
শেকড়ের খোঁজে,সাধারন মানুষের জীবন
"আমি আকাশে পাতিয়ে কান
শুনেছি শুনেছি তাদের গান" রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
চোখ বন্ধ করলে যেমন চিন্তায় ভেসে আসে তাদের চলা ফেরা, কান পাতলে যেন শুনতে পায় তাদের কথা আর মাটি হাতে নিলে মনে হয় এই মাটিতেই তারাও চলাফেরা করতো ঠিক আজকে আমরা যেমন করছি।
আর সীমানা?
"উত্তরে উত্তর গিরি
দক্ষিণেতে দুরন্ত সাগর"
"আমাদের সীমা হল
দক্ষিণে সুন্দরবন
উত্তরে টেরাই " প্রেমেন্দ্র মিত্র
একটু একটু করে ৫০০, ১০০০ তারপরে ২০০০ বছর পেছনে গিয়ে চলুন দেখে আসি কেমন ছিল আমাদের বঙ্গের সাধারন মানুষের জীবন,কেমন ছিল তাদের পোশাক? বাড়িঘর আর সাজগোজ ? প্রতিদিনের খাবার?
এগুলো ইতিহাসে তেমন থাকে না। থাকে কে কতদিন রাজত্ব করেছে ,কত গুলো রাজ্য জয় করেছে ইত্যাদি ইত্যাদি ।
আর সাধারন মানুষের কথা?
তা আলোচনায় থাকে না। তবে জানতে কার না ইচ্ছা করে। তারাও তো ইতিহাসের অংশ ।
পোশাক সবসময় পরিবর্তন হতেই থাকে ।আজ আমরা যা পরছি তা ১০০ বছর আগে পরা হতো না এবং ১০০ বছর পরে আবার পরিবর্তন হয়ে যাবে ।
উদাহরন স্বরূপ বলা যায় ইউরোপে বা ব্রিটেনে ভিক্টোরিয়ান আমলে পায়ের গোড়ালি পর্যন্ত অনেক কুচি সহকারে গাউন পরা হতো । তারপরে লম্বা স্কার্ট গ্যাদারিং ছাড়া,তারপরে হাঁটুর নীচ পর্যন্ত স্কার্ট ,ক্রমাগত ভাবে লম্বা ড্রেস ফ্রকের মতো এবং এখন জিনসের Trouser ।
এখন দেখি বাংলার পোশাক । একটা টাইম মেশিনে চড়ে চলে যায় ১৫০০ থেকে ২০০০ বছর আগে। তখন আমরা দেখতে পাবো এই অঞ্চলেই বাঙ্গালীরা কি পরে থাকতো।
"পোশাক" ব্যাপারটায় একেবারে শুরুর দিকে চলে গেলে সবার ক্ষেত্রেই একই রকম। অর্থাৎ শীত থেকে রক্ষা পেতে যা পাওয়া যেতো প্রকৃতি থেকে তাই পরতো সেলাই ছাড়া। যেমন গাছের বাকল,চামড়া বা পাতা দিয়ে কোন মতে শরীর ঢাকা ।
তারও আগে যখন মানুষ এসেছিল এই পৃথিবীতে তারা বিচরণ করতো আর সব পশু পাখীর মতোই । পশুর গায়ে কাপড় থাকতো না মানুষের গায়েও কিছু থাকতো না।
তবে অজানা কোন কারনে "মানুষের" বুদ্ধির ভাগ টা একটু বেশি হয়ে গেছে । এই একটু বেশি বুদ্ধি থাকার জন্য মানুষ হয়ে গেলো "থিঙ্কিং ম্যান" ।
এই একটু বেশি বুদ্ধি থাকার জন্য তাদের বুদ্ধির ইভুলেসান হওয়া আরম্ভ হয়ে গেলো ।
পশু পাখী মারার জন্য পাথর দিয়ে অস্ত্র বানাতে শিখলো,তীর ধনুক,সুচালো পাথর,পাথরের সাথে কাঠের বাঁট লাগাতে শিখলো ।
তারপরে আগুন জ্বালাতে শিখলো । বদলে দিল জীবন ধারা এই আগুণ আবিষ্কার । আগুণ দিয়ে কাঁচা মাছ আর মাংস পুড়িয়ে,ঝলসে খেতে শেখায় হজমের সুবিধা হয়ে গেলো ।
নেমে এলো গাছ থেকে আর বাস করতে শিখলো পাহাড়ের গুহায় । এই গুহায় বাস করে আগুণ জ্বালিয়ে পশুর হাত থেকে রক্ষা তো পেলোই এবং তার পরে ঠাণ্ডার হাত নিজেকে বাঁচালো।
এর পরে ঠাণ্ডা,গরম, আর আঘাতের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গায়ে টেনে নিলো আবরণ বা পরিচ্ছদ ।
মানুষের পোশাকের ইতিহাস জানতে চলে যেতে হবে ১ লক্ষ্য বছর আগে ।
কিন্তু বাঙ্গালীর পোশাক ব্যাবহার জানতে অতদুর যাওয়া সম্ভব নয়। আমরা যেতে পারি ২৫০০ হাজার বছর আগে "চন্দ্র কেতু গড়ের" দেয়াল চিত্র দেখতে ।
তার আগে কোন পাথরে আঁকা কোন দেয়াল চিত্র সে অর্থে নাই।
চন্দ্র কেতু গর,পাহাড়পুর, এবং বিভিন্ন শ্লোক আর ধর্মিয় গ্রন্থ খুঁজতে হবে কেমন ছিল আমাদের সাধারন মানুষের জীবন আর বেশ ভুষা।
