
টাঙ্গাইল একটি ঐতিহ্যবাহী জেলা। দেশে-বিদেশে তাঁতের শাড়ির জন্য এ জেলাটি সবার কাছে সুপরিচিত। দীর্ঘতম যমুনা বহুমুখী সেতু ও এই জেলার সাথে সংযুক্ত। যার পূর্বে ময়মনসিংহ ও গাজীপুর, পশ্চিমে সিরাজগঞ্জ, উত্তরে জামালপুর, দক্ষিণে ঢাকা ও মানিকগঞ্জ জেলা অবস্থিত। এ জেলায় মোট ১২টি উপজেলা আছে। নদীঘেরা নির্মল প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য্য ভ্রমণপিপাসুদের কাছে এ জেলাকে দিয়েছে এক অনন্য মর্যাদা। ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এই জেলায় বেশ কয়েকজন জমিদার বসবাস করতেন। সময় বদলে গেছে, কিন্তু কালের সাক্ষী হয়ে আজও ঠিকে আছে জমিদারদের রেখে যাওয়া সেই নয়নাভিরাম বাড়িগুলো।

● জমিদার বাড়ীতে প্রবেশের প্রধান ফটক ●

এখানে জন্মগ্রহণ করেছেন বাংলার অনেক কৃতি পুরুষ যারা বিভিন্ন সময় এদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করেছেন। এ মাটিতে শায়িত আছেন হযরত শাহান শাহ বাবা আহমদ কাশমিরী (রা.)। মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর জন্মস্থান এই জেলায়।

ভ্রমণ তালিকায় টাঙ্গাইল জেলা ছিলো বটে তবে পূর্ব প্রস্তুতিছাড়া এমন হুট হাট করে চলে যাব তা ভাবিনি। শুক্রবার সাথে মিলিয়ে অফিস থেকে দু’দিনের ছুটি নিযে বন্ধু মাসুদ রানাকে সঙ্গী করে সীমান্তবর্তী এলাকা নেত্রকোনার বিজয়পুরে চীনা মাটির পাহাড় দেখতে গিয়েছিলাম। সারাদিন সাদা মাটির দেশে বিচরণ করে আসার সময় মধ্যরাতে যাত্রা বিরতি দিলাম ময়মনসিংহ শহরে। রাত্রি যাপন করলাম শহরের ইসাঁখা হোটেলে। সকাল সকাল পুরো শহরটা ঘুরে দেখলাম এক পলক। ইচ্ছা ছিলো একদিন থাকার কিন্তু সময় সল্পতার কারনে তা হয়নি। মাসুদ রানার মাথায় ভর করলো যাওয়ার সময় মহেরা জমিদার বাড়ী দেখে যাবে। কিভাবে সল্প সময়ে যাওয়া যায় গুগুল ম্যাপ দেখে কিছুটা ধারণা নিল। ওর পরিকল্পনা অনুযায়ী ময়মনসিংহ জংশন থেকে গাজীপুর জংশন এ ট্রেন থেকে আমরা নেমে গেলাম। জংশন থেকে গেলাম গাজিপুর চৌরাস্তায়। তখন ঠিক দুপুর । মাথার উপর খা খা রোদ। বাসে করে আমরা চলে গেলাম চন্দ্রা বাস স্ট্যান্ড। সেই খান থেকে যাত্রা করলাম টাঙ্গাইল জমিদার বাড়ির উদ্দেশ্যে । অবশেষে যখন জমিদার বাড়ীতে প্রবেশ করি দুপুর গড়িয়ে তখন সময় বিকাল প্রায় সাড়ে তিনটা। আসার পথে দীর্ঘ ধকলের সকল ক্লান্তি ভুলে গেলাম যখন পড়ন্ত বেলায় দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়ীর সবুজ আঙিনায় পা রাখলাম।

