somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাসিকর, মূল: হাইনরিখ ব্যোল, জার্মান থেকে অনুবাদ: তীরন্দাজ

১৪ ই জানুয়ারি, ২০০৭ সকাল ৭:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


কেউ যদি আমাকে আমার পেশা কি জানতে চায়, বেশ লজ্জায় পড়ে যাই। এ প্রশ্নের উত্তরে মুখে কোন কথা যোগাতে চায় না, যদিও আমি যৌক্তিক কথার মানুষ হিসেবেই পরিচিত। আমি সেসব লোকদের হিংসা করি, যারা সরাসরি বলতে পারে, সে এক রাজমিস্ত্রী, নাপিত বা হিসাবরক্ষক। লেখকদের প্রতি আমার হিংসা, তাদের নামের সহজসাধ্যতার কারণে। এই প্রতিটি পেশার ক্ষেত্রেই পরিচয় ও বড় কেন বিবরণ দিতে হয়না। কিন্তু এ ধরণের প্রশ্নের উত্তরে আমি বাধ্য হই বলতে, 'আমি একজন হাসিকর'। পরপরই দ্বিতীয় প্রশ্ন, 'এটা কি আপনার জীবিকা'? যখন দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তরে সত্যি বলার জন্যে 'হ্যা' উত্তর দিতে হয়, তখন আরো কিছু প্রশ্নের অবতারণা ঘটে । আমার হাসি দিয়েই বেশ ভালভাবেই জীবন চালাই এবং অর্থনৈতিক বিচারে বলা যেতে পারে, এ হাসির বাজারও বেশ ভাল। আমি একজন ভাল ও দক্ষ হাসিকর, আমার মতো ভাল আর কেউই হাসতে পারে না, কেউই হাসির খুটিনাটি সুক্ষতা আমার চেয়ে ভাল জানেনা। অযাচিত প্রশ্ন থেকে নিজেকে বাঁচানোর জন্যে, বহুদিন ধরে নিজেকে অভিনেতা বলে পরিচয় দিতাম। কিন্তু আমার চেহারায় ও বাচনভঙ্গীতে অভিনয়ের পরিস্ফুটন এতোই কম যে, এ পরিচয় নিজের কাছেই সত্যি বলে মনে হতো না। আমি সত্যবাদী ও সত্যটি এই যে, আমি একজন হাসিকর, ক্লাউন নই, কৌতুকঅভিনেতাও নই। আমি লোকজনকে আনন্দ দিতে পারিনা, তবে আনন্দের পটভুমিকা তৈরী করতে পারি। আমি এক রোমান সম্রাটের মতো হাসতে পারি, প্রয়োজনে হাসতে পরি এক স্পর্শকাতর ছাত্রের মতো। উনিশশো শতাব্দীর হাসিতে আমি যেমন পটু, তেমনি পটু সতেরশো শতাব্দীর হাসিতেও। যদি প্রয়োজন হয়, তাহলে আমি প্রতিটি শতাব্দীর, প্রতিটি সামাজিক শ্রেনীর, প্রতিটি বয়েসের হাসি হাসতে পারি। জুতোর শুখতলা লাগানো যেমন ভাবে শিখতে হয়, হাসিও আমি তেমনি শিখেছি। আমেরিকার হাসি তার বুকের মাঝে আছে, আফ্রিকার হাসির বিভিন্ন রং, সাদা, লাল, হলুদ। আমাকে পয়সা দিলে পরিচালক যেমন চাইবেন, তেমনিই হাসব।

আমি প্রায় অপরিহার্য হয়ে পড়েছি, গ্রামোফোন রেকর্ডে হাসি, টেপেও হাসি। রেডিওতে নাটকের পরিচালকদের আমার দিকে নজর খুব। আমি বিষাদের হাসি হাসি, প্রশ্রয়ের হাসি হাসি। কখনো হাসি ট্রামচালকের মতো, কখনো খাবারের দোকানের শিক্ষানবীসের মতো। কখনো সকালের হাসি, কখনো বিকেলের হাসি, কখনো বা রাতের, কখনোবা গোধুলিলগ্নের। মোদ্দা কথা হচ্ছে, যখন যেভাবে হাসা দরকার, তা আমি অবলীলায় হেসে দিই প্রতিবারই।

