
পাল সাম্রাজ্য বাঙ্গালীর স্বর্ণালি যুগ
মুঘল আমল ছিল ১৮০ বছর, ব্রিটিশ শাসন করেছিল ২০০ বছর। কিন্তু তাদের আগে বাঙ্গালীরা প্রায় ৪০০ বছর শাসন করেছিল সে কথা স্কুল কলেজে পড়ানো হয় না। সিলেবাসে থাকেও না।
বাঙ্গালীর ইতিহাস চর্চায় ব্রিটিশ আগমন পরবর্তী নবজাগরণ কে এমন ভাবে দেখানো হয় যে মনে হয় বাংলায় শিক্ষা, সংস্কৃতি শিল্প ,সাহিত্য ইত্যাদি তে উল্লেখ যোগ্য ইতিহাস আদৌ ছিল না।
এই বাংলায় যে ছিল শৌর্য বির্য এবং পরাক্রম ,বিদ্যা শিক্ষা , এবং সংস্কৃতি তে উচ্চতার শেখরে তা তেমন ভাবে জানানো হয় না । যা হয়েছিল এই অনার্য বাঙ্গালী দ্বারা শাসিত এই বাংলায়।
বাঙ্গালী দ্বারা শাসিত বাংলা শুধু মাত্র বাংলা নয় বাংলার আশপাশের রাজ্য গুলো জয় করে বাংলার অন্তর্ভুক্তও করেছিল ।
শশাঙ্ক সর্ব প্রথম বাংলার স্বাধীন রাজা ছিল । বাংলা নিজের অস্তিত্ব নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়েছিল ।
কিন্তু শশাঙ্কের মৃত্যুর পর বাংলায় নেমে আসে কঠিন এক সময় । চারিদিকে বিশৃঙ্খলা ,হানাহানি বাংলাকে গ্রাস করে।
ছোটো ছোটো গোস্টি তে বিভক্ত বাঙ্গালী নিজেদের মধ্যে গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে রাখতো । প্রতিদিন একেক জন নিজেকে রাজা ঘোষণা করতো এবং পরের দিন তার কাটা মাথা ধুলায় লুটিয়ে পড়ে থাকা সাধারণ ব্যাপার ছিল ।
ক্ষমতা বান তার চেয়ে কম ক্ষমতা বান কে গ্রাস করে নিজের শক্তি পদর্শন করতো যাকে বলে "মাৎসায়নের যুগ" । অর্থাৎ বড় মাছ ছোটো মাছ কে খেয়ে নেওয়া ।
প্রায় এক শত বছর চলে এই বিশৃঙ্খলা । মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে এক মত হয়ে একজন কে রাজা বা শাসক নির্বাচন করে । তিনিই "গোপাল" ।
এই নির্বাচন কে প্রথম গণতন্ত্র বলা যায়।
ঊষা আরম্ভ হওয়ার আগে যেমন ঘোর অন্ধকার থাকে তারপরে অন্ধকার ভেদ করে আসে আলো তেমন এক শত বছর অন্ধকারের যুগ পার করে বাংলার রাজনৈতিক আকাশে আলোকিত করে ৭৫০ খ্রিঃ গোপাল বাংলার আকাশে ভোরের আলো নিয়ে আসে।
বাংলায় ঐক্য,সুশাসন আর সমৃদ্ধি নিয়ে আসার গুরু দায়িত্ব নিয়ে যখন গোপাল আসে তখন বাংলায় আরম্ভ হয় এক নুতুন যুগ । যারা কিনা শাসন করবে পরবর্তী চার শত বছর ।
গোপালের বাবার নাম ছিল বপ্যট (যাকে শত্রু ধ্বংসকারী বলা হয়) আর পিতামহের নাম দয়িতবিষ্ণু (সর্ব বিদ্যা শুদ্ধ) । (খলিমপুর তাম্রলিপী থেকে পাওয়া )
গোপাল মনোযোগ দিলেন একটি সুসংগঠিত সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে । তার শাসন কাল ছিল ২০ বছর (৭৭০ খ্রিঃ )
