somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বঙ্গ আর বাঙ্গালী , পুণ্ড্র বর্ধন বঙ্গের সবচেয়ে পুরাতন শক্তিশালী জনপদ

০৯ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ২:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

"বঙ্গ" আর "বাঙ্গালী" শেকড়ের খোঁজে (পর্ব ১২ D) 


"পুণ্ড্র বর্ধন " বঙ্গের সব চেয়ে পুরাতন শক্তিশালী জনপদ 

কোথায় কোথায় এর উল্লেখ আছে?  কে ছিল অনার্য রাজা?   কেন হারিয়ে গেল ? আর্য রাজারা কবে আসলো? অনার্য সম্বন্ধে তাদের ধারনা কি? 

বঙ্গ অনার্য দের বাস ভূমি । অনার্য দের  শ্রমে ঘামে তিল তিল করে গড়ে উঠা এই নগর । হয়  পুণ্ড্র নগরের সৃষ্টি। 
প্রমত্তা করতোয়া নদীর তীরে গড়ে উঠা ছিল বন্দর নগরী "পুণ্ড্র বর্ধন" ।
 
পৃথিবীর যে কোনো নগর গড়ে উঠার পেছনের কারন  হল সেই স্থানের সারপ্লাস ফসল অন্য স্থানে বিক্রি করার জন্য ব্যাবসা বাণিজ্যের প্রসার। 

বিভিন্ন পর্জটক দের বিবরণ থেকে জানা যায় মাঠ ভরা আখের ক্ষেত, কার্পাস তুলা আর রেশমের চাষ ,অবারিত ধানের ফসল ভরা জমি আর শাক-সবজির বাড়বাড়ন্ত উৎপাদন। 
চারদিকে আখ থেকে রস আর রস থেকে গুড় তৈরির রমরমা কারবার, কার্পাস আর রেশম থেকে সূতা কাটা  আর সুতা  দিয়ে বস্ত্র বয়নের শব্দ।

এগুলোকে  ঘিরে মানুষের বসতি তার সাথে আরও অন্য পেশা যেমন আর্টিস্ট, ধর্ম যাজক, পাথর কেটে মূর্তি বানানো, মাটির তৈজস পত্র বানানো, আর তা  পরিচালনা করতে  শাসকের উৎপত্তি ই হল নগরায়নের মূল উৎস ।

এই ভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল পুণ্ড্র নগরের অগ্রসর ভূমিকা। এই নগরের রমরমা এগিয়ে যাওয়া সহ্য হয়নি আশপাশের আর্য রাজাদের । তারপরে যা হয় তাই হল। অর্থাৎ আক্রমণ দখল ,পরাজিত । আক্রমণে বাধা সৃষ্টি হয় বারবার। আর তখনি তকমা জুটে অনার্য দের কপালে আর্য  দের দ্বারা । "দস্যু",  "ম্লেচ্ছ" ডাকাত, অসভ্য ইত্যাদি ইত্যাদি ।

যেখানে যেখানে উল্লেখ আছে পুণ্ড্র নগর এবং পুণ্ড্র জাতির কথাঃ  

উত্তরবঙ্গে পুণ্ড্র নগর সবচেয়ে পুরানো একটি জনপদের রাজধানী । 

যীশু খ্রিস্ট জন্মের বহু শতাব্দী পূর্বে পৌণ্ড্র বন্ধনের নিকট পুন্ডারিক নামক বনিক শাখার সন্ধান জৈন দিগের "কল্পসুত্রে" পাওয়া যায় । যেখানে পুণ্ড্র জাতের উল্লেখ আছে। 

ঋক বেদে "ঐতরেয় ব্রাম্ভনে" পুণ্ড্রের উল্লেখ আছে।  এখানে প্রাচীন অধিবাসী গন আজও পুণ্ড্র নামে এখানে বাস করে। 

মহাভারতের নানা স্থানে পুণ্ড্র জাতির উল্লেখ আছে। "শান্তি পর্বে " ৬৫তম অধ্যায়ে পুণ্ড্র দিগকে "দস্যু" বলা হয়েছে। 
নিচে শান্তি পর্বের পংতিঃ 
"পন্ড্রা পুলিন্দা রমঠাঃ কাম্বোজা স্বৈর্রশঃ 
মদ্বিবৈস্বচ্ছ কতঅং স্থাপ্যঃ সব্বৈ   বৈ দস্যু জীবন" 
 
এর অর্থ এরা অর্থাৎ পুণ্ড্র রা "যুদ্ধ বিশারদ দস্যু ছিল" । 

ভগবতে পুণ্ড্র কে বলা হয়েছে "অণুর বংশীয়" । 

ষষ্ঠ শতাব্দীতে শবর জাতি হিমালয়ের উত্তর পুর্ব দিক থেকে ভারতে প্রবেশ করে। কিন্তু আর্য দের আগমনে পুণ্ড্র ত্যাগ করে মধ্য ভারত, উড়িষ্যার জঙ্গলে চলে যায় । এরা "পুণ্ড্র শবর" নামে  এসব এলাকায় বাস করতো ।আর যারা সেখানে থেকে যায় তারা "পুণ্ড্র" নামেই আছে এবং তাদের নামেই "পুণ্ড্র নগর" হয়েছে।  

