somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোটগল্প - নার্গিস

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



ছবি: ইন্টারনেট

কী যে ফুটফুটে সুন্দর মেয়েটি! নাম নার্গিস। বয়স পাঁচ কি ছয় হবে। শায়লার বাসা থেকে কিছুটা দূরে একটি বস্তিতে ওর ঘর। ওর মা শায়লাদের বাসায় কাজ করে। নাম পারুল। এই মেয়ে ছাড়া তিন কুলে আর কেউ নেই পারুলের। নার্গিস যখন পেটে তখনই স্বামী ছেড়ে চলে যায়। এরপর ভাসতে ভাসতে এই বস্তিতে এসে ঠাঁই হয়েছে। নার্গিস ছোট্ট একটি কলস কাঙ্খে নিয়ে টুকটুক করে আসে মার সাথে। শায়লাকে খালা বলে ডাকে। শায়লার সাথে কলকলিয়ে কত কথা যে বলে। শায়লার মনটা মমতায় ভরে ওঠে। ওর একটি প্রিয় ছড়া আছে। শায়লা প্রতিদিনই ওকে বলে "নার্গিস তোর ছড়াটি বলতো।" ও ফিক করে হাসে। খুশিতে ঝিকমিক করে ওঠে ওর দুচোখ। যেনো অপেক্ষায় থাকে কখন শায়লা ছড়াটি বলতে বলবে। তারপর চুলের ঝুটি দুলিয়ে আদুরে গলায় বলে-- "নার্গিস কিসমিস, জামাই আইলে ভাত দিস, আলু, পটল, শিমেল বিস, মজা কইলা লাইন্ধা দিস"। শায়লা হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। সাথে নার্গিসও হাসতে থাকে। শায়লা বলে -- কি রে, জামাইকে শুধু আলু, পটল আর শিমের বিচি খাওয়াবি নাকি? পোলাও-কোরমা খাওয়াবি না?
নার্গিস হাসতে হাসতে বলে --
--খাওয়াইমু তো, সব খাওয়াইমু। পুলাও কুম্মা ছব খাওয়াইমু।
--নার্গিস, খওয়াইমু না, বল্ খাওয়াবো।
--খাওয়াবো।
--পুলাও না, পোলাও।
--পোলাও
--কুম্মা না কোরমা
--কোম্মা।

শায়লার চোখে জল আসে। নার্গিসকে ঝাপটা মেরে জড়িয়ে ধরে ও। অনেক অনেক আদর করে। নার্গিসেরও চোখ টলমল করে ওঠে। বলে
-- ও খালা কান্দেন ক্যান। আমি কইয়া দিলাম আর আইমু না।
--একদম চুপ। তুই না আসলে আমি যে মরে যাব।
--তাইলে কান্দা থামান।
নার্গিস ভাবে, খালার মাথা নষ্ট। এই হাসে এই কান্দে। তারপরেও খালারে তার খুব ভালা লাগে। কত্ত আদর করে তারে।
শায়লা চোখ মুছে হাসে। বলে --
-- চল, তোর চুল আঁচড়ে দেই। এই দেখ্ কি সুন্দর লাল ঝুটি এনেছি তোর জন্য। আনন্দে নেচে ওঠে নার্গিস। নার্গিসকে আরো অনেক কিছু দিতে ইচ্ছে করে শায়লার। কিন্তু দেয় না। গরীবের মেয়ের স্বভাব খারাপ করতে চায় না সে। যতক্ষণ পারুল কাজ করে ততক্ষণ এভাবেই নার্গিসের সাথে সময় কাটায় শায়লা। নার্গিসের সাথে যতক্ষণ থাকে ততক্ষণ বুকটা ভরে থাকে ওর। দুপুর একটার দিকে পারুল নার্গিসকে নিয়ে চলে যায়। তারপর আবার এক রাশ শূণ্যতা বুকে নিয়ে দিন কাটে।

