somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

অন্য শরীর-১২, মূল: ফ্রান্স কাফকা, জার্মান থেকে অনুবাদ তীরন্দাজ

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সন্ধ্যা ৭:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

গ্রেগর খাওয়াদাওয়া ছেড়েই দিল প্রায়। কোন কারনে যদি ছড়ানো খাবারের পাশ দিয়ে যেত, ছোট কোন এক টুকরো খেলাচ্ছলে মুখে নিয়ে নিত। ঘন্টার পর ঘন্টা রেখে একসময় বের করে দিত মুখ থেকে। একবার ভাবলো, তার ঘরের এই করুন চেহারাই তার অরুচির কারণ। কিন্তু তার ঘরের পরিবর্তনও একসময় তার সহ্য হয়ে গেল। বাড়ীর যা যা অপ্রয়েজনীয়, সব এঘরে রাখা সবার অভ্যাসে পরিণত হয়ে গেল। সে সাথে বাড়ীর কোন ঘর যদি তিনজনকে ভাড়া দেওয়া হয়, তাহলে এসব অপ্রয়োজনীয় বস্তুর সংখ্যা বাড়ারই কথা। এদের তিনজনেরই মুখভর্তি দাড়ি, গ্রেগর একবার দরজার ফাঁক দিয়ে দেখেছে। এরা তিনজনকেই শুচিবাইগ্রস্থ বলে মনে হলো। এর প্রভাব সারা বাড়ীতে ও বিশেষ করে রান্নাঘরে পড়লো। আপ্রয়োজনীয় ও নোংরা তাদের একেবারেই অসহ্য। তাছাড়া তাদের নিজেদের আসবাবপত্রের বেশীরভাগই নিজেরাই এনেছেন। তাতে অনেক কিছুই বাড়তি হয়ে পড়লো, যা বিক্রি করা যায়না, কিন্তু ফেলে দেবার কথাও ভাবতে মন চায়না। এ সবই গ্রেগরের ঘরে এনে জমা করা হলো। এমনকি রান্নাঘরের ছাই ও ময়লার বাক্সও। যে কোন মূহুর্তে যা অপ্রয়োজনীয়, এনে গ্রেগরের ঘরেই ফেলতেন কাজের মহিলাটি । খুব দ্রুত সারা হতো এ কাজটি, কপাল ভাল যে গ্রেগর শুধু ফেলে দেয়া ময়লা আর হাতটুকুই দেখতে পেত। মহিলার হয়তো পরিকল্পনা ছিল ওগুলো কোন সময় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া বা একবারে সব দুর করা, কিন্তু ময়লা সেখানেই পড়ে রইলো, যেখানে প্রথমবার ছুড়ে ফেলা হয়েছে, যদি না গ্রেগরের নড়াচড়ায় জায়গা থেকে না সরতো। সরাতে সে বাধ্যই হতো, কারন তার নিজের চালাফেরার পথও ছিলনা। একসময় এসবে তার আনন্দই হতো, যদিও এভাবে চালাফেরার পর সে কয়েক ঘন্টার জন্যে মৃতের মতো ক্লান্ত ও বিমর্ষ হয়ে পড়ে থাকতে বাধ্য হতো।

যেহেতু মাঝে মাঝে ভাড়াটিয়ারা বসার ঘরে রাতের খাবার খেতেন, দরজাটি সে পুরো সন্ধ্যার জন্যে বন্ধই থাকতো। কিন্তু গ্রেগরের তাতে কোন আপত্তি রইলো না। এমনও সময় গিয়েছে, দরজা খোলা সত্বেও সে তার বাড়ীর লোকের অগোচরে অন্ধকার কোনেই পড়ে থাকতো। একদিন কাজের মহিলা দরজাটি একটু ফাঁক করে রেখেছিলেন। রাতের খাবারের জন্যে যখন ভাড়াটিয়ারা বসার ঘরে এসে বাতি জালালেন, খোলাই রইল সে দরজা। তারা এসে একই টেবিলে বসলেন, যেখানে আগে গ্রেগর ও তার বাবা মা বসে খাওয়াদাওয়া সারতেন। ন্যপকিন বিছিয়ে কাটাচামচ ও ছুড়ি হাতে নিয়ে বসতেই মা একপেয়ালা মাংশ ও বোন পেয়ালা বোঝাই আলুসেদ্ধ নিয়ে ঘরে ঢুকলো। গরম খাবার থেকে ধোঁযা বেরুচ্ছিল। তিনজনই এমনভাবে পেয়ালার উপর ঝুঁকে পড়লেন, মনে হলো খাবার আগে পরীক্ষা করে দেখতে চাইছেন। মাঝের জন সত্যি সত্যিই ছুড়ি দিয়ে মাংসের একটি টুকরো কেটে পরীক্ষা করলেন, কতটুকো নরম, নাকি আরেকবার রান্নাঘরে পাঠাতে হবে। তাকেই তিনজনের মাঝে সবচেয়ে প্রভাবশালী মনে হলো। সন্তুষ্ট মনে হলো তাকে। মা ও বোন উত্তেজনায় তাকিয়ে থেকে থেকে অবশেষে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো।

