somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পাইরাসিটামল (এক দিন মজুরের গল্প)

০৭ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:২৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

বয়স ১৯ কি ২০ কিন্তু যে কেউ দেখলে বলবে ৩০ বছর! ওর নাম রমিজ। ১৫ বছর বয়স থেকেই মা আর বোনের সংসারের বোঝা কাঁধে চাপার জন্যই হোক আর দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলেই হোক, এই ৫ বছরেই তারুণ্য কে তাড়িয়ে দিয়ে তার চোখে মুখে চেপে বসেছে বয়স্কের ছাপ!! এ নিয়ে তার কোন মাথা ব্যাথাই নেই। বরং তার চেয়ে সুখী মানুষ যেন এই দুনিয়ায় মেলা ভার। কিসের রোদ, কিসের বৃষ্টি, কিসের তুফান!! আবহাওয়া যাই হোকনা কেন কাজে যাওয়া চাই চাই। বোনটা ক্লাস থ্রি তে উঠলো, ওর পড়াশোনার খরচ লাগবে যে ! বিধবা মা টা যে পথ চেয়ে বসে থাকে কখন ছেলে বাজার হাতে বাড়ি ফিরবে ! মাসে ঘর ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল, পানির বিল এত এত খরচের পয়সা আসবে কোত্থেকে !! এমন ছেলে ঘরে বসে থাকলে কি মানায়!! তাতে তার চেহারা বুড়ো মানুষের মত দেখাক আর চুলোয় যাক কিচ্ছু আসে যায় না রমিজের!! তার চাই মায়ের মুখে হাসি আর বোনের জীবনের নিরাপত্তা। তাইতো সে ঠাঁ ঠাঁ রোদ কিংবা ঝুম বৃষ্টি কোন কিছুকেই তোয়াক্কা না করে ছুটে চলেছে জীবিকার সন্ধানে। বাবা বেঁচে থাকলে হয়তো দুকলম বিদ্যা পেটে জুটতো। কিন্তু তাহলে যে আর প্রকৃতির সইছিল না !! ঠিকি বাপটার অকাল মৃত্যু হলো আর এই চোখ না ফুটতেই ঘারে চেপে বসল সংসারের বোঝা। অবশ্যি এখন আর তার ৰোঝা মনে হয় না। এই ৫ বছরে প্রকৃতি সব শিখিয়ে দিয়েছে ওকে।
আমার এক বন্ধু গোছের বড়ভাই ইসমাইলের ওষুধের দোকানে বসে জেসমিন ফ্লেভার নিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম। মুলত এই ওষুধের দোকান থেকেই আমার পরিচয় হয় রমিজের সাথে। দেখলাম একটা ঠেলা ভ্যান গাড়ি এসে থামল দোকানের সামনে। ঠেলা গাড়িতে চুলার ব্যবস্থা আছে। যেখানে একটা ছোট্ট কড়াইয়ে ভাজা হচ্ছে বাদাম, ছোলা, বুট ইত্যাদি। গাড়িটা রেখে সে দোকানের দিকে এগিয়ে এলো। রমিজ কে দেখেই বোঝা যাচ্ছে সে বেশ অসুস্থ। ইসমাইল ভাইয়ের হাতে ২০ টা টাকা দিয়ে বলল -
"ভাইজান, দুই পাতা পাইরাসিটামল দ্যান তো"
ইসমাইল ভাই বলল -"ওই নামে কোন ওষুধ নাই!! ওটা প্যারাসিটামল হবে, পাইরাসিটামল নয়"
-"বহুত কষ্টে পাইরার লগে নাম মিলাইয়া ওষুদ ডার নাম মুকস্ত করছি ভাইজান" লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল রমিজ।
-"হুম বেশ করেছিস" বলে রমিজের হাতে ওই ২০ টাকা ফিরিয়ে দিয়ে আমাদেরকে ২০ টাকার বাদাম দিতে বলল ইসমাইল ভাই।
কি অদ্ভুত দুনিয়া!! আমরা সবাই একে অপরের নিকট দায় বদ্ধ!! কেউ একা সম্পূর্ণ রূপে সয়ং সম্পূর্ণ নয়। ওষুধের জন্য রমিজ আসলো আমাদের কাছে। আবার বাদামের জন্য আমরা যাচ্ছি রমিজের কাছে!! পুলিশ যাচ্ছে ডক্টরের কাছে রোগ দেখাতে। আবার ডক্টর যাচ্ছে পুলিশের কাছে চোর দেখাতে। সে যাই হোগ্গে, রমিজ হাসি মুখে বাদাম দিতে দিতে বলল -"৫ টাকার বাদাম বেশি দিছি ভাইজান"
এতটুকু মানুষের ৫ টাকার বাদাম বেশী দেয়ার পেছনে যে আন্তরিকতা আর বড় মনের পরিচয় লুকিয়ে ছিলো তা আমাকে বেশ অভিভুত করল। রমিজ গাড়ি নিয়ে এগোতে থাকলো। আমি বাদাম খাচ্ছি আর রমিজের দিকে তাকিয়ে আছি যতদূর ওকে দেখা যায়! দেখলাম ও পাশের একটা চায়ের দোকানে দাড়ালো! এক গ্লাস পানি নিল! তারপর অবাক হয়ে দেখলাম এক সাথে ৫ টা ওষুধ খেয়ে ফেলল !! আমি ইসমাইল ভাইকে আসছি বলে ছুটে গেলাম ওই চায়ের দোকানে। -
"এই ছেলে এটা কি করলে??" ধমক দিয়ে বললাম আমি। রমিজ কিছুটা হকচকিয়ে গেলো!! আমি আবার বললাম- "৫ টা ওষুধ এক সাথে কেউ খায়?"
রমিজ বলল -"ভাইজান, এই ওষুদি এক মাত্তর ব্যাবাক রোগের ওষুদ"
"কে বলেছে তোমাকে এইসব ফালতু কথা?" জিজ্ঞাসা করলাম আমি।
"আমগো এক বন্দু আচে, হেই কইছে। উপকারো হইচে মেলা" অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিল রমিজ।
