বিয়ে আমাদের জীবনে একটি স্বাভাবিক ও গুরুত্বপূর্ন ঘটনা। জীবনে একজন লোক নিজে বিয়ে করা ছাড়াও ভাইবোন বা আত্নীয় স্বজনদের বিয়ে দিয়ে থাকে।
আমাদের সমাজে বা দেশে প্রচলিত যেসব প্রথা ইসলামের দৃষ্টিতে হারাম সেগেুলো আমরা বর্জন করা উচিৎ। বিয়ের সময় যৌতুক, গায়ে হলুদ বা গান বাজনা করা ইত্যাদি বিদাত বা হারাম তা আমরা সবাই জানি। এগুলো ছাড়াও আরোও কিছু কুপ্রথা আমাদের সমাজে প্রচলিত আছে। তাই আমাদের মুসলিম সমাজে প্রচলিত বিয়ে সংক্রান্ত কিছু বিদাত ও হারাম বিষয় নিয়ে কোরআন ও হাদীসের আলোকে আজ আলোচনা করবো।
১। পালিয়ে বিয়ে করাঃ মেয়ের অবিভাবকের অনুমতি ছাড়া পালিয়ে বিয়ে করা ইসলামে হারাম। অর্থাৎ মেয়ের শরীয়ত সম্মত অবিভাবক ছাড়া বিয়ে শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য নয়। নবী করিম (সঃ) বলেন- “ওলী ছাড়া বিয়ে হয়ন।” আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্নিত –কোন মহিলা তার ওলীর বিনা অনুমতিতে নিজেই বিয়ে করে ফেললো তার সম্বন্ধে নবী করিম (সঃ) বলেছেন, তার বিয়ে বাতিল, বাতিল, বাতিল (তিনবার বলেছেন)।” ওলী অর্থ হচ্ছে শরীয়ত সম্মত অবিভাবক। অপরপক্ষে একটি ছেলে তার অবিভাবকের সম্মতি ছাড়াও বিয়ে করতে পারে। তাই আজকের যুব সমাজে প্রচলিত কোর্ট ম্যারেজের ক্ষেত্রে অন্তত মেয়ে পক্ষের অভিবাবকের অনুমতি নিতে হবে। তাছাড়া সে বিয়ে ইসলামের দৃষ্টিতে গ্রহনযোগ্য হবেনা। তবে যদি কোন মেয়ে মনে করে যে তার বাবা মা কোন কিছুর লোভে বা কারও ভয়ে তাকে কুপাত্রের কাছে বিয়ে দিতে চাচ্ছে বা তাদের কে বোঝানো যাচ্ছেনা আবার বিয়েতে রাজী না হলে কোন প্রকার সমস্যা হবে অথবা ইত্যাদি আরও অনেক সমস্যার কারনে পালিয়ে যাওয়া ছাড়া কোন উপায় না থাকে তবে সেক্ষেত্রে কোন বিজ্ঞ আলেমের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে বিয়ে করা উচিৎ।
২। মেয়ে দেখাঃ মেয়ে দেখার ক্ষেত্রে পাত্র পক্ষের মহিলারা ও পাত্র নিজে দেখতে পারেন। অন্য কোন পুরুষ লোক মেয়ে পক্ষের সাথে আলোচনা করতে পারবেন কিন্তু মেয়ে দেখতে পারবেন না । তবে পাত্রের নিজে দেখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নবী করীম (সঃ) সাহাবীদের নিজের চোখে পাত্রী দেখে পছন্দ করতে নির্দেশ বা উপদেশ দিয়েছেন।
৩। মেয়ের কবুল বলাঃ আমাদের সমাজে আরেকটি বিদাত হচ্ছে বিয়ের দিন মেয়ের তিনবার কবুল বলা। বস্তুত মেয়ের কবুল বলার কোন প্রয়োজন বা বিধান নেই। বিয়ের দিন মেয়ের অবিভাবক মেয়ের বিয়েতে সম্মতি দিলে ছেলে কবুল বল্লেই বিয়ে হয়ে যায়। তাই বিয়ের দিন মেয়ের কোন কাজ নেই। অভিবাবক আগেই মেয়ের অনুমতি নিয়ে নিতে হয়। উল্ল্যেখ্য মেয়ের অনুমতি ছাড়া বিয়ে হবেনা।
৪। ওকিল বানানোঃ বিয়ের দিনে ওকিল ও সাক্ষী দিয়ে মেয়ের অনুমতি নেয়ার প্রথা আমাদের দেশের অনেক জায়গায় প্রচলিত। মেয়ের অনুমতি নেওয়ার দায়িত্ব তার অবিভাবকের। তাই বাইরের কোন লোক, ওকিল বা সাক্ষী ইত্যাদি ইসলাম সম্মত নয়।
