনও জানিনা। কেউ বলে শিহাবে কে মেরে গড়াই নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছে, কেউ বলে গুম করে রেখেছে, জানিনা মামা কোথায় আছে, শুধু মনে মনে দোয়া করি যেনো সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকে। এ জীবনে আমার সাথে আর দেখা না হলেও যেনো শিহাব বেঁচে থাকে।’ বলতে বলতে আঁচল দিয়ে একটু চোখ মুছলেন। (শিহাব ওনার একমাত্র সন্তান)

বড় শক্ত ধাতুতে গড়া উনি। অন্যকেউ হলে হয়ত এতক্ষনে হাউমাউ করে কাঁদতো। কিন্তু কেবল মাত্র গলার স্বরে যে প্রচন্ড বেদনার দেখা আমি পেয়েছি সেটাও ঠিক বর্ননায় আনা যায় না।

আমি যথা সম্ভব গলার স্বর স্বাভাবিক রেখে আবার জিজ্ঞাস করলাম, কেন আপনার স্বামী - সন্তানকে সন্ত্রাসীরা মেরে ফেলেছে ?

ভঙ্গিমায় যতখানি না জানার ইচ্ছে ছিল তার চেয়ে বরং সন্দেহর পরিমানটাই বেশি ছিল। কারন জানিনা কেন জানি আজকাল মানুষকে একদম বিশ্বাস করতে পারিনা। একদম না। ঠকতে ঠকতে এখন বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয়। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, মানুষের উপর বিশ্বাস হারোনো পাপ। আমি সেই পাপী এখন।

উনি আমার সকল ভঙ্গিমাকে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে উডিয়ে দিয়ে বললেন,‘আমার স্বামী ছিলেন একসময় এখানকার নামকরা পাটের ব্যাবসায়ী। মনোহর পুর জমিদার বাড়ির ছেলে উনি। (মনোহর পুর কুষ্টিয়া শহর থেকে ৮-১০ কি:মি: দূরে)। ওনারা ছিলেন ২ ভাই। শিহাবের বাবাই মূলত ব্যাবসা দেখাশোনা করতেন আর দাদা মানে আমার দেবর শহরে পড়াশোনা করতো।

আমি খুব উৎসুক হয়ে শুনতে লাগলাম। জিজ্ঞাস করলাম, ’তারপর’। ওনাকেও যেন কথায় পেয়ে বসেছে।

বললেন, এখানকার মোহিনী মিল এর পাটের বড় চালানই দিতেন শিহাবের বাবা। যেসময় পাটের ব্যাবসায় ভাটা পড়ল তখন থেকেই শুরু হল সমস্যা। কারন তখনও আমাদের ব্যাবসাটা ভালোই চলছিল। এটা সহ্য হলনা অন্যান্য ব্যবসায়ীদের। বছর চারেক আগে একরাতে আর বাসায় ফিরলেন না। লাশ পেলাম তিনদিন পরে গড়াই নদীতে। এটুকু বলে উনি থামলেন।

আমি আবার জিজ্ঞাস করলাম, তারপর?

"শিহাব তখন ঢাকায় পড়াশোনা করছে আমার দেবরের বাসায় থেকে” বলে আবার শুরু করলেন উনি। শিহাব এসে ব্যবসাটা শুরু করার চেষ্টা করল। কিন্তু পারলনা। কেস চালাতে গিয়ে জমিজমা যা ছিল একে একে প্রায় সবই বেচতে হল। এ নিয়ে দেবরের সাথেও সম্পর্ক খারাপ হল আমাদের। আসামিদের কেউ কেউ ধরা পড়ল, আর অনেকেই ধরা পড়ল না। হুমকি ধামকি দিত সারাক্ষন। আমি ভয়ে কাঠ হয়ে থাকতাম সারাক্ষন। শিহাবকে বলতাম বাদ দে, যা হওয়ার হয়েছে। আমার সব বেঁচে দিয়ে অন্য কোথাও চলে যাই। শেষপর্যন্ত শিহাব চলে গেল, অমাাকে রেখে।" বলে ফ্লোরে পায়ের আঙ্গুল দিয়ে খুটতে লাগলেন।