"ও আচ্ছা!! তো কি কারনে এই ওষুধ খেলে তুমি?"
"ভাইজান, ইকটু জ্বর জ্বর লাগে, হেইল্লিগা"
আমি রমিজের কপালে হাত দিয়ে চমকিয়ে উঠলাম!! এইটা ইকটু জ্বর!!! প্রচন্ড জ্বর তার শরীরে!! আমি রমিজকে ইসমাইল ভাইয়ের দোকানে নিয়ে এসে থার্মোমিটার দিয়ে ওর জ্বর মাপলাম। ১০৩ জ্বর!! এই জ্বর নিয়ে এই ছেলে কিভাবে হেটে চলে বেড়াচ্ছে আমি অবাক হয়ে ভাবলাম। রমিজ জানালো ওই প্যারাসিটামল খেলে তার জ্বর কমে, কিন্তু এখন নাকি আর একটা দুটোতে কাজ করেনা!! ডক্টর দেখানোর কথা জিজ্ঞেস করলে সে এড়িয়ে যায়!! বলে -"ডাকতার দ্যাখোনের কাম নাই"!! বলেই সে চলে যেতে চাইলো। কিন্তু কেন জানিনা ভয়ঙ্কর অসস্তিতে মনে প্রানে বিষাদ দেখা দিল!! এবার আমি জোর করলাম রমিজ কে ! বললাম -"কতদিন যাবৎ তোমার এই জ্বর?"
-"পিরাই ৩ মাস" সহজেই বলল সে।
-" What!!! ৩ মাস!! অথচ একবারও ডক্টর দেখাওনি?" বেশ বিচলিত হয়েই বললাম আমি। এবং আমি রমিজকে জোর করে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাবো এমনটা অনুমান করেই সে আমতা আমতা করে বলল -"ডাকতার দ্যাখাইছিলাম ভাইজান, কিন্তু অনেক গুলান টেস্টু দিচিল সে ম্যালা ট্যাকার ব্যাপার"
যা বুজলাম তা হলো, ডক্টর সে দেখিয়েছিল, এবং ডক্টর তাকে কিছু ব্লাড টেস্ট দেয়। কিন্তু বোনের ৩ সেট স্কুলের জামা বানিয়ে দিতে হবে, মা কে মাজার ব্যাথার জন্য ডক্টর দেখাতে হবে, এবং দুমাসের বাড়ি ভাড়া বাকি পরাই সে আর ওমুখো ভেড়েনি। তারচে বরং মাসের পর মাস পাইরাসিটামল দিয়েই চালিয়ে নিচ্ছে সে!!
ভিষণ মায়া হলো ছেলেটার প্রতি। বিশেষ করে ওর জীবনের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ঝরের গল্প শুনে এবং মা আর বোনের প্রতি ওর দ্বায়িত্বববোধ দেখে আমার অবচেতন মনেও নাড়া দিল। এটিএম বুথে ঘষা দিয়ে ৫ হাজার টাকা তুললাম। রমিজের বাড়ির ঠিকানা নিলাম। আর ওর হাতে টাকাটা দিয় বললাম টেস্ট গুলো করাতে। ইসমাইল ভাইও তার ড্রয়ার থেকে ১ হাজার বের করে আমাকে উদ্যেশ্য করে বলল -
"কি ফয়সাল মিয়া!! ভালো কাজে আমাকেও একটু অংশীদার করো!!"
আমি হেসে ফেললাম... তারপর টাকাটা নিয়ে রমিজের হাতে দিলাম। রমিজ টাকাটা হাতে নিয়েই আমার মাজা জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে সেকি মরা কান্না!!! ভ্যা ভ্যা করে কাঁদলো আর আব্বা গো ... আব্বা গো ... বলল। আমি ওর কপালে হাত দিয়ে দেখলাম জ্বর নেই। এভাবেই শুধু প্যারাসিটামল খেয়ে খেয়ে জ্বর কমিয়ে রাখছে সে!! এটা যে কি ভয়ানক ব্যাপার জানত না সে ...
৩ দিন পর ...
রমিজের ঠিকানা অনুযায়ী মিরপুর ১ জি ব্লক এর বস্তিতে থাকার কথা। সেই মোতাবেক রওনা দিলাম আমি আর ইসমাইল ভাই। বস্তির মুখেই অনেক মানুষের ভীড়!! যেহেতু ঢাকার বস্তি গুলো এরকমই তাই ব্যাপারটাকে আমোলে না নিয়ে এগিয়ে চললাম। বস্তির মুখে ঢুকতেই দেখলাম রমিজের ভ্যানগাড়ি টা। সারিবদ্ধ অনেক গুলো ছোট ছোট ঘরের তালিকায় দ্বিতীয় ঘরটা হলো রমিজদের।
বারান্দায় রমিজের মা, আর ফুটফুটে বোনটা বসে আছে। তাদের সামনে পরে আছে রমিজের মৃত দেহটা ..!! দেখে বোঝা যাচ্ছে মৃত্যুর আগে নাক দিয়ে বেশ রক্ত ক্ষরণ হয়েছিল!! নাক মুখের কাছে কিছু মাছি উরছিল। মাঝে মাঝে বোনটা কেঁদে কেঁদে উঠছে। কিন্তু ওর মা স্থির!! সে আমাদের জানাল রমিজ নাকি ৩ দিন আগে তাকে নিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছে, ওষুধ কিনে দিয়েছে বোন কে ৩ সেট স্কুলের জামা কিনে দিয়েছে, বকেয়া বাড়ি ভাড়া দিয়েছে!! এসবের পিছনে নাকি মোট ৫৫০০ টাকা খরচ হয়েছিল। তিনি রমিজকে টাকার কথা জিজ্ঞাসা করাতে রমিজ নাকি বলেছিল ফেরেশতা এসে তাকে টাকা দিয়ে গেছে!!!
ইসমাইল ভাই দেখলাম ফোপাচ্ছেন। কিছুতেই তিনি এ মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। আমি লক্ষ্য করলাম রমিজের ডান হাত শক্ত করে মুঠ করা!! আমি অনেক কষ্টে মুঠ খুললাম। একরাশ বেদনা আর মিষ্ময় নিয়ে দেখলাম ৫ টা প্যারাসিটামল!!!
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ১২:২৫
৪টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"..

