
দেশভাগের অনেক পরে আমার জন্ম।
আমি দেশভাগের ইতিহাস জানি। দেশভাগের পরে যা হয়েছে, অতি মন্দ সব ঘটনা ঘটেছে। লাখ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং হাজার হাজার নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। দেড় কোটি মানুষ তাদের ঠিকানা হারিয়েছে। হিন্দু মুসলিম মিলেমিশে থাকতে পারলে দেশভাগ হতো না। তাই বলা যেতে পারে- দাঙ্গা থেকে দেশভাগ। যে দুটো দেশের জন্মই হয়েছে ধর্মকে কেন্দ্র করে, সেসব দেশে সাম্প্রদায়িকতা থাকবে না কেন? মসজিদ ভাঙ্গো, মন্দির পুড়ো। হায়রে ধার্মিক! ৪৭ এ কয়েক মাস ধরে মানুষ বাস, ট্রেনে করে দেশ ছেড়েছে। যারা বাস বা ট্রেন পায়নি তারা নিজের শেষ সম্বলটুকু পোটলা বেধে মাথায় নিয়ে দেশ ছেড়েছে। খালি পায়ে। ছাগল হাঁস মূরগী পর্যন্ত সাথে নিয়েছে। আবার পাকিস্তান থেকে হিন্দুরা এসেছে দলে দলে ভারতে। প্রাচীন গঙ্গা নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো- আমাদের এই ভূখন্ড। ভূখন্ড ভাগ হয়ে গেছে। আশার কথা হচ্ছে- অনেক কিছুর পরও আজ এই ভূখন্ড টিকে আছে।
দেশভাগ হলো আর স্বাধীন হলো- ভারত।
পরাধীনতার গ্লানি মুছলো। কিন্তু ভারত এত এত রিফিউজিকে কোথায় আশ্রয় দেবে? কিভাবে দেবে খাবার? এদিকে উদ্বাস্তু'রাও ভালো নেই। ভারত ধনী দেশ নয়। তাদের থাকা এবং খাওয়ার সুন্দর ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। ভারত তাদের আশ্রয় দিয়েছে, এটা তারা মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছে। এত এত উদ্বাস্তু'র কোনো দেশ নেই। তারা অভাগা। নিজের দেশ ছেড়ে ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! সারা কলকাতা রিফিউজি দিয়ে ভরে গেছে। ইলিয়ট রোড, মার্কুইস স্ট্রিট, রিপন স্ট্রিট, বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট, হাওড়া স্টেশন যেদিকে তাকাও শুধু রিফিউজি আর রিজিউজি। নাঙ্গা ভূখজা মানুষ। এরা কেউ ভিক্ষা করে, কেউ স্টেশনের কুলি হয়েছে। মেয়েরা কাজ করছে বাসা বাড়িতে। কেউ কেউ বিক্রি হয়েছে পতিতা পল্লীতে। এদের সামলাতে সরকার হিমিশিম খাচ্ছে। কোনো এক বিচিত্র কারনে- এইসব রিজিউজিরা কলকাতা ছেড়ে কোথাও যেতে চায় না। সরকার তাদের প্রস্তাব দিয়েছে উড়িষ্যা যাও, দন্ডকারন্যে যাও। যেখানে রিফিউজিরা যাবে না। জঙ্গলে যেয়ে তারা করবে কি? ৪৭ এর রিফিউজিদের চেয়ে আমাদের দেশের রোহিঙ্গারা কিছুটা ভালো অবস্থানে আছে। তাদের সবার হাতে স্মার্টফোন।
মুসলিমলীগ ও তার নেতা মহম্মদ আলি জিন্না-
তারা যদি নমীনিয় হতো, তাদের যদি মানুষের প্রতি ভালোবাসা থাকতো- তাহলে কোটি কোটি মানুষ দেশহারা হতো না। বাড়িঘর ছেড়ে চলে যেতে হতো না। হারাতে হতো না তাদের বাপ-দাদার বসতভিটা। করতে হতো না মানবেতর জীবনযাপন। নেতারা ভুল সিদ্ধান্ত নিলে- দূর্ভোগ পোহাতে হয় দেশের জনগনের। আমার ভাবতে ভালো লাগে- মানুষ কোনো একক দেশের নাগরিক হবে না। মানুষ হবে বিশ্ব নাগরিক। ভিসা পাসপোর্ট ছাড়াই মানুষ চলে যাবে অন্য দেশে। কোনো বর্ডারে থাকবে না কাঁটাতার। কলকাতার বৈঠকখানা রোডে আমাদের একটা বাড়ি ছিলো। দোতলা বাড়ি। আমার দাদা কলকাতায় গেলে সে বাড়িতে উঠতেন। আমি নিজেও কলকাতা গিয়ে সেই বাড়িটা দেখে এসেছি। বাড়ির কাগজপত্র আছে। কয়েক বছর আমার ছোট চাচা মামলা লড়েছেন। দেশ ত্যাগের সময় যাদের আর্থিক অবস্থা ভালো ছিলো এবং যারা শিক্ষিত ছিলো- তারা খেয়েপরে বেচে ছিলো, ভালো ছিলো। এমনকি শিক্ষিতরা ভালো চাকরি পেয়েছে। তারা ভালো পরিবেশে বাড়ি ভাড়া করে থেকেছে।
কলকাতার রানাঘাট এলাকায় বিশাল এক বটগাছ আছে।
বটগাছ থেকে কিছু দূরে আছে একটা অশ্বত্থ গাছ। এই অশ্বত্থ গাছের কাছেই কুপার্স ক্যাম্প। আরো কিছু দূরে আছে রুপশ্রী কলোনি। বিশাল এক গুদাম ঘরকেই কলোনি বানানো হয়েছে। এই গুদামঘর বহু বছর ধরে তালা বন্ধ ছিলো। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় এই গুদামঘর সচল ছিলো। এখানে আশ্রয় নিয়েছে কয়েক হাজার রিফিউজি। হাজার হাজার উদ্বাস্তু'র জন্য আছেন মাত্র একজন পল্লী চিকিৎসক। সব উদ্বাস্তু অসুস্থ। তাদের সবারই কোনো না কোনো সমস্যা আছে। টাকা দিয়ে চিকিৎসা করাবে এমন রিফিউজি নেই বললেই চলে। ডাক্তার রোগি দেখতে দেখতে দিশেহারা। ডাক্তার সবাইকে এক ওষুধ দিচ্ছে। মাথা ব্যথার জন্য যে ওষুধ দিচ্ছে, পাইলসের জন্যও সেই একই অষুধ দিচ্ছে। ওষুধ নিতে হলে- এক আনা দিয়ে কাচের বোতল কিনতে হয়। যার কাচের বোতল নেই, সে ওষুধ পাবে না। রিফিউজিদের ফেলা যাওয়া বাড়িঘর, গরু ছাগল দখল করে নিয়েছে চতুক লোকেরা।
সর্বশেষ এডিট : ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