ধর্মপালঃ
তারপরে দায়িত্ব পায় তার পুত্র ধর্মপাল । ততদিনে বাংলা একটি শক্ত শক্তিতে পরিণত হয়েছে। আনুমানিক ৭৭০ সালে ধর্মপাল সিংহাসনে বসেন।
ধর্মপালের সময় বাংলার রাজ্য সীমায় যোগ হয় মঘধ (বিহার) আর্রযাবর্ত্য (অর্থাৎ উত্তর এবং দক্ষিণ ভারত) ,আরযাবর্তের কেন্দ্র ছিল কৌনয। ধর্মপাল এই সব স্থানে বাংলার পতাকা উড়াতে কূটনীতি আর ধর্মনীতি প্রয়োগ করেন। কৌনযের ক্ষমতা তখন ছিল গুর্য দের হাতে এবং প্রতিনিধি ছিল ইন্দ্রা ।
কূটনীতি এবং সমরনীতির সমন্বয়ে রাষ্ট্রকূট বংশিয়া রাজকুমারী রর্ননা দেবী কে বিবাহ করে কাছে টানলেন বৈবাহিক সূত্রে পাওয়া সম্পর্ক যুক্ত দাক্ষিণাত্যের শক্তিশালী ও প্রতাপশালী রাষ্ট্রকূট দের ।
তারপরই গুর্যের শাসক দের পরাজিত করে ছিনিয়ে নিলেন কনৌজ এবং এর শাসন ভার অর্পন করেন তাঁর অনুগত সামন্ত "চক্রায়দ" কে, আর এভাবে সমগ্র উত্তর ভারত বাংলার দখলে আসে।
খিলিমপুর তাম্রলিপি থেকে জানা যায় তার সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয় বর্তমানের ভোজ অর্থাৎ মধ্য ভারত, মৎস্য অর্থাৎ রাজস্থানের পুর্ব অংশ,মদ্র অর্থাৎ পাঞ্জাব , কুরু অর্থাৎ দিল্লি, ও হারিয়ানা, যদু অর্থাৎ গুজরাট, অবন্তী অর্থাৎ মধ্যপ্রদেশ , কীর অর্থাৎ উত্তর অঞ্চল , গান্ধার অর্থাৎ পাকিস্তানের পশ্চিম অংশ ও আফগানিস্থান ।
এই সমস্ত রাজ্য গুলো ধর্মপালের আধিপত্য স্বীকার করে নায় ।
"উত্তরপদ স্বামী" আখ্যায় ধর্মপাল ভূষিত হয়।
সামরিক অভিযান বা সাম্রাজ্য বিস্তারই সীমাবদ্ধ ছিল না ধর্মপাল, বাংলাকে বিদ্যা শিক্ষার পীঠস্থানে পরিণত করার কৃতিত্ব তারই ।
শুধুমাত্র নালন্দা নয় অসংখ্য বিহার আর বিদ্যালয় গড়ে উঠে তা আমলে। বৌদ্ধ দর্শন চর্চা কেন্দ্র ও বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয় যেমন বিক্রম শিলা, পাহাড়পুরের সোমপুর বিহার, অদন্তপুরি ও জগদ্দল ইত্যাদি ।
এই পাঁচ টি বিশ্ব বিদ্যালয় আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করে ।
ধর্মপাল প্রথমে পৌণ্ড্র বর্ধন অধিকার করেন। এবং
"ভুশুর" পুণ্ড্রবর্ধন রাজত্ব করতেন এবং সেখানে অনেক বিহার গড়ে উঠে ।
ধর্মপাল আর বৌদ্ধ বিহার এবং শিক্ষার বিস্তারঃ
পাল আমল বিশেষ করে ধর্মপালের সময় বাংলা আর বিহারে একের পড় এক বৌদ্ধ বিহার গড়ে উঠে। কারন পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মের পৃষ্টপোষক ।
বিহারের নাম "বিহার" হওয়ার কারন হল প্রচুর বৌদ্ধ বিহার থাকার জন্য ।
