somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নীল মনি
ভীষণ কঠিন পোড়ামাটিকে আবার সেই কাদামাটিতে ফিরিয়ে আনা,ভীষণ কঠিন আঘাত দেয়া শব্দমালা গুলো ফিরিয়ে নেয়া।ভীষণ কঠিন নিজের সম্পর্কে কিছু বলা।যে চোখ দেখিনি সে চোখ কেমন করে বিশ্বাস করবে জানি না।যে কখনো রাখিনি হৃদয়ের উপর হৃদয়;সে কেমন করে বুঝবে আমায়!

'নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি'

০১ লা নভেম্বর, ২০১৭ রাত ২:৪৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


অত্র এলাকায় ঘোষণাটি শুনেছিলাম আমি প্রথম; এর আগে কোথাও আমি এমন করে মাইকিং করতে শুনিনি। আর মাইকিং এর সমস্ত কথা
পুন:রুদ্ধার করতে বেশ সময় লেগেছিল। ঘোষণাটি-

"প্রিয় এলাকাবাসী,সকলের অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে;গতকাল ছমিরন নামের যে বৃদ্ধা হারিয়ে গিয়েছিল, আজ সকালে তাকে খুঁজে পাওয়া গেছে।কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের সাথে জানানো যাচ্ছে যে, তাকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।আজ বাদ আসর বড় মসজিদে তার নামাযের জানাযা অনুষ্ঠিত হবে;...। "

খুঁজে পাওয়ার বিষয়টি আনন্দের হলেও হারিয়ে আবার এভাবে খুঁজে পাওয়াটা বেশ পীড়াদায়ক ।হারিয়ে গেলেও মনে ক্ষীণ আশা তবুও থাকে -না,সে আসবে একদিন।কিন্তু চিরতরে চলে গেলে আশা যে আর থাকে না।আর সে আশাটুকু ক'জনই বা করে!কারো কারো চলে যাওয়া যেন প্রত্যাশিত;অপেক্ষায় থাকা জীবন যেন বোঝার মত।তিলে তিলে তাকে অপেক্ষা করতে হয়;কেন মৃত্যু এত দেরিতে আসছে তার কাছে।নিজের অজান্তে কামনা করে বসে, হায় খোদা!কেন দাও না মৃত্যু আমায়।ছমিরন চেয়েছিল এমনি করে;না চেয়ে উপায় কী!যে জীবন পর্দায় ঢাকায় ;মানুষ ভাবে মৃত্যুতেই জীবনের পরিসমাপ্তি।নাকি পরিসমাপ্তি থেকেই নতুন জীবনের শুরু।

গৃহস্থ বাড়ির সংসার;বিয়ে হয়েছে সেই ছয় বছর বয়সে।সেই থেকে এই উঠোন থেকে ওই উঠোন।সারাদিন কাজ আর কাজ।নি:শ্বাস নেয়ার সময় যেন আর হয়ে ওঠে না।নাম তার ছমিরন বিবি।গ্রামের চেয়ারম্যান সাহেবের বউ।প্রচুর সম্পদের মালিক চেয়ারম্যান সাহেব।

ক্যালেন্ডারের পৃষ্ঠা উল্টে যাবার মত করে জীবনের পৃষ্ঠা উল্টে নতুন ছবি আসে।ছমিরন বিবি যৌবনকালে খুব সুন্দর দেখতে ছিলেন ;বয়সের সাথে সাথে মুখের চামড়াগুলো কুঁচকে যায়।সেদিকে বিশেষ খেয়াল থাকে না।শুধু আয়নায় দেখে নাকের পাশে কালো রংয়ের নতুন তিল হয়েছে।পান খাওয়া দাঁতগুলো কালো হয়ে গেছে।মাথার সমস্ত চুল সাদা।সেই সাদা চুলে কালো কালো মোটা মোটা উঁকুন ঘুরে বেড়ায়।ছমিরন বিবি আজ কপালে বাড়ি দিচ্ছি আর কাদঁছে।
-আমারে তুমি একলা র‍্যাইখা গেলে কেনে সাবু'র আব্বা।কয়দিন পাইলাম আমি তোমারে!
-ও সাবুর আব্বা! ও আল্লাহ, আমারেও লও তুমি।
চেয়ারম্যান সাহেব মারা গেছেন।ষাটটি বছর একসাথে থাকার পরেও বলে কয়দিন পেলাম তোমারে!চেয়ারম্যান চলে গেছেন সম্পত্তির সাথে সাথে ফেলে গেছেন তাদের সন্তানের জননীকে।
যার পাঁচ পুত্র আছে তার আবার চিন্তা কিসের!