’বুঝলাম না ঠিক, ছেলে আপনাকে রেখে চলে গেল?’ বললাম আমি।

একটা দীর্ঘম্বাস ফেলে বললেন, ‘এখানকার চরমপন্থীদের কথা তো জানে সবাই। একদিন দুপুর বেলা তখন আমরা মায়ে ছেলে বসে গল্প করছিলাম। তখন হুন্ডা নিয়ে আট নয় জন লোক আসল। কোন কথা না বলেই ঘরে ঢুকে শিহাব কে রড দিয়ে পেটাতে লাগল। আর বলতে লাগল, "ভাইয়ের নামে মামলা করেছিস..... ভাই এবার তোর মামলার রায় দিয়েছে"। বলেই ওকে পেটাতে লাগল, শিহাব চিৎকার করতে লাগল। আমি ভয়েই অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

জ্ঞান ফিরে টের পাই সরা শরীরে ব্যাথা। আমার বা হাতটা ভাঙ্গা। (দেখলাম বা হাতের দুুই টা আঙ্গুল খুব বাজে ভাবে বেঁকিয়ে আছে। বুঝলাম চিকিৎসার অভাবে ঠিকমত জোড়াও লাগেনি।) উঠে দাঁড়াতেও পারছিলাম না। বুঝলাম সন্ত্রাসীরা আমাকেও খুব মেরেছে। হামাগুড়ি দিয়ে শিহাবকে খুজতে লাগলাম ঘরময়। সবকিছু তছনছ করা। কিন্তু শিহাব কে কোথাও পেলামনা। তখন প্রায় রাত হয় হয়। আমার কোন প্রতিবেশীও আসল না সেদিন। দুই দিন এভাবে পড়ে ছিলাম। শুধু কেদেছি আর বলেছি আল্লাহ, আমার শিহবাকে এনে দেও, আর কিচ্ছু চাই না আমি।

কেউই আসেনি। একদিন কষ্ট করে উঠে হাসপাতালে গেলাম। আমার দেবর ও আসলনা একবারের জন্য দেখতে। কাউকে দোষ ও দেইনা। সে সময় অবস্থাই ছিল এমন ই। কেউ আমাকে জায়গা দিতে চাইল না ভয়ে। না শহরে না গ্রামে।

’এখন কোথায় থাকেন ?’ আমার তখন খুব খারাপ লাগছিল ওনার জন্য।

নিজেদের বাড়িতেই। সব কিছু ভেঙ্গে আছে। কারেন্ট এর লাইন ও নাই। বিল দিব কিভাবে। আমার তো আর উপার্জন করার কিছু নাই। তাই বাসায় বাসায় কাজ করে ফিরি। শুধু আপনাদের মত বিদেশি লোকদের বাসায় কাজ করি যাতে কেউ না চিনে। কেউ যেন না বলে মনোহরপুরের জমিদারের বউ বাসায় ঝি গিরি করে। তাই ভোর হবার আগেই সবার সকাল আর দুপুরের খাওয়া করে দিয়ে যাই আর রাতের টা সন্ধ্যে নামলে করি।

মামা, জীবনে কখনো নিজের ঘরের চুলার কাছে যাইনি। কপালের এমনই লিখন যে এখন বাকী জীবনটা অন্যের চুলায় রান্না করে কাটাতে হবে।

আর আপনার দেবর?

একবার এসেছিল, তার ভাগের সব বেঁচে চলে গিয়েছে। যাবার সময় ২০০ টাকা হাতে দিয়ে বললো, " তোমার সাথে আমাদের সম্পর্ক দাদাকে দিয়ে। দাদাও নেই, শিহাব ও নেই। তুমি আর খামোখা আমার সাথে সম্পর্ক টানতে যেওনা"। আমি সেই ২০০ টাকা পরে ফেরৎ পাঠিয়ে দিয়েছি মানি ওর্ডার করে। মেয়েদের আসলে আপন বলতে কিছুই নাই। কখনো বাবার বাড়ী, কখনো স্বামীর বাড়ি। নিজের বাড়ি বলতে একটাই আছে - হয় কবর না হয় শস্শান। আমাদের নিজের বলতে কিছুই নাই।