ভগবতে নবম স্কন্ধে আছে "ভরত রাজা" অব্রাম্ভন নরপতিকে জয় করেন । 

ভগবতের একটি পংতি 

"কিরা তহু মান যব নান পৌন্ড্ররান কখান, খসান, শকান,  অব্রম্ভন্যান পাংশ্চাহন "ম্লেচ্ছান" 

অর্থাৎ এই পুণ্ড্র কে তারা ম্লেচ্ছ, যবন, এসব বলে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে । 

এবার আসা যাক বোধায়ন স্মৃতি তে কি বলা হয়েছে, সেখানে বলা হয়েছে পুণ্ড্র এবং বঙ্গতে প্রবেশ করলে আর্য পুরুষকে "প্রায়সচিত্ত" করতে হবে। অর্থাৎ শুদ্ধ হতে হবে। 

এই নিচু ভাবে  তখনি ভাবা হয় যখন মানুষ তাদের কাছে পরাজিত হতে থাকে ।
 
পদ্ম পুরাণে "পোন্ড্র"  এবং "পুণ্ড্র"  দুটি দেশের নাম আছে। 
জৈন দের ধর্ম গ্রন্থ "কল্প সূত্রে" এবং  কৃষ্ণ দাসের "মগব্যাক্তি" গ্রন্থে,  পুণ্ড্র দ্বীপে শকদ্বীপী ব্রাম্ভন গন খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে  জৈন ধর্ম পালন করে "পুণ্ডরীক" নাম গ্রহণ করে। 

এই ছিল বিভিন্ন জায়গায় পাওয়া পুণ্ড্র এবং পুণ্ড্র জাতি সম্বন্ধে যা পাওয়া গেছে তার বিবরণ। 

এখন দেখব পুণ্ড্র রাজ্য টি   কোথায় তার বিবরণ  এবং কি ভাবে বলা আছেঃ 

করতোয়া এবং মহানন্দা পুণ্ড্র রাজ্যের পূর্ব এবং পশ্চিম সীমার নদী । 
"মহাভারতের" "বন পর্বে" ২৫ অধ্যায়ে লেখা আছে

"পুনরাবর্ত্ত নন্দাং চ মহানন্দাআং চ ব্যবৈ, লোওহিত্য বিধিবৎ স্নাতা পুণ্ড্ররি কফলং লভেৎ " 

অর্থাৎ ব্রম্ভপুত্র (লৌহিত্য) এবং মহানন্দার মধ্যবর্তি স্থানে পুণ্ড্র নগর । যেখানে প্রচুর ফসল উৎপাদন হয় । এখানে পুণ্ড্র দেশের প্রশংশা   করা হয়েছে ।  

মহা নন্দার  পশ্চিম পাড়ে আর্য এবং পূর্ব পাড়ে অনার্য বংশীয় লোকের বাস ছিল । 

করতোয়া সে  সময় ব্রম্ভপুত্র নদের চেয়ে প্রকাণ্ড আর বিশাল নদী ছিল। দেখা যায় "পুরাণে"  করতোয়া নদী ব্রম্ভপুত্র নদী অপেক্ষা বেশি বেশি উল্লেখ আছে। 
পরে পলি জমে এবং এই নদী থেকে বের হওয়া দক্ষিণ বঙ্গের কুমার, ইছামতী, চূর্নি, নবগঙ্গা বের হয়ে পরে তা গঙ্গার সাথে মিশেছে। 

সুন্দর বনে "করতোয়া নান্মি" নামক একটি ছোট নদী, ক্ষুদ্র স্রোতা  এখনো আছে । 

"চণ্ডাল" রা পুণ্ড্র দেশের আদিম অধিবাসী বলে অনেকের অনুমান। 

এই রাজ্যের অনার্য শাসক দের নাম তেমন পাওয়া না গেলেও "বালি" নামক  শেষ অনার্য রাজা কে আক্রমণ করে আর্য রাজা । আর এক জায়গাতে উল্লেখ আছে পাণিনি কালে রাজা ছিলেন "পাউন্ড্রিক  বাসু দেভা " । 

খ্রিস্ট পূর্ব  ৬০০ অব্দে অভীর জাতি পুণ্ড্র রাজ্য আক্রমণ করে। পাহাড়পুরে বিরাট একটি কালি মন্দীরের ভগ্নাবশেষ পরে আছে। এটা ৬০০ বছর খ্রিস্টপূর্ব অভির দ্বারা তৈরী । 