পাহাড়পুর বা সোমপুর বৌদ্ধ বিহার বর্তমানের বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় ২৭ একর জায়গা নিয়ে অবস্থিত। বৌদ্ধ মঠ ,হিন্দু মন্দির, মহা বিহার এবং বিশ্ববিদ্যালয় এর ক্যাম্পাস ছিল এই স্থানে।
খননের পরে এই স্থানে পাওয়া যায় প্রস্তর নির্মিত ৬৩ টি অপূর্ব হিন্দু দেবতা মূর্তি । এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৭৭ টি কক্ষ ছিল বৌদ্ধ শ্রমণ দের থাকার জন্য। ১০০০ ছাত্র এখানে বিদ্যা শিক্ষা করতো বিনা খরচে ।
বাংলার মেধা এবং চিন্তনের বিরাট ব্যাবস্থা ছিল এই সোমপুর মহা বিহারে।
সোমপুরের অদূরে আর এক বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে "জগদ্দল মহা বিহার" ।যা স্থাপন হয় এই রামপালের আমলেই। যার ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার হয় সম্প্রতি ।
"অদন্তপুরি বিশ্ববিদ্যালয়ে" ১২০০ আবাসিক ছাত্র শতাধিক অধ্যাপকের কাছে বিনামূল্যে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। এক হাজারের বেশি বৌদ্ধ শ্রমণ এবং সন্যাসী দের থাকার ভ্যাবস্থা ছিল এখানে।
সে সময়ের সবচেয়ে বিখ্যাত বৌদ্ধ বিহার ছিল "বিক্রমশীলা" । সম্রাট ধর্মপাল তাঁর রাজকীয় উপাধী "বিক্রমশীল" অনুসারে এই বিশ্ব বিদ্যালয়ের নামকরণ হয়।
এখানে ২০০০ ছাত্র ১৬০ জন অধ্যাপকের কাছ থেকে পাঠ নিতেন। তাদের উপরে ছিল ১০৮ জন পণ্ডিত । তাদের উপরে ছিল যথাক্রমে মহাপন্ডিত এবং ৬ জন দ্বার পণ্ডিত এবং সর্ব উপরে অধ্যক্ষ ।
সোম পুর মহাবিহার এবং বিক্রমশীল মহাবিহার দুই বিহারেই হিন্দু ও বৌদ্ধ দুই ধর্মের দেবালয়ের সমন্বয় দেখা যায় ।
খনন কার্যে পাওয়া যায় বৌদ্ধ মূর্তির সাথে বিষ্ণু, পার্বতী, অর্ধনারীস্বর ,হনুমান এবং নরসিংহ মূর্তি ।
বাংলার বিখ্যাত বৌদ্ধ দার্শনিক অতিস দীপঙ্কর এখানে অধ্যক্ষের পদে ছিলেন।
মহাবিহার এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলো পরস্পর সংযুক্ত ছিল। বিশ্ববিদ্যালয় গুলো নিজেদের মধ্যে অধ্যাপক এবং শিক্ষক বিনিময় করতো ।
ধর্ম,দর্শন, ব্যাকারন, সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান, এবং বৌদ্ধ তন্ত্র ইত্যাদি বিষয়ে পঠন পাঠন এখানে চলতো ।
এই বিশ্ববিদ্যালয় গুলো এবং বিহার পরিচালিত হত রাজার অর্থে পৃষ্টপোষকতায় এবং তত্ত্বাবধানে । মহাবিহার এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও অনেক বিদ্যালয় তাঁর রাজত্বে স্থাপন হয়।
শিল্প কলা এবং ভাস্কর্যঃ
