somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মায়াময় স্মৃতি, পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫….(৯)

২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

অষ্টম পর্বের লিঙ্কঃ পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)

১০ই জিলহজ্জ্ব তারিখে (০৬ জুন ২০২৫) সূর্যোদয়ের আগেই আমরা মুযদালিফা থেকে রওনা হয়ে সকাল সকাল ‘বড় জামারাত’ বা জামারাত আল আক্বাবায় গিয়ে ‘রামি’ করে, অর্থাৎ সাতটি পাথর নিক্ষেপ করে মিনায় প্রত্যাবর্তন করলাম। মাথার উপরে ছিল গনগনে সূর্য, মনে হচ্ছিল যেন মগজগুলো মাথার খুলি ঠিকরে বের হয়ে আসবে। পথের উভয় পার্শ্বে ৫০/৬০ গজ পর পর মুখমণ্ডলে ও মাথায় ঠাণ্ডা পানির স্প্রে করা হচ্ছিল। এতে সাময়িক কিছুটা আরাম হচ্ছিল বটে, তবে জুন মাসের সৌদি গরম মোকাবিলায় তা অপ্রতুল ছিল। ইতোমধ্যে আমাদের পশু কুরবানি হয়ে যাবার সচিত্র বার্তা এলো। আমরা একটা সেলনে গিয়ে আমাদের মাথামুণ্ডন করে এসে গোসল করে নিলাম এবং সাময়িকভাবে এহরাম পরিত্যাগ করে স্বাভাবিক পোষাক পরে নিলাম। এ পর্যায়ে এই ‘partial exit from Ihram’ বা এহরাম পরিধান হতে সাময়িক অবকাশ এর অনুমতি রয়েছে, তবে শর্ত থাকে যে একই দিনে পরে সুবিধেমত সময়ে মক্কায় গিয়ে ‘তাওয়াফ আল ইফাদাহ’ (হজ্জ্বের ফরয তাওয়াফ) ও সা’ঈ করতে হবে।

সম্ভাব্য সব সুবিধা অসুবিধার কথা বিবেচনা করে আমাদের দলনেতা (দেশি মুয়াল্লেম) ও অন্যান্য মুরুব্বিরা সাব্যস্ত করেছিলেন যে আমরা ঐদিন রাতে এশার নামাযের পরপরই পুনরায় এহরাম পরে হারাম শরীফে গিয়ে হজ্জ্বের ফরয তাওয়াফ ও সা’ঈ সম্পন্ন করবো। আমি আন্দাজ করতে পেরেছিলাম যে এটা পালন করতে গিয়ে আমাদের সারা রাত পার হয়ে যেতে পারে। কারণ, সেটা ছিল হজ্জ্বের পূর্ণতার দিন ও রাত। বিশ লক্ষাধিক হাজ্জ্বীর মধ্যে প্রায় সকল হাজ্জ্বীই ঐ সময়ে ‘তাওয়াফ আল ইফাদাহ’ ও সা’ঈ করার জন্য মক্কায় উপস্থিত থাকবেন। ফলে, চলাচলের সুবিধা সীমিত হয়ে পড়বে, স্বাভাবিকের চেয়ে চলাচলের সময় অনেক বেশি লাগবে। লক্ষাধিক হাজ্জ্বীর সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটার কারণে সময় ৩/৪ গুণ বেশি লাগবে। মূল হারাম শরীফ প্রাঙ্গণে ঠাঁই পাওয়া দুষ্কর হবে, উপরের তলায় যত উপরে ওঠা হবে, একেকটি তাওয়াফের পরিধি ততই বৃ্দ্ধি পাবে। হাঁটার কদম সংখ্যাও নিচের প্রাঙ্গণের চেয়ে ৩/৪ গুণ বৃ্দ্ধি পাবে। এসব সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখে তাই সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত আমি এবং আমার স্ত্রী নামাযের সময় ব্যতীত পর্যাপ্ত ঘুম দিয়ে নিলাম।

আমি যা ভেবেছিলাম, ঠিক তাই হলো। আমাদের বাস হারাম শরীফ থেকে বেশ কিছুটা দূরেই আমাদেরকে নামিয়ে দিল, কারণ সৌদি পুলিশ আশেপাশের রাস্তাগুলো বাসের জন্য বন্ধ করে দিয়েছিল। ফলে বিভিন্ন দিক থেকে পায়ে হাঁটা জনস্রোত কা’বা শরীফের দিকে ধাবিত হচ্ছিল। আমাদের গ্রুপে বিভিন্ন বয়সের হাজ্জ্বী ছিলেন, যাদের বয়স ৩০-৩৫ থেকে ৬০-৭০ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। তাই আমাদের দলনেতা (দেশি মুয়াল্লেম) জনাব আব্দুল্লাহ আল মাহবুব শাহীন শুরু থেকে সম্মিলিত তাওয়াফের আগে একটা বিষয়ের উপর খুব জোর দিতেন। সেটা হলোঃ আমরা কেউ কাউকে পেছনে ফেলে নিজেরা অগ্রসর হবো না। আমরা কনুইবদ্ধ হয়ে একসাথে প্রতিটি পদক্ষেপ নিব। এটা কঠোরভাবে মেনে চলা কঠিন ছিল। মাঝে মাঝে বন্ধন ছুটে গিয়েছিল, কিন্তু তারপরেও আমরা কাছাকাছি ছিলাম, একে অপরের দৃষ্টিসীমার মধ্যে ছিলাম এবং সময় সূযোগমত পুনরায় কনুইবদ্ধ হয়েছিলাম।

