somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫ এর মায়াময় স্মৃতি….(৮)

১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ১২:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সপ্তম পর্বের লিঙ্কঃ মায়াময় স্মৃতি, পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫….(৭)

আমরা ০৯ জিলহজ্জ্ব/০৫ জুন রাত সাড়ে দশটার দিকে মুযদালিফায় পৌঁছলাম। বাস থেকে নেমেই অযু করে একসাথে দুই ইকামায় মাগরিব ও এশার নামায পড়ে নিলাম। নামাযে ইমামতি করেছিলেন আমাদের দলেরই একজন, লন্ডন থেকে আগত জনাব নাসিম, পিতা আবু যাফর। তার পর হাল্কা কিছু খেয়ে নিয়ে যে যার মত করে পরেরদিন সকালে জামারাতে নিক্ষেপের জন্য ছোট ছোট পাথরখণ্ড সংগ্রহ করে আলাদা করে তিনটি ছোট খালি পানির বোতলে ঢুকিয়ে রাখলাম। মিনায় হজ্জ্বের পরে দুইদিন অবস্থান করলে মোট ৪৯টি পাথরের প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোন কারণে তিনদিন অবস্থান করতে হলে আরও ২১টি, অর্থাৎ মোট ৭০টি পাথরখণ্ডের প্রয়োজন হয়। সম্ভাব্য পরের পরিস্থিতিটা সামলানোর লক্ষ্যে আমরাও একেকজন মোট ৭০টি করেই পাথরখণ্ড সংগ্রহ করেছিলাম। উল্লেখ্য যে পাথরগুলোর আদর্শ সাইজ হলো শিমের বিচির সমান। এর চেয়ে বড়-ছোট হলে হাতের মুঠিতে ধরে রাখতে এবং নিক্ষেপ করতে অসুবিধে হয়। কাছাকাছি উচ্চভূমিগুলোর পাদদেশে গিয়ে এই সাইজের পরিষ্কার পাথর যথেচ্ছ সংখ্যক সংগ্রহ করা যায়। কোন ওয়াশরুমের নিকটবর্তী এলাকা থেকে পাথর সংগ্রহ না করাই উত্তম। কোন পাথরের গায়ে ময়লা লাগা থাকলে সেটাকে ধুয়ে নিতে হবে; না থাকলে সেটাকে পরিষ্কার পাথর হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে।

পাকা রাস্তার একপাশে বাসগুলো লাইন করে পার্কিং করে রাখা ছিল, অপর পাশে হাজ্জ্বী সাহেবগণ যে যার মত করে একটা কাপড়ের চাদর অথবা পাতলা সতরঞ্চি (স্লীপিং ম্যাট) বিছিয়ে শুয়ে পড়লেন। মুযদালিফায় একটি রাত “খোলা আকাশের নিচে” ঘুমানো/বসে থাকা/ বিশ্রাম নেয়া হজ্জ্বের একটি পূর্বশর্ত। হাজ্জ্বী সাহেবগণ জাগ্রত প্রতিটি মুহূর্তই ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। তাই আমরা সবাই সবসময় সতর্ক থাকতাম যেন কেউ কারও অসুবিধা বা বিরক্তির কারণ না হই। অনেকে না শুয়ে হাতে বহন করা চেয়ার-কাম-ওয়াকিং স্টিক এ বসে নীরবে স্রষ্টার ক্ষমা প্রার্থনায় মগ্ন হলেন। শুধুমাত্র বাসচালকগণ ও তাদের সহকারীগণ বাসে বসে এসি চালিয়ে ঘুমিয়ে গেলেন। তাদের মাত্র দুই/ তিনজনের জন্য প্রতিটি বাসের এসি’র ঘরঘর শব্দের মাঝেই হাজ্জ্বীগণ ঘুমাতে/ বিশ্রাম নিতে বাধ্য হলেন। আমিও রাতের ওয়াশরুমের কাজ সেরে অযু করে এসে মাগফিরাতের দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে এক কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরেই ঘুমে চোখ বুঁজে এলো।