সজল চাকরি করতে বলে। কিন্তু কোন কাজেই যে মন বসে না। বাসায়ই থাকতে ভাল লাগে এক রাশ শূণ্যতা বুকে নিয়ে। অনেক রাত করে বাড়ি ফেরে সজল। ইচ্ছে করে দেরিতে আসে সে। অফিসের পর বন্ধুদের সাথে কিছু সময় ব্যয় করে তারপর আসে। শায়লার দুচোখের শূণ্যতা পীড়া দেয় ওকে। এই পীড়া থেকে যতটা সম্ভব পালিয়ে থাকতে চায় সে। শায়লা মনে মনে খুশিই হয় সজলের দেরিতে আসাতে। সজল যতই বলুক ওর কোন কষ্ট নেই তবু ওর দুচোখে কষ্টের ছাপ শায়লা ঠিকই দেখতে পায়। দুজনের মধ্যে প্রগাঢ় ভালবাসা। একজন আরেকজনকে ভালভাবেই বোঝে, জানে। একজনের মনে কী চলছে না বললেও অন্যজন ঠিকই বুঝে যায়। দুজনের কষ্ট দুজনের কষ্টের বোঝা আরো বাড়িয়ে তোলে।

মাঝে মাঝে সজল শায়লাকে নিয়ে বাইরে খেতে যায়। মাঝে মাঝে পার্কে যায়। কখনো বা রিকশার হুট ফেলে ঘুরে বেড়ায়। কিন্তু শূণ্যতার সে দেয়াল কিছুতেই যেনো ভাঙতে চায় না। মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ায় শায়লা। গ্রীল ধরে তাকিয়ে থাকে আকাশের দিকে। কখনো জোছনা, কখনো তারা ভরা আকাশ টানে ওকে। মন কেমন করে। নীরব এক দীর্ঘশ্বাস বুকের গভীর থেকে বেরিয়ে আসে। পেছনে এসে চুপটি করে দাঁড়ায় সজল। কাঁধে হাত রাখে। সজলের কাঁধে মাথা রাখে শায়লা। দুজনে একসাথে আকাশ দেখে কোন কথা না বলে। দুজনের চোখে জল জমতে শুরু করে। ঝাপসা হয়ে আসে আকাশ।
-----
খেতে বসলে সজল অফিসের নানান গল্প বলে।
--জানো শায়লা রফিক সাহেবের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে।
--সে কি! কই বিয়ের দাওয়াত তো পেলাম না।
--দাওয়াত পাবে কী করে? কোন অনুষ্ঠানই তো হয়নি। মেয়ে কোর্ট ম্যারেজ করেছে লুকিয়ে। লোকটা একেবারে ভেঙে পড়েছে। বড় আদরের ছিলো মেয়েটা।
শায়লার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ে।
--সজল আমরাও তো বাবা মার কত আদরের ছিলাম। আমরাও তো পালিয়ে বিয়ে করেছি। আমাদের বাবা মাও তো কত কষ্ট পেয়েছেন।
হয়তো তাদের অভিশাপই লেগেছে। তাই আজ আমরা সন্তানহীন।
বলে কান্নায় ভেঙে পড়ে ও। সজল কী বলবে ভেবে পায় না। তার বুকটা কষ্টে ফেটে যায়। তবু সে শায়লাকে বুঝতে দেয় না। বলে
--কী যে বল না তুমি! বাবা মা কি কখনো সন্তানদের অভিশাপ দিতে পারে?
--তাহলে কী পাপে আমাদের এই শাস্তি হল বলো।আমাদের কারোরই তো কোন সমস্যা নেই। তবে কেন আজও আমাদের কোল খালি?
-- আমাদের কোল ভরবে একদিন দেখে নিয়ো তুমি।
--আর কবে? দশ বছর হয়ে গেলো আমাদের বিয়ের।
--তো কী হয়েছে? আমরা কি বুড়ো হয়ে গেছি নাকি?
বলে হাসে সজল। এই কথায় শায়লা একটু সান্ত্বনা পায়। ওর চোখে আবার আশার ঝিলিক দেখা যায়। সজল বলে
--এবার চোখটা মুছো তো ডারলিং। তোমার চোখে জল একদম মানায় না।
শায়লা হেসে চোখ মুছে। এভাবেই শূণ্যতায়, ভালবাসায়, আশায় ওরা বেঁচে থাকে। স্বপ্ন দেখে, স্বপ্ন ভাঙে, স্বপ্ন জুড়ে।