■ মহেরা জমিদার বাড়ি
প্রকৃতির অনিন্দ্য নিকেতন মহেড়া জমিদার বাড়ী অপরূপ সৌন্দর্যে নয়নাভিরাম। তার রূপশোভা বিস্তার করে কালের নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এক উজ্জ্বল ভাস্কর্য। নিভৃত পল্লীতে ছায়াঘেরা, পাখী ডাকা নির্মল নির্ঝর শান্ত পরিবেশ আপনাকে দিবে এক রাশ প্রশান্তি ও দেহ মনে ছুঁয়ে যাবে ভালোলাগার হিমশীতল পরশ। আগন্তুককে একবার নয় বারবার এই সৌন্দর্য দেখার হাতছানি দিয়ে আমন্ত্রণ জানায় এখানকার রকমারি দেশী-বিদেশী ফুলের সমারোহ ও সুশোভন বাহারী পাতাবাহার দ্বারা পরিবেষ্টিত ফুলের বাগান। গাছে গাছে সকাল সন্ধ্যা পাখির কলকাকলিতে মুখর, সৌম্য-শান্ত কোলাহলমুক্ত পরিবেশ আপনাকে দিবে এক অন্যরকম ভ্রমানুভুতি। চারদিকে নানা বৈচিত্র্যের ফুলের বর্ণ ও গন্ধের সমারোহ। যেন নিবেদিত পুষ্পার্ঘ্য। এক কথায় যেন ধরণীতে স্বর্গধাম।

■ পিছনে ফিরে দেখা :
ধারনা পাওয়া যায় ১৮৯০ দশকের পূর্বে স্পেনের করডোভা নগরীর আদলে ভবনসমূহ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কালের বিবর্তনে ফুলে-ফলে, পত্র-পল্লবে শোভিত হয়ে উঠে কালের স্বাক্ষী এ দৃষ্টিনন্দন জমিদার বাড়ী। দৃষ্টিনন্দন এই জমিদার বাড়ীর রয়েছে এক কলঙ্কিত স্মৃতি। ১৯৭১ সালের ১৪ মে বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের সময়ে পাকবাহিনী মহেড়া জমিদার বাড়ীতে হামলা করে এবং জমিদার বাড়ীর কূলবধূ যোগমায়া রায় চৌধুরীসহ পাঁচজন গ্রামবাসীকে চৌধুরী লজের মন্দিরের পেছনে একত্রে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করে হত্যা করে। তন্মধ্যে স্থানীয় প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক পন্ডিত বিমল কুমার সরকার, মনিন্দ্র কুমার চক্রবর্তী, অতুল চন্দ্র সাহা এবং নোয়াই বণিক ছিলেন।

ইতিহাস কলঙ্কিত সেই রক্তের দাগ এখনো লেগে আছে মহেড়া জমিদার বাড়ীতে। যে দেশের জন্য, যে দেশের মানুষের জন্য মহেড়া জমিদার পরিবার নিজেদের শত প্রাচুর্য ভুলে এলাকার উন্নয়নে সর্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতেন, সেই এলাকার রাজাকার আল-বদরদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় পাকিস্থানী বাহিনীর এই চরম হত্যযজ্ঞে জমিদার পরিবার শুধু হতাশ হননি, শত বছরের সাজানো জমিদার বাড়ী আর কোটি টাকার সম্পদ ফেলে চরম ঘৃণা আর ক্ষোভ নিয়ে লৌহজং নদীর নৌপথে নৌকা যোগে চলে যান বাংলাদেশ ছেড়ে। অতঃপর স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার বায়েজীদ সাহেবের নেতৃত্বে এক প্লাটুন মুক্তিবাহিনী জমিদার বাড়ীতে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্প স্থাপন করে।


● জমিদার বাড়ীর মিউজিয়ামের ভিতরের ছবি●

১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে পরিত্যাক্ত জমিদার বাড়ীটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পুলিশ ট্রেনিং স্কুল হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এ মহতী কাজটি করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মান্নান। পুলিশের প্রশিক্ষণকে আধুনিক এবং যুগোপোযোগী করার লক্ষ্যে ১৯৯০ সালে পুলিশ ট্রেনিং স্কুলকে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারে উন্নীত করা হয়। আর পুলিশের ট্রেনিং সেন্টার স্থাপন হওয়ায় ট্রেনিং পরিচালনার জন্য জমিদার বাড়ীটির যথাযথ রক্ষনাবেক্ষণসহ নতুন নতুন স্থাপনা তৈরী করার কারনে পুরানো স্থাপত্য কলার অপরুপ এই জমিদার বাড়ীটির সৌন্দর্য্য শুধু অক্ষত থাকেনি বরং তার কলেবর আরো বৃদ্ধি পেয়েছে।
জমিদার বাড়ীর পূর্বপুরুষেরা হলেন- বিদু সাহা, বুদ্ধু সাহা, হরেন্দ্র সাহা ও কালীচরণ সাহা।

● জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে বিশাখা সাগর ●
দর্শনীয়
জমিদার বাড়ির সামনেই রয়েছে ‘বিশাখা সাগর’নামে বিশাল এক দীঘি। বাড়িতে প্রবেশের জন্য রয়েছে ২টি সুরম্য গেট। এখান থেকে একসময় এলাকার জনগণ সুপেয় পানি সংগ্রহ করত। বিশাখা সাগর সংলগ্ন দক্ষিণ পার্শ্বে বিশাল আম্র কানন রয়েছে। ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগসহ দেশী বিভিন্ন প্রজাতির আম্র বৃক্ষ শোভা পাচ্ছে। আম্র কানন ব্যতীত বর্তমান পিটিসি’র প্রায় ৪৪ একর জমিতে সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নানা বৈচিত্র্যময় ফলের সমারোহ। সৌখিন ফটোগ্রাফারদের জন্য চমৎকার এক লোকেশন। দর্শনার্থীদের জন্য আছে কয়েকটি আকর্ষনীয় দোলনা এবং মাছ, পাখী, জীব-জন্তুর কৃত্তিম চিড়িয়াখানা। এছাড়াও বিশাখা সাগরে আছে নৌভ্রমনের জন্য অন্যতম আকর্ষণ সোনার তরী এবং সপ্তডিঙ্গা। অপরুপ স্থাপত্য আধুনিক শহীদ মিনার আপনাকে সামান্য সময়ের জন্য হলেও স্থম্ভিত করে দিবে। শুভাবর্ধনে রয়েছে সুন্দর ফুলের বাগান।

অপরুপ সাঁজে সাজানো এই জমিদার বাড়িতে প্রায় প্রতিদিনই চলে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পিকনিক এবং বিভিন্ন নাটক বা ছবির শুটিং। ব্যবস্থাপনার স্বার্থে এখানে প্রবেশের শুভেচ্ছা মূল্য মাত্র ৫০ টাকা। পিকনিক বা শুটিং স্পট ভাড়া দেওয়া হয় আলোচনা সাপেক্ষ্যে। আর খাবার ও পানীয়ের জন্য আছে স্বল্প মূল্যের ক্যান্টিন সুবিধা।

জমিদারদের আকর্ষণীয় প্রাসাদগুলো বর্তমানে পর্যটন স্পটে পরিনত হয়েছে। যেহেতো জমিদারেরা ধনী ছিলেন তাই স্থানীয়রা মনে করেন এসব জমিদারবাড়ি জমিদারী প্রথা চালু হওয়ার পূর্বেই নির্মাণ করা হয়েছিল। মহেড়া জমিদার বাড়ীটি মূলতঃ চার টি ভবনে বেষ্টিত। যথা- মহারাজ লজ, আনন্দ লজ, চৌধুরী লজ এবং রাণী ভবন (কালীচরণ লজ) নামে পরিচিত।

● মহারাজ লজঃ
বাইজেনটাইন শৈলীতে নির্মিত এই off white color ভবনের সামনে ৬ টি কলাম রয়েছে। মহারাজ লজের সামনের সিঁড়ির বাঁকানো রেলিংটি ভবনের সৌন্দর্য বহুগুনে বৃদ্ধি করেছে। অন্যান্য ভবনের মত মহারাজ লজের সামনেও একটি বাগান আছে। ভবনের পেছনে একটি টেনিস কোর্ট আছে।