পালযুগে গৌড়িও শিল্পের শিল্পকলা এক অনন্য সম্পদ । পাথর খোদায় করে যে ভাস্কর্য সে সময় সৃষ্টি হয়েছিল তা অনবদ্য।
"বতপাল" এবং "ধীমান" নামে দুই কিংবদন্তী শিল্পী ছিলেন সে সময়ে। তাদের সৃষ্টি করা অসংখ্য ভাস্কর্য দেশ বিদেশের মিউজিয়ামে দেখতে পাওয়া যায় ।
আর্ট
তালপাতায় আঁকা বহু বর্ণের চিত্র ও মিনিয়চর পেন্টিইং আজও সমগ্র বিশ্বের বিস্ময় । অংকন শিল্পীর সেই তাল পাখার পুঁথি হাজার বছর পরেও অক্ষত আছে।
৯৮৩ খ্রিঃ প্রজ্ঞা পারমিতা গ্রন্থে সৃষ্ট অষ্ট সহস্রস্রিকা বৌদ্ধ দেব দেবী ,বোধিসত্ব এবং বৌদ্ধ প্রতীকের চিত্র তাদের মধ্যে একটি । সমস্ত চিত্র পাল, নেপালি শিল্প কলার যা অতি চমৎকার ।
বাংলা ভাষার বিকাশঃ
বাংলা ভাষা বিকাশের জন্ম লগ্ন এই পাল যুগ
এই সময়ে চর্যা পদের ভাষার মাধ্যমে পরিণতি পায় আজকের বাংলা ভাষা । আর এই সময়ে দার্শনিক
অতীশ দীপঙ্করের মাধ্যমে তিব্বতে বৌদ্ধ ধর্ম বিস্তার লাভ করে।
পরধর্ম সহিষ্ণুতাঃ
পাল রাজা গন বৌদ্ধ ধর্ম এবং হিন্দু ধর্মে বিভেদ সৃষ্টি করে নি বা হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করতে বাধা দেন নি।
তাম্র সাসনে উল্লেখ আছে ধর্ম পালের সামন্ত ছিলেন নারায়ণ বর্মণ । তিনি সুবস্থলি নামক স্থানে একটি হিন্দু মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন । তিনি এই মন্দিরে চারটি গ্রামে ভূমি দান করেছিলেন।
ধর্ম পালের প্রধান মন্ত্রী ছিলেন একজন হিন্দু ব্রাম্ভন । ধর্মপাল যার যার ধর্ম পালনে ব্যাবস্থা করেন।
"কেশব প্রসস্থি" বুদ্ধ গয়ার প্রশস্থি থেকে জানা যায় ধর্মপাল তাঁর ২৬ তম সিংহাষন গ্রহণের বছরে তাঁর রাজ্যে মহাদেবের মন্দির স্থাপন করেন এবং এক সুবিশাল সরবর খননে তিন হাজার স্বর্ণ মুদ্রা ব্যয় করেন।
পাল যুগে বাংলা জুড়ে জ্ঞান,চিন্তন, শিল্প সংস্কৃতির উতকর্ষ তৈরি এবং জ্ঞান চর্চা বৃদ্ধির উন্নতি ঘটে ।
বিভিন্ন তাম্রলিপিতে এবং গ্রন্থে পাওয়া পাল রাজাদের বর্ণনা
+ গোয়ালিয়র লিপিতে পালরাজ ধর্মপাল কে বলা হয় "বঙ্গ পতি"
+ সন্ধ্যাকর নন্দী বলেন পাল রাজা দের জনক ভূমি বরেন্দ্রী দেশ অর্থাৎ বরেন্দ্র অঞ্চল
+ সন্ধ্যাকর নন্দীর রামচরিতে ধর্মপাল কে বলা হয়েছে "সমুদ্রকুলদীপ" । হয়তো এর অর্থ সমুদ্রের আশ্রয়ে আদি অস্ট্রেলীয় নরগোষ্ঠীর সাথে বাংলার পাল রাজাদের কোন সম্বন্ধ কে ইঙ্গিত করছে । বলেন ইতিহাসবিদ নিহাররঞ্জন রায় ।
+ কবি তারানাথ বলেন "পুণ্ড্রবর্ধনের কোন ক্ষত্রিয় বংশে গোপালের জন্ম পরে তিনি বাংলার রাজা হন।
