( ২১ পর্ব ) বঙ্গ আর বাঙ্গালী,শেকড়ের সন্ধানে
পাল সাম্রাজ্য পতনের কারন।
বাংলার পাল আমল এবং পাল রাজারা ইতিহাসের একটা অন্যতম ঘটনা ।
শশাঙ্ক ছিল বাংলার প্রথম বাঙ্গালী রাজা । কিন্তু তার মৃত্যুর পর নেমে আসে একশত বছর ধরে চলা এক নৈরাজ্য অবস্থা ।
পাল রাজারা সেই অবস্থা থেকে বাংলা কে উদ্ধার করে।
এবং জন জীবনে স্বস্থী আনে।
কিন্তু ইতিহাসের নিয়ম উত্থান আর পতন । তবুও যে একনাগাড়ে তারা প্রায় চার শত বছর শাসন করেছিলো তা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে এক অনন্য ঘটনা।
গোপালের হাত ধরে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা পায় ।
নেতৃস্থানীয় লোকদের দ্বারা তিনি ক্ষমতায় বসেন। গোপাল দেশকে সুসংহত করলেও ক্ষমতার শীর্ষে নিয়ে যায় তার পুত্র ধর্মপাল ।
তারপরে কখনো উত্থান কখনো পতন আবার কখনো স্থবরিতার মধ্যে দিয়ে গেছে পাল আমলের সময় কাল।
তবুও চার শত বছরের দীর্ঘ শাসন আসলেই একটা সুদীর্ঘ সময় ।
পাল আমলের শাসন আমল তিনটি পর্যায়ে ভাগ করা যায় ।
১) সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা এবং পতিপত্তি লাভের সময়
২) অবনতির সময় কাল
৩) চূড়ান্ত পতনের সময় কাল
অন্য সব আমলের মত হটাৎ করে পাল আমল শেষ হয়ে যায় নি ।
ধীরে ধীরে যেমন উঠেছে তেমন ধীরে ধীরেি হারিয়ে গেছে ক্ষমতা, সময়ের অতলে ।
ইতিবৃত্ত (পাল আমল ৭৫০-৭৮১ )
ব্যপট এর প্রপুত্র গোপাল এর পুত্র ধর্মপাল ছিল বুদ্ধিমান, এবং রাজনীতিবিদ। তিনি ছিলেন সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল রাজা সব পাল রাজা দের মধ্যে ।
ত্রিপক্ষিয় শাসকের নায়ক ছিলেন তিনি। বর্তমান বাংলা এবং বিহার নিয়ে গঠিত রাজ্যটি ধর্মপাল শক্তিশালী রাজ্যের কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসেন ।
গৌড়,মঘধ, আর উত্তর ভারতের নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে এক বৃহৎ রাজ্যে পরিণত করেন। ৪০ বছর ক্ষমতায় থাকার পর ৮১০ সালে মৃত্যু বরন করেন। তার পরে তার পুত্র দেবপাল ক্ষমতায় আসেন। ৮৬১ সালে দেবপালের মৃত্যুর পরে পাল আমলের অগ্রগতি স্থবির হয়ে যায় । এই সময় গুলোর মতো আর কখনই ফিরতে পারে নাই পাল রাজারা।
৮৬১ সাল পর্যন্ত পালদের প্রভাব প্রতিপত্তি কাল ছিল।
দেবপালের পরেও ৩০০ বছর পাল বংশ ছিল কিন্তু তা কোনমতে টিকে থাকা।
কেউ কেউ শাসক হিসেবে নৈপুণ্য দেখাতে পারলেও গৌরব ধরে রাখতে পারে নাই । যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না।
তাই নানা প্রতিকূল পরিবেশে ধীরে ধীরে পতনের দিকে ধাবিত হয় ।
দেবপালের পরে কে ক্ষমতায় ছিল তা নিয়ে রয়েছে ধোঁয়াশা । বেশ কয়েকজন এর মধ্যে ক্ষমতায় বসলেও রাজ্যের অবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে ।
কম্বজ রা বরেন্দ্র ভূমী এবং পশ্চিমবঙ্গ তাদের দখলে নিয়ে নায় ।তবে ৯৫০ সালে আর একজন পাল রাজা তিনি প্রথম মহীপাল কিছুটা ভালোর দিকে নিয়ে যায়। ৯৫৫ থেকে একহাজার ৪৩ সাল পর্যন্ত ছিল মহিপালের শাসন কাল।
পাল আমল শেষ হওয়ার আগে তার শাসন কাল 'আলো নিভে যাওয়ার আগে দপ করে জ্বলে উঠার মতো'।মহীপাল ছিল দ্বিতীয় বিগ্রহ পালের পুত্র ।
মহীপাল তার পুর্বসুরীর মর্যাদা কিছুটা হলেও উদ্ধার করতে সক্ষম হন। তিনি কম্বজ দের হাত থেকে পিতৃ ভূমী উদ্ধার করে হৃত গৌরব ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট হন।
সে সময় গজনীর 'সুলতান মাহমুদ ' ভারত অভিযান চালান। সে সময় সমস্ত হিন্দু রাজা একত্র হয়ে জোট বাঁধার চেষ্টা করলেও মহীপাল সেই জোটে যোগ না দিয়ে নিজের সাম্রাজ্য শক্ত করতে মননিবেশ করেন।
মহীপালের মৃত্যুর পরে তার পুত্র নয়াপাল ক্ষমতায় আসে। তিনি কর্চুরির রাজার আক্রমণ ঠেকিয়ে পিতৃরাজ্য ধরে রাখতে পেরেছিলেন ।
