আমাদের দেশে অধিকাংশ বিয়েই বাবা মা বা আত্মীয় পরিজন ঠিক করে থাকেন। একদিন দু'দিন হয়তো ছেলে মেয়ের দেখাদেখি হয় ও এর উপর নির্ভর করে নেয়া হয় সামনে পড়ে থাকা বিশাল বাকী জীবনের সিদ্ধান্ত। দুপরেই, বিশেষ করে মেয়েদের বিবাহিত জীবন মুখের না হলেও, তা মেনে নেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকে না সাধারনত:। কোন কোন েেত্র স্বামীর অত্যাচার, অনাচার এমনই দৈহিক নিপীড়ন সহ্য করেও মুখ বুঝে কাটিয়ে দিতে হয় সারা জীবন। আর্থিক নির্ভরশীলতা, সামাজিক নিশ্চয়তার অভাব, সামাজিক সন্মানের ফাঁকা আবরণ নিজেস্ব জীবনের প্রতি নিজের অধিকারের প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। সন্তানের জন্ম হয়ে যাবার পর তাদের কথা ভেবে অসন্মানের চুড়ান্ত পর্ষায়ে পৌছনোর পরও হাসিমুখে সমাজকে জানান দিতে হয়, 'ভালো আছি'। যা বলছি একটাও ফাঁকা বুলি নয়, আশেপাশে তাকালে উদাহরনের অভাব থাকবে না।
ক'দিন আগে বাংলাদেশের কোন এক শিল্পপতির সাথে ফেনে আলাপ হচিছল। তার সাথে আমার আগে থেকে কোন পরিচয় ছিল না। আমাকে ফোন করেছিলেন তারই কোন এক আত্মীয় ও আত্মীয়ার দাম্পত্য কলহোলের সমাধানের জনে। তার আত্মীয় ও আত্মীয়া আমার বিশেষ পরিচিত, সেজন্যেই আমাকে ফোন করা । উনি উদাহরন টেনে বললেন, ' অমিতো জানি আমার নীজের স্ত্রী ও আমার যোগ্য নয়, আমার প্রতিষ্ঠার কারনেই বড় বড় পার্টিতে যেতে হয় আমাকে, আমার বউ সেখানেই একেবারেই বেমানান। তারপরেও তার সাথে সংসার করছি আমি'। অবাক হয়ে গেলাম। আমার মতো একজন অপরিচিত লোকের কাছে নিজের স্ত্রী সম্পর্কে অসন্মান প্রকাশেও সামন্যতম দ্বিধা নেই তার। সী্ত্রর সাথে তার দৈনন্দিন চলাফেরায় কি তার প্রকাশ একেবারেই ঘটে না ? আমি এধরনের বক্তব্যের সরাসরি প্রতিবাদী। এবারও তাই করলাম বলে ভদ্রলোকের সাথে ছোটখাট একটা ঝগড়া হয়ে গেল। তার মতো বিত্তশীল, শিক্ষিত মানুষের চিন্তান দৈনতা আমাকে আঘাত দিল বেশ। আমি বাংলাদেশে পরিচিত কয়েতজনের কাছে এ নিয়ে আলাপ করলাম। তারা বলল বর্তমান দেশীয় সমাজের প্রেক্ষ্রাপটে এ চিন্তা একেবারেই স্বাভাবিক। তাতে আমার হতাশা বাড়ল বই কমলো না।
ইউরোপে, বিশেষ করে জার্মানীতে বেশীরভাগ বাংলাদেশীই রেষ্টুরেন্টে কাজ করে থাকেন। তাদের সিংহভাগই প্রথমে স্থানীয় মহিলাদের বিয়ে করে প্রথম এ দেশে থাকাটা নিশ্চিত করে নিয়েছেন। অনেকের আগের স্ত্রীর সাথে সস্তানও রয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিয়েটা কাগজে কলমে ছিল, কোন কোন ক্ষেত্রে প্রেমের অভিনয় করে কোন বয়সী মহিলাকে বাগানো হয়েছে, কোন কোন ক্ষেত্রে সত্যিকারেরই ভালবাসা। তবে প্রথম ও দ্বিতীয় দলই ভারী বেশী। কাগজ হবার পর ছাড়াছাড়ি হয়েছে। বাংলাদেশে বিয়ে করছেন বা করেছেন অনেকেই। সেখানেও ফাঁকি। প্রায় সবাই আগের বিয়ের ও সন্তানের কথা গোপন রেখেছেন। নিজেদের সত্যিকারের পেশার কথা প্রকাশ করেন নি। তাদের চেয়ে অনেক বেশী শিক্ষিত, সুন্দরী মেয়েদের বিয়ে করে বিদেশে এনেছেন। এ মেয়েদের অধিকাংশই মানসিক দিক থেকে অসুখী, নিজেদেরকে প্রতারিত মনে করেও প্রতারক স্বামীর সাথে সংসার করে যাচ্ছেন। বিয়ে করে আনার পর যত দ্রুত সম্ভব সন্তানের জন্ম দেয়া হয়, যাতে ফিরে যাবার পথ আরো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আমার প্রশ্ন,এই ছেলেমেয়েদের কি ভবিষ্যত এই বিভাজ্য পৃথিবীতে ? এই মেয়েদের জীবনের এই বঞ্চনার জন্যে দায়ী কে ? নাকি জীবনটাই ফাঁকি কথাটি স্বীকার করে এই প্রতারনাকেই স্বাভাবিক বলে কাটিয়ে দিতে হবে বাকী জীবন ও বেশীরভাগই তাই করছেন। 'প্রতারনাই স্বাভাবিক বা প্রাপ্য', এর ভয়াবহ প্রভাব কি সমাজ, সংসার ও ভবিষ্যত প্রজন্মের উপর পড়বে না ?
আমার মতে সঙ্গী নির্বাচনের প্রশ্নে আমাদের দেশের ছেলে-মেয়েদের আরো বেশী সাবলম্বী হওয়া দরকার। বাবা মা ,আত্মীয় ও ঘটকের উপর নির্ভর না করে নিজেরই উদ্দোগী হওয়া প্রয়োজন। নিজের ভালো লাগার মানুষটি নিজেই খুজে নিতে পারলে ভুল হবার সম্ভাবনা অনেক কম থাকবে। এতে যৌতুক প্রথার বিলুপ্তি ঘটবে। লেখার প্রথমেই যে 'জেনারেশান গ্যাপের' কথা বলেছি, সেখান থেকেই শুরু হয় যৌতুক প্রথার। এর প্রভাব না থাকলে এ কদর্য প্রথা বন্ধ হতে বাধ্য। বলছি না বাবা মা ছেলে মেয়ের অমঙ্গল চান। কিন্তু অনেক েেত্রই নিজের অজান্তে তা করে বসেন, যেমন করেছেন নাসিমার পরিচিত মেয়েটির বাবা-মা।
তারপরেও অনেকের জীবনেই বৈবাহিক সমস্যা থাকবে, দাম্পত্য কলহ থাকবে, অসুখী জীবন থাকবে। এ নিয়েই পৃখিবী। তারপরেও একটা কথা মনে রাখা দরকার, 'জীবন একবারই ও একবারের এই জীবনে সুথী হবার অধিকার প্রতিটি মানুষের। এ অধিকার মানুষের লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সবারই'। এই সুখ বা দু:খের দায়ভার প্রতিটি মানুষের একান্ত নিজস্ব।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