আমার এই পেশা যে যথেষ্ট পরিশ্রমের, আশা করি তা বিশ্বাস্য। তাছাড়া আমার বিশেষ ক্ষমতায়, যাকে 'ছোয়াঁচে হাসি' বলে আখ্যা দেয়া যেতে পারে, ভীষন দক্ষ আমি। বিশেষ করে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেনীর কৌতুকঅভিনেতারা যখন অভিনয়ের সময় স্বাভাবিকভাবেই চুড়ান্ত সাফল্যে পৌছানোর জন্যে ভয়ে কাঁপতে থাকেন, তখনই আমাকে ছাড়া চলে না তাদের। আমি প্রায় প্রতি সন্ধ্যাতেই ভেরাইটি শো গুলোতে এক কোনে চুপচাপ বসে থাকি, ও দুর্বল মূহুর্তগুলোতে আমার তথাকথিত ্তুছোঁয়াচে হাসি্থ হেসে দিই। খুব মেপেঝুকে করতে হয় তা, একটু আগে বা পরে হলে একেবারেই চলবে না। একেবারে সঠিক সময়ে পরিকল্পনামাফিক হাসিতে ভেঙ্গে পড়ি আমি। সমস্ত দর্শকরাও হাসির সোরগোল তোলে ও তাতেই পার পেয়ে যায় অভিনেতার চুড়ান্ত মূহুর্ত।

তারর সন্তর্পনে পোষাক পাল্টানোর ঘরে গিয়ে ওভারকোটটি পড়ি, অবশেষে কাজের ছুটি ভেবে আনন্দিত মনে বেরিয়ে পড়ি। বেশীভাগ ক্ষেত্রেই বাড়ীতে পৌঁছেই টেলিগ্রাম পাই, ্তুহাসার জন্যে আপনাকে জরুরী প্রয়োজন। মঙ্গলবার রেকর্ড করা হবে্থ। কয়েক ঘন্টা পরেই আমাকে নিজের ক্ষমতাকে অভিশাপ দিতে দিতে ট্রেনে চড়তে হয়।

সবাই বুঝতে পারবেন নিশ্চয়ই যে, আমি ছুটির দিনে না কোথাও বেড়াতে গেলে হাসতে খুব একটা আগ্রহী হই না। যে দুধ দোয়ায়, সে গরুকে ভুলতে পারলে খুশী হয় আর রাজমিস্ত্রী খুশী হয়, যদি সে ইট-সুড়কী ভুলতে পারে। কাঠমিস্ত্রীর বাড়ীর দরজাই সবচেয়ে ত্রুটিপূর্ণ, তার সব ড্রয়ারই টেনটুনে খুলতে হয়। ময়রা ভালবাসে টক শশার আচার, কশাই ভালোবাসে মিষ্টির গোল্লা। রুটিওয়ালার রুটির চেয়ে মাংসের বেশী ঝোঁক। পেশাদার হিসেবে ষাড়ের সাথে যারা যুদ্ধ করে, অবসরে তারা পোষে কবুতর। মুষ্টিযোদ্ধারা শিশুদের নাকে রক্ত দেখলে ভয়ে সাদা হয়ে যায়। আমি নিজেও এসব ভাল টের পাই, কারণ কাজের শেষে হাসি না কখনোই। আমি একজন গম্ভীর ধরণের মানুষ ও লোকে আমাকে সেজন্যে হতাশাবাদী আখ্যা দেয়।