৫। কবুল বলার পর সালাম করাঃ আমাদের দেশে আরেকটি বিদাত হলো কবুল বলার পর বর দাড়িয়ে সবাইকে সালাম করে। আসলে সালাম করতে হয় কারও সাথে দেখা হলে বা কোথাও গেলে বা বিদায় নেওয়ার সময়। বিয়ের অনুষ্ঠানের মাঝখানে দাড়িয়ে এভাবে সালাম দেয়ার প্রথা নবী(সঃ) এর আমলে ছিলোনা অর্থাৎ তা পরে আবিস্কৃত।
৬। বিয়ের মোহরানাঃ বিয়ের মোহরানা নির্ধারনের ক্ষেত্রে সামাজিক সম্মান বিবেচনা করে অসম্ভব বা অসাধ্য পরিমান মোহরানায় রাজী হওয়া বা বরপক্ষকে চাপ দিয়ে রাজী করানো ইত্যাদি শরীয়ত সম্মত নয়। নবী করীম (সঃ) নগদ মোহরানা দিয়ে বিয়ে করেছেন বা সাহাবীদের সাধ্যমতো মোহরানা দেয়ে বিয়ে পড়িয়েছেন। মোহরানা হতে পারে টাকা পয়সা, জমিজমা, অলংকার এমনকি জ্ঞান বা শিক্ষাও হতে পারে।
৭। বিয়ের অনুষ্ঠানঃ আমাদের দেশের প্রচলিত বিয়ের ক্ষেত্রে মেয়ে পক্ষ ঘটা করে অনুষ্ঠান করে লোক দাওয়াত দিয়ে খাওয়ায়। ইসলামী দৃষ্টিতে মেয়ে পক্ষের অনুষ্টান করা বা লোক খাওয়ানোর কোন বিধান নেই। তবে বরপক্ষের লোকদের জন্য মেহমানদারী করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে সামাজিক নিয়মের চাপে পড়ে বাবা মা ধারদেনা করে বিয়ের আয়োজন করে আর বরপক্ষ বরযাত্রী নিয়ে ধুমধাম করে এসে দাওয়াত খায়। উপরন্তু খাবার দাবারে সমস্যা হলে মেয়ে পক্ষকে দু একটি কথা না শুনিয়ে ছাড়েনা। বস্তুত এসবই ইসলামের নিয়মের বাইরে আমাদের সামাজিক প্রথা যা একেতো অন্যায় এবং তা ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ন ।
৮। মালামাল দেয়াঃ বিয়েতে কনে পক্ষ বিয়ের দিন বরের বাড়ীতে যে মালামাল পাঠায় তাও ইসলামী সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জ্যস্য পূর্ন নয়। এগুলো বেদাত এবং তাতে মেয়ে পক্ষের উপর খরচের চাপ পড়ে। এবং এ খরচ মিটাতে গিয়ে মেয়ের বাবা মা ধার দেনা গ্রস্থ হয়ে পরেন।
৯। গিফট নেয়াঃ আমাদের দেশী বিয়েতে গিফট নেওয়ার প্রথা রয়েছে। শুধু তাই নয়, বিয়েতে গিফট নিয়ে তা লিপিবদ্ধ করে রাখা হয়। গেইট দিয়ে ঢুকেই গিফট গ্রহনকারী লোক জনের মুখামুখি হতে হয়। এতে যারা গিফট নিয়ে আসেন নি বা গিফট আনার সামর্থ যাদের নেই তারা ভীষন বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখে পড়েন। গিফট লিপিবদ্ধ করার কারনে দামী গিফট না দিলে সামাজিক অবস্থান হারানোর একটা আশংকা থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে দামী গিফট করতে বাধ্য হন। ওনেকে গিফট দেওয়ার অসামর্থের কারনে বিয়েতে আসেন না। গিফট দেওয়া একটা সওয়াবের কাজ কিন্তু এভাবে পরোক্ষ চাপ দিয়ে গিফট আদায় করা সম্পূর্ণ অনৈসলামিক।
১০। ওয়ালিমা না করাঃ আমাদের দেশ প্রচলিত বিয়েতে মেয়ে পক্ষ ঘটা করে অনুষ্টান করলেও ছেলে পক্ষ অনেক ক্ষেত্রে ওয়ালিমা করেনা। এটা শরীয়তের দৃষ্টিতে পুরো উল্টা সিষ্টেম। ইসলামে মেয়ে পক্ষের অনুষ্টান করা বা লোক খাওয়ানোর বিধান নেই কিন্তু ছেলে পক্ষের ওয়ালিমা করা সুন্নাতে মুয়াক্বাদা। কিছু কিছু আলেম ওয়াজিব ও বলেছেন। নবী করীম (সঃ) সাহাবী আব্দুর রহমান বিন আওয়াফ (রাঃ) এর বিয়ের পর তাকে বল্লেন যে, কমপক্ষে একটা ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালিমা করো। ওয়ালিমার দাওয়াতের ক্ষেত্রে গরীবদের অবশ্যই প্রাধ্যন্য দিতে হবে। আবু হুরায়রা(রাঃ) কতৃক বর্নিত, ”নবী করীম(সঃ) বলেছেন, সবচেয়ে নিকৃষ্ঠ খাবার হচ্ছে সে ওয়ালিমার খাবার যেখানে ধনীদেরকে তো ডাকা হয় কিন্তু ফকির গরীবদের কে ডাকা হয়না।” তিনি আরও বলেন- ”যে ব্যাক্তি ওয়ালিমার দাওয়াত ছেড়ে দিলো সে আল্লাহ ও রাসুল(সঃ) এর সাথে নাফরমানী করলো।” তাই কোন জরুরী কোন কাজ বা সমস্যা না হলে অবশ্যই ওয়ালিমার আসতে হবে।