বাবার বাড়ির সাথে কোন যোগাযোগ নেই? জানতে চাইলাম খুব হেলাচ্ছলে। কারন তখন আর কিছু শুনতে ইচ্ছে করছিল না। বিষাদে মনটা পুরো ছেয়ে আছে।

নাহ্। একমাত্র মেয়ে ছিলাম। ঐ সংসারে কেউই আর বেঁচে নেই। যারা আছে তাদের কাছে গিয়ে উপদ্রপ হতে চাইনা। (বুঝলাম জমিদারী রক্তের আত্মমর্যাদাটা রয়ে গেছে এখনো।)

তাছড়া এখনো আসায় থাকি.... যদি শিহাব কখনো ফিরে আসে। বলে কি এক গভীর ভাবনায় ডুবে গেলেন।

আমি আর কিছুই বললাম না। আমাদের মাথার উপর দিয়ে পরী উড়ে গেল। দুজনই নতঃশীরে ভাবনায় ডুবে থাকলাম। আমি ভাবছিলাম তার কথা, অপেক্ষা আর আশার কথা, সাম্রাজ্য আর দীনতার কথা, স্বপ্ন আর বাস্তবতার কথা। আর উনি ভাবছিলে কেবল একটাই। শিহাবের কথা।

সেদিন রাতেও খেতে বসে খেতে পারিনি ঠিকমত। না রান্নাটা খারাপ লাগছিল না আর। তবে কেমন যেনো গলায় দলা পাঁকিয়ে আসছিল। পৃথিবীতে কেবল মানুষের জীবনই সবচেয়ে অনিশ্চিত।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০২১ সকাল ১১:৪৯
১০টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মেয়েদের চোখে মাস্ক পড়া ছেলেরা বেশী আকর্ষণীয়

লিখেছেন সাড়ে চুয়াত্তর, ২৪ শে জানুয়ারি, ২০২২ সকাল ১১:১৪


ইংল্যান্ডের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগ পরিচালিত একটা সমীক্ষায় দেখা গেছে যে মেয়েরা মাস্কহীন পুরুষের চেয়ে মাস্ক পরিহিত পুরুষদের দ্বারা বেশী আকৃষ্ট হয়। যে সব ছেলেদের চেহারা আমার মত ব্যাকা ত্যাড়া... ...বাকিটুকু পড়ুন

সারোগেট বেবি

লিখেছেন শাহ আজিজ, ২৪ শে জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১২:১৮





অন্যের পেটে আপনার সন্তান, বাড়ছে আরামে, আর আপনি মা হয়েও ঘুরছেন হিল্লি-দিল্লী। সহজ কথায় এরই নাম সারোগেট। বাবার শুক্রানু ও মায়ের ডিম্বানু নিয়ে ভ্রুণ বানিয়ে কোনো এক মায়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময়ের ব্যবধানে...

লিখেছেন দেয়ালিকা বিপাশা, ২৪ শে জানুয়ারি, ২০২২ দুপুর ১২:৪০

সব আন্দোলন আসলে আন্দোলন নয়, সব দাবী, দাওয়া সত্যিকার অর্থেই কোন অর্থই বহন করে না

লিখেছেন সাখাওয়াত হোসেন বাবন, ২৪ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৩:২৫



শাহ জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালযয়ের ছাত্র ছাত্রীদের আন্দোলন দেখে, আমার ছোট বেলার একটি আন্দোলনের কথা মনে পরে গেলো । সেটি ছিলো আমার জীবনের প্রথম কোন আন্দোলনে সরাসরি অংশগ্রহন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফাবিআইয়্যিআলায়িরাব্বিকুমাতুকাজ্জিবান?

লিখেছেন জটিল ভাই, ২৪ শে জানুয়ারি, ২০২২ বিকাল ৫:২৩


(ছবি নেট হতে)

তোমায় ভালবেসে জীবন দিতে চাই,
সকল সময়ে তোমার চরণে দিও ঠাঁই।
জানি মোর পাপের পাল্লা অতিমাত্রায় ভারি,
কিন্তু বহুগুণ ভারিতো; করুনার পাল্লা তোমারি।
তাইতো কঠিন মাটিতে ফলাও শস্যদানা,
আবার সে মাটি হতেই দাও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×