সেদিন ছিল শুক্রবার। ছুটির দিন। সজল তাই ঘরে। পারুল যথারীতি কাজে এসেছে নার্গিসকে সাথে নিয়ে। শায়লা দেখলো পারুলের মুখটা যেন কিছুটা ফ্যাকাসে। কী হয়েছে জিজ্ঞেস করলে বলল কিছু হয়নি। পারুলের প্রায়ই বুকে ব্যথা থাকে। ডাক্তার দেখানোর জন্য অনেক জোর করেছে শায়লা। কিন্তু পারুল কিছুতেই ডাক্তার দেখাতে চায় না। শায়লা আর কথা না বলে নার্গিসকে নিয়ে মেতে উঠলো। এই সময়টা সজলের খুব ভাল লাগে। কারন এই সময়টায় শায়লার চোখে মুখে শূণ্যতার বদলে এক অসীম আনন্দ খেলা করে। নার্গিসও কি সুন্দর টুকটুক করে কথা বলে। ভীষণ মায়া লাগে ওর। এমনিতেই খুব সুন্দর মেয়েটি। তার উপর শায়লার ভালবাসায় মেয়েটি এখন অনেক বদলে গেছে। বস্তির মেয়ে বলে এখন আর মনেই হয় না। হঠাৎ রান্নাঘরে ভারী কিছু পড়ার শব্দ হয়। ওরা ছুটে যায় রান্নাঘরে। দেখে মেঝেতে লুটিয়ে পড়ে আছে জ্ঞানশূণ্য পারুল। হাসপাতাল পর্যন্ত আর যাওয়া হয় না। পথেই মৃত্যু হয় পারুলের।
-----
নার্গিস শায়লার কাছেই আছে মা মারা যাওয়ার পর থেকে। পথ চেয়ে থাকে মায়ের। ওর চোখে থাকে কান্নার ঢল। বুক জুড়ে মায়ের শূণ্যতা। মুখে একই প্রশ্ন --
--মা আসে না ক্যান খালা? ক্যান কবরে থাকে? মা কি আমার উপরে রাগ করসে?
শায়লা কি বলবে ভেবে পায় না। কী করে সে এই কচি প্রাণের পাহাড় সমান কষ্টের বোঝা হালকা করবে। নার্গিসের কষ্ট ভোলানোর জন্য কত কী যে করে ও। কখনো শিশু পার্কে নিয়ে যায়, কখনো চিড়িয়াখানায়। কখনো শপিং করে। এটা সেটা কত কী যে কিনে দেয়। ধীরে ধীরে যেন মা হারানোর কষ্টটা ফিকে হতে থাকে নার্গিসের।


শায়লা আর সজল আইনগতভাবে দত্তক নিয়ে নেয় নার্গিসকে। তারা নার্গিসকে ভালো স্কুলে ভর্তি করে। শায়লা প্রতি সকালে নার্গিসকে মজার মজার টিফিন বানিয়ে দেয়। স্কুলের জন্য রেডি করে। চুল বেঁধে দেয়। জুতো মুজো পড়িয়ে দেয়। ব্যাগ রেডি করে দেয়। তারপর ব্যাগের ভেতর টিফিন রাখতে রাখতে বলে --
--বল তো মামনি আজ টিফিনে তোমাকে কী দিয়েছি?
কিছুক্ষণ গালে আঙুল দিয়ে চিন্তা করে নার্গিস। তারপর বলে --
--উমমমম। ম্যাগি নুডলস।
--উহু। হলো না সোনা। আজ দিয়েছি চিকেন বল।