নয়াপালের মৃত্যুর পরে তার পুত্র ৩য় বিগ্রহ পালের সময় কর্নপাল তার রাজত্ব আক্রমণ করে। তবে ৩য় বিগ্রহ পাল তাকে পরাজিত করে। কিন্তু চালক্য রাজা বিক্রমাদিত্যের কাছে পরাজিত হন। তিনি দিশেহারা হয়ে পড়েন এবং পাল সাম্রাজ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকে। এই সময় পুর্ববাংলা দখল করে নায় বর্মন রা।
ইতিহাস কখনো কখনো উলটো পথে হাঁটে ।
এক সময় বিশৃঙ্খলা এবং অরাজকতা থেকে রক্ষ্যা পেতে পাল রাজা গোপাল কে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল দুঃখের বিষয় সেই পালদের আমলেই শুরু হয় আবার
বিশৃঙ্খলা ।
"মাছে ভাতে বাঙ্গালী" সেই মাছ খাওয়ার উপর
নিষেধাজ্ঞা থেকে পাল আমলের
"কৈবর্ত বিদ্রোহ"
২য় মহীপাল তখন ক্ষমতায় ।
বৌদ্ধ ধর্ম অনুসরণ করতে গিয়ে "মাছ ভক্ষণ" বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
কিন্তু বাঙ্গালীর প্রধান খাদ্য "মাছ ভাত " । প্রাকৃতিক কারনে বঙ্গের মানুষ মৎস্য ভোজী ।
কাজেই এই মাছ খাওয়ার উপরে নিষেধাজ্ঞা এলে
জনোরোষ বৃদ্ধি পেতে থাকে । এবং পরে তা বিদ্রোহে পরিণত হয়।
কৈবর্ত মূলত ছিল জেলে সম্প্রদায়ের কিন্তু পরে তাতে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলের মানুষ যোগ দায় । বরেন্দ্র অঞ্চলের আপময় জনতা এই বিদ্রোহে সমর্থন দিয়েছিল ।
কৈবর্ত দের নেতা ছিল "দিব্যক" । এবং একসময় সে এক সময় পাল রাজাদের রাজ কর্মচারী ছিল ।
"দ্বিতীয় মহীপাল" এই দিব্য আর এই বিদ্রোহ প্রতিহত করতে গিয়ে মৃত্যু মুখে পতিত হয়।
এই বিদ্রোহ কেই বাংলা অঞ্চলে সবচেয়ে সফল বিদ্রোহ বলা হয় ।
দ্বিতীয় মহীপালের মৃত্যুর পরে পাল রাজ্যের হাল ধরে "সুর পাল" আর সুর পালের পরে আরও একটু আলো ছড়িয়ে ছিল "রামপাল" ।
অপর দিকে বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষমতা গ্রহণ করে "দিব্যক" এবং তারপরে "ভীম" । দিব্যক এবং ভীম দুজনেই সুশাসক ছিলেন।
রামপালের হাতে ভীমের মৃত্যু
তাদের জনপ্রীয়তায় রামপাল শঙ্কিত হয়ে পড়ে এবং রামপাল আরও কিছু সামন্ত রাজাকে নিজের দিকে করে ভীমকে আক্রমণ করে ।
প্রচণ্ড যুদ্ধে ভীম বন্দী হলে রামপাল ভীম এবং তার পুরো পরিবার কে নিষ্ঠুর ভাবে হত্যা করে।
ভীমের মৃত্যুর পরে বরেন্দ্র অঞ্চলের ক্ষমতা আবার পালদের হাতে আসে। রামপাল রাজ্য পুনরুদ্ধার সহ উড়িষ্যা এবং কামরূপে আধিপত্য বিস্তার করতে সমর্থ হয়ে ছিল ।
রামপালের মৃত্যুর পরে আর কোন শক্তিমান রাজা কে পাল রাজ্যের মসনদে দেখা যায় নি ।
রামপালের মৃত্যুর পর তার পুত্র "কুমার পাল" ক্ষমতায় আসে এবং তার আমলে ক্ষমতা ধীরে ধীরে সংকুচিত হতে থাকে ।
সেন বংশের উত্থান
এই সময়ে রাঢ় অঞ্চলে সেন রাজাদের উত্থান হয়।
প্রায় চার শত বছর আগে যে গোপাল কে দিয়ে পাল বংশের উত্থান হয়ে ছিল সেই ক্ষমতা শক্ত হাঁটে ধরে ছিল চতুর্থ গোপাল পর্যন্ত ।ধারনা করা হয় শত্রু দের হাতে মৃত্যু বরন করেন তিনি।
তারপরে যারা এসেছিল তাদের হাতে পাল দের ক্ষমতা চূড়ান্ত ভাবে ভেঙ্গে পড়ে ।
"মদন পাল" শেষ পাল রাজা
যে পাল রাজ্যের ক্ষমতা তীলে তীলে গড়ে উঠেছিল সেই ক্ষমতার চূড়ান্ত পতন হয় ১১৬১ সালে "মদন পালে" এর সময় ।
রাজবংশের উত্থান পতন ইতিহাসের একটা সাধারণ নিয়ম হলেও পাল দের ইতিহাস একটু ব্যাতিক্রম ।
দার্শনিক ইবনে খালেদুন এর মন্তব্য
পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করে সরলীকরণে উপনীত হয়ে দার্শনিক ইবনে খালেদুন বলেছিলেন,
"একটি রাজবংশ সাধারণত একশত বছর ক্ষমতায় থাকে, কিন্তু প্রায় চারশত বছর ক্ষমতায় থেকে পাল বংশ একটি অনন্য উদাহরন সৃষ্টি করেছেন " ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