মুযদালিফা মক্কার নিকটবর্তী, মিনা’র দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত চার কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খোলা উপত্যকা। এলাকাটির ক্ষেত্রফল ১২.২৫ বর্গ কিলোমিটার। এলাকাটি আরাফাত পাহাড় ও মিনা’র মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। আরাফাত ও মিনা’র মত এখানে কোন তাবু’র ব্যবস্থা নেই; খোলা আকাশের নিচেই হাজ্জ্বীগণকে এখানে রাত কাটাতে হয়। শরীর ক্লান্ত থাকায় বাস ও মানুষের চলাচলের শব্দ সত্ত্বেও আমার ঘুমের কোন ব্যাঘাত ঘটেনি। এক সময় আমার ছেলে আমাকে ডেকে তুলে বললো, কিছুক্ষণের মধ্যেই ওয়াশরুমে ও অযুখানায় লম্বা লাইন পড়ে যাবে। আমি যেন তাড়াতাড়ি অযু করে এসে তাহাজ্জুদ ও ফজরের নামাজের জন্য তৈ্রি হয়ে নেই। দ্রুতই তার কথাটা সঠিক প্রমাণিত হলো। অযু করতে করতেই দেখলাম ভীড় অনেকটা বেড়ে গেছে। তাহাজ্জুদের পর ফজরের ওয়াক্তের জন্য অপেক্ষা করতে থাকলাম। ওয়াক্ত হলে উপস্থিত সবাই জামাতবদ্ধ হয়ে ফজরের নামায পড়ে নিজ নিজ বাস সন্ধান করে বাসে উঠে বসলাম। প্রতিটি স্টপেজে সব হুজ্জ্বাজগণকে একত্রিত করে শৃঙ্খলার সাথে বাসে উঠানো ও নামানোর দায়িত্বটা আমাদের মোয়াল্লেম জনাব আব্দুল্লাহ আল মামুন শাহিন সুচারুরূপে পালন করেন। তিনি শৃঙ্খলার সাথে আপোষ করেন নাই, আবার তার আচরণে বিনয় ও শিষ্টাচারেরও অভাব ছিল না। বিশেষ করে বয়স্কদের প্রতি তিনি বেশ যত্নবান ছিলেন।

সূর্যোদয়ের পূর্বেই মুযদালিফার সীমানা ত্যাগ করা আবশ্যক। বাসচালক সে হিসেব কষেই বাস চালানো শুরু করলো। বহু হাজ্জ্বী যানজটে আটকা পড়ার ভয়ে পোটলা পুটলি বাসে রেখে পদব্রজেই রওনা দিলেন। মুযদালিফার সীমানা ত্যাগ করার সময় মনটা মোচড় দিয়ে উঠলো এই ভেবে যে আবার কি কখনো এখানে আসা হবে? প্রায় বিশ পঁচিশ লক্ষ হাজ্জ্বী একসাথে একই গন্তব্যের দিকে অগ্রসর হচ্ছেন, যানজট ও জনজট তো লাগারই কথা; তা ট্রাফিক সিস্টেমকে যতই উন্নত করা হোক না কেন! তাই আমাদেরকেও গন্তব্যের নিকটবর্তী হবার অনেক আগেই বাস ছেড়ে নেমে আসতে হলো। ততক্ষণে রোদ বেশ চাড়া দিয়ে উঠেছে। জনস্রোতের সাথে মিশে আমরা ধীরে ধীরে ‘বড় জামারাত’ বা জামারাত আল আক্বাবা এর দিকে এগোচ্ছি। কাছাকাছি এলে সাতটি পাথরখণ্ড বোতল থেকে বের করে হাতের মুঠিতে নিলাম। যতই জামারাতের নিকটবর্তী হচ্ছিলাম, ততই মানুষের মাঝে পাথর নিক্ষেপের উত্তেজনা বেড়ে যাচ্ছিল। অনেকে অনেক দূর থেকে পাথর নিক্ষেপ করছিল, ফলে সেগুলো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে মানুষের গায়ে গিয়ে পড়ছিল। আমরা কয়েকজন সে উত্তেজনা দমন করে জামারাতের একেবারে নিকটে গিয়ে সঠিকভাবে লক্ষ্যস্থির করে পাথর নিক্ষেপ করলাম। ফলে পাথরের কোন অপচয় হয় নাই, আমাদের ছোঁড়া পাথর অন্য কারও গায়েও পড়েনি।