পরিবারের সবাই খাওয়াদাওয়া সারতো রান্নাঘরে। তারপরও বাবা রান্নাঘরে ঢোকার আগে এ ঘরেই ঢুকলেন। টুপি খুলে মাথা নীচু করে সম্ভাষন জানালেন সবাইকে টেবিলের চারপাশ ঘুরে। ভাড়াটিয়ারা উঠে দাঁড়িয়ে দাড়ির ফাঁকে কিছু একটা বললেন। একা হয়ে যাবার পর কোন তারা কথা কথা না বলে শুধু খেয়েই চললেন। খাবার সময়ে তাদের দাঁতের বিভিন্ন ধরণের বিচিত্র শব্দে অবাক হলো গ্রেগর। মনে হলো তারা গ্রগরকে বোঝাতে চাইছেন খাবার সময়ে দাঁতের প্রয়েজনীয়তা ও দাঁত না থাকলে অতি সুন্দর মাড়িও কোন কাজেই আসে না। 'আমার রুচি আছে ঠিকই', চিন্তিত হয়ে নিজেকেই বললো গ্রেগর। 'তবে এসবের প্রতি নয়, ওরা যেভাবে খাচ্ছে, মারাই পড়বো তাতে'!

এই পুরো সময়ের মাঝে বোনের বেহালা বাজানো কোনদিন শুনেছে বলে মনে করতে পারছে না গ্রেগর, কিন্তু ঠিক সেই সন্ধ্যাতেই রান্নাঘর থেকে বেহালার আওয়াজ ভেসে এলো। ভাড়াটিয়ারা তাদের খাওয়াদাওয়া শেষ করেছেন, মাঝের জন একটি পত্রিকা বের করে বাকী দু্থজনকে একটি করে পত্রিকার পাতা দিয়ে পড়া শুরু করেছেন। আরামে হেলান দিয়ে ধুমপান শুরু করেছেন মাত্র, বেহালায় বাজনা শুনেই সজাগ হয়ে উঠলেন। পা টিপে টিপে দরজার কাছে গিয়ে একসাথে কান পাতলেন সবাই। হয়তো রান্নাঘর থেকেও কেউ শুনতে পেয়ে থাকবে কেউ। বাবা উচ্চস্বরে বললেন,'আপনাদের কারো কি অসুবিধা হচ্ছে এতে? তাহলে বাজনা সাথে সাথেই বন্ধ করে দেয়া যায়'। 'বরং উল্টোটি', বললেন মাঝের ভদ্রলোক। 'ম্যাডাম আমাদের এখানে এসে এঘরে বাজালেই ভাল হতো। এঘরটি নিশ্চয়ই আরো বেশী আরামদায়ক'। 'অবশ্যই', বললেন বাবা, যেন তিনি নিজেই বাজাচ্ছেন বেহালা। ওরা আবার টেবিলে এসে বসলেন ও অপেক্ষা করলেন। পরমূহুর্তে বাবা এলেন স্বরলিপি রাখার স্ট্যান্ড, মা স্বরলিপির বই ও বোন বেহালা নিয়ে। বোন আস্তে আস্তে বাজনার জন্যে তৈরী হলো। বাবা মা আগে কখনও কাউকে ঘর ভাড়া দেননি, তাই ভদ্রতার আতিশয্যে সোফাতেও বসতে সাহস পেলেন না। বাবা দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, ডান হাতটি সার্টের দুই বন্ধ বোতামের মাঝে ঢুকিয়ে। একজন মা কে সোফায় বসার অনুরোধ জানালে, সেখানে বসলেন তিনি। একটু দুরে, এক কোনায়, যেখানে ভদ্রলোক সোফাটি সরিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন আগেই।

