
ছবি: ইন্টারনেট
--অ্যাহ! কি রানছ এইটা? লবনে এক্কেরে তিতা বানাই ফেলছ? বাপ মা কিচ্ছু শিখায় নাই। বদের হাড্ডি একটা। সব আমার সাথে শত্রুতা।
বকবক করতে করতে শিমের তরকারি দিয়ে ভাত খাচ্ছেন জমিলা বেগম।
রীণা বললো,
--আরেকটু তরকারি দিই মা?
--দিবা? দাও আরেকটু। কী আর করা, বিষই খাই। নাইলে তো না খাইয়া মরণ লাগবো। সব আমার কপাল!
এভাবেই রীণার গোষ্ঠি উদ্ধার করতে করতে প্রতিদিন খাবার খান জমিলা বেগম। রান্না ভাল হোক বা মন্দ হোক তাতে কিছু যায় আসে না। রীণাকে বকতে বকতে না খেলে উনার খাবার হজম হয় না। রীণা পান সাজিয়ে পানদানটা এনে শাশুড়ির সামনে রাখে। খাওয়া শেষ করে জমিলা বেগম একটা পান হাতে নেন। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে পানটা দেখেন। তারপর সুপারিতে হাত দিয়ে বলেন --
--এইটারে সুপারি কাটা বলে? কি পাপ করসিলাম যে এই হাড় বজ্জাত মেয়ে আমার কপালে জুটসে! আমারে একটু শান্তি দিলো না। আমার জীবনটা একেবারে শেষ কইরা দিলো।
অথচ সুপারিটা যথাসাধ্য চিকন করেই কেটেছে রীণা। না জানি রীণার সাথে কীসের শত্রুতা উনার। রীণা যেন দুচোখের বিষ। ওকে কাঁচা চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে পারলে উনার শান্তি হত।
সেদিন গুছগাছ করার সময় হঠাৎ রীণার হাত লেগে একটি প্লেট ভেঙ্গে গেলো। হায় হায় করে তেড়ে এলেন জমিলা বেগম।
--আমার সব শেষ করে দিল। আমার এত দামী ডিনার সেট! হায় রে! কই থাইকা যে এই অলক্ষী আমার কপালে জুটসিলো! বাপের জনমে এমন সেট দেখসো তুমি?
রীণা চুপচাপ শাশুড়ির বকুনী শুনে যায় আর প্লেটের টুকরো গুলো জড়ো করে। ওর চেহারায় কোন ভাবান্তর নেই। ছয় মাস হলো ওর বিয়ে হয়েছে। শাশুড়ি ওকে ভাল মন্দ সব কিছুতেই বকেন। বাজে বাজে কথা বলেন। ও কোনদিনই প্রতিউত্তর করেনা। আশ্চর্যের বিষয় হলো প্রথম প্রথম এই মহিলার উপর ভীষণ রাগ হত। রাগে দুঃখে অপমানে মরে যেতে ইচ্ছে করতো ওর। কিন্তু এখন তেমন কিছুই হয় না। বরং উনি রাগ বা বকবকানি না করলেই মনে হয় ব্যাপারটা অস্বাভাবিক।
----
--মা আপনার জন্য আজ সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস রান্না করেছি। আপনার তো অনেক প্রিয় সাতকরা দিয়ে গরুর মাংস।
জমিলার চেহারায় একটু যেনো খুশির ঝিলিক দেখা যায়।
--তুমি রানবা সাতকরা দিয়া গরু! রান্নার কিছুই তো জানো না। মায় কিচ্ছু শিখায়া দেয় নাই। আইচ্চা রানছ যখন খাইতে তো অইবোই। দাও খাইয়া দেখি।
জমিলা বেগম প্রথমে এক টুকরো মাংস তুলে মুখে দিলেন। তারপর মুখটা কুঁচকে বললেন,
--ইশশিরে এত্ত দামী জিনিসটার এক্কেরে বারোটা বাজাই ফেলছে। কইসিলাম তো আগেই। তুমি পারবা না। তারপর তৃপ্তি ভরে গরুর মাংসের তরকারী দিয়ে ভাত খেলেন। উনার চেহারা দেখলেই বোঝা যায় তরকারীটা অনেক ভাল হয়েছে। রীণা মিটিমিটি হাসে।
-------
--মা, আজ মা দিবস। আপনার জন্য একটা শাড়ি এনেছি। দেখেন পছন্দ হয় কিনা।
--মা দিবস আবার কি? যতসব ফালতু ব্যাপার। খালি টেকা খরচ করার পাঁয়তারা। আইচ্চা আনছ যখন ফালাইতে তো আর পারি না।দেখি কি আনলা?
