somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এইচ এন নার্গিস
জ্ঞান মনের জানালা খুলে দায় এবং সেই খোলা জানালা দিয়ে না জানা বিষয় গুলো দেখি যা বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবী দেখতে সাহায্য করে ।

বঙ্গ আর বাঙ্গালী ,শেকড়ের খোঁজে , প্রাচীন বাংলার বসতির চিহ্ন "চন্দ্র কেতু গড়"

১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

( ১৭ A পর্ব   বঙ্গ আর  বাঙ্গালি, শেকড়ের খোঁজে

প্রাচীন বাঙ্গলার প্রাচীন বসতির চিহ্ন  (চন্দ্রকেতু গড় ) 


"উত্তরে উত্তুঙ্গ গিরি 
দক্ষিণে তে দুরন্ত সাগর"  বঙ্গের সীমানা   

বঙ্গের সীমানার মধ্যে আর কি এবং কোথায় আছে প্রাচীন বাংলার স্যাটেলমেন্টের অবস্থানঃ 


বাঙ্গালী হল অ্যাস্ট্রএশিয়াটিক ভাষাগোষ্ঠী আর "ভেড ডিড নরগোষ্ঠীর"  মানুষ।

 খাবার তাদের ভাত মাছ ।

বাংলার সীমা উত্তরে হিমালয় কন্যা নেপাল ভুটান সিকিম আর  তেরাই,   দক্ষিণে সাগর, উত্তর পশ্চিমে দ্বারবঙ্গ পর্যন্ত  ভাগীরথীর সমান্তরাল বর্তী সমভূমি ,পূর্বে গারো,খাসিয়া,জন্তিয়া ত্রিপুরা,  চট্টগ্রাম এর শৈল শ্রেণী ,পশ্চিমে ছোটোনাগপুর, সাঁওতাল পরগনার আরণ্য ময় মালভূমি ।

আবহাওয়া উষ্ণ আদ্র জলবায়ু । শত শত  নদনদী আর তার   শাখা প্রশাখা ,  বিল আর জলাভূমি । মাঝে ভেজা বঙ্গ । প্রাচীন বাঙ্গালী হিন্দুও ছিল না মুসলমানও ছিল না। 
অবারিত মাঠ আর মাঠ ভরা ধান রবি  শস্য ,মনসুন বন্যা, ঝড় ঝঞ্জা বাঙ্গালীর নিত্য সঙ্গী। 

এই বঙ্গ ভূমি তে পাঁচ হাজার বছর আগে এসে বসবাস আরম্ভ করে বাঙ্গালীর পুর্ব পুরুষ । জঙ্গল আর নিচু ভূমি তে পুর্ন ছিল পুরো অঞ্চল। 

প্রাচীন বাঙ্গলার প্রাচীন বসতির চিহ্ন এখনো পাওয়া যাবে পুণ্ড্র ভূমি, পাণ্ডু রাজার ঢিপি, চন্দ্রকেতু গড়, উয়ারি বটেস্বর,  তাম্রলিপ্ত,বানগড়,বেতড়,বিষ্ণুপুর,দেবলগড়,কর্নসুবর্ন,
পান্ডুয়া,অযোধ্যা পাহাড়   এসব  জায়গায় ।  

কিভাবে থাকত তারা?  কেমন ছিল ঘরবাড়ি বা  পটারীর ব্যাবহার ? তাদের সংস্কৃতী বা ধর্ম কি সব কিছু খুঁজে পায় আরকেওলজিস্ট রা তাদের খনন কাজ চালিয়ে ।

তারই  একটি চন্দ্রকেতু গড়  
 
প্রাচীনত্বের দিক দিয়ে কোন অংশে কম নয় চন্দ্রকেতু গড়।

অবস্থানঃ
কলকাতার কিছু দূরে পদ্মা নদী আর বিদ্যাধরী নদীর কুল ঘেঁষে এই "চন্দ্র কেতু গড়" । সেখানে দেখা যায় বিশাল বিশাল মাটির গড় যার নিচে ঢাকা পড়ে আছে সুদীর্ঘ ইতিহাস । যা কিনা খ্রিস্টপুর্ব ১৫০০ বছরের প্রাচীন । 
 