১১। মেয়ে পক্ষের খরচ করাঃ ইসলাম সম্মত বিয়েতে বিয়ের সময় বা বিয়ের অনুষ্ঠানে মেয়ে পক্ষের খরচ করার মতো তেমন কিছু নেই। বিয়েতে মোহরানা দিবে ছেলে। ওয়ালিমা করবে ছেলে। কনে ঘরে আনার ক্ষেত্রে প্রয়োজনী ঘরের আসবাব পত্রের ব্যবস্থা করবে ছেলে। অথচ আমাদের দেশে হয় ঠিক তার উল্টো। যৌতুক দেয় মেয়ে পক্ষ, অনুষ্ঠান করে লোক খাওয়ায় মেয়ে পক্ষ, মেয়ের সাথে প্রয়োজনীয় ফার্নিচার বা আসবাব দেয় মেয়ে পক্ষ। এসবই হচ্ছে বিদাতী প্রথা।
১২। কাজিনদের মেয়ে বিয়ে করাঃ আমাদের অনেকের ধারনা যে মামাতো বোন, খালাতো বোনদের মেয়ে বিয়ে করা জায়েজ নয় কারন তারা আমাদের ভাগ্নি বা ভাতিজী হয়। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে তাদের বিয়ে করা জায়েজ।
১৩। আরও কিছু প্রথাঃ আরও কিছু কুপ্রথা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে যেমন, বিয়ের পরে মেয়ে কতৃক শশুরের পায়ে তেল মালিশ করে দেয়া। এটা বিদাতী প্রথা। বিয়ের আগে এ্যংগ্যাজমেন্ট সময় আংটি দেয়াও ইসলামী রীতি নয়। এটা আমাদের দেশের রীতি। যদি ছেলে নিজে মেয়ের হাতে আংটি পড়িয়ে দেয় তবে তা হারাম হবে কারন বিয়ের আগেই মেয়ের হাত স্পর্শ করা হারাম। বিয়ের পরে মেয়ে পক্ষের পক্ষ হতে রমজানে ইফতার দেয়া, মেীসুমী ফল পাঠানো, ঈদের সময় কাপড় চোপর পাঠানো ইত্যাদিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে চাপ প্রয়োগ করা বা সামাজিক চাপের কারনে মেয়ে পক্ষ তা দিতে সম্মত হলেও তাদের কষ্ট হবে জেনেও ছেলে তা পাঠাতে বারণ না করা ইসলামের দৃষ্টিতে গর্হিত কাজ। এটি জুলুম ও বটে।
আমাদের সমাজে কিছু বিত্তবান আছেন যারা মনে করেন যে, তাদের সামর্থ্য আছে তাই তারা মেয়ের বিয়েতে দাওয়াত দিয়ে ঘটা করে লোক খাওয়াবেন বা মেয়ের সাথে আসবাব পত্র দিবেন ইত্যাদি ইত্যাদি। উপহার সামগ্রী দেওয়া ভালো কিন্তু এক্ষেত্রে তাদের খেয়াল রাখা উচিৎ তাদের এই কাজের ফলে একটি বিদাতী প্রথা প্রতিষ্টিত হচ্ছে কি না যাতে পরে অন্য একজন অসামর্থ্যবান পিতা তার মেয়ের বিয়েতে তা করতে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে বাধ্য হন। যদি তাই হয় তাহলে তাই এই প্রথা প্রতিষ্টিত করার কারনে ঐ বিত্তবান ব্যাক্তি গোনহগার হবেন। সবচেয়ে ভালো হয় উপহার সামগ্রী সবার অগোচরে নির্দিষ্ট ব্যক্তির নিকঠ প্রদান করা।
নোাটঃ উক্ত লিখাটি ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার আয়োজিত শায়খ মতিউর রহমান এর ওয়াজ “বিবাহ নবীগনের সুন্নত” এর অবলম্বনে লিখেছি। তার ওয়াজটি ইউটিউবে “বিবাহ নবীগনের সুন্নত” অথবা “Marriage in Islam” লিখে সার্চ দিলেই পাওয়া যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