● আনন্দ লজঃ
আনন্দ লজকে বলা যেতে পারে এই জমিদার বাড়ির সবচেয়ে আকর্ষণীয় ভবন। সাদা ও সোনালী রঙের ছোঁয়াসমৃদ্ধ ভবনটির সামনে আটটি কলাম রয়েছে। এই ভবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল তিন তলার ঝুলন্ত বারান্দা। এছাড়া আনন্দ লজের সামনে একটি চমৎকার বাগান রয়েছে।

● চৌধুরী লজঃ
মূল ফটক দিয়ে জমিদারবাড়ির সীমানায় প্রবেশ করলে সর্বপ্রথম চৌধুরী লজ আপনার চোখে পরবে। সাদা ও সোনালী রঙের মিশেলে এই ভবনের সামনের দিকে রোমানশৈলীতে নির্মিত পিলার রয়েছে। চমৎকার নকশাখচিত এই ভবনের ভেতরের ছাদটি ঢেউ খেলানো। দোতলা এই ভবনের সামনে বাগান রয়েছে এবং শিশুদের খেলার মাঠ রয়েছে। এছাড়া ভবনের পেছনদিকটাও বেশ দৃষ্টিনন্দন।

● ( রাণী ভবন ) কালীচরণ লজঃ
জমিদারীর শেষ পর্যায়ে নির্মিত হওয়ায় এই ভবনটি দেখতে অন্যান্য তিনটি ভবন থেকে আলাদা। অন্যান্য ভবনগুলোর চেয়ে কালীচরণ লজে কক্ষের সংখ্যাও বেশি। ইংরেজি ‘ইউ’ অক্ষরের আকারের এই ভবনটির স্থাপত্যশৈলী ইংরেজ আমলের অন্যান্য ভবনের মতই। কালীচরণ লজের এই আকারের জন্য বিকালবেলা ভবনের ভেতর থেকে চমৎকার আলো আধারির খেলা দেখা যায়।

● নায়েব ভবন ●

● কাচারি ভবন ●
□ অন্যান্য ভবনসমূহঃ
আকর্ষণীয় স্থাপত্যশৈলীর ভবনগুলো ছাড়াও জমিদারবাড়ির সীমানায় রয়েছে বেশকিছু ভবন
যেমনঃ কাচারি ভবন, নায়েব ভবন রানী মহল ইত্যাদি।

● চমৎকারভাবে সজ্জিত পশরা পুকুরে যাওয়ার রাস্তা ●

● পশরা পুকুরের মাঝে চেয়ারম্যানের চেয়ার চাইলে আপনি বসতে পারেন আর অনুভব করতে পারেন চেয়ারম্যানের পাওয়ার ●

● শিশুদের জন্য আছে সবুজ ছায়া ঘেরা মিনি শিশুর্পাক ●


● প্রিয়জনকে নিয়ে বসতে পারেন কিছুটা সময় জমিদার বাড়ির পিছনের দিকে ●


□ যেভাবে যাবেন
ঢাকার মহাখালি থেকে টাঙ্গাইলে চলাচলকারী বিভিন্ন বাসে যেমনঃ ধলেশ্বরী, ঝটিকা পরিবহনে করে এখানে আসতে পারবেন। তবে আপনাকে মির্জাপুরের পাকুল্লার পরই অবস্থিত নাটিয়াপাড়ায় নামতে হবে। নাটিয়াপাড়া বাসষ্ট্যান্ডে নেমে অপেক্ষ্যমান সিএনজি বেবীটেক্সীযোগে ০৩ কিঃমিঃ পূর্ব দিকে জমিদারবাড়িটি অবস্থিত। চাইলে আপনি এখানে ব্যাক্তিগত গাড়িতে করেও আসতে পারেন।
মহাসড়কে পুলিশ ট্রেনিং সেন্টার, মহেড়া, টাঙ্গাইল নামে দিক নির্দেশনা ফলক (বিশাল সাইনবোর্ড) আছে, যা খুব সহজে আপনার নজরে পড়বে ।



● সবুজ ঘাসের চাদরে ঢাকা উন্মুক্ত বিশাল মাঠ ●
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে জুন, ২০২০ বিকাল ৩:০৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