বাবার সম্পত্তির পুরো অংশটি পাঁচ ছেলে সমান ভাগে ভাগ করে নেয়;সেই সাথে সম্পত্তির মত করে মা'কেও ভাগ করেছে।ছমিরন বিবি একমাস করে করে পাঁচ ছেলের বাড়ি গিয়ে থাকেন।প্রতিটা বাড়িতে কত আপ্যায়ন;ছমিরন কখনো ভাবতে পারে না দৃশ্যপট এত দ্রুত বদলে যাবে!ছোট ছেলেটার হবার আগেও ঢেঁকিতে ধান ভাঙতে হয়েছে;দুপুরের রান্না করতে হয়েছে।বেলা যখন পড়ে এল তখন না গফুর হল।একটু আগেই হয়েছিল।চোখ ফোটেনি তাই তুলোর মধ্যে রেখে দিয়ে মানুষ করতে হল।ছেলেরা দেখতে দেখতে সব বড় হয়ে গেল!

বাবার সম্পত্তি মানে তো তা সন্তানদের জন্য।সম্পত্তি ভাগে পেলে সেই জমি থেকে টাকা আসে,সেই টাকায় কত কাজ করা যায়! মনের অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।সবাই ব্যস্ত হয়ে ওঠে নিজেদের শখ মেটাতে।মা'য়ের পান খাওয়া শখ মেটাতে গেলেই শুধু বাড়তি খরচের হিসাব তালিকায় চলে যায়।

সম্পত্তি আর মা কখনো এক নয়।একটা সময় পর মা বোঝা;আর সেই মা ভাগে পাওয়া মানে একটা বিশাল ক্ষতি।
বয়স বেশি মানে অসুস্থতা থাকবে;তার জন্য দু'দিন পর পর ডা: দেখাও,ওষুধ কিনো।ছেলে ও তার বউদের মতে এমনিতেই দুদিন পরে মরে যাবে,এই বয়সে একটু আধটু শরীর খারাপ হয়,তাই বলে দু'দিন পর পর ডাক্তার দেখাতে হবে!


ছেলের বউয়ের অভিযোগ-তোমার মায়ের পেটে কী? সারাদিনে এত ভাত খায় ;যায় কই!
-তোমার মায়ের অদ্ভুত অস্বাভাবিক আচরণে আমরা অতিষ্ঠ।মা'কে অন্য কোথাও রেখে আসো।

বয়স হয়েছে তো তাই খাপ খাইয়ে উঠতে পারে না ছমিরন।ছমিরন বিবির মনে হয় সব ছেলে এক জায়গায় থাকলে কী হয়!কী হয়!ঝাপসা চোখে ফ্যালফ্যাল করে ছমিরন দেখে -পড়ে থাকা একলা উঠোন,বিষণ্ণ বিকেল,জীবনের পরিণত সন্ধ্যা।

ভাতের জন্য বড় কষ্ট।বয়স যত বাড়ছে ছমিরন বিবি সব ভুলে যায়শুধু ক্ষুধা লাগে,খেয়ে উঠে বলে খাইনি।যখন যে ছেলের বৌয়ের কাছে যায় তারাও বকাঝকা করে।তাদের তো জীবন আছে,কতবার খেতে দিবে।আর খেতে দিয়েও কি নাম আছে? ঠিকই অন্য বাড়ি গিয়ে বদনাম করবে।

অথচ কেউ বুঝে না ছমিরন স্মৃতি বিচ্যুত মানুষ তাই খেলেও ভুলে যায়।আজ সকালে সেজ ছেলের বৌয়ের কাছে খাবার চেয়েছিল।রাগ করে বৌ বলেছিল -"মানুষের পেট বলে তো মনে হয় না,রাক্ষুসীর মত পেট,কিন্তু দেখতে তো দেখি ঠিকই মানুষের মত।"

ছমিরনের কষ্ট লাগে।সে ভীষণ কষ্ট।চিনচিনে কষ্ট।ভাতের উপর রাগ উঠে, ভাত না খেলে কী হয়? মানুষ মরে যায়? না খেয়ে তো কেউ কখনো মরে না!

