অষ্টম পর্বের লিঙ্কঃ পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)
১০ই জিলহজ্জ্ব তারিখে (০৬ জুন ২০২৫) সূর্যোদয়ের আগেই আমরা মুযদালিফা থেকে রওনা হয়ে সকাল সকাল ‘বড় জামারাত’ বা জামারাত আল আক্বাবায় গিয়ে ‘রামি’ করে, অর্থাৎ সাতটি পাথর নিক্ষেপ করে মিনায় প্রত্যাবর্তন করলাম। মাথার উপরে ছিল গনগনে সূর্য, মনে হচ্ছিল যেন মগজগুলো মাথার খুলি ঠিকরে বের হয়ে আসবে। পথের উভয় পার্শ্বে ৫০/৬০ গজ পর পর মুখমণ্ডলে ও মাথায় ঠাণ্ডা পানির স্প্রে করা হচ্ছিল। এতে সাময়িক কিছুটা আরাম হচ্ছিল বটে, তবে জুন মাসের সৌদি গরম মোকাবিলায় তা অপ্রতুল ছিল। ইতোমধ্যে আমাদের পশু কুরবানি হয়ে যাবার সচিত্র বার্তা এলো। আমরা একটা সেলনে গিয়ে আমাদের মাথামুণ্ডন করে এসে গোসল করে নিলাম এবং সাময়িকভাবে এহরাম পরিত্যাগ করে স্বাভাবিক পোষাক পরে নিলাম। এ পর্যায়ে এই ‘partial exit from Ihram’ বা এহরাম পরিধান হতে সাময়িক অবকাশ এর অনুমতি রয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে একই দিনে পরে সুবিধেমত সময়ে মক্কায় গিয়ে ‘তাওয়াফ আল ইফাদাহ’ (হজ্জ্বের ফরয তাওয়াফ) ও সা’ঈ করতে হবে।
সম্ভাব্য সব সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে আমাদের দলনেতা (দেশি মুয়াল্লেম) ও অন্যান্য মুরুব্বিরা সাব্যস্ত করেছিলেন যে আমরা ঐদিন রাতে এশার নামাযের পরপরই পুনরায় এহরাম পরে হারাম শরীফে গিয়ে হজ্জ্বের ফরয তাওয়াফ ও সা’ঈ সম্পন্ন করবো। আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম যে এটা পালন করতে গিয়ে আমাদের সারা রাত পার হয়ে যেতে পারে। কারণ, সেটা ছিল হজ্জ্বের পূর্ণতার দিন ও রাত। বিশ লক্ষাধিক হাজ্জ্বীর মধ্যে প্রায় সকল হাজ্জ্বীই ঐ সময়ে ‘তাওয়াফ আল ইফাদাহ’ ও সা’ঈ করার জন্য মক্কায় উপস্থিত থাকবেন। ফলে, চলাচলের সুবিধা সীমিত হয়ে পড়বে, স্বাভাবিকের চেয়ে চলাচলের সময় অনেক বেশি লাগবে। লক্ষাধিক হাজ্জ্বীর সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটার কারণে সময় ৩/৪ গুণ বেশি লাগবে। মূল হারাম শরীফ প্রাঙ্গণে ঠাঁই পাওয়া দুষ্কর হবে, উপরের তলায় যত উপরে ওঠা হবে, একেকটি তাওয়াফের পরিধি ততই বৃ্দ্ধি পাবে। হাঁটার কদম সংখ্যাও নিচের প্রাঙ্গণের চেয়ে ৩/৪ গুণ বৃ্দ্ধি পাবে। এসব সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে তাই সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত আমি এবং আমার স্ত্রী নামাযের সময় ব্যতীত পর্যাপ্ত ঘুম দিয়ে নিলাম।
আমি যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই হলো। আমাদের বাস হারাম শরীফ থেকে বেশ কিছুটা দূরেই আমাদেরকে নামিয়ে দিল, কারণ সৌদি পুলিশ আশেপাশের রাস্তাগুলো বাসের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে পায়ে হাঁটা জনস্রোত কা’বা শরীফের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। আমাদের গ্রুপে বিভিন্ন বয়সের হাজ্জ্বী ছিলেন, যাদের বয়স ৩০-৩৫ থেকে ৬০-৭০ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাই আমাদের দলনেতা (দেশি মুয়াল্লেম) জনাব আব্দুল্লাহ আল মাহবুব শাহীন শুরু থেকে সম্মিলিত তাওয়াফের আগে একটা বিষয়ের উপর খুব জোর দিতেন। সেটা হলোঃ আমরা কেউ কাউকে পেছনে ফেলে নিজেরা অগ্রসর হবো না। আমরা কনুইবদ্ধ হয়ে একসাথে প্রতিটি পদক্ষেপ নিব। এটা কঠোরভাবে মেনে চলা কঠিন ছিল। মাঝে মাঝে বন্ধন ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তারপরেও আমরা কাছাকাছি ছিলাম, একে অপরের দৃষ্টিসীমার মধ্যে ছিলাম এবং সময় সূযোগমত পুনরায় কনুইবদ্ধ হয়েছিলাম।
আমরা সবাই একাগ্রচিত্ত ছিলাম কী করে হজ্জ্বের এই ফরয উমরাহ (তাওয়াফ ও সা’ঈ) নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা যায়। হারাম শরীফে প্রবেশ করেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করার চেষ্টা করি কা’বা ঘরের প্রতি, কিন্ত কা’বা ঘরকে শুধু দূর থেকেই দেখে গিয়েছি, অত্যধিক ভিড়ের কারণে নিকটে যাবার কোন উপায় ছিল না। আমাদের চেষ্টা ছিল, দূর থেকে হোক, আমরা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ধীরে সুস্থে নিব, কোথাও তাড়াহুড়ো করবো না। সাতবার তাওয়াফের মাঝে শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে স্লো ডাউন করেছি, দোয়া দরুদ পড়েছি, সাথে রাখা জমজমের পানি পান করেছি। সাতবার তাওয়াফ শেষ হয়ে যাবার পর আরও কিছু করণীয় থাকে, সেগুলো করেছি (যেমন মাকা’মে ইব্রাহীমে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া দরুদ পড়া)। তাওয়াফ শেষে ক্ষণিকের তরে বিশ্রাম নিয়ে ওয়াশরুমের কাজ ইত্যাদি শেষ করে রওনা হয়েছি সা’ফা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে, সা’ঈ করার জন্য। তীর্থযাত্রীদের এত বিরাট জনস্রোতের ক্ষুদ্র একটি অংশ হিসেবে কাফেলার সাথে পায়ে পায়ে হেঁটে সা’ফাতে পৌঁছাতেও অনেক সময় লেগে গেলো। সা’ঈ শেষ করে আমরা কা’বা প্রাঙ্গণে পুনরায় প্রবেশ করলাম। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে নিতে ফজরের নামাযের সময় হয়ে গেল। সারা রাত এভাবে ফরজ ইবাদতে কেটে গেল। তবুও, দিনের প্রখর রৌদ্রতাপের মধ্যে এই ইবাদতসমূহ পালনের চেয়ে রাতের বেলায় পালন করাই তুলনামূলকভাবে অনেক আরামদায়ক ছিল।
ঢাকা
২০ এপ্রিল ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৬১৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