জামারাত থেকে ফেরার পথে খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। ফলে বিশ্রাম নেয়াটা আবশ্যকীয় হয়ে উঠেছিল। এর পরবর্তী কাজ আপাততঃ দুটো ছিলঃ পশু কুরবানি করা ও তারপর নিজের মাথা মুণ্ডন করা। এ দুটো কাজ করার পর ইচ্ছে করলে গোসল করে এহরাম পরিত্যাগ করে স্বাভাবিক পোষাক পরিধান করা যায়। একই দিনে পরে সুবিধেমত সময়ে মক্কায় গিয়ে হজ্জ্বের ফরয তাওয়াফ ও সা’ঈ করতে হয়। বিশ্রাম নিতে নিতে আমাদের কাছে খবর আসলো যে আমাদের পশু কুরবানি হয়ে গেছে। এই খবর পাওয়ার পর আমরা তিন/চারজন মিলে রওনা হ’লাম কোন একটা সেলনের উদ্দেশ্যে, মাথামুণ্ডনের জন্য। একই দিনে কাছাকাছি সময়ে প্রায় বিশ পঁচিশ লক্ষ হাজ্জ্বী মাথামুণ্ডন করবেন, তাই প্রতিটি সেলনের সামনে স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ লাইন ছিল। আজকের এই দিনটির জন্য মক্কা ও মিনা’র ক্ষৌরকারগণ মুখিয়ে থাকে। সারা বছরে তারা যা আয় করে, তার সিংহভাগ অংশ আসে এই কয়েকটি দিনে হাজ্জ্বীদের মাথামুণ্ডন বাবদ আয় থেকে। তাই স্বাভাবিকের চেয়ে বহুগুণ বেশি মূল্য চুকিয়ে আমরা ‘আজিজিয়া’য় ফিরে এলাম। সেখানে এহরাম পরিত্যাগ করে গোসল করে নিয়ে স্বাভাবিক পোষাক পরে কাছাকাছি একটা তুর্কী হোটেলে গিয়ে লাঞ্চ করলাম।

ঢাকা
১৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
শব্দ সংখ্যাঃ ৮২৫

নবম পর্বের লিঙ্কঃ মায়াময় স্মৃতি, পবিত্র হজ্জ্ব- ২০২৫….(৯)
সর্বশেষ এডিট : ২১ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ১১:২৫
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ পাঠের সওয়াব

লিখেছেন শিমুল মামুন, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৪৬


লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ। গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল। এর ফজিলত ও সওয়াব অনেক বেশি। আমলটি করার ব্যাপারে হাদিসে অনেক বর্ণনা এসেছে।

সাগরের ফেনা পরিমাণ গুনাহ মাফ হয়
আবদুল্লাহ ইবনে আমর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সী পার্ল এবং চারপাশ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। সূর্য তখনও জাগেনি। ব্যালকুনিতে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন। সামনে সাগর আপনমনে ঢেউ তুলে নাচছে। একজন মানুষও নাই সাগরপাড়ে। এমন নিরিবিলি সাগরপাড়ই চেয়েছিলাম। যেখানে পুরোটাই আমার থাকবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয়

লিখেছেন এমএলজি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪০

= ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয় =

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া (NVIDIA)-তে কর্মরত, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানী ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

হয় না দেখা আর

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩৩


কতদিন হলো, হয় না দেখা
রঙধনু মেলা, শীত কাটে না
আর ঐশ্বর্য উষ্ণ বেলা
চঞ্চলতায় টিপুটিপু খেলা;
বিস্মৃতির পাতায় ডুবে যাচ্ছে
চাঁদ না দেখার আর্তনাদ,
ভেঙ্গে পরেছে অমোঘ
অপেক্ষায় দীর্ঘশ্বাস ঘুণ ধরেছে
নুনে পরেছে সময়ের ছলনা
মুখ ফিরেছে বাতাসের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×