খনন কাজঃ 
 
সর্ব প্রথম ১৯০৬ সালে তারকানাথ ঘোষ নামে এক ডাক্তার ভারতের প্রত্নতত্ত্ব  বিভাগের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন । পূর্ব অঞ্চল দেখ ভালের সুপারিটেন্ডেট ছিলেন এক ইংরেজ নাম মিস্টার লঙহ্রাস্ট  । তিনি দেখতে এসে বলেন   "বঙ্গের সবচেয়ে পুরাতন স্যাটেলমেন্ট" বলে ধারনা"। 
এর পরে  পরিদর্শনে আসেন  ১৯০৯ সালে আরকেওলজিস্ট আর ইতিহাসবিদ রাখাল দাস বন্ধোপাদ্ধায় । তার কাছে এটি একটি গুরুত্ব পুর্ন প্রাচীনতম স্থান বলে মনে হয় যা কিনা হরপ্পা মহেঞ্জোদারোর কাছাকাছি  হতে পারে। 
১৯২২-২৩ সালে কাশীনাথ দীক্ষিত পুরাতত্বের প্রতিবদনে বলেন "বাংলার প্রাচীনতম জনবসতির একটি" ।
 
১৯৬৭-৬৮ সালে খনন কাজ আরম্ভ হয়। প্রায় দশ বছর ধরে চলে খনন কাজ। খননে দুর্গ নগরীর ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। যা কিনা খ্রিস্টপূর্ব  ৬০০-৩০০ অব্দের। প্রাক মৌর্য সময়  থেকে পাল যুগ পর্যন্ত অনেক প্রত্নবস্তু পাওয়া যায়। 

মানুষের মনে আসতে পারে কে এই চন্দ্রকেতু? তিনি কি একজন mythical king নাকি মৌর্য আমলের কোন রাজা। ?
এটা এখানে গুরুত্বপুর্ন নয় । গুরুত্বপুর্ন হল এর ঐতিহাসিক মূল্য । কারন এখানে  প্রত্নবস্তু পাওয়া গেছে তা অনেক মূল্যবান কারন সে গুলো মৌর্য আমল আরম্ভ হওয়ার অনেক অনেক আগের।
কারন  এগুলো প্রি- হিস্টরিক সময়ের। সময়ের হিসেবে অনেক মূল্যবান ।  প্রাচীন বাংলার  বাঙ্গালীর  অমূল্য রত্ন ।যা বাঙ্গালীর অতীত নিয়ে কথা বলে।  অতীত জানতে সাহায্য করে। 

যে যে প্রত্নবস্তু এখানে পাওয়া গেছেঃ 

.) ৬৩ বর্গ ফুটের ক্ষেত্রের  মেঝে সহ মন্দির .) 
৪৫ বর্গ ফুটের ক্ষেত্রের মেঝের মন্দির .)মন্দিরের গায়ে টেরা কোটা চিত্র ফলক .) ২৩ ফুট মাটি খুড়ে  পাওয়া গেছে গর্ভগৃহ ,যা কিনা প্রাচীনতম মন্দির।.) চতুর্থ বছরে ৮ম শতকের মন্দির এবং প্রত্নবস্তু .) রাশিচক্র .) পঞ্ছচূড় অপ্সরা । 

অনেক প্রত্নবস্তু চলে গেছে ইউরোপের বিভিন্ন মিউজিয়ামেঃ 
 
তার মধ্যে জার্মানের মিউজিয়াম অব ইন্ডিয়ান আর্ট, ফ্রান্সের লিন্ডেন মিউজিয়াম, Guiment মিউজিয়াম , Ashmolem মিউজিয়াম, UK, Victoria Albert Museum এবং ব্রিটিশ মিউজিয়াম ।

যে প্রত্ন বস্তু চলে গেছে তা মহামূল্যবান কারন তা সেই সময়ের  প্রাচীন বাংলার সংস্কৃতি এবং সমাজ কে ফুটিয়ে তোলে এবং আমরা তা জানতে পারি।
 
