somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

মৃত প্রজাপতির রূপকথা

০৬ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৪:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সারা ঘরময় উড়ছে প্রজাপতি। এখান থেকে সেখানে, আবার আগের জায়গায়। একবার উচুতে, আরেকবার ঢেউএর দোলায় যেন একটা নীচুতে, বাতাসের শরীর ভালবেসে বেসে।

প্রজাপতি উড়ে এসে আলতো শরীরে বসল দু:খিনি মায়ের কাঁধে। মায়ের পাশের তার কাধে হেলান দিয়ে বসে থাকা কিশোরীর চোখে স্ফটিকের মতো জল, কিন্তু বুকের ভেতরে আষাঢ়ের কান্না।
- মা, বাবাকে আরো একবার বল।
মায়ের চোখেও কান্না, বিষাদের কালো কঠিন দেয়াল। মেয়ে মুখের দিকে বিষাদ মোড়ানো দৃষ্টি রাখলেন।
- মা গো মা, কিছু বল মা!
মা শাড়ীর আঁচলে মুখ মুছলেন। মেয়ে ঘন কালো এলোমেলো চুলে হাত বুলিয়ে দিলেন পরম মমতায়।
- তোর বাবার তো আর কোন পথ নেই মা।
- কেন নেই! রহিম আখন্দের সাথে বিয়েতে মত না দিলেই হলো।
- রহিম আখন্দ ধারের টাকা ফেরত চেয়েছে। বিয়ে না দিলে বাড়ীঘর সব নীলামে চড়াবে। তোদের সবাইকে নিয়ে তো পথে বসবো আমরা।
- এজন্যে তোমরা আমাকে এই বুড়ো বদমাসের সাথে বিয়ে দেবে?

মায়ের মুখে কোন উত্তর জোগালো না। টপ টপ করে অশ্রু ঝরে পড়লো মেয়ের মসৃণ কাঁধে। মায়ের কান্না দেখে এবার ডুকরে কেঁদে উঠলো অভিমানী মেয়ে।

প্রজাপতি আবার উড়লো। ঘরময়, এদিক সেদিক। একবার বসলো ভাঙ্গা আয়নার সামনে পড়ে থাকা চিরুনীর গায়ে। তারপর সেখান থেকে উড়ে বসলো বিছানার উপরে সযত্নে শুইয়ে রাখা অনেক দিনের পুরানো পুতুলটির গায়ে। মতিমহলের আড়ং থেকে মেয়ের জন্যে কিনে এনেছিলেন বাবা। পুতুলটির মাথায়, মুখে, নিজের শরীরের নরম আদর জানিয়ে অতীতের পথ বেয়ে বারান্দায় উড়ে এলো প্রজাপতি। দাওয়ায় বনে আছেন বাবা শুন্য দৃষ্টিতে বাইরের দিকে তাকিয়ে। চৈতের খরদাহ। প্রকৃতি আগুনের লোলিহান শিখা হয়ে কোন এক বিধ্বংসী ধ্যনে মগ্ন। বাবার মাথায় উড়ে বসলো প্রজাপতি। ঘর থেকে আলুথালু পোষাকে বেরিয়ে এলেন মা।

- আমার মেয়েকে বাঁচাও, তোমার পায়ে পড়ি!

কোন উত্তর না দিয়ে শুন্যের দিকে তাকিয়ে রইলেন বাবা। বুকের ছাউনীর ভেতরে যে আগুন, চৈতের খরদাহ ও হার মানবে সে আগুনের কাছে।

- গাঁয়ের সবাই তো রহিম আখন্দের কাছে টাকা ধার নেয়। তুমি তোমার মেয়ের জন্যে নিতে পারবে না?
- নিতে তো পারি। চড়া সুদ, ভিটেমাটি সব বন্ধক দিতে হবে যে। শোধ না করতে পারলে তো পথে বসতে হবে ছেলেমেয়ে নিয়ে।
- সেটা আমি জানিনা। আমার মেয়েকে বাচাও। শহরের হাসপাতালে ভর্তি করাও।

বলেই বাবার পায়ের উপর পড়লেন দু:খীনি মা। আদরের বউকে পায়ের কাছ থেকে সরিয়ে অসুস্থ মেয়ের বিছানার কাছে বসিয়ে ছাতাটি হাতে নিয়ে রহিম আখন্দের বাড়ীর দিকে রওয়ানা হলেন বাবা। ওদের মাঝে কি কথা হলো, তা জানতে পেল না প্রজাপতি। রহিম আখন্দের নি:চ্ছিদ্র পাহাড়া পেরিয়ে সেখানে প্রবেশের সাধ্য প্রজাপতিরও ছিল না।