অসুর গড়, (পুর্নিয়া) বেনুগড় (কৃষ্ণ গঞ্জ ,পুর্নিয়া ), কান্তারনের প্রকাণ্ড বৌদ্ধ স্তূপ মনে করা হয় এগুলো অভির জাতি দ্বারা তৈরি । 

চীনা পর্যটক হোয়েন সাং এর বর্ণনায় পুণ্ড্র বর্ধনঃ 

চীনা পর্যটক হোয়েন সাং ৬২৯ খ্রিস্টাব্দে পুণ্ড্র বর্ধন আসেন। তার বিবরণে সে সময়ে গৌড় ,বঙ্গদেশ, চম্পা, কজুথির, পুণ্ড্র বর্ধন, সমতট , তাম্রলিপ্ত, কর্ণ সুবর্ন , এই কটি  রাজ্যের উল্লেখ আছে । 

পুণ্ড্র বর্ধন সম্বন্ধে তিনি বলেন ৪০০০লিঃ অর্থাৎ ৬৬৬.৪ মাইল লম্বা । দুর্গের প্রাচীর ৪ মিটার প্রস্থ । রাজধানীতে জলাশয়, রাজার কার্যালয়, ফুলের বাগান, ২০তি স্তূপ ,অশোক স্তূপ ,  ৩০০০ বৌদ্ধ শ্রমণের বাস, ১০০ হিন্দু মন্দির, অনেক জৈনের বাস, বৌদ্ধ স্তূপে স্বয়ং বুদ্ধ দেব তিন মাস ধর্ম প্রচার করতেন এবং অধ্যাপকের সংখ্যা ৭০০। 
প্রচুর ফসল উৎপাদন হয় এখানে। নগরের রাস্তার পাশে দোকানপাট এবং বাড়ির উল্লেখ আছে।

এই ছিল সব চেয়ে পুরানো বঙ্গের রাজ্য "পুণ্ড্র বর্ধনের" অনার্য আমলের বর্ণনা। 


চলবে 






সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই মার্চ, ২০২৬ রাত ২:২৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বিদায় বন্ধু

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ২৩ শে মার্চ, ২০২৬ রাত ১০:৫১

ইফতার করে আজ সন্ধ্যের দিকে একটু হাটতে আর চা খেতে বের হয়েছিলাম। বিগত কয়েকদিনের মতোই গিয়ে দেখি চায়ের রেস্টুরেন্ট আজও বন্ধ। উপায় না দেখে ছোট একটা দোকান থেকে মেশিনে তৈরী... ...বাকিটুকু পড়ুন

ডার্ক ওয়েব সংবাদ : অনুসন্ধানী রিপোর্ট

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ ভোর ৫:১২

ডার্ক ওয়েব সংবাদ : অনুসন্ধানী রিপোর্ট এর সত্যতা কতটুকু ?
সাধারণ মানুষ জানতে চায় !




বাংলাদেশ কি বিক্রি হচ্ছে ডা*র্ক ওয়েবে ?
Redlineinvestigation নামে ডা*র্ক ওয়েবের কেবল ফাইলে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট ফাঁস... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইরান বনাম ইজরাইল আমেরিকা যুদ্ধ; কার কি লাভ?

লিখেছেন খাঁজা বাবা, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১২:১৮



২০০৬ থেকে আহমাদিনেজাদ ইজরাইলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি দিয়ে আসছে, আমেরিকা ২০০২ থেকে ইরানে হামলার প্ল্যান করছে, নেতানিয়াহু ৪০ বছর ধরে স্বপ্ন দেখছেন ইরানে হামলা করার। তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

মিথ্যাবাদী কাউবয় "ট্রাম্প" এবং ইরান যুদ্ধের খবর

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ দুপুর ১:৫৯


দিনের শুরুটা হলো ট্রাম্পের মিথ্যা দিয়ে। তিনি লিখলেন: "ইরানে সামরিক হামলা পাঁচ দিনের জন্য বন্ধ রাখা হচ্ছে, যা আলোচনার সাফল্যের ওপর নির্ভর করবে।" পরে জানা গেলো, ট্রাম্প যথারীতি মিথ্যা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার হারিয়ে যাবার গল্প

লিখেছেন রানার ব্লগ, ২৪ শে মার্চ, ২০২৬ বিকাল ৫:৩২

তোমাকে আমি কোথায় রাখি বলো,
চোখের ভিতর রাখলে
ঘুম ভেঙে যায় বারবার,
বালিশের নিচে রাখলে
স্বপ্নে এসে কাঁদো।

তুমি কি জানো
আমার এই শরীরটা এখন
পুরোনো বাড়ির মতো,
দরজায় হাত দিলেই কেঁপে ওঠে,
জানালায় হাওয়া লাগলেই
তোমার নাম ধরে ডাকে।

আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×