আমরা সবাই একাগ্রচিত্ত ছিলাম কী করে হজ্জ্বের এই ফরয তাওয়াফ (তাওয়াফ আল-ইফাদাহ) ও ওয়াজিব সা’ঈ নির্ভুলভাবে সম্পন্ন করা যায়। হারাম শরীফে প্রবেশ করেই আমাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করার চেষ্টা করি কা’বা ঘরের প্রতি, কিন্ত কা’বা ঘরকে শুধু দূর থেকেই দেখে গিয়েছি, অত্যধিক ভিড়ের কারণে নিকটে যাবার কোন উপায় ছিল না। আমাদের চেষ্টা ছিল, দূর থেকে হোক, আমরা আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপ ধীরে সুস্থে নিব, কোথাও তাড়াহুড়ো করবো না। সাতবার তাওয়াফের মাঝে শরীর ক্লান্ত হয়ে গেলে স্লো ডাউন করেছি, দোয়া দরুদ পড়েছি, সাথে রাখা জমজমের পানি পান করেছি। সাতবার তাওয়াফ শেষ হয়ে যাবার পর আরও কিছু করণীয় থাকে, সেগুলো করেছি (যেমন মাকা’মে ইব্রাহীমে দু’রাকাত নফল নামাজ পড়ে দোয়া দরুদ পড়া)। তাওয়াফ শেষে ক্ষণিকের তরে বিশ্রাম নিয়ে ওয়াশরুমের কাজ ইত্যাদি শেষ করে রওনা হয়েছি সা’ফা পাহাড়ের উদ্দেশ্যে, সা’ঈ করার জন্য। তীর্থযাত্রীদের এত বিরাট জনস্রোতের ক্ষুদ্র একটি অংশ হিসেবে কাফেলার সাথে পায়ে পায়ে হেঁটে সা’ফাতে পৌঁছাতেও অনেক সময় লেগে গেলো। সা’ঈ শেষ করে আমরা কা’বা প্রাঙ্গণে পুনরায় প্রবেশ করলাম। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে নিতে ফজরের নামাযের সময় হয়ে গেল। সারা রাত এভাবে ফরজ ইবাদতে কেটে গেল। তবুও, দিনের প্রখর রৌদ্রতাপের মধ্যে এই ইবাদতসমূহ পালনের চেয়ে রাতের বেলায় পালন করাই তুলনামূলকভাবে অনেক আরামদায়ক ছিল।

ঢাকা
২০ এপ্রিল ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৬১৬

সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ বিকাল ৩:৩৭
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

প্রধানমন্ত্রী বিদেশে, আইনও কি সঙ্গে নিয়ে গেছেন ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ২:০৬


প্রধানমন্ত্রী বিদেশ সফরে গেলেই দেশ অশান্ত হয়ে ওঠে । সালাহউদ্দিন আহমেদের মতো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী থাকতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে কেন? প্রধানমন্ত্রী দেশের বাইরে থাকলেই কিছু নেতাকর্মী যেন নিজেদের দেশের... ...বাকিটুকু পড়ুন

৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:৪৪


৫ আগস্টের সেই ভিডিও, কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন এবং ইতিহাসের নির্মম পরিণতি

ক্ষমতার পালাবদল হয়, কিন্তু ইতিহাসের কাঠগড়া কখনো খালি থাকে না
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নাটকীয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

তখন

লিখেছেন সাইফুলসাইফসাই, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১১:৫৬

তখন
সাইফুল ইসলাম সাঈফ

তখন আলিফ লায়লা হতো
দেখতাম বিটিভিতে বাংলা মুভি
মিনা কাটুন, হারকিউলিস, রবিন হুড
নাটক, ইত্যাদি, বেশ আনন্দ পেতাম।
খেলাধুলা করতাম বন্ধুদের সাথে
বিবিধ রকম, সবসময় থাকতাম প্রাণবন্ত!
যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম তাদের
একটি সাদা-কালো টিভি... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাওকে নিয়ে চীনের আবেগ, শেখ মুজিবকে নিয়ে আমাদের বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২২


ফরাসি ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পেকে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকারে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তাঁকে নিয়ে কোন মিমটি দেখে সবচেয়ে বেশি হাসি পেয়েছিল। ফরাসি অনুষ্ঠান The Bridge এর ব্যাকস্টেজ ভিডিওতে তিনি বলেন, একটি... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোটগল্প - চক্ষুহীন লোকটি

লিখেছেন ফাহমিদা বারী, ৩০ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৩




মি পারসনস যখন হোটেল থেকে বের হলেন, ভিক্ষুকটি তখন রাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে।

সে ছিল একজন অন্ধ ভিক্ষুক। অন্ধদের চিরাচরিত সাদা ছড়ি ছিল তার হাতে। সেটা দিয়ে সামনের পথটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×