somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

Diplomacy is not tourism

২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:৫৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আফ্রিকার পশ্চিম প্রান্তে আটলান্টিকের তীরে সেনেগালের রাজধানী ডাকার। এপ্রিলের শেষে সেখানে বসেছে 'Dakar International Forum on Peace and Security in Africa'-এর দশম আসর। নামটা দীর্ঘ হলেও এবারের হাওয়া বেশ গরম। আফ্রিকার 'Sahel' অঞ্চল এখন পৃথিবীর অন্যতম জটিল রণক্ষেত্র। মালি, বুর্কিনা ফাসো আর নাইজারে একের পর এক সামরিক অভ্যুত্থান ফ্রান্সকে বিদায় করে রাশিয়াকে ঘরে তুলেছে। তৈরি হয়েছে 'Alliance of Sahel States' (AES), যারা পুরনো আঞ্চলিক জোট ECOWAS-এর রক্তচক্ষুকে তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে গেছে। এই চরম বিশৃঙ্খলার সুযোগে একদিকে জিহাদি গোষ্ঠীগুলো ছড়াচ্ছে বিষ, অন্যদিকে শুরু হয়েছে বড় শক্তিগুলোর এক অদৃশ্য স্নায়ুযুদ্ধ।

ডাকারে এবার কেউ শুধু বক্তৃতা দিতে আসেনি। ফ্রান্স ব্রাত্য হওয়ায় জার্মানি সরাসরি এইএস-এর সামরিক সরকারগুলোর সাথে যোগাযোগ বাড়াতে গিয়েছে, যাতে রাশিয়ার প্রভাব কমানো যায়। পর্তুগাল তাদের পরিচ্ছন্ন ইমেজ নিয়ে হতে চাইছে ইউরোপের আফ্রিকা নীতির নতুন মুখ। এমনকি বুর্কিনা ফাসোর তরুণতম রাষ্ট্রপ্রধান ইব্রাহিম ত্রাওরে নিজেও এক জেনারেলকে পাঠিয়ে এক সূক্ষ্ম চাল চেলেছেন। ইউরোপ-রাশিয়া-আ্ফ্রিকা সবাইকে বার্তা দিলেন তিনি । এই পুরো সমীকরণের মধ্যে একটা অদ্ভুত চরিত্র হলো বাংলাদেশ। জিয়াউর রহমানের পথ অনুসরণ করে সেনেগাল সফরে গেলেন বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ । মরক্কোয় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত এবং একইসঙ্গে সেনেগালেও দায়িত্বপ্রাপ্ত স্বীকৃত দূত সাইদা ফায়জুন্নেসা এ সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ফোরামে অংশ নেন।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম ডাকার ফোরামে একটি উচ্চপর্যায়ের প্যানেলে বক্তব্য দিলেন। সেই বক্তব্যে তিনি বললেন "প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ একটি নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় অগ্রসর হচ্ছে যার লক্ষ্য একটি বৈষম্যহীন ও সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র গঠন করা।" শামা ওবায়েদ ইসলাম যখন ঝানু কূটনৈতিক মহলে দাঁড়িয়ে 'ফ্যামিলি কার্ড' আর 'কৃষক কার্ডের' গল্প শোনালেন, তখন কারো মনোযোগই সেখানে থাকার কথা নয় । কারণ সেই মঞ্চে আলোচনা চলছিল সার্বভৌমত্ব আর খনিজ সম্পদের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে, শান্তিরক্ষা বা সামাজিক কার্ড নিয়ে নয়।

বাংলাদেশ এই সামিটে কেন গেল? ২০১৪ সাল থেকে শুরু হওয়া এই ফোরামের কোনো বছরের অংশগ্রহণকারীদের তালিকায় আগে বাংলাদেশের নাম ছিল না। তাহলে এবার হঠাৎ কেন ? কারণ নতুন সরকার ক্ষমতায় এসেছে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের তুলে ধরতে হবে। যেখানে আমন্ত্রণ পাওয়া যাচ্ছে সেখানে যাচ্ছে। এটাকে পুরোপুরি ভুল বলা যায় না কারণ নতুন সরকার এসে আন্তর্জাতিক পরিচিতি দরকার হয়। কিন্তু সমস্যা হলো কোথায় যাচ্ছে এবং গিয়ে কী বলছে তা নিয়ে ।

অনেকে বলতে পারেন বাংলাদেশ আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশি শান্তিরক্ষী পাঠায় তাই এই ফোরামে যাওয়াটা যুক্তিসংগত। কথাটা অর্ধসত্য। শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অবদান সত্যিকারের গর্বের। কিন্তু এই ফোরামের আলোচনা ছিল আফ্রিকার সার্বভৌমত্ব, ফ্রান্সের প্রত্যাহার, বিরল খনিজের উপর পশ্চিমা নিয়ন্ত্রণ বনাম আফ্রিকান মালিকানা। শান্তিরক্ষার প্রসঙ্গ এই আলোচনায় আসেইনি। সেই যুক্তি দিয়ে এখানে গেলে তা হবে অনেকটা ক্রিকেট বিষয়ক সম্মেলনে গিয়ে ফুটবলের বক্তৃতা দেওয়ার মতো।