প্রচন্ড অভিমানে ক্ষুধার্ত পেট নিয়ে ঘর হতে বের আসে ছমিরন।তারপর তো ছমিরন - 'নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি'তে ঠাঁই পাওয়া একজন মানুষ।

আচ্ছা, একটু খেতে চাইলে মানুষ এমন করে কেন? অথচ মানুষগুলো তো তার রক্তের।রক্তের ছেলেরা মা'কে ভাগাভাগি করে শুধু খেতে দেয়ার ভয়ে।মাকে কি সত্যি ভাগ করা যায়? কই মা'তো সন্তানদের ভাগ করে না।
ছমিরনে'র সকল ব্যথা জানি;কেউ না জানুক কেমনে জেনেছি আমি!সমস্ত ছমিরন নিখোঁজ বিজ্ঞপ্তি হয়ে উঠুক জমানো অভিমানে,জন্ম না হোক এমন পুত্র কিংবা কন্যা যারা মায়ের যত্ন না নিতে পারে!
©রুবাইদা গুলশান
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা নভেম্বর, ২০১৭ সকাল ৯:৫২
১৪টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সী পার্ল এবং চারপাশ

লিখেছেন রোকসানা লেইস, ০৮ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ১১:১৪


খুব ভোরে ঘুম ভাঙ্গল। সূর্য তখনও জাগেনি। ব্যালকুনিতে গিয়ে বসলাম কিছুক্ষন। সামনে সাগর আপনমনে ঢেউ তুলে নাচছে। একজন মানুষও নাই সাগরপাড়ে। এমন নিরিবিলি সাগরপাড়ই চেয়েছিলাম। যেখানে পুরোটাই আমার থাকবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয়

লিখেছেন এমএলজি, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ রাত ২:৪০

= ড. ইরফান আল-হোসাইনীর রহস্যজনক মৃত্যু - জীবনের চেয়ে কোনো সম্পর্ক বড় নয় =

বিশ্বখ্যাত আমেরিকান বহুজাতিক প্রযুক্তি কোম্পানি এনভিডিয়া (NVIDIA)-তে কর্মরত, বুয়েটের প্রাক্তন শিক্ষার্থী এবং অত্যন্ত সম্ভাবনাময় তরুণ বিজ্ঞানী ড.... ...বাকিটুকু পড়ুন

জলসার আসর

লিখেছেন নিচু তলাৱ উকিল, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১২:১০

রঙ্গিন শহররের বুকে তাম্বু টাঙিয়ে বসিয়েছি জলসার আসর।
ধর্মীয় বয়ানের ফাঁকে;
গলির মাথায় বেজে উঠছে উলুধ্বনি।
এদিকে তুমি আর আমি ডুবে আছি কলকির ধোঁয়ায়।
নোনতা ঘামের ব্যবচ্ছেদে পুটিমাছের বুক চিরে মেখে দিয়েছি পাঁচ প্রহরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ শেষ জীবনে

লিখেছেন সামিয়া, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৫:৩৯



ঘুমিয়ে থাকা একজন মানুষ কখনো কখনো জেগে থাকা একজন মানুষের চেয়ে অনেক বেশি ভালো থাকতে পারে? কথাটা শুনতে অদ্ভুত। কিন্তু বয়স হলে মানুষ অনেক অদ্ভুত কথাই বিশ্বাস করে চিন্তা... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাষ্ট্রপতি পদে আনভীর সোবহানকে দেখতে চাই।

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৯ ই আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪২


সায়েম সোবহান আনভীর। এক বিশাল বিজনেস টাইকুন, বসুন্ধরা গ্রুপের যোগ্য কান্ডারী। আহা, কী তার ব্যক্তিত্ব! দেখতে যেমন সুন্দর, চরিত্রও যেন মাশাআল্লাহ্ ফুলের মতো পবিত্র। আর বসুন্ধরা গ্রুপের কথা তো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×