প্রাচীন বাংলায় গাছের ছালকে পাতাল করে বানানো হতো "ক্ষৌম" । ক্ষৌমের প্রছন ছিল এই বঙ্গেও ।বানগড়ে পাওয়া গেছে পাতলা হাড় দিয়ে বানানো সূচ
অর্থ শাস্ত্র থেকে জানা যায় মৌর্য যুগে বঙ্গ দেশে কার্পাস থেকে সুতা তৈরি হতো ।
তার আগে জানা যায় কার্পাসের পাশাপাশি পাট,অতসী আর রেশম এটাই ছিল কাপড় বুনোনের উপকরন ।
পুরুষের পোশাকঃ
বাংলায় নারী পুরুষের পোশাকে খুব একটা তফাৎ নাই।
পুরুষ নিন্মাঙ্গে এক টুকরো কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতো। যাকে বলা হয় "দুকুল" ।
দুকুল অনেকটা ধূতির মতো । মনে করা হয় 'ধূতি' কথাটি এসেছে ধৌত থেকে । বঙ্গের দুকুল ছিল সাদা রঙের । তবে সব ধূতি সাদা রঙের ছিল না। পুণ্ড্রের দুকুল ছিল 'শ্যামলা" ।
কোমরে পেঁচিয়ে এক কোন ধরে টেনে এনে কোমরে গুঁজে দিয়ে ধূতি পরতে হয় । উঁচু শ্রেণীর মানুষ রা পরত হাঁটুর নীচ অবধি। আর সাধারন মানুষ হাঁটু পর্যন্ত।
গিঁট দিয়ে শক্ত করা ছাড়াও আর একটা কাপড় দিয়ে বেঁধে রেখে এক প্রান্ত লম্বা করে নীচে ঝুলিয়ে দিতে হতো । যাকে বলা হয় "কোটি বন্ধ" আর কোট বন্ধের গাঁট টা সামনে ঝুলিয়ে রাখা হতো । যা দেখা যায় প্রাচীন মূর্তি গুলোর পরিধানে ।
তবে চাষবাস করার সময় একেবারে উপরে টেনে নিয়ে পরা হতো, যাকে বলা হয় "নেংটি" বা "ন্যাগটি" । কাদা মাটি থেকে রক্ষা পেতে যার চলন এখনো আছে অনেক জায়গায়। মল্ল যুদ্ধ করার সময় এবং সাধু সন্ন্যাসীরা এখনো এভাবে পরে ।
পুরুষ রা উপরে কিছু পরতেন না তবে কোন উৎসবে এক খণ্ড কাপড় আড়াআড়ি ভাবে গায়ে দিতেন।
মেয়েদের পোশাকঃ
মেয়েরাও এক কাপড় পরতেন এবং পরার রীতিও ছিল পুরুষের মতো । তবে তা থাকতো পায়ের গোড়ালি
পর্যন্ত ।
তবে অলংকার ছাড়া ঊর্ধ্বাঙ্গে কিছুই থাকতো না। যা ছিল খুব সাধারন ব্যাপার।
অনেক দিন ছিল এই একই পোশাক ।
যা কিন্তু দেখা যায় এখনো আফ্রিকার অনেক ট্রাইব দের মধ্যে । এবং তারাও অনেক গয়না পরে ঠিক প্রাচীন বঙ্গের নারীদের মতোই ।
নারী দেহের উত্তরার্ধ অনাবৃত রাখার প্রথা শুধু বঙ্গেই নয় সমগ্র প্রাচীন আদি অস্ট্রেলীয় -পলেনেশিয়-মেলানেশিয়- নরগোষ্ঠীর মধ্যে এটাই ছিল প্রচলিত নিয়ম।
বালি দ্বীপ এবং প্রশান্ত মহাসাগরীয় অন্যান্য কয়েকটি দ্বীপে সেই অভ্যাস এখনো বিদ্যমান ।
এই পরিধান থেকেই ধীরে ধীরে সেই কাপড় টি শাড়ি তে রূপান্তরিত হয়। শাড়ির দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং এক প্রান্ত লম্বা করে এনে টেনে দিয়ে সামনে টা পেঁচিয়ে দিয়ে শরীর টা ঢাকে।
একটা লম্বা কাপড় পেঁচিয়ে এবং কোমরে গুঁজে দিয়ে পরার ব্যাপার টি এখনো গ্রাম বাংলায় দেখা যায় । এবং তারাও ব্লাউজ পরে না ।
নীচে পেটিকোট বা ব্লাউজ আসে অনেক অনেক পরে , নব্য যুগে ।
প্রাচীন বাংলায় সেলাই করা বস্ত্র পরিধানের বিষয়টি ছিল না। মধ্য ভারত বা উত্তর বা পশ্চিম ভারতে সেলাই করা বা জামার ব্যাবহার লক্ষ্য করা যায়।
কিন্তু তামিল ,গুজরাট, মারাঠি, আর বাঙ্গালী এই ধরন টি গ্রহণ করেনি । পরে যে শাড়ি এসেছে তা কিন্তু এখনো বাঙ্গালী আর তামিল দের প্রধান পছন্দের পরিধেয় পোশাক ।
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই মে, ২০২৬ রাত ৩:১৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