বোন বাজনা শুরু করলো। বা আর মা দু'পাশ থেকেই বাহালার তারে তার হাতের চলাচলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। গ্রগর বাজনার প্রতি আগ্রহে এগিয়ে মাথাটি বসার ঘরে ঢুকিয়ে দিল। অন্যের সুবিধার প্রতি নজর রাখলো না ভেবে অবাক হলোনা একেবারেই। আগে তো এ নিয়ে গর্ববোধ ছিল তার। এখন তো নিজেকে লুকিয়ে রাখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। পুরো ঘরভর্তি ধুলো, সামান্য নড়াচড়াতেই আরো বেশী ছড়িয়ে পড়ে, তাতে তার নিজের শরীরও ধুলোয় ঢাকা। সুতো, চুল, খাবারের অবশিষ্ট, সবই বইছে সে পিঠে ও শরীরের পাশে। এখন সেদিকে নজরই নেই, অথচ প্রথম দিকে শরীর উল্টে কার্পেট সব ময়লা ছড়িয়ে নিজেকে পরিস্কার করতো। এখন নিটোল পরিস্কার বৈঠকখানার মেঝেতে এগিয়ে যেতে তান কোন দ্বিধাই হচ্ছে না।

আসলে কেউই তার দিকে নজর দিল না। বাবা আর মা বাজনাতেই ডুবে ছিলেন। ভাড়াটিয়ারা পকেটে হাত রেখে বোনের পেছনে স্বরলিপির ষ্ট্যন্ডের কাছে গিয়ে এমন ভাবে দাঁড়ালেন, যাতে স্বরলিপি দেখতে পারেন। বোনের অবশ্যই বিরক্ত হবার কথা। তারা নীচুস্বরে কথা বলতে বণতে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন ও বাবার চিন্তিত দৃষ্টির সামনে সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। পরিস্কার বোঝা গেলো, তারা সুন্দর ও চিত্তাকর্ষক বাজনা শোনার আশা করেছিলেন, আশাহত হয়ে এবার বিরক্তই হয়েছেন। শুধুমাত্র ভদ্রতা বজায় রাখার জন্যেই তার প্রকাশ ঘটাচ্ছেন না। বিশেষ করে যেভাবে নাকেমুখে উপরের দিকে চুরুটের ধোয়া ছাড়ছিলেন, তাতে তাদের চুড়ান্ত অসহিষ্ণুতাই প্রকাশ হলো। অথচ কত সুন্দর বাজাচ্ছিল বোন! মাথাটি একপাশে কাত করা, চোখের বিষাদময় দৃষ্টি নেচে বেড়াচ্ছিল স্বরলিপির ছত্রে ছত্রে। গ্রেগর আরেকটু সামনের দিকে এগিয়ে গেল, মাথাটি মেঝেতে নামিয়ে, হয়তো বোনের দৃষ্টিকে ধরার আশাতেই। আসলেই কি সে এক পশু, সঙ্গীতে যার এতোটা তৃষ্ণা? এটাই তার এতদিনের অজানা খোরাক, যা এতদিন খুঁজে এসেছে। তার স্থির সিদ্ধান্ত, বোনের আরো কাছাকাছি এগিয়ে যাওয়া, তার স্কার্টে টান দিয়ে তাকে বোঝানো, সে যেন বেহালা নিয়ে গ্রেগরের ঘরে আসে। তার বাজনার মুল্য গ্রেগরের কাছে যতো, এখানকার কারো কাছেই ততটা না। বোনকে তার ঘরের বাইরে বেরুতে আর কখনোই দেবে না, অন্ততপক্ষে: যতদিন সে বেঁচে থাকবে। এই ভয়ংকর চেহারা প্রথমবারের মতো কাজে আসবে তার। একই সাথে ঘরের প্রতিটি দরজা ও জানালায় সবরকম আক্রমণ প্রতিহত করবে । বোনকে থাকতে বাধ্য করতে হবে না, সে নিজেই থাকবে। সোফার উপর বসে ভাইএর দিকে কান পাতবে। তখন গ্রেগর বলতে পারবে, বোনকে সংগীত কলেজে পাঠানোর পুরো সিদ্ধান্ত সে নিয়েছিল। যদি নিজের এ সমস্যাটি না হতো, তাহলে কারো কথায় কোন পাত্তা না দিয়ে গত বড়দিনেই সবাইকে জানাতো। এবারের বড়দিন কি পেরিয়ে গেছে? একথা শুনে নিশ্চয়ই নরম হয়ে কাঁদতো বোন। গ্রেগর সোজা হয়ে আদর করে চুমু খেত বোনের গলায়। কারণ যতদিন ধরে দোকানে কাজে যাচ্ছে বোন, ততদিন ধরে কলার ও কোন ফিতে নেই তার গলায়।