অ্যাহ! এইডা কি রঙ আনলা? তুমি এর চেয়ে ভালা কেমনে আনবা! কি আর করা! পড়ন তো লাগবোই। নইলে আমার পুলার এতোডা পয়সা পানিত যাইবো।
------
--মা, আপনার চশমা বার বার হারিয়ে যায়। তাই আরেকটা চশমা এনেছি আপনার জন্য। দেখেন কি সুন্দর ফ্রেম!
--একটা চশমা তো আছে। আরেকটা আনলা কেন? টাকার গাছ হইছে না? আর কি ফ্রেম আনছ এইটা? জোয়ান মানুষের ফ্রেম নিয়া আইছ।
জমিলা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলেন চশমাটা। চেহারা খুশিতে ঝলমল করছে। আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন। তারপর চশমাটা চোখে লাগিয়ে নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন।
-------
রীণার ভীষণ জ্বর আজ। সকালে অনেক চেষ্টা করেও মাথাটা তুলতে পারলো না। শফিক ঘরে নেই কাল থেকে। কোন একটা কাজে বাইরে গিয়েছে। এদিকে সকাল বেলা বউ এর কোন সারা নেই দেখে জমিলা বেগম চিৎকার শুরু করলেন।
--কি আইজ নাশতা টাশতা হইবো না নাকি। জামাই ঘরে নাই তাই নবাবজাদীর ঘুম এখনো ভাঙতেছে না। বলি, ঘরে যে একটা বুড়া মানুষ এতক্ষণ ধরে না খেয়ে বসে আছে কোন খবর আছে?
বলে রীণার ঘরের ভেজানো দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলেন তিনি। দেখলেন রীণা জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে কী জানি বিড়বিড় করছে। কিছুটা ঘাবড়ে গেলেন তিনি। তাড়াতাড়ি পাশে এসে বললেন,
---ও বউ কি হইসে তোমার?
মাথায় হাত দিয়ে দেখলেন জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। জ্ঞান নেই। জমিলা বেগম বিহ্বল হয়ে পড়লেন। তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে ফোন করে পানি ঢালতে লাগলেন রীণার মাথায়। বিকেলের দিকে রীণার জ্বর কিছুটা কমলো। চোখ মেলে দেখলো শাশুড়ি ওর মাথায় পানি ঢালছেন। ও খুব লজ্জা পেলো। বললো--
--মা আর লাগবে না। জ্বর কমেছে।
রীণাকে কথা বলতে দেখে জমিলা বেগম উপর দিকে চেয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন। তারপর রীণাকে একটা ধমক দিয়ে বললেন
--চুপ থাকো। জ্বর কমসে কি না সেটা আমি বুঝমু। তুমি মাতব্বরি কইরো না।
তারপর পানি ঢালা শেষ করে রীণার মাথাটা পরম যত্নে মুছে দিলেন তিনি। রীণা চেষ্টা করলো মাথাটা উঠাতে। কিন্তু পারলো না। ও অবাক হয়ে দেখলো শাশুড়ি প্রায় ওর সমস্ত শরীরের ভার তুলে নিলেন নিজের হাতে এবং বালিশের কাছে ওর সমস্ত শরীর বয়ে নিয়ে গিয়ে শুইয়ে দিলেন। রীণা বিস্ময়ভরা নয়নে তাকিয়ে রইলো। শাশুড়ির এই রূপ ওর অচেনা।
এরপর রান্নাঘর থেকে বাটিতে করে স্যুপ নিয়ে এলেন জমিলা বেগম। রীণা অস্বস্তি নিয়ে তাকিয়ে রইলো। স্যুপের জন্য হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল--
--কেন এত কষ্ট করছেন, মা?
জমিলা বেগম স্যুপের বাটি রীণার হাতে দিলেন না।
-- একদম চুপ থাকো। কোন কথা বলবা না।
বলে নিজেই রীণাকে মুখে তুলে খাইয়ে দিতে লাগলেন। রীণার দুচোখে জল টলমল করতে লাগলো। খাওয়া শেষ হলে তিনি রীণার মুখ মুছিয়ে দিলেন। এরপর ওর কাঁধে ধরে শুইয়ে দিতে যাবেন এমন সময় রীণা হঠাৎ শাশুড়িকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো।
জমিলা বেগম চমকে উঠে বললেন,
-- আরে আরে, হইল কী তোমার?
--আমাকে একটু কাঁদতে দিন মা। এই কান্না আনন্দের কান্না।
শাশুড়ির কাঁধে মাথা রেখে রীণা কাঁদতে থাকে অঝর ধারায় আর জমিলা বেগম মমতার পরশ বুলিয়ে দিতে থাকেন রীণার মাথায়। ততক্ষণে উনার চোখের কোণেও জমতে শুরু করেছে জলের কণা।
©নিভৃতা
রচনাকাল: ১৭-০২-২০১৭

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।