"ইয়াম্মি" বলে নার্গিস জড়িয়ে ধরে শায়লার গালে চুমু খায়। নার্গিস এখন পুরোপুরি শুদ্ধ করে কথা বলে। শায়লাকে মামনি আর সজলকে বাবাই বলে ডাকে। স্কুলে কখনো শায়লা দিয়ে আসে, কখনো সজল অফিস যাওয়ার পথে নামিয়ে দিয়ে যায়। তারপর শায়লা দুপুরের রান্না করতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। মেয়েটা এসে খাবে। এটা সেটা কত কী রাঁধে। রান্না শেষ করে মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে আসে। গোসল করায়, খাওয়ায়। এভাবেই নার্গিসময় শায়লার দিন কেটে যায়। সজল এখন আর রাতে দেরিতে ফিরে না। সন্ধ্যা হতেই চলে আসে। সাথে করে নিয়ে আসে ক্যাডবেরি। মাঝেমাঝে এটা সেটা খেলনাও আনে। এসেই চিৎকার করে নার্গিসকে ডাকে--
-- কই আমার মামনি, চুলবুলি, তুলতুলি?
সজল ঠিকই জানে নার্গিস আড়ালে কোথাও লুকিয়ে আছে। সজল কাছে আসতেই সে "ভুক" করে সজলকে ভয় দেখায়। সজল চমকে ওঠার ভান করে। তারপর নার্গিসকে জড়িয়ে ধরে অনেক আদর করে। নার্গিস বলে--
--বাবাই আমার চকলেট কোথায়?
সজল জিভে কামড় দিয়ে কান ধরে বলে--
--আল্লাহ! ভুলে গেছি মা।
নার্গিস মিটিমিটি হেসে সজলের পকেটে হাত দিয়ে বলে--
--বাবাই তুমি না খুব দুষ্ট হয়েছ। এটা কী?

শায়লা দাঁড়িয়ে বাবা মেয়ের কান্ড দেখে আর হাসে। তার বুকটা ভরে ওঠে আনন্দে। আর কোন শূণ্যতা তাদের মধ্যে দেয়াল হয়ে দাঁড়ায় না। রাতে সজল আর শায়লা মাঝখানে নার্গিস নামক সুখ নিয়ে তৃপ্তির ঘুম ঘুমায়। মাঝরাতে ঘুম ভেঙে ব্যালকনিতে গিয়ে আর তারা কাঁদে না। ছুটির দিনে নার্গিসকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায় ওরা। অনেক মজা করে। ছবি তোলে। বাইরেই খায়। এভাবেই কেটে যায় দুটি বছর।
----
একদিন সজল স্কুলে আসে নার্গিসকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। নার্গিস অবাক হয়ে বলে ---
"বাবাই তুমি?"
সজল মুখ ভরা হাসি নিয়ে বলে,
-- হ্যাঁ আমি, তোর মামনি একটু অসুস্থ, তাই।
নার্গিস কিছু বুঝতে পারে না। বলে,
--মামনি অসুস্থ তো তুমি এত খুশি কেন বাবাই?
সজল আবার হাসে। হেসে ওকে জড়িয়ে ধরে।
--কারন আজ আমার খুব খুশির দিন। তোর একটা ছোট্ট খেলার সাথি আসবে।
নার্গিস তারপরেও কিছু বুঝে না। বাসায় এসে শায়লার কাছে ছুটে যায়। দেখে শায়লা বিছানায় শুয়ে আছে। কিন্তু তার মুখেও হাসি। সে পাশে গিয়ে বলে
--কী হয়েছে তোমার মামনি?
--কিছু না সোনা। একটু শরীর খারাপ।
--শরীর খারাপ হলে কি কেউ এত খুশি থাকে?
--খুশির কারন তোর একটা খেলার সাথি আসবে।
--কই সে? নাম কী?
শায়লা তার পেটে হাত দিয়ে বলে
--এই যে এখানে। এখানে সে কিছুদিন থাকবে।
তারপর আসবে।
নার্গিস খুশিতে নেচে উঠে।
-----
নার্গিসের খুব মন খারাপ থাকে আজকাল। টিফিন দেয়ার সময় মামনি আজকাল তাকে কিছুই জিজ্ঞেস করে না। টিফিনও প্রতিদিন একই থাকে। ব্রেড আর জেলি। স্কুল থেকে এলে জিজ্ঞেস করে না আজ স্কুলে কী কী হল। ছড়া বলে না। আদর করে খাওয়ায় না। মামনি আর আগের মত ভালবাসে না তাকে। নার্গিস চুপি চুপি কাঁদে আর ভাবে--মামনি তো অসুস্থ। তাই হয়তো ভুলে যায়।কিন্তু মামনি যখন ভালো থাকে তখনও তো আগের মত তার সাথে কথা বলে না। আদর করে না। ছড়া বলে না।