বড় ডাক্তার এলেন, মেয়েকে শহরের বড় হাসপাতালে ভর্তি করা হলো। দু’মাস হাসপাতালে থেকে সুস্থ হয়ে ফিরে এলো মেয়ে। প্রজাপতি এদিক সেদিক উপর নীচ ঢেউ মতো উড়ে উড়ে সব ঘটনার সাক্ষী হয়ে রইল।

সানাই বাজছে বৃষ্টিধারার মতো। প্রজাপতি উড়ে নেচে বেড়াচ্ছে সে সানাইএর তালে তালে। রহিম আখন্দের মনের ভেতরের কুৎসিত আনন্দ তার শেরওয়ানীর চমক ছাপিয়ে পুরোনো, পঁচা তেলের মতো গলে পড়ছে এদিক সেদিক। গ্রামের মাতবর মোল্লাদের পানের পিকের দুর্গন্ধে বাতাসও অসহনীয়। এর মাঝে চলছে ধর্মকথা, ধর্মলোচনা বাজারী বেশ্যার মতো। মাতবর মোল্লাদে ও তাদের চামচাদের ফোকলা দাঁতের অশ্লীল হাসিতে বাতাসও যেন তার শ্লীলতা হারিয়ে ফেলেছে।

অশ্লীলতার এতো বেশী কাছাকাছি, তাই নি:শ্বাস ভারী হয়ে এলো প্রজাপতির। রংধনু রঙ্গে আঁকা পাখাগুলোর শরীরে জেকে বসলো কোন এক দাঁতালো শুয়োর। বেহালার করুন কান্না হাজারো দৈত্যের অট্টহাসি হয়ে একসময় স্তব্ধ হয়ে গেল। একসময় এলিয়ে পড়ল প্রজাপতি, নিথর হয়ে পড়ে রইল মাটিতে।

বিয়ের রাতেই তিন বউ থাকা সত্বেও প্রথমবারের মতো বিপত্নিক হলো রহিম আখন্দ।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই মে, ২০০৭ বিকাল ৪:৫৩
১৪টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৮:২৯

বাংলাদেশ কি অন্যের যুদ্ধ লড়বে, নাকি নিজের দেশকে আগে রক্ষা করবে?
============================================
সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্কের মধ্যে যে নতুন যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি হয়েছে, সেখানে বাংলাদেশকে যুক্ত করার আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের পক্ষ... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃশ্যমানতা এখন একধরনের পুঁজি

লিখেছেন মুনতাসির, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:০০

মানুষ শুধু অর্থ উপার্জনের জন্য কনটেন্ট নির্মাতা হতে চাইছে না। দৃশ্যমানতা নিজেই এখন একটি মূল্যবান সামাজিক সম্পদে পরিণত হয়েছে।

অনুসারীর সংখ্যা একজন মানুষকে পরিচিতি, আমন্ত্রণ, প্রভাব, গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের কাছে প্রবেশাধিকার, বাণিজ্যিক... ...বাকিটুকু পড়ুন

।। রাশিয়ার মতো বাংলাদেশে হামলা করুক ভারত।।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ৯:১২


আমি আজ পর্যন্ত আম্লিগে কোন ভালোমানুষ খুঁজে পাইনি। আম্লিগ মানেই ইয়ের বাচ্চা। আম্লিগ মননে মগজে ধর্ষক, লুন্ঠনকারী, দেশদ্রোহী ও পাচারকারী। এদের মাঝে কোন কালেই কোন ভালোমানুষ ছিলোনা বর্তমানেও নেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইয়ামানাকা ফ্যাক্টরস

লিখেছেন কলাবাগান১, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১০:৫৭


ছবিতে যাকে দেখছেন উনার নাম প্রফেসর ইমানাকা। উনাকে সারা বিশ্ব মনে রাখবে উনার যুগান্তরী আবিস্কার এর জন্য। তার আবিস্কার যেভাবে সবার জীবনকে বদলে দিবে এবং দিচ্ছে সেটা জানানোর জন্যই... ...বাকিটুকু পড়ুন

Movie-Obsession(2026)

লিখেছেন ডি এইচ তুহিন, ৩০ শে আগস্ট, ২০২৬ সকাল ১১:৫৯

বিশিদবার রাতে খুব বাজে আর একটা ছিনেমা দেখলাম। ভাই-রে ভাই কি বলবো, ঐ রাতে আর ঘুমাতে পারি নাই। মানে দেখার পর থেকে এখনো গা শিরশির করছে। চোখ বন্ধ করলেও চোখের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×