+ সন্ধ্যাকর নন্দীর কবিতায় দেখা যায় তিনি ধর্মপাল কে বলছেন "বঙ্গ পতি" ।তারা যে বাঙ্গালী ছিলেন এ সম্বন্ধে সন্দেহ করার আর কারন নাই। বলেন নিহাররঞ্জন রায় ।
পাল রাজ্যের সামাজিক আদর্শঃ
বাংলাদেশ এবং বিহার অঞ্চলে যতো বৌদ্ধ মন্দির অবস্থান সবোই এই পাল আমলের করা। বিহারের বিক্রম্পুর,ফুল্লহরি, জগদ্দল পট্টিক, দেবিকোট, ত্রৈকুটুক, সন্নগড় এবং বাংলাদেশের সোমপুর মহা বিহার,হলুদ বিহার, ভাসুবিহার এবং শালবন বিহার সবোই পাল আমলের ।
তবে এদের প্রায় সবায় ব্রাম্ভন সংস্কার অনুসারী । যে লিপি গুলো পাওয়া গেছে সেগুলো ভুমিদান সম্পর্কিত । আর এই ভূমি গুলো দেওয়া হয়েছে ব্রাম্ভন দের ।
ব্রাম্ভন্দের সন্মান না করে দান কার্য সম্পন্ন করা হত না।
তা ছাড়া পাল রাজ্যের মন্ত্রী সহ বড় বড় পদ ব্রাম্ভন দের দেওয়া এবং কর্ম পরিচালনা করা থেকে বোঝা যায় পাল রাজা রা বৌদ্ধ ধর্মের হলেও হিন্দু ধর্মের সাথে মিলে মিশে কাজ পরিচালনা একটা সাধারণ ব্যাপার । কোন দ্বন্দ্ব ছিল না ।
পাল আমলের সংস্কৃতি এবং সমাজঃ
বংশ আভিজাত্যের দাম্ভিকতা কখনও ছিল না
প্রথমতঃ বংশ নিয়ে গর্ব করার দাবি বা নিজেদের কে উঁচু ভাবা, সমাজের অভিজাত শ্রেণী মনে করা বা মানুষে মানুষে ভাগাভাগি পাল আমলে ছিল না। যা কিনা সমাজে তিক্ততা বৃদ্ধির প্রধান কারন।
এরা ছিল পুরোপুরি বাঙ্গালী ।
দ্বিতীয়তঃ পাল আমলের কৃতিত্ব ছিল দান করা। নিজেরা বৌদ্ধ ধর্ম অবলম্বন করলেও পরধর্ম সহিষ্ণু ছিল ।
যা দেখা যায় ব্রাম্ভন দের নানা ব্যাপারে ভূমি করা থেকে।
গোপাল ছিলেন সমাজ সংস্কার এবং সংস্কৃতির লোক "মঞ্জুশ্রীমূলককল্প" গ্রন্থের লেখক পাল রাজাদের বলেছেন "দাসজীবিন" । অনেক পাল রাজা ব্রাম্ভন্য ধর্মের পূজা এবং যাগ যজ্ঞে অংশ গ্রহণ করতেন। মন্ত্রী এবং সেনাপতি পর্যন্ত অন্য ধর্ম থেকে নেওয়া সাধারণ ব্যাপার ছিল । এবং কৈবর্ত বা জেলে সম্প্রদয় পর্যন্ত নানা পদে আসীন ছিল ।
বাংলায় প্রথম সামাজিক সমন্বয়ঃ
সামাজিক সমন্বয় অর্থাৎ ব্রাম্ভন্য বাদ এবং বৌদ্ধ ধর্ম দুটি ধর্মের স্রোত একই সময়ে প্রবাহিত ছিল। উভয় ধর্মের বিস্তার এবং স্বীকৃতি সমান ভাবে বিরাজ ছিল । যা দেখা যায় পাহাড়পুর পোড়ামাটির ফলক গুলোতে এবং সমসাময়িক ধর্মমতে ।
আমলাতন্ত্রঃ
আমলা বা কর্মচারী তন্ত্র প্রসার লাভ করে। রাষ্ট্র কর্মের বিচিত্র বিভাগে ছিল বিচিত্র কর্মচারী ।
রাষ্ট্রের কেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রামের হাট পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল আমলাতন্ত্র । তার প্রমাণ মিলে বিভিন্ন লিপিতে পাওয়া বিচিত্র কর্ম চারীর সুদীর্ঘ তালিকা থেকে ।