আমাদের বিবাহিত জীবনের প্রথমদিকে আমার স্ত্রী আমাকে প্রায়ই বলতো, 'হাসো না একবার'! কিন্তু এতদিনে সে বুঝে নিয়েছে যে, তার এই অভিলাস পূরণের সাধ্য আমার নেই। আমি তাতেই খুশী হই, যদি আমার পরিশ্রান্ত চেহারার ছাপ, উত্তেজিত মেজাজ খুব সতর্কতার সাথে ঠান্ডা করতে পারি। অন্যদের হাসিও বিরক্ত করে আমাকে, কারন তা আমাকে আমার পেশার কথা মনে করিয়ে দেয়। এভাবেই আমরা একটা শান্তিপূর্ন, শান্ত জীবন যাপন করি, কারণ আমার স্ত্রীও হাসতে ভুলে গিয়েছে। মাঝে মাঝে ওকটু মুচকি হেসে আমার হাতে ধরা পড়ে সে, তখন আমিও মুচকি হাসি। আমরা খুব কম আওয়াজে কথা বলি, কারন 'ভেরাইটি শো' ও 'রেকর্ডিং রুম' এর শোরগোলকে ঘৃণা করি আমি।

যে মানুষ আমাকে ভাল চেনেনা, তারা আমাকে একজন তালাবন্ধ মুখের মানুষ হিসেবে ভাবে। হয়তো আমি সেরকমই, কারণ পেশার হাসির জন্যে বেশ ঘনঘনই মুখ খুলতে হয় আমার।

ভাবলেশহীন চেহারা নিয়ে জীবনের পথে চলছি আমি। মাঝে মাঝে, কদাচিৎ মৃদু হাসিকে প্রশ্রয় দিই। মাঝে মাঝে ভাবি, আমার পুরো জীবনে একবারও হেসেছি কি না। আমার মনে হয় না। আমার সহোদররা নিশ্চয়ই বলবে যে ছোটবেলা থেকেই এক গম্ভীর বালক ছিলাম আমি।

বিভিন্ন ধরণের হাসি আমি হাসি, অথচ আমার নিজের হাসি কেমন, সেটাই জানা হলোনা আমার।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০
১০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

অপারেশন ইকারুস: বালির নীল গোলকধাঁধা

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:১২



কুয়ালালামপুর অপারেশনের ঠিক সাতদিন পর। ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপের ‘নগুরা রাই’ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে যখন একটি প্রাইভেট চার্টার্ড বিমান ল্যান্ড করল, তখন বালির আকাশ জুড়ে গোধূলির রক্তিম আলো।

বিমান... ...বাকিটুকু পড়ুন

যদি কামের কাম না হয়, সংখ্যা দেখলে বিগাড় ওঠে

লিখেছেন অপলক , ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:২২



বগুড়া জিয়াউর রহমান মেডিকেল বর্তমানে ৫০০ শয্যা বিশিষ্ট। এতেই রুগিরা সেবা পায়না, অপরিচ্ছন্ন, লোকবল নেই, যন্ত্রাংশ নষ্ট, ওষূধ নেই, ১৫০০ শষ্যাবিশিষ্ট করে লাভ কি? সেবা নিশ্চিত হবে না...

এখন ডাক্তাররা... ...বাকিটুকু পড়ুন

তুমি কার জন্য বাঁচো? কীভাবে এ-আই দিয়ে কভার সং তৈরি করি?

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৩৩

প্রথমত, এ-আই দিয়ে গান তৈরি করা অনেক সহজ। আপনি নিজে কোনো লিরিক না লিখে, কোনো সুর তৈরি না করেও এ-আই-তে প্রম্পট দিয়েই গান তৈরি করে ফেলতে পারেন। তবে সেটা আপনার... ...বাকিটুকু পড়ুন

পলাশবাড়ীর মূর্তি বিতর্ক, ধর্মীয় স্থাপনার আড়ালে কি অন্য কোনো নীলনকশা?

লিখেছেন ওয়াসিম ফারুক হ্যাভেন, ২০ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ২:১৪

সাম্প্রতিক ভূরাজনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার সমীকরণে হাইব্রিড ওয়ারফেয়ারবা অপ্রতিসম যুদ্ধকৌশল এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যার প্রধান লক্ষ্যবস্তু রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ফাটল ও অননুমোদিত কাঠামোর মাধ্যমে মানুষের মনস্তত্ত্ব নিয়ন্ত্রণ করে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভালো লাগে

লিখেছেন আরমান আরজু, ২০ শে জুন, ২০২৬ রাত ৮:৪৮
×