
এদেশে এখন শেখ হাসিনা প্রয়োজন- নাকি আমরা তাঁর সময়ের কিছু বাস্তবতাকে নতুন করে অনুভব করছি?
একটা সময় ছিল- শেখ হাসিনার নাম উচ্চারণ করলেই কারও চোখে ক্ষোভ, কারও মনে শ্রদ্ধা, আবার কারও মনে ভয় তৈরি হতো। তাঁকে স্বৈরাচারী বলা হয়েছে, ফ্যাসিস্ট বলা হয়েছে, তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ ও মামলা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পরিবর্তনও হয়েছে।
কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের পর একটি প্রশ্নকে আর এড়িয়ে যাওয়া যাচ্ছে না-
মানুষ কি সত্যিই আগের চেয়ে ভালো আছে? চায়ের দোকান থেকে বাজারের মোড়, গণপরিবহন থেকে মধ্যবিত্তের ড্রয়িংরুম- কোথাও কোথাও এখন শোনা যায় সেই অস্বস্তিকর বাক্যটি- “আগে অন্তত এতটা অনিশ্চয়তা ছিল না।” এই কথার অর্থ শেখ হাসিনার আমলের সবকিছু ভালো ছিল- তা নয়। তাঁর সরকারের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, মানবাধিকার, নির্বাচন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ছিল। এসব প্রশ্ন ইতিহাসের অংশ, এগুলো অস্বীকার করারও সুযোগ নেই।
কিন্তু ইতিহাসের আরেকটি পাতাও তো আছে। ২০০৯ সালের বাংলাদেশ আর পরবর্তী বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনীতি, অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন ঘটেছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্প্রসারণ, ডিজিটাল অবকাঠামো- এসব কেবল রাজনৈতিক স্লোগান নয়; এগুলো মানুষের চোখের সামনে তৈরি হওয়া বাস্তব অবকাঠামো।
তখন প্রশ্ন ছিল- বাংলাদেশ পারবে তো? পদ্মা সেতু নিয়ে যখন বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন সরে গেল, তখন নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি শেষ করার সিদ্ধান্ত অনেকের কাছে ছিল অসম্ভব সাহসের ব্যাপার। শেষ পর্যন্ত সেতু দাঁড়িয়েছে। অর্থনীতি, পোশাকশিল্প, নারীর কর্মসংস্থান, গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন- সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতায় পৌঁছেছিল। দারিদ্র্য কমেছিল, মানুষের আয় ও ভোগক্ষমতা বেড়েছিল।
তার মানে কি সব মানুষ সুখে ছিল? অবশ্যই নয়। দ্রব্যমূল্য, বেকারত্ব, বৈষম্য, দুর্নীতি- এসব সমস্যাও ছিল। উন্নয়নের পাশাপাশি রাষ্ট্রের জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়েও প্রশ্ন ছিল।
তবু আজ যখন নিরাপত্তা, বাজারদর, প্রশাসনের সক্ষমতা কিংবা রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা নিয়ে মানুষ উদ্বিগ্ন- তখন অতীতের কিছু অর্জনকে নতুন করে মূল্যায়ন করার প্রয়োজন কি নেই?
রাষ্ট্র চালানো আর আন্দোলন করা এক জিনিস নয়।
একটি সরকারকে সরিয়ে দেওয়া যায় কয়েক দিনের আন্দোলনে। কিন্তু একটি দেশের অর্থনীতি, প্রশাসন, বিদ্যুৎ, রপ্তানি, কূটনীতি, আইনশৃঙ্খলা- এসব প্রতিদিন, প্রতি ঘণ্টায় পরিচালনা করতে হয়।
সেখানেই অভিজ্ঞতার মূল্য।
শেখ হাসিনার দীর্ঘ রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ছিল। সেই অভিজ্ঞতার ভালো দিক যেমন ছিল, তেমনি ছিল বড় বড় বিতর্কও।
তাই প্রশ্নটি হওয়া উচিত-
আমরা কি শুধু একজন ব্যক্তিকে ভালোবাসব বা ঘৃণা করব, নাকি তাঁর শাসনামলের ভালো-মন্দ দুটোই বিচার করব?
আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা-
কোনো নেতাকে জনগণের ভোটের বাইরে রেখে চিরতরে অযোগ্য ঘোষণা করা কি গণতন্ত্রের সমাধান? জনগণ যদি কাউকে না চায়, ভোটেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করবে। আবার জনগণের একটি অংশ যদি মনে করে কোনো নেতার সময়ে দেশ তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল ছিল, সেই মত প্রকাশের অধিকারও তাদের থাকা উচিত। শেষ পর্যন্ত ইতিহাস আবেগ দিয়ে লেখা হয় না। ইতিহাস লেখা হয় তুলনা, তথ্য, অভিজ্ঞতা এবং মানুষের স্মৃতি দিয়ে।
হয়তো আজকের বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি দরকার কোনো ব্যক্তিকে অন্ধভাবে ফিরিয়ে আনা নয়, দেশের প্রয়োজনে তাঁর যোগ্যতায় অভিজ্ঞতায়-
দরকার এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, যেখানে উন্নয়ন থাকবে, স্থিতিশীলতা থাকবে, নিরাপত্তা থাকবে, আবার একই সঙ্গে থাকবে ভোটের অধিকার, জবাবদিহি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও আইনের শাসন। আর সেই বিচারে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলকে ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নতুন করে ভাবার ও বিচার এর নামে প্রহসন বন্ধ করার সময় হয়তো সত্যিই এসেছে।
কারণ ইতিহাসকে মুছে ফেলা যায় না- শুধু নতুন করে পড়া যায়।
.
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