'মি: সামসা', বাবাকে ডাকলেন মাঝের ভদ্রলোক ও আর কোন বাক্য ব্যয় না করে সামনের দিকে এগিয়ে আসা গ্রেগরের দিকে তর্জনী নির্দেশ করলেন। বেহালা থেমে গেল, ভদ্রলোক তার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে মাথা ঝাকিয়ে হেসে আবার গ্রেগরের দিকে তাকালেন। বাবা গ্রেগরকে না থামিয়ে ওদেরকে শান্ত করাই বেশী জরুরী মনে করলেন বলে মনে হলো। তারপরও ওদেরকে খুব বিব্রত বলে মনে হলোনা, বাজনার চেয়ে গ্রেগরই এখন ওদের কাছে বড় আকর্ষন। বাবা তাদের দিকে এগিয়ে দুই হাত তুলে তাদেরকে তাদের ঘরের দিকে পাঠানোর চেষ্টায় নিয়োজিত হলেন ও সে সাথে শরীর দিয়ে গ্রেগরকে তাদের দৃষ্টির আড়াল করতে চাইলেন। তাদেরকে এবার বেশ বিরক্ত মনে হলো। কিন্তু বোঝা গেলনা, বাবার ব্যাবহারের কারণে, নাকি এইমাত্র গ্রেগরের মতো এক পাশের ঘরের প্রতিবেশীর কথা জানতে পেরে। নিজেদের দাড়িতে অস্থির হাত বুলিয়ে তারা বাবার কাছে এসবের ব্যাখ্যা দাবী করলেন ও সহজে নিজেদের ঘরে ফেরৎ যেতে রাজী হলেন না। এরই মাঝে বোন তার সচেতনতা ফিরে পেয়েছে, যা হঠাৎ তার বাজনা বন্ধ হওয়ায় হারিয়ে ফেলেছিল। এতোক্ষন বেহালার ছড়ি আর তারেই ছিল তার শিথিল হাত, আর দৃষ্টি স্বরলিপির পাতায়, যেন একটু পরই বাজনা শুরু করবে আবার। মা বসেছিলেন তার ঘন ঘন নি:শ্বাস আর শ্বাসকষ্ট নিয়ে সোফাতে। বোন উঠে দাঁড়িয়ে মায়ের কোলের উপর বেহালাটি রেখে এঘর ছেড়ে পাশের ঘরের দিকে ছুটলো, বাবার চাপের মুখে সেদিকে যেতে ভাড়াটিয়ারাও বাধ্য হচ্ছিল। তারা ঘরে ঢোকার আগেই গ্রেটে সে ঘরের বিছানা চাদর ছুড়ে ফেলল এদিক সেদিক। বাবার ভেতরেও কিছু একটা ভর করলো, যার প্রভাবে তিনি ভাড়াটিয়াদের তাদের প্রাপ্য সন্মান দিতেও ভুলে গেলেন। তাদের ঘরের দিকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিতে শত্তি প্রয়োগ করছেন বারবার। একসময় মাঝের জন দরজার কাঠে পা রেখে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। উপরের দিতে হাত তুলে মা ও বোনের দিকেও তাকালেন। 'এই বাড়ীর পরিবারের সদস্যরা যে কদর্য পবিবেশে বাস করছেন, তার প্রতি সজাগ হয়ে বাড়িটি ছেড়ে দিলাম'। এটা বলে একদলা থুতু ফেললেন মেঝের উপর। 'যে ক'দিন এখানে ছিলাম, তার জন্যে এক পয়সা ভাড়া তো দেবোই না, বরং প্রমাণ সাপেক্ষেই ক্ষতিপূরণ দাবী করার কথা চিন্তা করে দেখবো। বিশ্বাস করতে পারেন আমাকে, প্রমান করা বিন্দুমাত্রও কঠিন হবে না'। এটা বলেই তিনি থামলেন ও কোন প্রত্যাশায় এদিক ওদিক তাকালেন। সত্যিসত্যিই সাড়া দিলেন বাকী দু্থজনও। 'আমরাও এই মুহুর্তে বাড়িটি ছেড়ে দিলাম'। পরপরই মাঝের জন হাতল ধরে সশব্দে দরজা বন্ধ করে দিলেন।