মন্ত্রী এবং সেনাপতি এদের হাতে ক্ষমতা ছিল প্রচুর এবং সুযোগ পেলে তারা রাষ্ট্রের প্রতিকূলে আচরণ করতো ।
"বৈদ্য নাথ" (কুমার পালের সেনাপতি) আর "দিব্য" (উচ্চ রাজ কর্মচারী) এর প্রমান ।
সমাজ এবং কৃষি নির্ভরতাঃ
লিপি গুলোতে দেখা যায় ক্ষেত্র কর, কৃষক, কর্ষক কৃষি সংক্রান্ত শব্দ । অধিকাংশ "রাজপদ" ভূমি ও কৃষি সম্পকৃত"। বাংলায় সামুদ্রিক বন্দরের খবর দেখা যায় না। রৌপ্য মুদ্রার প্রচলন ছিল কিন্তু সুবর্ন মুদ্রা একেবারে নাই ।
পাল আমলে দেশের অবস্থা
ভাষাঃ বিভিন্ন তাম্রলিপিতে যে ভাষা পাওয়া গেছে তার সাথে সংস্কৃতির ভাষার মিল নাই। স্ত্রী পুরুষ দের নাম গুলোতে সংস্কৃতির প্রভাব নাই।
পুকুর খনন, গাছ লাগানো, পথ ঘাট নির্মাণ করতে যে ডাকের 'বচন' পাওয়া যায় তা অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যে রচিত । ডাকের বচন গুলতে ভাষার পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায় ।
রাজস্ব প্রদানঃ রাজস্ব প্রদান করা হতো কড়ি দিয়ে ।
জীবন যাপনঃ সাধারণ মানুষ বাস করতো বাংলো ঘরে বিলাসী জীবন না থাকলেও খাওয়ার অভাব ছিল না। ঐশ্বর্যের সীমা ছিল না। ইন্দ্র কম্বল, পাটের পাছড়া , দণ্ড পাখা, বিলাস সামগ্রী ছিল । ধনী রা সুপারী খেয়ে মুখ শুদ্ধি করতেন। রাজারা থাকতেন সোনার খাটে।
গোপাল এবং তার পুত্র ধর্মপাল এবং ধর্মপালের পুত্র দেবপাল (৮১০ খ্রিস্টঃ) তাদের আমল যে যে কারনে কৃত কার্য হয়ে ছিল সুন্দর এবং শান্তি পুর্ন শাসন কাল দিতে ।
১) রাজস্ব আদায় সহজ করা ২) আইন শৃঙ্খলা আনা ৩) সামরিক বাহিনী সংক্রান্ত নুতুন নীতি মালা গৃহীত যা পাল রাজার জন্য একটি আদর্শ হয়ে ওঠে ৪) প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নিয়োগ ৫) রাজ্যের প্রতীটি অঞ্চলে সরকারি নীতির সুস্ঠ বাস্তবায়ন ৬) জনগণের অধিকার রক্ষ্যা করা ৭) ধর্মীয় সহিষ্ণুতা প্রতিষ্ঠা 8) শিক্ষার প্রসার ৯) বাণিজ্য ব্যাবস্থার উন্নতি ১০) প্রশাসনিক কর্মকান্ডের দক্ষতা প্রদর্শন ১১) বাংলায় রাজ্য,জাতি, ধর্ম, এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠা ।
রমেশচন্দ্র মজুমদার বলেন " রাজনৈতিক বিজ্ঞতা,দূরদর্শিতা এবং চরম দুক্ষ দুর্দশা থেকে বাঙ্গালী জাতি কে মুক্তি দেওয়া ইতিহাসে আর দেখা যায় না "
ক্রমাগত ভাবে বৌদ্ধ ধর্ম থেকে হিন্দু ধর্মে সরে যাওয়াঃ