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:৪৯

"আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথঃ দ্য আয়নাঘর ফাইলস"
-একজন গুমের শিকার মানুষের চোখে একটি ভয়াবহ সত্যের দলিল।

“আনফোল্ডিং দ্য ট্রুথ: দ্য আয়নাঘর ফাইলস”- নামটি যতটা আকর্ষণীয়, বইটির ভেতরের সত্য তার চেয়েও বেশি নির্মম, বেদনাদায়ক... ...বাকিটুকু পড়ুন

মানুষের অহংকার ও বুদ্ধিমত্তার ভ্রান্ত ধারণা

লিখেছেন শেরজা তপন, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৫২


উৎসর্গঃ ব্লগার রাজীব নুর( ঈশ্বর বিশ্বাসের কোল ঘেঁষে যাওয়া কোন লেখা এলেই যিনি লেখককে ভীষন সন্দেহের চোখে দেখেন- ভাবেন; কি অদ্ভুত কথা- ইনি দেখি ঈশ্বর বিশ্বাসী!!))
ধর্ম ও বিজ্ঞান: সংঘর্ষ না... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঠেলায় নাম বাবাজি

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৯


সময়টা সরকারের জন্য মোটেও ভালো যাচ্ছে না। একদিকে গ্যাস আর বিদ্যুতের সংকটে মানুষ প্রতিদিন কষ্টে দিন কাটাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারের একের পর এক সিদ্ধান্ত নেটিজেনদের বাধার মুখে পড়ছে। ফলে সরকার নতুন... ...বাকিটুকু পড়ুন

শেখ হাসিনার মত তারেক জিয়াও কি ভারতে ইলিশ পাচার করছে?

লিখেছেন জ্যাক স্মিথ, ১০ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:২৬



চলছে ইলিশের ভরা মৌসুম কিন্তু বাজারে কোন ইলিশ নেই.... ইলিশ নেই বললে ভুল হবে ইলিশ আছে কিন্তু উহা সাধারণ মানুষের ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আওয়ামীলীগ আমলের ১৭ টি বছর... ...বাকিটুকু পড়ুন

~~~সংশয়~~~

লিখেছেন জটিল ভাই, ১১ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৩

♦أَعُوْذُ بِاللهِ مِنَ الشِّيْطَانِ الرَّجِيْمِ (বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহ্'র নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করছি)
♦بِسْمِ ٱللَّٰهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ (পরম করুণাময় অসীম দয়ালু আল্লাহ্'র নামে)
♦ٱلسَّلَامُ عَلَيْكُمْ (আপনার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)


(ছবি নেট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×