চন্দ্রকেতু মেডিভ্যাল বাংলার সময়ের। তখন গ্রীসের সাথে এই পথ দিয়ে বাণিজ্য চলতো ।
কিছু মুদ্রা পাওয়া গেছে যেখানে আঁকা আছে সমুদ্র গামী নৌযান ,শস্য পূর্ণ বিরাট পাত্র । মুদ্রার ভাষা Kharosthi, Brahmi. সব কিছু মৌর্য আমলের অনেক আগের
। 
অনেক ইতিহাসবিদ এবং আরকেওলজিসস্ট মনে করেন এটা "গঙ্গারিডি" অঞ্চলের । 

পুরো এলাকাটি এক মাইল এলাকা জুড়ে। বলা হয় শেষ রাজার নাম চন্দ্রকেতু। শুধু  মাত্র  লোকগাথার মধ্যেই এর  সীমাবদ্ধতা আছে ,ইতিহাসের লিস্টে এই নামে কেউ নাই। হয়তো তিনি স্বতন্ত্র এক শাসক ছিলেন । প্রবাদ আর লোকগাথা তেই তার নাম আছে। 

মৌর্য আর পাল যুগে কারা এখানে রাজত্ব করতেন তা হয়তো জানা যাবে আরও খনন কাজ চলতে থাকলে। 

জনৈক গোরাচাঁদ পীরের সাথে চন্দ্রকেতুর সংঘর্ষ হয় ।তার পরেই এই গড়ের বিলুপ্ত হয়। 

চন্দ্রকেতু গড়ের কাছে গোরাচাঁদ নামে এক পীর থাকতেন। লকো কথা অনুযায়ী গোরাচাঁদ সুর্য দেবতার কাছ থেকে তিনি আদেশ পান সুর্য ওঠার সময় থেকে সুর্য ডুবা পর্যন্ত তাকে একটি মসজিদ বানিয়ে শেষ করতে হবে। তা আর  সম্ভব হয়নি ।
 
ইতিহাস রাখাল দাস বন্ধোপাদ্ধায় এর দাবি মসজিদ টি একটি বৌদ্ধ স্তূপের ধ্বংস স্তূপের উপর নির্মিত। এবং যা কিনা খ্রিস্টপূর্ব  ১৩০০ বছর আগে নির্মিত হয়ে ছিল। সে হিসেবে   এই অঞ্চল টিতে  ৩৫০০ বছর আগে বসতি স্থাপন হয়েছিলো । 

স্তর ভিত্তিক প্রত্নবস্তুর বিবরনঃ 

প্রথম স্তরে মসৃণ মৃৎ পাত্র (প্রাক উত্তর ভারতীয় )
 
দ্বিতীয় স্তরে লাল মৃৎপাত্র (৪০০-১০০ খ্রিস্টপুর্ব)

তৃতীয় স্তরে গোলাকার পেয়ালা ,তামার তৈরি সুরমা লাগানো দণ্ড এবং হাতীর দাঁতের তৈরি জিনিস। তামার মুদ্রা,  প্রচুর রুপার মুদ্রা এবং সিলমোহর । 

চতুর্থ স্তরে কুশান যুগের রোম এবং গ্রীস দেশীয়
মৃৎপাত্র, লোহার মুর্তি, সিল মোহর এবং তাতে  আঁকা বাইরে যাওয়া ফসল ভর্তি জাহাজ। 
স্বর্ণ মুদ্রা ,সেখানে আঁকা ব্যাবিলনীয় দেবী "নাসা' ।কুশান যুগের মাথার মুকুট এবং  আংটি ।
 
পঞ্চম স্তরে গুপ্ত যুগের পোড়া মাটির মৃৎ পাত্র নকশা যুক্ত এবং দ্বিতীয় চন্দ্র গুপ্তের মূর্তি ।১৪ ফুট এলাকা জুড়ে ইটের মন্দিরের ধ্বংস স্তূপ যা পাল আমলের । ২৭২ টি রুপার মুদ্রা । স্বর্ণ মুদ্রা যেখানে খোদায় করা প্রথম চন্দ্রগুপ্তের বিবাহ দৃশ্য । 