সজল কদিন ধরেই লক্ষ্য করছে নার্গিস একটু অন্যরকম হয়ে গেছে। আগের মত লুকিয়ে থাকে না। ভয় দেখায় না। চকলেট খোঁজে না। চকলেট দিলে খুশি হয় না আগের মত। সেদিন বাসায় এসে সারা ঘর খুঁজে পেলো না নার্গিসকে। শেষে ব্যালকনিতে গিয়ে দেখে আকাশের দিকে তাকিয়ে উদাস চোখে তাকিয়ে আছে নার্গিস। সজল কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরে বলে--
-- কি দেখছ মামনি? ঠান্ডার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছ। ঠান্ডা লেগে যাবে তো।
--মা কে খুঁজি বাবাই।
বুকটা ছ্যাৎ করে উঠে সজলের। বলে
--তোর মা তো ঘরেই আছে পাগলি।
--যে মা মরে গেছে সেই মা, বাবাই।
সজলের মনটা কেমন করে উঠে। কোলে তোলে ঘরের ভেতরে নিয়ে আসে নার্গিসকে। ক্যাডবেরি দেয়। নার্গিস ক্যাডবেরি হাতে নেয় কিন্তু খায় না।
----
--শায়লা বলো তো তোমার মাতৃত্বের সাধ কে ঘোচালো?
শায়লা অবাক হয়। বলে
--কী বলছ এই সব?
--বলো শায়লা।
শায়লা নিজের পেটে হাত দিয়ে বলে
--এই যে, যে আসছে আমাদের সন্তান। আমাদের কতদিনের স্বপ্ন, সাধনা।
--ভুল শায়লা। খুব বড় ভুল করে ফেললে তুমি। তোমাকে মাতৃত্বের সাধ যে পাইয়ে দিয়েছে সে হলো নার্গিস। যে আমাদের সব শূণ্যতা ঘুচিয়ে দিয়েছে সে হলো নার্গিস। যে আমাদের ভেতরের সব দূরত্ব মিটিয়ে দিয়ে আমাদের আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিয়েছে সে হলো নার্গিস। আমরা তো মরেই গিয়েছিলাম, শায়লা। নার্গিস হলো আমাদের সেই জিয়ন কাঠি যে আমাদের নতুন জীবন দিয়েছে। আমাদের আবার বাঁচতে শিখিয়েছে। আর তুমি কী করলে শায়লা? যে আমাদের নতুন করে বাঁচতে শেখালো তাকেই তুমি মেরে ফেললে?