বিশুদ্ধ বৌদ্ধ ধর্ম গৌড় রাজ্যে প্রচারিত না হওয়ায় হিন্দু ধর্মের পুনরুদ্ধার হয় ।
হিন্দু পণ্ডিতরা বৌদ্ধ দেবালয় গুলি কে নিজস্ব করে নায় । বৌদ্ধ প্রতিমা গুলোকে নিজেদের দেবতা শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত করে।
বৌদ্ধ উৎসব হিন্দু উৎসবে পরিণত হয়। রথযাত্রা, দীপালি, আগে বৌদ্ধ উৎসব হলেও পরে হিন্দু উৎসবে পরিণত হয় ।
"বুদ্ধ দেব" বাংলায় দেবতা হিসেবে পূজা পেতে থাকে। পাল রাজারা বৌদ্ধ ধর্মের "মহাযান" মতের অনুসারী ছিলেন।
আবার তার সাথে বজ্র বারাহী, বজ্র তারা, বজ্র ভৈরবী, ইত্যাদি শক্তি দেবীরও উপাসনা করতেন।
পাল বংশের রাজত্ব কালে বৌদ্ধমত এবং পার্বতীয় ধর্মমতের মিশ্রণে 'তান্ত্রিক বৌদ্ধ মুর্তি' প্রতিষ্ঠিত হয়।
শেষ রাজা গোবিন্দ পাল সম্ভবত বৌদ্ধ ছিলেন না। কারন একটি তাম্র শাসনে "নমো ভগবতে বাসুদেবায়" অর্থাৎ হিন্দু ও বৌদ্ধ এক হয়ে গেছে লেখা আছে । সম্ভবত শেষ পাল রাজা রা একেবারে হিন্দু হয়ে যায় ।
খলিমপুর তাম্রশাসন অনুযায়ী পাল বংশের সমস্ত পাল রাজার নাম পাওয়া যায়
খলিম পুর তাম্র লিপি গৌড়ের পূর্ব দিকে ভাতিয়ার বিলের ধারে একটি উঁচু ভূখণ্ডে ১৮৯৩ খ্রিঃ পাওয়া যায় এরপরে দিনাজপুরে দুইটি তাম্র শাসন পাওয়া গেছে। তাম্রলিপি গুলো থেকে বিশুদ্ধ বংশ তালিকা উদ্ধার হয়। তারা হলেন ১) গোপাল ১ম ২) ধর্মপাল ৩) দেবপাল ৪) বিগ্রহপাল ৫) নারায়ন পাল ৬) রাজ্যপাল ৭) গোপাল ২য় ৮) বিগ্রহপাল২য় ৯) মহীপাল ১ম ১০) নয়াপাল ১১) বিগ্রহ পাল ৩য় ১২) মহীপাল ২য় ১৩) শূরপাল ১৪) রামপাল ১৫) কুমারপাল ১৬) গোপাল ৩য় ১৭) মদন পাল
পাল বংশ বাংলাদেশ এবং বাঙ্গালী জাতির গোড়া পত্তন করে। পাল যুগ বৃহৎ সমাজ ও সমন্বয়ের যুগ।
জাতীয় স্বাতন্ত্র্য পাল বংশের সর্বশ্রেষ্ঠ দান। আলাদা ভাবে বেঁচে থাকার একটি স্থানীয় সত্তা যার মধ্যে ছিল নিজস্ব ভাষা,লিপি, ভৌগলিক সত্তা ,একটা আদর্শ আশ্রয় করে গড়ে উঠে আলাদা সত্তা ।
শশাঙ্কের এই সত্তা জাগিয়ে তুলতে এক শত বছর বিলীন হয় পুনরায় পাল আমলে পাল রাজারা জেগে উঠে এবং এই সত্তার জীবন দান করে।
বাঙ্গালী দুই বছরের নবাবী আমল, ১৮০ বছরের মুঘল আমল বা ইংরেজ শাসন চর্চা করে । কিন্তু আমরা ভুলেই থাকি বাংলার শ্রেষ্ঠ সম্রাট ধর্মপাল কে । বাঙ্গালী ভুলে গেছে চর্চার অভাবে পাল যুগের গৌরবময় অতীত কে ।
ভুললে চলবে না বাংলা ভাষার পরিণতি পেয়ে ছিল এই পাল আমলে যা কিনা বাংলার ইতিহাসে স্বর্ণ যুগ আর বাঙ্গালী জীবনের জীবন প্রভাত ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