বাবা টলতে টলতে সোফার কাছে এসে এলিয়ে পড়লেন সোফায়। মনে হলো, প্রতি সন্ধ্যার মতোই ঘুমোচ্ছেন সোফায়। কিন্তু তার মাথার অবাধ্য ঝাকুনি দেখে বোঝা গেল, জেগেই আছেন তিনি। গ্রেগর পুরো সময়টি সে জায়গাতেই পড়ে রইল, যেখানে ভাড়াটিয়ারা দেখতে পেয়েছিলেন তাকে। ব্যর্থ পরিকল্পনার হতাশা ও হয়তো অবিরাম উপোষের কারণেই নড়ার কোন ক্ষমতা ছিল না তার। মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে তার দিকে এগিয়ে আসা পরবর্তী ঝড়ের অপেক্ষায় রইল সে। মায়ের কাঁপা কাঁপা আঙ্গুলের ফাঁক গলে বেহালাটি তার কোল থেকে মেঝেতে পড়লো বিকট আওয়াজে। তাতেও আতঙ্কিত হলো না গ্রেগর।

'প্রিয় বাবা ও মা' মুষ্টিবদ্ধ হাতে টেবিলে ঘুষি মেরে জানালো বোন। 'এভাবে আর চলতে পারে না। তোমাদের নিজেদের যদি তা মনে না হয়, আমার হচ্ছে। এই পশুকে আমি আর ভাই বলে ডাকতে চাইনা। সেজন্যে স্পষ্ট করে বলছি, একে বিদেয় করার চেষ্টা করতে হবে আমাদের। একজন মানুষের পক্ষে একে সহ্য করা, এর দেখাশোনা করার যতটুকো সম্ভব, তা আমরা করেছি। মনে হয়না, নিজেদের প্রতি এরপর কোন অভিযোগ থাকতে পারে আমাদের'।

'হাজার বার ঠিক কথা বলছে সে', বললেন বাবা। মায়ের নি:শ্বাসে কষ্ট হচ্ছিল তখনও। দম না পেয়ে বিভ্রান্ত দৃষ্টিতে অবিরাম কাশতে শুরু করলেন।

বোন মায়ের কাছে ছুটে গিয়ে কপালে হাত রাখলো। বাবা হয়তো বোনের কথায় কোন এক সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে। ভাড়াটিয়াদের খাবার প্লেট পড়ে আছে টেবিলে তখনও। তারই মাঝে তার দারোয়ানের টুপিটি নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে গ্রেগরের দিকে তাকালেন।

'একে বিদায় করতে হবে' এবার সরাসরি বাবাকেই বললো বোন। কারণ কাশির দমকে মা'র কিছু শোনার ক্ষমতা ছিল না। 'স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমি, এ তোমাদের দু'জনকেই হত্যা করবে। যে রকম কঠিন পরিশ্রম করি আমরা, তারপর বাড়ীতে এসব ঝন্ঝাট আর সহ্য করা যায়না। অন্তপক্ষে আমি আর করতে পারছি না'। বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়লো বোন। তার চোখের অশ্ত্রু মায়ের মায়ের মুখমন্ডলে ঝরলো।

'মা'! মেয়ের প্রতি সহানুভুতি ও একাত্মতায় অধীর হয়ে বললেন বাবা। 'কিন্তু কি করতে পারি আমরা'?