শায়লা স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ বসে রইলো। তারপর ছুটে গেলো নার্গিসের কাছে। গিয়ে দেখলো নার্গিস সোফাতে ঘুমিয়ে পড়েছে। মলিন চেহারা। অবহেলার ছাপ। অনেকটা শুকিয়েও গেছে। এতদিন যেনো একটা ঘোরের মধ্যে ছিলো শায়লা। ভালো করে তাকিয়েও দেখেনি মেয়ের মুখের দিকে। নার্গিসের চোখের কোণে জলের শুকনো দাগ। হাহাকার করে উঠলো শায়লার মন। নার্গিসকে জড়িয়ে ধরে অঝরে কাঁদতে লাগলো সে। নার্গিসের ঘুম ভেঙে যায়। সে চমকে উঠে বলে
--কী হয়েছে মামনি? কাঁদছ কেনো?
সজল পেছনেই দাঁড়ানো ছিলো। সজলের দিকে তাকিয়ে বললো,
-- নিশ্চই তুমি মামনিকে বকেছ বাবাই? তুমি একটা পঁচা। আমি তোমার সাথে আর কথা বলবো না। তুমি কেঁদো না মামনি। আমি বাবাইকে বকে দিয়েছি।
বলে শায়লার চোখের জল মুছে দেয় নার্গিস।
--আমাকে ক্ষমা করে দে মা। আমি তোকে শেষ করে ফেলেছি। আর কোনদিনও এমন ভুল হবে না লক্ষ্মী মা আমার।
বলে দুহাতের মুঠোয় নার্গিসের মুখ নিয়ে সারা মুখে পাগলের মত চুমু খেতে থাকে শায়লা। সজলের চোখ দিয়েও টপটপ করে কয়েক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে।
-----
তিন বছর পরের দৃশ্য। শায়লা নার্গিসের পেছন পেছন ছুটছে দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে।
--খেয়ে নে মা আমার। লক্ষ্মীটি। আর জ্বালাস না মাকে।
--আমি খাবো না মামনি। দুধ আমার ভাল লাগে না। পঁচা গন্ধ করে। ওটা তুমি ভাইকে খাইয়ে দাও।
--নাক বন্ধ করে খেয়ে নে মা।
শায়লা নাছরবান্দা। মেয়েকে দুধ খাইয়েই ছাড়বে।
শেষ পর্যন্ত হার মানে নার্গিস। নাক বন্ধ করে মুখ বিকৃত করে কোন রকমে দুধটা খায় সে।
ওদিকে সজলের কোলে বসে মা আর বোনের কান্ড দেখে হাত তালি দিয়ে খিলখিল করে হাসে আড়াই বছরের নাহিন, সজল আর শায়লার ছেলে।
সজল আর শায়লার ড্রয়িং রুমে ঝুলছে একটি ফেমিলি ফটো। বাবার কোলে নাহিন আর মায়ের কোলে নার্গিস। সবার মুখে অকৃত্রিম হাসির ছটা।

রচনাকাল - ২২-০২-২০১৭

© নিভৃতা
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫৫
১৫টি মন্তব্য ১৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩



মেট্রোরেল পুরো বাংলাদেশের জন্য শান্তির বিষয়।
শুধু মেট্রোরেল না পদ্মাসেতুও। দারুণ এক কাজ হয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরা যেতে খবর হয়ে যেতো। তিন ঘন্টার বেশি সময় লাগতো। এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারণে অকারণে ছবি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

আমি ছবি তুলি। পরে সেগুলো দেখি। বেশ ভালো লাগে। ফোনের স্টোরেজ এ আজ দেখলাম মোট ছবি ৬৮৯৩ টি। ব্লগে কখনোই ছবি দিয়ে লেখা হয়নি। আজ মাইদুল ভাইয়ের লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারখানা তো রাজনীতি করে না !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:৪১


৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেকদিন মনে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের বড় বাঁকগুলোর মতো এই পরিবর্তনেরও একটা দাম ছিল, যেটার হিসাব আমরা এখনও পুরোপুরি মেলাতে পারিনি। ক্ষমতার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ বাবার প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:০৩



একটা মাস হয়ে গেল।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে রিপা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, নার্সরা ডিউটি বদলাচ্ছে, ডাক্তাররা আসছেন, যাচ্ছেন। শুধু একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আনন্দ ও শোকে কবিতা সংকলন - অক্টোবর ২০২৫

লিখেছেন বিজন রয়, ২৯ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:২৫



আনন্দ বিশ্বকাপ ফুটবল!
শোক ভেনেজুয়েলা ভূমিকম্প!!


এই আনন্দ ও শোকে কবিতা সংকলন পোস্ট অক্টোবর ২০২৫! অনেক দেরি হয়ে গেল! হ্যাঁ অক্টোবর ২০২৫ এর সব কবিতা সংরক্ষিত ছিল, কিন্ত সময়ের অভাবে সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×