ধর্মীয় নিদর্শনঃ 
১)আদিম ধারিত্রী দেবী ২) নাগ, যোগিনী  ৩) সুন্দর বনের বাঘ লৌকিক দেবতা  ৪) বিভিন্ন নিতি কাহিনীর ভাস্কর্য  ৫) মৃৎ পাত্রে দাও হাতে ধান কাটার দৃশ্য ৬) খেজুর গাছের কান্ডের দৃশ্য, ৭) দেবী মনসার নাগ মুর্তি  পোশাক গ্রীসয় রোমান যুগে পরিবর্তিত । 

উন্নত নাগরিক  সভ্যতার নিদর্শনঃ 
মাটির ১০/১২ হাত তলায় জীবজন্তুর হাড়গোড় , মাটির পাত্র, পানির কুয়ো, ধান খেতে ৫/৮ইঞ্ছির ব্যাসের ২ফুট ৭ইঞ্ছি লম্বা ভূগর্ভস্থ পয়ঃপ্রণালি । ১ মাইল লম্বা বাঁধ যা ২৫/৩০ ফুট উঁচু ।

মাটির পরোতে পরোতে লুকিয়ে আছে প্রাচীন বাঙ্গালীর  পদচিহ্ন । কান পাতলেই মনে হয় শোনা যাবে তাদের কথা বার্তা ।

তাদের প্রাচীন ঢিবি আর স্থাপনা গুলো মনে হয় বলছে "আমাদের খুঁজে নাও" । 
 

চলবে  
  
 

 
 


 



  
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই এপ্রিল, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৮
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করছি

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ দুপুর ১:৪৪



কথা হচ্ছিলো একজন আর্ট সমঝদার মানুষের সাথে। তিনি আক্ষেপ করে বলছিলেন, জীবিতবস্থায় আমাদের দেশে আর্টিস্টদের দাম দেওয়া হয় না। আমাদের দেশের নামকরা অনেক চিত্র শিল্পী ছিলেন, যারা জীবিতবস্থায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষ মারা যাবার পর আবার পৃথিবীতে আসবে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই মে, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১০



আমার মনে হয়, আমরা শেষ জামানায় পৌছে গেছি।
পুরো পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে খুব শ্রীঘই। চারিদিকে অনাচার হচ্ছে। মানুষের শরম লজ্জা নাই হয়ে গেছে। পতিতারা সামনে এসে, সে... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিজ্ঞানীরাও একেশ্বরবাদী হতে পারেন - আইজ্যাক নিউটন তা প্রমাণ করে গিয়েছেন

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৯ ই মে, ২০২৬ রাত ৯:৪০



প্রত্যেক মহান বিজ্ঞানীই নিজের জীবনে ধর্ম নিয়ে গবেষনা করে গিয়েছেন। এমনটাই আমার বিশ্বাস ছিলো। সামুতে আমি এই নিয়ে আগেও লিখেছি। তারপরও, কয়েক দিন স্টাডি করার পরে বুঝতে পারলাম-... ...বাকিটুকু পড়ুন

মত প্রকাশের স্বাধীনতা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ০৯ ই মে, ২০২৬ রাত ১০:৩৮



আমাদের দেশের সাধারণ ও অসাধারণ জনগণ সহ সকল প্রকার সংবাদ মাধ্যম “মত প্রকাশের স্বাধীনতা”র জন্য প্রায় যুদ্ধ করছেন। মত প্রকাশের সামান্য নমুনাচিত্র হিসেবে একটি সংবাদের ভিডিও চিত্র তুলে ধরছি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের "ইসলামী" বই - নমুনা ! আলেমদের দায়িত্ব

লিখেছেন ঢাকার লোক, ১০ ই মে, ২০২৬ সকাল ৮:৪৭

আমাদের দেশের বিখ্যাত চরমোনাইয়ের প্রাক্তন পীর সাহেব, মাওলানা ইসহাক, যিনি বর্তমান পীর রেজাউল করিম সাহেবের দাদা, এর লেখা একটা বই , "ভেদে মারেফাত বা ইয়াদে খোদা"। এ বইটার... ...বাকিটুকু পড়ুন

×