বোন কোন উত্তর খুঁজে না পেয়ে কনুই ঝাঁকালো। মনে হলো কান্নার প্রভাবে তার আগের সেই নিশ্চিত ভাব অনেকটাই আবদমিত।

'সে যদি আমাদেরকে বুঝতো'! অনেকটা প্রশ্নের মতোই বললেন বাবা। বাবার এ আশা নিতান্তই দূরাশা, কাঁদতে কাঁদতেই দু'হাত নাড়িয়ে তা জানালো বোন।

'সে যদি আমাদেরকে বুঝতো' আবারো বললেন বাবা। তারপর দু'চোখ বন্ধ করে যেন মেয়ের অবিশ্বাসের গভীরতাই টেনে নিলেন নিজের ভেতরে। 'তাহলে হয়তো তার সাথে কোন এক সমঝোতায় আসা যেতো। কিন্তু এভাবে....'।

'তাকে দুর করতে হবে্থ, জোরে বললো বোন। 'এটাই একমাত্র পথ বাবা। এ চিন্তা ছাড়তে হবে যে, এটা গ্রেগর। আমরা যে এ পর্যন্ত তা করে এসেছি, এটা আমাদেরই দুর্ভাগ্য। সে কিভাবে গ্রেগর হতে পারে? যদি সে গ্রেগর হতো, এতদিনে নিশ্চয়ই বুঝতে পারতো, মানুষের সাথে পশুর বসবাস অসম্ভব ও নিজ থেকেই বিদেয় হতো। আমাদের কোন ভাই থাকতো না, কিন্তু তার স্মৃতিকে সন্মানে রাখতে পারতাম। কিন্তু এখন এই পশু আমাদেরকে সবসময় অনুসরণ করছে, ভাড়াটিয়াদের তাড়িয়েছে। মনে হয় আমাদেরকে রাস্তায় বের করে সে পুরো বাড়ীটিই নিজের দখলে নিতে চাইছে। দেখ বাবা! সে আবার শুরু করেছে' বলেই গ্রেগরের অবোধ্য কোন এক কারণে চিৎকার করে সোফাটি রেখে মায়ের কাছ থেকে সরে বাবার পেছনে পালালো সে। মনে হলো গ্রেগরের সামনা সামনি হওয়ার পরিবর্তে সে মা কেও বলি দিতে তৈরী। মেয়ের ব্যাবহারে উৎকন্#25
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সন্ধ্যা ৭:২৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Diplomacy is not tourism

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৯


আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের তীরে সেনেগালের রাজধানী ডাকার। এপ্রিলের শেষে সেখানে বসেছে 'Dakar International Forum on Peace and Security in Africa'-এর দশম আসর। নামটা দীর্ঘ হলেও এবারের হাওয়া বেশ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার একশততম পোস্ট!

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৮



আমার একশততম পোস্ট!

আজ আমার লেখকজীবনের এক ছোট্ট কিন্তু হৃদয়ের গভীরে দাগ কাটা দিন- সামহোয়্যারইন ব্লগ এ আমার একশততম পোস্ট। সংখ্যার হিসেবে হয়তো ১০০ খুব বড় কিছু নয়।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভুল শুধু ভুল, আমি কি করছি ভুল?

লিখেছেন রবিন.হুড, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১২:৪১

আমি টাকার পিছনে না ছোটার কারনে আমার হাতে যথেষ্ট সময় থাকায় সে সময়টুকু সামাজিক কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করছি। আবার বিলাসিতা পরিহার করার কারনে অল্প কিছু টাকা সাশ্রয় করছি যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংসদের বায়না : ৩০ সেট গয়না

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ১:১৪

একসময় এই প্রবাদটি খুব প্রচলিত ছিল, এমনকি পণ্ডিত মহলেও এটি নিয়ে ঠাট্টা-মশকরা করা হতো।
সময় বদলে গেছে; যমুনা নদী দিয়ে বহু জল বয়ে গিয়ে সাগরে মিশেছে।



বাস্তবতার নিরিখে আমাদের সমাজে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফুল ট্যাঙ্ক স্বপ্ন

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৬



শহরের সকালগুলো এখন আর আগের মতো নয়। সূর্য ওঠার আগেই পেট্রোল পাম্পের সামনে লম্বা লাইন পড়ে যায়। সেই লাইনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকে রিদম—একটি নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, আর জীবনের বাস্তবতায় আটকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×