কূটনীতি কোনো টুরিজম নয়। একটি রাষ্ট্র যখন কোনো আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশ নেয়, তখন তিনটি প্রশ্নের উত্তর আগে থেকেই পরিষ্কার থাকতে হয়: সেখানে আমার জাতীয় স্বার্থ কী, আমি বিশ্বকে দেওয়ার মতো কী রাখি, আর দিনশেষে আমি কী নিয়ে ফিরছি। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই তিনটির কোনো উত্তরই স্পষ্ট ছিল না। শুধু উপস্থিত থেকে প্রথাগত বক্তৃতা দেওয়া আর যা-ই হোক কূটনীতি নয়; এটি আসলে রাষ্ট্রীয় খরচে ফলহীন এক আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

বাংলাদেশের হাতে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে এমন কার্ড আছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আমাদের বড় একটা নৈতিক শক্তি দেয়। রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে কথা বলার জন্য আসিয়ান (ASEAN) বা জাতিসংঘ যেমন মোক্ষম জায়গা, তেমনি শান্তিরক্ষা মিশন নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতার কথা নিউ ইয়র্ক বা জেনেভাতে সবাই গুরুত্ব দিয়ে শোনে। এমনকি জলবায়ু পরিবর্তনের শিকার হওয়া দেশগুলোর প্রতিনিধি হিসেবে প্যারিস বা গ্লাসগোর মঞ্চে দাঁড়ালে বিশ্ববাসী আগ্রহ নিয়ে শোনে কারণ সেখানে আমাদের কথা বলার অধিকার আছে। এই জায়গাগুলোতে বাংলাদেশ যখন যায়, তখন কেউ প্রশ্ন তোলে না যে আমরা সেখানে কেন ।

আফ্রিকান সার্বভৌমত্ব আর জটিল ভূ-রাজনৈতিক সংকটের এক মঞ্চে গিয়ে হুট করে 'ফ্যামিলি কার্ডে'র গল্প শোনানোটা আসলে বেমানান। সেই ঘরে যারা বসেছিলেন, তারা হয়তো বিরক্ত হয়েছেন অথবা অবাক হয়ে ভেবেছেন এই দেশটা এখানে এলো কেন। দুটোর কোনোটিই আমাদের দেশের ইমেজের জন্য ভালো নয়। নতুন সরকার এসে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে পরিচিত হতে চাইবে, এটা খুব স্বাভাবিক এবং দরকারি। কিন্তু ইমেজ তৈরি হয় সঠিক মঞ্চে সঠিক কথা বললে। অপ্রাসঙ্গিক জায়গায় গিয়ে দেশীয় রাজনীতির প্রচার করলে দেশের পত্রিকায় হয়তো বড় হেডলাইন পাওয়া যায়, কিন্তু আন্তর্জাতিক কোনো জার্নাল বা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের নাম খুঁজে পাওয়া যাবে না ।

তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন গণতান্ত্রিক অভিযাত্রায় বাংলাদেশ - https://www.banglatribune.com/942924
প্রথম বি‌দেশ সফরে সেনেগাল গেছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-https://www.deshrupantor.com/681121
Photo Courtesy: Ministry of Foreign Affairs, Bangladesh
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ২:০৭
৭টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সাধু সাবধান!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ৩:২১

রোমান সাম্রাজ্যের পম্পেই এবং বর্তমান বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থা, সংস্কৃতি ও সময়কাল সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও, মানুষের সামাজিক আচরণ এবং নৈতিক স্খলনের কিছু ক্ষেত্রে আশ্চর্যজনক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। নিচে পম্পেইয়ের সেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেম....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১০



সরকারের ছয় মাসের পোস্টমর্টেমঃ সমর্থনের জায়গা থেকেই কিছু কঠিন কথা.....

ছয় মাস খুব দীর্ঘ সময় নয়- কিন্তু একটি সরকারের দিকনির্দেশনা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার কিছুটা ধারণা পাওয়ার জন্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইলিয়াস কাঞ্চন

লিখেছেন অর্ক, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৩৩



আমার ছোটোবেলায় ইলিয়াস কাঞ্চন সুপারহিরো। খুব সম্ভবত জীবনে প্রথম হলে দেখা সিনেমা ছিলো জবরদোস্ত। ইলিয়াস কাঞ্চন ও ওয়াসিম নায়ক। তিনবার দেখেছিলাম। বাড়ির কাছে হল। সেভাবে কড়াকড়ি ছিলো না। ছোটো বাচ্চা... ...বাকিটুকু পড়ুন

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "শিউলি গাছ"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:১৭

শিউলি গাছ

- মঞ্জুর চৌধুরী

১.

"কাকু ভাল আছেন?"
অনিরুদ্ধ সেন শিউলিতলা থেকে ফুল কুড়াচ্ছিলেন। তাঁর উঠানের সামনে সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা শিউলি গাছটার নিচে সাদা ফুল বিছিয়ে আছে। কমলা... ...বাকিটুকু পড়ুন

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×